মেয়েদের ফুটবলের কারণে পালিচড়া গ্রাম এখন দেশজুড়ে পরিচিত
· Prothom Alo
রংপুর শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের গ্রাম পালিচড়া। এই গ্রামের পরিচিতি এখন দেশজুড়ে। এর কারণ, শুধু মেয়েদের ফুটবল। দেশের ভেতরে দেড় দশক ধরে বয়সভিত্তিক বিভিন্ন ফুটবল প্রতিযোগিতায় ধারাবাহিক সাফল্য পেয়ে আসছে এই গ্রামের মেয়েরা। ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবেও নিয়মিত ফুটবল খেলে তারা। ২০২২ সালের সাফ ফুটবলে বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল পালিচড়ার মেয়েদের।
পালিচড়া গ্রামে মেয়েদের ফুটবলকে উৎসাহিত করতে চার বছর আগে সরকারি উদোগে ছোট্ট একটি স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হয়। এই স্টেডিয়াম দিনে দিনে রংপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়েদের ফুটবলচর্চার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। তবে মাঠে সাফল্য এলেও নিয়মিত অনুশীলন করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাদের। স্টেডিয়ামের জন্য সরকার কোনো বরাদ্দ দেয় না।
Visit moryak.biz for more information.
ফুটবলের প্রশিক্ষণে আসা কিশোরীদের খাবারের ব্যবস্থাও নেই। প্রশিক্ষণেও উন্নত সরঞ্জাম থাকে না। আবার স্টেডিয়ামের মাঠেরও বেহাল। নিরাপত্তার সমস্যাও রয়েছে।
পালিচড়া গ্রামে পাশাপাশি দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। পালিচড়া এম এন উচ্চবিদ্যালয় ও মজিদা খাতুন কলেজ। এই দুই প্রতিষ্ঠানের দুটি মাঠের জায়গায় ২০২২ সালে স্টেডিয়ামটি নির্মাণ করে দেয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। এতে ব্যয় হয় প্রায় পৌনে ছয় কোটি টাকা। স্টেডিয়ামটি পরিচালনার দায়িত্বে আছে রংপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থা। তবে সংস্থার পক্ষ থেকে স্টেডিয়ামটি দেখভালের মৌখিক অনুমতি দেওয়া হয়েছে পালিচড়া গ্রামের সদ্যপুস্কুরিনী যুব স্পোর্টিং ক্লাবকে।
এই স্টেডিয়াম থেকেই উঠে আসা কিশোরীরা জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য পাচ্ছে। গত জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের প্রথম আসরে মেয়েদের ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে রংপুর অঞ্চল। এরপর গত আগস্টে দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত জেএফএ (জাপান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন) অনূর্ধ্ব-১৪ ফুটবল টুর্নামেন্টেও শিরোপা জিতেছে রংপুর জেলার কিশোরীরা। পরপর দুটি শিরোপাজয়ী রংপুর দলের প্রথম একাদশের আটজনই পালিচড়া গ্রামের।
রংপুরের সাবেক কৃতী ফুটবলার নিয়ামুল আতিকুর রহমান বলেন, পালিচড়ার মেয়েরা জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য পাচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবেও দেশের জন্য স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। সবার সহযোগিতা পেলে তারা বহুদূর এগিয়ে যাবে।
গ্রাম থেকে জাতীয় পর্যায়ে
২০১১ সালে জাতীয়ভাবে আয়োজিত প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে অংশ নেয় পালিচড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রথম বছরই জাতীয় পর্যায়ে রানারআপ হয় দলটি। পরের বছর ২০১২ সালে জাতীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয় তারা।
পালিচড়ার ফুটবল কন্যারাএরপর পালিচড়ায় নারী ফুটবল নিয়ে আগ্রহ বাড়তে থাকে। বদলাতে শুরু করে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও। ২০১৬ সালে দেশের বাইরে তাজিকিস্তানে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ ফুটবল প্রতিযোগিতায় শেষ ম্যাচে ভারতকে ৪-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা জেতে বাংলাদেশ। বিজয়ী দলে ছিলেন এই গ্রামেরই তিন নারী ফুটবলার—লাবনী আক্তার, আর্শিতা জাহান ও আঁখি আক্তার। ২০২২ সালে সাফজয়ী নারী ফুটবল দলে ১০ নম্বর জার্সি পরে খেলেছেন পালিচড়ার মেয়ে সিরাত জাহান।
রংপুরের বিভিন্ন উপজেলার শতাধিক কিশোরী পালিচড়া স্টেডিয়ামে এখন ফুটবলের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। ২১ আগস্ট রংপুর সদর উপজেলায়পালিচড়ার মাঠ থেকে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে খেলেছেন ১০ জন। এ ছাড়া ১২ জন নারী খেলোয়াড় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চাকরি পেয়েছেন। বাংলাদেশ উইমেন্স প্রিমিয়ার লিগেও খেলেছেন এই গ্রামের মেয়েরা। জেলা, বিভাগ ও জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের প্রতিভার প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছেন তাঁরা।
পালিচড়া স্টেডিয়ামে মেয়েদের ফুটবলের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন সাবেক ফুটবলার মিলন মিয়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে এই মাঠের অন্তত ১৫ জন খেলোয়াড় ঢাকার বিভিন্ন ক্লাবে খেলছেন। এর মধ্যে আর্মি স্পোর্টস ক্লাবে খেলছেন জয়নব বিবি, সুলতানা আক্তার, বৃষ্টি আখতার, নাসরিন বেগম ও কাকলি সরেন। আইএম ১০ এফসি ক্লাবে খেলছেন শীলা আক্তার এবং ঢাকা ওয়ারিয়র্সে ইন্নিমা খানম ও হৈমন্তী শুক্লা খালকো। তাঁরা প্রতি মৌসুমে এক থেকে দেড় লাখ টাকা সম্মানী পান।
প্রশিক্ষক মিলন মিয়া বলেন, খেলোয়াড়দের জন্য জিমনেসিয়াম, পুষ্টিকর খাবার, উন্নত প্রশিক্ষণ ও ভালো মাঠ প্রয়োজন। এসব সমস্যা নিয়ে প্রায় এক মাস আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও) জানানো হলেও এখনো কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
জানতে চাইলে রংপুর সদরের ইউএনও লোকমান হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, মেয়ে ফুটবলারদের সমস্যাগুলো তিনি জেনেছেন। সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
সাফল্যের আড়ালে কষ্ট
রংপুরের বিভিন্ন উপজেলার শতাধিক কিশোরী পালিচড়া স্টেডিয়ামে এখন ফুটবলের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। তাদের বয়স ৮ থেকে ২০ বছর। এর মধ্যে ২৫ জন স্টেডিয়ামের ডরমিটরিতে থেকেই প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। সেখানে বিদ্যুৎ–সংযোগ, পানি সরবরাহব্যবস্থা ও শৌচাগার আছে। তবে রান্নাঘরের ব্যবস্থা নেই। স্টেডিয়ামে ৫০ জনের থাকার মতো জায়গা রয়েছে। তবে বর্তমানে বেড (শয্যা) রয়েছে ২০টি।
প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন সদ্যপুস্কুরিনী যুব স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি ও কোচ মিলন মিয়া। আবাসিক প্রশিক্ষণার্থীদের থাকা–খাওয়ার খরচ নিজ উদ্যোগে বহন করেন তিনি। রান্না হয় তাঁর বাড়িতেই।
যত্নহীন এবড়োখেবড়ো পড়ে আছে মাঠ। একটু বৃষ্টিতে পানি জমে থাকে। ২১ আগস্ট রংপুর সদর উপজেলার পালিচড়া স্টেডিয়ামেকিশোরীদের খাবার বাবদ অর্থ কিংবা প্রশিক্ষক মিলন মিয়াকে সরকারিভাবে কোনো বেতন দেওয়া হয় না। স্টেডিয়ামের অনুকূলে মাসিক কিংবা বার্ষিক সরকারি কোনো বরাদ্দও নেই। এ কারণে গত দুই বছরে স্টেডিয়ামের ৬৫ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল বাকি পড়েছে। আবার সন্ধ্যার পর বিদ্যুৎ চলে গেলে স্টেডিয়ামজুড়ে নেমে আসে অন্ধকার। বিকল্প আলোর ব্যবস্থা নেই। দিনভর অনুশীলনের পর লোডশেডিংয়ের কারণে গরমে ঘুমাতেও কষ্ট হয় কিশোরীদের। অনুশীলন শেষে স্বস্তির গোসলেরও নিশ্চয়তা নেই। রোদে ট্যাংকের পানি অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়, আবার শীতকালে গরম পানির ব্যবস্থা থাকে না। স্টেডিয়ামে কোনো ব্যায়ামাগার বা জিমনেসিয়ামও নেই।
প্রশিক্ষণরত কিশোরীদের খাবারের সংকটও নিত্যসঙ্গী। পালিচড়ার ফুটবলার সিনহা আয়াত বলে, ‘কোচ মিলন মিয়ার বাড়িতে যা জোটে, তাই খেয়েই থাকতে হয়। তিনি নিজের টাকায় আমাদের খাওয়ান। খেলার সরঞ্জামেরও অভাব।’
এই স্টেডিয়ামের মাঠের চারপাশের নিরাপত্তাবেষ্টনীও যথেষ্ট উঁচু নয়। ফলে বাইরে থেকে সহজেই মাঠে ঢুকে পড়া যায়। প্রশিক্ষণের সময় এমন ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে।
সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে পালিচড়ার মেয়েরা আরও এগিয়ে যাবে বলে মনে করেন রংপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য শামীম খান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে পালিচড়ার ৪ জন মেয়ে জাতীয় দলের হয়ে জাপানে (এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে) খেলতে গেছে। সমস্যা হচ্ছে স্টেডিয়াম এবং খেলোয়াড়দের দিকে কেউ তাকায় না। পালিচড়া স্টেডিয়ামে সমস্যা অনেক। সেখানে প্রশিক্ষণ নেওয়া মেয়েরা বেশির ভাগ গরিব ঘরের সন্তান। পুষ্টিকর খাবার পায় না। তাদের জন্য জেলা ক্রীড়া সংস্থার আসলে তেমন কিছু করারও নেই।
নিরাপত্তাহীন মাঠ, চোটের ঝুঁকি
খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, স্টেডিয়ামের মাঠটা সমান নয়, উঁচু-নিচু। অনুশীলনের সময় খেলোয়াড়দের চোট পাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ইতিমধ্যে কয়েকজন এমন সমস্যার মুখোমুখিও হয়েছে।
এই স্টেডিয়ামের মাঠের চারপাশের নিরাপত্তাবেষ্টনীও যথেষ্ট উঁচু নয়। ফলে বাইরে থেকে সহজেই মাঠে ঢুকে পড়া যায়। প্রশিক্ষণের সময় এমন ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। এতে নারী ফুটবলারদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি অনুশীলনের পরিবেশও নষ্ট হয়।
মাঠের মধ্যে চড়ে বেড়ায় গবাদিপশু। ২১ আগস্ট রংপুর সদর উপজেলার পালিচড়া স্টেডিয়ামেসদ্যপুস্কুরিনী যুব স্পোর্টিং ক্লাবের খেলোয়াড় ঐশী আক্তার বলে, মাঠের সীমানাপ্রাচীর নিচু হওয়ায় বাইরের ছেলেরা অনেক সময় ভেতরে ঢুকে পড়ে।
বরাদ্দের অভাবে স্টেডিয়ামের নানা সমস্যা সমাধান করা যাচ্ছে না বলে জানান রংপুর জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা মাসুদ রানা। তিনি ১০ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোকে বলেন, স্টেডিয়ামটি দেখভাল করার জন্য স্থানীয় সদ্যপুস্কুরিনী যুব স্পোর্টিং ক্লাবকে মৌখিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া স্টেডিয়ামের নিরাপত্তায় একজন নৈশপ্রহরী রয়েছেন। তাঁর মাসিক বেতন–ভাতা জেলা ক্রীড়া সংস্থা থেকে দেওয়া হয়। স্টেডিয়ামে অনেক সমস্যা আছে। এসব নিয়ে আলোচনাও হয়; কিন্তু সমাধান করা যাচ্ছে না।
রংপুর সদরের শ্যামপুর পুটিমারী গ্রামের মেয়ে ইন্নিমা খানম জাতীয় ফুটসাল দলে খেলেছেন। জাতীয় ফুটবল লিগেও খেলেছেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘পালিচড়া স্টেডিয়ামে অনুশীলন করেই জাতীয় দলসহ বিভিন্ন লিগে খেলার সুযোগ পেয়েছি। মিলন ভাইয়া (কোচ) নিজের জমিতে শাকসবজি লাগিয়ে নিজ খরচে আমাদের খাবার দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর সংসারেও অভাব রয়েছে। আমাদের দিকে কেউ ফিরে তাকায় না। খেলায় ভালো করলে বাহবা পাই—এতটুকুই।’
২০২২ সালে স্টেডিয়ামটি নির্মাণ করে দেয় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। এতে ব্যয় হয় প্রায় পৌনে ছয় কোটি টাকা। ২১ আগস্ট রংপুর সদর উপজেলার পালিচড়া স্টেডিয়ামেএ বছর নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের মেয়েদের ফুটবলে ‘ফাইনাল-সেরা’ হয়েছে পালিচড়া স্টেডিয়ামে প্রশিক্ষণ নেওয়া কিশোরী স্মৃতি কিসকু। তার বাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার চক কৃষ্ণপুর গ্রামে। প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলার সময় এই কিশোরী বারবার একটি কথাই বলেছে, স্টেডিয়ামে সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো খুব দরকার।
দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনা কিশোরী ফুটবলারদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর কথা বললেন পালিচড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুল আমিনও। আরও বললেন, পালিচড়ার মেয়েদের সাফল্যের গল্প যেন থেমে না যায়।
নারী ফুটবলারদের সাফল্যে অজপাড়াগাঁয় স্টেডিয়াম