কিছু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত চলছে: চিফ প্রসিকিউটর
· Prothom Alo

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে কিছু সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে একটি তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো.আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে কতিপয় সাংবাদিকের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ আছে। কতিপয় সাংবাদিক তৎকালীন সরকারের সময় বিভিন্ন অপকর্মকে সহায়তা করেছে।’
Visit casino-promo.biz for more information.
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে আজ বৃহস্পতিবার এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর এ কথা বলেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শতাধিক ব্যক্তিকে গুম করে হত্যার ঘটনায় মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আজ মেজর (অব.) মো.সাব্বির রহমান ওসমানী ১৩তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। জবানবন্দিতে সাব্বির রহমান কী বলেছেন, তা গণমাধ্যমকে জানাতে চিফ প্রসিকিউটর এই ব্রিফিংয়ে আসেন।
জবানবন্দিতে সাংবাদিকদের প্রসঙ্গ টেনেছেন মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী। এ প্রসঙ্গে ব্রিফিংয়ে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘আমাদের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে একটা ইনভেস্টিগেশন (তদন্ত) চলছে এবং পরবর্তীকালে আজকের এই সাক্ষীর সাক্ষ্য হয়তো সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে।’
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করার নামে কিছু উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় তিন সাংবাদিক গ্রেপ্তার আছেন। তাঁরা হলেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্ত; একাত্তর টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু এবং একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ও উপস্থাপক ফারজানা রুপা।
এ মামলার বিষয়ে গত ১৭ আগস্ট প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনে কয়েকজন সাংবাদিক প্রশ্ন করার নামে কিছু উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়েছিলেন। যে বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতেই শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের ‘রাজাকার’, ‘রাজাকারের বাচ্চা’, ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ বলেছিলেন।
এ ছাড়া রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাংবাদিক মোজাম্মেল বাবু ও ফারজানা রুপাকে আসামি করা হয়েছে।
‘ট্রাইব্যুনালে কিছু বিতর্কিত সাংবাদিকের বিচার হওয়া উচিত’
গুম–খুনের ঘটনায় জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মামলার সাক্ষী মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী আজ জবানবন্দিতে বলেছেন, ২০১২ সালের মার্চ মাসে জিয়াউল আহসানের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় সুন্দরবনের ভোলা নদী–সংলগ্ন মরা ভোলা এলাকায় একটি ত্রিমাত্রিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল। সেই অভিযান পরিচালনার আগের রাতে র্যাব গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের একটি দল আগেই মরা ভোলার উদ্দেশে রওনা দেয়। অভিযানস্থল চিহ্নিত করে এলাকা ঘিরে ফেলার সময় বনের ভেতর থেকে ২ থেকে ৩টি গুলির শব্দ শোনা যায়। এই শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে জিয়াউল আহসানের নির্দেশে মূল আভিযানিক দল বন লক্ষ্য করে গুলি শুরু করে। প্রায় ৩০ মিনিট পর গুলি থামে। স্থানীয় থানা–পুলিশের মাধ্যমে বন তল্লাশি করে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অস্ত্র, গোলাবারুদ ও পাঁচটি মৃতদেহ উদ্ধার দেখানো হয়।
সাক্ষী মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানী জবানবন্দিতে আরও বলেন, এই অভিযানে র্যাব সদর দপ্তরের তৎকালীন এডিজি (অপস) কর্নেল মুজিব, আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মোহাম্মদ সোহায়েল এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকেরা অংশগ্রহণ করেন। উপস্থিত ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকেরা সোহায়েলের আমন্ত্রণে বরিশালে র্যাব-৮–এ এসে উপস্থিত হতেন।
সাংবাদিকদের বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পরিয়ে পৃথক ট্রলারে করে মূল আভিযানিক দলের একদম শেষের দিকে রাখা হতো উল্লেখ করে সাব্বির রহমান ওসমানী বলেন, ফায়ারিং শেষে তল্লাশি অভিযান পরিচালনার সময় জিয়াউল ও সোহায়েল সাংবাদিকদের নিয়ে ঘটনাস্থল ঘুরে দেখতেন।
জিয়াউলের তিনটি ‘এনকাউন্টার’ বা বন্দুকযুদ্ধ অভিযান দেখে সাব্বির রহমান ওসমানীর মনে হয়েছে সব সাজানো ছিল। তিনি এ বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, কারণ প্রতিটি অভিযান পরিচালনার আগেই র্যাবের গোয়েন্দা শাখার একটি দল অভিযানস্থলে চলে যেত। বনের ভেতর থেকে বনদস্যুদের গুলি এলে সেটি আসার কথা একনলা বা দোনলা বন্দুক থেকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অটোমেটিক (স্বয়ংক্রিয়) অস্ত্র দিয়ে গুলির শব্দ পেয়েছেন তিনি। এ ধরনের অস্ত্র কোনো অবস্থাতেই দস্যু বাহিনীর কাছে ছিল না। ঘটনার সময় ধারণকৃত বিভিন্ন সাংবাদিকের আলোকচিত্র ও ভিডিও ফুটেজ (নিশানখালী, কটকা ও মরা ভোলা) দেখার পর তাঁর মনে হয়েছে, মূল আভিযানিক দল যখন অভিযানস্থলে গোলাগুলিতে ব্যস্ত তখন র্যাব সদর দপ্তর থেকে আসা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও তাঁদের সঙ্গের সদস্যরা কোনো ধরনের অস্ত্র, বুলেট প্রুফ জ্যাকেট, বুলেট প্রুফ হেলমেট ছাড়াই চলাফেরা করতেন; যা ‘স্টেইজড অপারেশন’ (সাজানো অভিযান)। কোনোভাবেই নিরাপত্তার ঝুঁকিকে ছাড় দিয়ে অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
এই সাক্ষীর জবানবন্দির পরই চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে ব্রিফিং করেন। সাক্ষী মেজর (অব.) সাব্বির রহমান ওসমানীর জবানবন্দির এই অংশকে ইঙ্গিত করে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, এখানে সাংবাদিকদেরও একধরনের ভূমিকার কথা সাক্ষী বলেছেন। সাংবাদিকদের নিয়ে যাওয়া হতো। পরে সোহায়েল তাদের ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই ঘটনাগুলো দেখাতেন। সাংবাদিকেরা কি প্রত্যক্ষভাবে এ ধরনের কাজগুলোর বয়ান তৈরিতে সহায়তা করেছে?
এর জবাবে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, র্যাবের গণমাধ্যম শাখার প্রধান ছিলেন সোহায়েল। তিনি পছন্দের কিছু সাংবাদিককে বা সংবাদমাধ্যমকে আমন্ত্রণ করতেন। তাঁদের নিয়ে অভিযানস্থল পর্যন্ত যেতেন। সাংবাদিকদের লাইফ জ্যাকেট দিতেন। সাংবাদিকদের যেভাবে ব্রিফ করা হতো, সেভাবে তাঁরা বা সেই গণমাধ্যমগুলো প্রচার করতেন। এই কর্মকাণ্ডের পেছনে তৎকালীন সময়ের কিছু বিতর্কিত গণমাধ্যম অথবা কিছু বিতর্কিত সাংবাদিক; যাঁরা এই কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা করেছেন, অ্যাবেটমেন্ট (সহায়তা) করেছেন, তাঁরাও কিন্তু সমভাবে অপরাধী। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তাঁদেরও বিচার হওয়া উচিত। এটাও মানবতাবিরোধী অপরাধ।
আরেক প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এই সাক্ষী কোনো গণমাধ্যমের নাম উল্লেখ করেননি। কোনো সাংবাদিকের নাম উল্লেখ করেননি। তবে তৎকালীন সময়ে যেসব সাংবাদিক অথবা যাঁরা অভিযানস্থল পর্যন্ত গিয়েছেন, তাঁদের ফুটেজ সাংবাদিকদের কাছে আছে। সাংবাদিকদের কাছ থেকেই এই ফুটেজ সংগ্রহ করে পরবর্তী তদন্তে সহায়তা পাওয়া যাবে।