স্টিল মিলের ধ্বংসস্তূপে এখন বৈচিত্র্যময় শিল্প

· Prothom Alo

একসময় এখানে আগুনে গলত লোহার টুকরা। বিশাল চিমনি দিয়ে উঠত ধোঁয়া। হাজারো শ্রমিকের কর্মচাঞ্চল্যে মুখর থাকত কর্ণফুলী নদীর তীরের চট্টগ্রাম স্টিল মিলস। সেই কারখানা এখন আর নেই। তবে কারখানাটির জায়গায় শিল্পের কর্মকাণ্ড থেমে থাকেনি।

Visit aportal.club for more information.

পুরোনো স্টিল মিলের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে গড়ে উঠেছে সারি সারি কারখানা। এসব কারখানায় তৈরি হচ্ছে পর্বতারোহীর সাইকেল, তাঁবু, খনিশ্রমিকের জুতা, ঝুলন্ত বিছানা (হ্যামক), স্লিপিং ব্যাগ, গাড়ির কভার, ভারোত্তোলনের বেল্ট। চট্টগ্রাম স্টিল মিলস এখন পরিচিত কর্ণফুলী ইপিজেড নামে। এই ইপিজেডের কারখানায় তৈরি সব পণ্যই রপ্তানি হয় বিদেশে। সর্বশেষ গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিশ্বের ৬ মহাদেশের ৮০টি দেশ ও অঞ্চলে রপ্তানি হয়েছে কর্ণফুলী ইপিজেডের পণ্য। এই তালিকায় আছে ইউরোপের ২৯ দেশ, যুক্তরাষ্ট্রসহ উত্তর আমেরিকার ছয় দেশ।

বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ভারী শিল্পের জায়গা কীভাবে নতুন ধরনের রপ্তানি শিল্পকেন্দ্রে রূপ নিল গত শনিবার সরেজমিনে ঘুরে সেই চিত্রই পাওয়া গেল। ২০০৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু হয় কর্ণফুলী ইপিজেডের। বিশেষায়িত এই শিল্পাঞ্চল এরই মধ্যে দুই দশক পূর্ণ করেছে।

স্টিল মিল থেকে শিল্পাঞ্চল

ষাটের দশকে কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে উঠে চট্টগ্রাম স্টিল মিলস। ১৯৬৭ সালে কারখানাটিতে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়। সরকারি এই কারখানায় বিলেট, পাতসহ নানা ধরনের ইস্পাতপণ্য তৈরি হতো। সময়ের ব্যবধানে আর্থিক সংকটে পড়ে মিলটি। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়েও বড় ক্ষতি হয় মিলটির। আর্থিক সংকটে পড়ে ১৯৯৯ সালের ৭ জুলাই কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০০৩ সালে সরকার সেখানে ইপিজেড (রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল) গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। পুরোনো স্থাপনা সরিয়ে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পর ২০০৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া কর্ণফুলী ইপিজেডের উদ্বোধন করেন। বর্তমানে প্রায় ২০৯ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত এই ইপিজেডে মোট বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ৭৮ কোটি ৭৩ লাখ মার্কিন ডলার। কর্মসংস্থান হয়েছে ৮০ হাজার লোকের।

রেসিং সাইকেল থেকে ঘোড়ার স্যাডল প্যাড

বাংলাদেশের রপ্তানি বললেই প্রথমে মনে আসে তৈরি পোশাকের কথা। কর্ণফুলী ইপিজেডেও পোশাক কারখানা রয়েছে। তবে পোশাকের পাশাপাশি রয়েছে নানা বৈচিত্র্যময় পণ্য তৈরির কারখানাও। এসব পণ্যও রপ্তানি হচ্ছে।

গত শনিবার সরেজমিন দেখা যায়, ইপিজেডের করভো সাইকেলস লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের সাইকেল। কারখানাতে প্রতিদিন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ সাইকেল তৈরি হয়। গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ১ কোটি ১৮ লাখ ডলার মূল্যের সাইকেল রপ্তানি করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক দেব কুমার দাশ প্রথম আলোকে বলেন, মাউন্টেন, রেসিং, ফোল্ডিং সাইকেলসহ বিশেষায়িত সাইকেল তৈরি হয় তাঁদের কারখানায়। এসব সাইকেল রপ্তানি হয় ইউরোপের বাজারে। প্রতিটি সাইকেলের গড় রপ্তানিমূল্য ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

কর্ণফুলী ইপিজেডে বৈচিত্র্যময় পণ্যে তৈরির আরেক প্রতিষ্ঠান অফমা ক্যাম্প লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি ক্যাম্পিংয়ে ব্যবহৃত নানা ধরনের সামগ্রী তৈরি ও রপ্তানি করে। তাদের রপ্তানির তালিকায় রয়েছে হ্যামক বা ঝুলন্ত বিছানা, স্লিপিং ব্যাগ, বালিশ, ঘোড়ার স্যাডল প্যাড ইত্যাদি। বিশ্বের ২১টি দেশে তাদের পণ্য রপ্তানি হয়। গত অর্থবছর প্রতিষ্ঠানটি রপ্তানি করেছে ৪ কোটি ২৫ লাখ ডলারের পণ্য। অফমা ক্যাম্প লিমিটেডের বড় ক্রেতা ফরাসি ক্রীড়া ও আউটডোর পণ্যের খুচরা বিক্রেতা ডিক্যাথেলন।

সরেজমিনে এই ইপিজেডের পার্ক বাংলাদেশ লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখা যায়, তাদের কারখানায় তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের ব্যাগ ও ভারোত্তোলনের বেল্ট। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা জানান, ভারোত্তোলনের সময় কোমর ও পিঠে সাপোর্ট দিতে এই বেল্ট ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণ কোরিয়ার মালিকানাধীন এই কারখানা গত অর্থবছরে ৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজর জেনারেল (অব) সৈয়দ ইউসুফ মাহবুব আলী সাংবাদিকদের জানান, সার্ফিং ব্যাগ, ট্রাভেল ব্রাগ, ব্যাকপ্যাক, লেডিস ব্যাগ থেকে শুরু করে হরেক রকমের ব্যাগ তৈরি হয় তাঁদের কারখানায়। প্রতি মাসে ছয় লাখ পিস ব্যাগ তৈরি হচ্ছে এই কারখানায়।

কর্ণফুলী ইপিজেডের বিদেশি মালিকানাধীন আরেক প্রতিষ্ঠান শিন চ্যাং শুজ (বিডি) লিমিটেডে তৈরি হয় নানা ধরনের সেইফটি শু। কারখানাটির ব্যবস্থাপক দীপংকর দাশ জানান, এই কারখানা থেকে মাইনিং শু (খননকাজে শ্রমিকদের ব্যবহারের জুতা) ও ভারী কাজে ব্যবহারের জুতা তৈরি হয়।

কর্ণফুলী ইপিজেড থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয় কাঠের চেয়ারসহ নানা ধরনের আসবাবসামগ্রী। ট্রেন্ডেক্স ফার্নিচার নামের একটি প্রতিষ্ঠান এসব আসবাব রপ্তানি করে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ভ্রমণপ্রিয় মানুষের জন্য তাঁবু যাচ্ছে এই ইপিজেড থেকে। গত অর্থবছরে ৩ কোটি ৭২ লাখ ডলারের তাঁবু রপ্তানি করেছে এইচকেডি আউটডোর ইনোভেশনস লিমিটেডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

শুধু বৈচিত্র্যময় পণ্যই নয়, পোশাকও তৈরি হচ্ছে এই ইপিজেডে। ইপিজেডে অবস্থিত ক্যানপার্ক বাংলাদেশ লিমিটেডের কারখানা ঘুরে দেখা যায়, সারি সারি লাইনে কারখানাটির শ্রমিকেরা পোশাক তৈরির কাজে ব্যস্ত।

ক্যানপার্কের পরিচালক (মানবসম্পদ) মো. খলিলুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, কর্ণফুলী ইপিজেডে ১১ হাজার শ্রমিক কাজ করছেন তাঁদের কারখানায়। এনবিআরের তথ্য জানাচ্ছে, গত অর্থবছরে এই ইপিজেড থেকে ক্যানপার্ক রপ্তানি করেছে প্রায় ২৮ কোটি ডলারের পণ্য। রাল্ফ লরেন, মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার, হুগো বস, কন্টুরের মতো বিখ্যাত ক্রেতারা ক্যানপার্ক থেকে পোশাক কিনছে।

সব মিলিয়ে গত অর্থবছরে কর্ণফুলী ইপিজেড থেকে ১২৩ কোটি ডলার পণ্য রপ্তানি হয়েছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত অর্থবছর পর্যন্ত মোট রপ্তানি হয়েছে ১ হাজার ৪১৬ কোটি ডলারের পণ্য।

জানতে চাইলে কর্ণফুলী ইপিজেডের নির্বাহী পরিচালক মাহবুব আহমেদ সিদ্দিক জানান, পোশাকের গণ্ডি পেরিয়ে কেইপিজেড এখন উচ্চমূল্যের বৈচিত্র্যময় পণ্য তৈরির কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

বদলে যাওয়া শিল্পকেন্দ্র

চট্টগ্রাম স্টিল মিলসে একসময় সর্বোচ্চ প্রায় ১০ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। মিলটি বন্ধ হওয়ার সময় সেখানে কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ছিল প্রায় দুই হাজার। আর বন্ধ সেই মিলে ইপিজেড গড়ে তোলার পর এখন সেখানে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার মানুষের।

কর্ণফুলী ইপিজেডের দুই দশক পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ বা বেপজার আয়োজনে গত শনিবার পতেঙ্গায় সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করে সংস্থাটি। কেইপিজেডের অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক মো. খালেদ চৌধুরীর সঞ্চালনায় কর্ণফুলী ইপিজেডের দুই দশকের বিনিয়োগ, রপ্তানি, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বেপজার নির্বাহী পরিচালক আনোয়ার পারভেজ।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বর্তমানে কর্ণফুলী ইপিজেডে চালু শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে ৪১টি। এর মধ্যে ২৯টি শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন, তিনটি যৌথ এবং ৯টি দেশীয় মালিকানার। আরও পাঁচটি প্রতিষ্ঠান চালুর পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশসহ ১৪টি দেশের বিনিয়োগ রয়েছে কর্ণফুলী ইপিজেডে।

শুধু কর্মসংস্থান নয়, ইপিজেড ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ছে। ইপিজেডে কর্মরত ৮০ হাজার শ্রমিকের একজন পাওলো ফুটওয়্যার (বিডি) লিমিটেডের হাফিজা আকতার। তিনি জানান, বরিশাল থেকে আসার পর এই ইপিজেডে প্রতিষ্ঠানটিতে চাকরিতে যোগদান করেছেন ২০০৭ সালে। বেতন-ভাতা ও কাজের পরিবেশ ভালো থাকায় আর কোথাও যাননি। পরিবারের ভরণপোষণ তাঁর বেতন-ভাতা দিয়েই চলছে।

বেপজার সদস্য (ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন) মো. তানভীর হোসাইন বলেন, কর্ণফুলী ইপিজেডে কর্মরত শ্রমিকেরা মাসে ২৩৫ কোটি টাকার বেশি বেতন–ভাতা পাচ্ছেন। শুধু বেতন–ভাতাই নয়, কারখানা ঘিরে সরঞ্জাম সরবরাহ, খাদ্যপণ্য সরবরাহসহ বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ চলছে। সার্বিকভাবে যা দেশের রপ্তানি বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখছে।

Read full story at source