ঘরোয়া দোকানে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন হাওরপারের অর্পনা
· Prothom Alo
অসুস্থ স্বামীর চিকিৎসায় দুটি গরু বিক্রি ও সঞ্চয়ের সব টাকা শেষ। অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসক তাঁকে কিছুদিন বিশ্রামে থাকতে বলেন। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটি কাজ করতে না পারায় থমকে যায় সংসারের চাকা। দুই মেয়ের পড়াশোনাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
Visit turconews.click for more information.
এ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন অর্পনা রানী সরকার (৪০)। একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ঘরের একপাশে ছোট্ট একটি দোকান দেন। চার বছর ধরে সেই দোকানের আয়েই চলছে তাঁর সংসার, চলছে দুই মেয়ের পড়াশোনা।
বৃহস্পতিবার দুপুরে মৌলভীবাজার সদরের একাটুনা ইউনিয়নের কাউয়াদীঘি হাওরপারের ইটা বড়বাড়ি গ্রামে অর্পনার বাড়িতে যান এই প্রতিবেদক। টিনের বসতঘরের একটি অংশজুড়ে তাঁর দোকান। সেখানে ঝুলছে চানাচুর, চিপস, বিস্কুটসহ নানা পণ্য। লবণ, মরিচ, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীও আছে। বসার কোনো ব্যবস্থা নেই। ক্রেতা এলে দাঁড়িয়েই পণ্য তুলে দেন তিনি।
একসঙ্গে অর্পনা রানী সরকারের ঘর ও দোকান। বৃহস্পতিবার দুপুরে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ইটা বড়বাড়ি গ্রামে।অর্পনার স্বামী জিতেন্দ্র সরকার কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। তাঁর আয়েই সংসার চলত। হঠাৎ তাঁর পিত্তথলিতে পাথর ধরা পড়ে। অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হয়। চিকিৎসার খরচ জোগাতে বাড়িতে থাকা দুটি গরু বিক্রি করেন অর্পনা। সঞ্চয়ের টাকাও শেষ হয়ে যায়। অস্ত্রোপচারের পর স্বামীকে কিছুদিন ভারী কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেন চিকিৎসক।
তখন সংসারের খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে। দুই মেয়ের পড়াশোনা কীভাবে চলবে, তা নিয়েও চিন্তায় পড়েন অর্পনা। তিনি বলেন, ‘দেখলাম, অচল অই যাইমু। বাইচ্চাইনতোরে (দুই মেয়েকে) লেখাপড়া করাইতাম পারতাম নায়। তখনই দোকান দেওয়ার কথা মাথাত আইছে।’
দোকানের শুরুটা সহজ ছিল না। অর্পনা বলেন, ‘শুরুতে বুঝতাম না—ছয়–সাত মাস লস খাইছি (লোকসান দিয়েছি)। আস্তে আস্তে সব ঠিক অইছে। দোকান ভালাই চলের। এই দোকানের আয় দিয়াই এখন আমার সংসার চলের, মেয়েদের লেখাপড়া করারাম (করাচ্ছি)।’
দোকানে শুরুতে লবণ-মরিচ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য রাখতেন অর্পনা। পরে ধীরে ধীরে পণ্যের সংখ্যা বাড়ান। শহর থেকে স্বামীর মাধ্যমে কিছু পণ্য আনাতেন। প্রতি বৃহস্পতিবার বিভিন্ন কোম্পানির লোকজন ভ্যানে করে তাঁকে পণ্য দিয়ে যান।
অর্পনা রানী সরকারের দোকানে এক ক্রেতা। বৃহস্পতিবার দুপুরে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ইটা বড়বাড়ি গ্রামেবর্তমানে দোকান থেকে মাসে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা আয় হয় অর্পনার। গ্রামের মানুষ তাঁর দোকান থেকেই প্রয়োজনীয় পণ্য কেনেন। কিছু বাকি পড়লেও পরে সবাই টাকা পরিশোধ করেন। জিতেন্দ্র সরকারও এখন কিছুটা কাজ করতে পারেন। তাতে সংসারে কিছুটা সহযোগিতা হয়। এর মধ্যে অর্পনা ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করেছেন। তাঁর বড় মেয়ে এবার এসএসসি পাস করেছে। ছোট মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ে।
ইটা বড়বাড়ি গ্রামের উত্তর দিকে কাউয়াদীঘি হাওর। ৮০ থেকে ৮৫টি পরিবারের এই গ্রামের বেশির ভাগ মানুষ কৃষিজীবী। এই গ্রামেরই অর্পনা এখন নিজের দোকানটি আরও বড় করার স্বপ্ন দেখেন।
অর্পনা বলেন, ‘আমি থ্রি (তৃতীয় শ্রেণি) পর্যন্ত পড়ছি। হিসাব-টিসাব আগে বুঝতাম না। এখন হিসাব করতাম পারি। দোকানটা বড় করার ইচ্ছা আছে; কিন্তু ঋণ আর করতাম চাই না। কোনো সহযোগিতা পাইলে গ্রামের সড়কের পাশে দোকানটারে লইয়া যাইতাম।’