ওরিগনের প্রশান্ত মহাসাগরপারের ওশানসাইড ও কেপ মিয়ারসে কয়েক দিন
· Prothom Alo

ওরিগনের বৃহত্তম শহর পোর্টল্যান্ড থেকে পশ্চিমমুখী সড়ক ধরে প্রশান্ত মহাসাগর সৈকতের দিকে স্ত্রী নাসরীন ও মেয়ে-জামাতা মোহনা-ফাহাদসহ আমি এগোচ্ছি । পথে পড়ল সাজানো-গোছানো ও শান্ত উপকূলীয় ছোট্ট শহর টিলামুক। শহরটি দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত সামগ্রী, বিশেষত পনির উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। জুলাইয়ের শেষ বিকেলের মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, একটু বৃষ্টি পড়ছিল। অঞ্চলের আবহাওয়ার আগাম নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব নয়। আমাদের গন্তব্যের ওশানসাইড সৈকত ও কেপ মিয়ারস দুটোই প্রশান্ত মহাসাগরপারের নৈসর্গিক দৃশ্যের জন্য বিখ্যাত।
টিলামুক থেকে পশ্চিমে কিছুদূর এগোতে দৃষ্টিতে এল বিশাল প্রশান্ত মহাসাগর। ডানে ঘুরে কিছুটা উত্তরে মহাসাগরের পাড়েই ওশানসাইড নামের পর্যটন শহর। সবুজ-সতেজ ছোট-বড় বৃক্ষ, লতাগুল্ম, বুনো ফুল-ফলে আচ্ছাদিত পাহাড়ের ঢালে বিভিন্ন উচ্চতায় ঘরবাড়ি তৈরি করা হয়েছে, সেগুলোকে যুক্ত করেছে আঁকাবাঁকা ও উঁচু-নিচু পাহাড়ি রাস্তা। বাড়িগুলো প্রধানত দোচালা এবং ধূসর ও সাদা রঙের, ব্যতিক্রম রয়েছে বৈকি। আমরা যাকে বলি ছবির মতো সুন্দর দৃশ্য।
Visit betsport.cv for more information.
বিকেল পাঁচটায় আমরা ওশানসাইডে পৌঁছে আগে থেকে ফাহাদের ব্যবস্থা করা বাড়িতে উঠলাম। ধূসর রঙের কাঠের তিনতলা, আসবাবপত্রসহ যাবতীয় প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রে সুসজ্জিত। বাড়ির বারান্দা থেকে দেখছি দিগন্তবিস্তৃত প্রশান্ত মহাসাগর, কানে শুনছি মহাগর্জন—সে এক অপরূপ দৃশ্য। বহুল প্রতীক্ষিত মহাসাগরের হাতছানি উপেক্ষণীয় নয়, ইচ্ছা করছিল ছুঁয়ে দেখতে, পানিতে পা ভেজাতে। কাজেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম, তখন সাতটা বাজে, সন্ধ্যা নামতে দুই ঘণ্টা দেরি।
সৈকতের প্রবেশমুখে গাড়ি পার্কিংয়ে ভূমিকম্প তথা সুনামি সতর্কতা ও করণীয় সম্পর্কে ইংরেজি ও ফ্রেঞ্চ ভাষায় নির্দেশনা, মানচিত্র এবং পার্কিং ফির বিবরণসহ সাইনবোর্ডগুলো টাঙানো আছে, আরও আছে ওয়াশরুমের সুবিধা। কিন্তু সৈকতের ওপর ও সমুদ্রের খুব কাছে বাড়িঘর নির্মাণ আমাকে অবাক করেছে।
দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]
পার্কিং থেকে কয়েকটা সিঁড়ি ভেঙে নিচের লালচে বালুকাময় সৈকতে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। আমাদের সামনে দিগন্তবিস্তৃত, অপরূপ প্রশান্ত মহাসাগর, মহাগর্জন তুলে ফেনিল ঢেউগুলো দূর থেকে সৈকতে আছড়ে পড়ছে, অবিরাম, ক্লান্তিহীনভাবে। সৈকতে দাঁড়িয়ে উত্তর দিকে তাকালে দেখা যায়, সমুদ্রের মধ্যে মাথা উঁচু করে দৃঢ় পায়ে নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকা এক পাহাড়, আর তার সামনে সমুদ্রের পানিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি গোলাকার ছোট পাহাড়। পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে মনে হয়েছে সমুদ্রের আহ্বানে দুরন্ত বালকদের মহাসাগরের দিকে ছুটে চলা। ছোটরা দ্রুততায় পানিতে নেমে পড়েছে আর বড়টি পেছনে পড়েছে তাদের মতো জোরে দৌড়াতে না পারায়। থ্রি-আর্ক রক বা তিন-খিলানযুক্ত শিলা নামের এটি সমধিক পরিচিত।
কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতের মতো ওশানসাইড সৈকতে আমি ঝিনুক খুঁজেছি, কিন্তু কিছু শৈবাল ও আগে থেকে ভেসে আসা শুকনো গাছের গুঁড়ি শুধু দেখেছি। তবে শুনলাম, একটু দক্ষিণে নেটার্তে স্থানীয়রা ঝিনুক সংগ্রহ করেন। ওই এলাকার উপগ্রহচিত্র দেখে আমার ধারণা হয়েছে, সমুদ্রস্রোতের গতি ও দিক ঝিনুকের ভেসে আসাকে প্রভাবিত করে, জমা হওয়ার জায়গা নির্দিষ্ট করে।
কেপ মিয়ারসের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য সবাইকে আকর্ষণ করে, সাগরজলের ও স্থলের বন্য প্রাণীর স্বর্গ নামে ডাকা হয়। তবে ‘কেপ’ শব্দটার সঙ্গে অনেকের পরিচয় থাকলেও শব্দার্থটা বলি। কেপ বা অন্তরীপ হলো সমুদ্রের দিকে ঢুকে যাওয়া ভূখণ্ড, যা সাধারণত উঁচু, বন্ধুর ও খাড়া হয়—এ ক্ষেত্রে প্রশান্ত মহাসাগরের ভেতরে ঢুকে যাওয়া ভূখণ্ড। কেপ মিয়ারস নামটি ক্যাপ্টেন জন মিয়ারসের নামানুসারে ১৭৮৮ সালে রাখা হয়।
সবুজ বনাঞ্চল, জীববৈচিত্র্য, ঐতিহাসিক বাতিঘর ইত্যাদি কেপ মিয়ারসের অন্যতম আকর্ষণ। তবে ভূবিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে আমার কাছে এ অঞ্চলের ভূতত্ত্ব ও ভূতাত্ত্বিক বিবর্তন চিত্তাকর্ষক, বিস্ময়কর ও আগ্রহোদ্দীপক; ভূবিজ্ঞানের নানা বিষয়ে গবেষণার অসংখ্য উপাদান আছে। ওরিগন স্টেট পার্কের মধ্যে অবস্থিত এ বনাঞ্চল ওরিগন অঞ্চলের প্রাচীন বনাঞ্চল। সাধারণত উপকূলীয় অঞ্চলের আর্দ্র পরিবেশে স্বল্পসংখ্যক গাছই টিকে থাকতে পারে। তাই ৭০-২৪০ বছর বয়সী সিটকা স্প্রুস ও ১০০-২০০ বছর বয়সী ওয়েস্টার্ন হেমলক গাছগুলোর আধিক্যসহ বুনো বেরি, ফার্ন ও মাশরুমজাতীয় গাছ দেখা যায় এ বনে।
বৃক্ষপ্রেমীরা সরু ট্রেইল ধরে বনের ভেতরে প্রবেশ করে নানা প্রজাতির, নানা আকৃতির গাছের সঙ্গে পরিচিত হতে ও সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন; তবে বৃক্ষপ্রেমী না হলেও বনের প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং পত্র-পল্লবের স্নিগ্ধ ও শ্রুতিমধুর ধ্বনি সবাইকে আকর্ষণ করবে। এ বনে আমার এক বিরল অভিজ্ঞতা হয়েছে—৭৫০ বছরের বেশি বয়সী নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকা সিটকা স্প্রুসগাছের সঙ্গে পরিচয়। পার্কটির প্রবেশমুখ থেকে ট্রেইল ধরে আনুমানিক আধা কিলোমিটার হেঁটে গেলে এ বয়স্ক গাছটির দেখা মিলবে। প্রায় সাড়ে ১৪ মিটার পরিধি ও সাড়ে ৪ মিটার ব্যাসের গাছটি প্রায় ৪৪ মিটার দীর্ঘ। অতি প্রবীণ একটি জীবনের সামনে আমি দাঁড়িয়ে। সে এক অভূতপূর্ব, বিস্ময়কর, রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা।
বৃক্ষটি ছুঁয়ে দেখার লোভ সামলাতে পারিনি। শক্ত ও রুক্ষ বাকল, কিন্তু শিহরণ–জাগানিয়া অনুভূতি। ভাবতে অবাক লাগে, দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষটি কত শতাব্দীর কত ইতিহাসের নীরব সাক্ষী, শরীরে ধারণ করে আছে বহু বছরের বহু কঠিন ও নানা পরিবেশগত অবস্থার প্রমাণগুলো।
অক্টোপাস আকৃতির সিটকা স্প্রুস গাছ (বৈজ্ঞানিক নাম Picea sitchensis) এ বনের আরেক বিস্ময়। তবে গাছটির এমন আকৃতির কারণ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এটা প্রাকৃতিকভাবে না আদি আমেরিকানদের দ্বারা ঘটেছে, তা এক রহস্য। প্রধান কাণ্ডবিহীন গাছটির পরিধি ১৪ মিটারের বেশি এবং পরিবর্তে ডানাগুলো অনুভূমিকভাবে প্রায় ৫ মিটারের বেশি বিস্তার লাভ করে ওপরের দিকে উঠে গেছে। ৩২ মিটার দীর্ঘকায় গাছটির বয়স ২৫০ থেকে ৩০০ বছরের মধ্যে বলে ধারণা করা হয়।
বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও তিমি-সিলের আবাসস্থলের জন্য কেপ মিয়ারস বিখ্যাত। এ ছাড়া বনে রয়েছে ইঁদুর প্রজাতির নানা প্রাণী, গিরগিটি ইত্যাদি। এখানে দেখা মেলে পেরেগ্রিন ফ্যালকন, গাঙচিল, টেকো ইগল, বাদামি পেলিক্যান, মারে, পানকৌড়ি ইত্যাদি পাখির। দর্শনার্থী পাখিপ্রেমীদের হিসাব করতে দেখলাম, কত ধরনের পাখির দেখা তাঁরা পেয়েছেন। পাহাড়ের গায়ে নীল পানির ঢেউ আছড়ে পড়ছে অবিরাম। উছলে ওঠা ফেনিল পানি ও পাহাড়ের মিলনস্থলে এক অপরূপ দৃশ্যের অবতারণা করেছে। পাহাড়ের পাদদেশে সৃষ্ট গুহায়, যেখানে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে, সেখানে পাখিদের বাসা ও বিচরণ প্রত্যক্ষ করার সম্ভাবনায় তাঁরা ব্যস্ত।
বছরের সঠিক সময় ও ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে সমুদ্রে তিমি, সিল, সি-লায়নের দেখা মেলে। তবে আমরা এদের দেখা পাইনি। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির সঙ্গে ঠান্ডা ঝোড়ো বাতাস, মেঘাচ্ছন্ন আকাশ ও কুয়াশা দৃশ্যমানতা হ্রাস করেছিল। তাপমাত্রা ১৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলেও তীব্র বাতাস শীতের অনুভূতিকে বৃদ্ধি করা ছাড়াও আমার মতো পরিণত বয়সের মানুষের পক্ষে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা কষ্টকর করেছিল। তাই সব বিবেচনায় সেদিনের আবহাওয়া আমাদের অনুকূলে ছিল না। তবে এ অঞ্চল ভ্রমণকালে এমন বিরূপ আবহাওয়ার সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনার জন্য মানসিক প্রস্তুতি দরকার।
১৮০০ শতকের শেষার্ধে ওরিগন উপকূলে ৯টি বাতিঘর স্থাপন করা হয়। প্রতিটি বাতিঘরের সংকেতের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ছিল। কেপ মিয়ারসের বাতিঘরটি ১৮৮৮ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল। বাতিটির এক টন ওজনের বিশালাকার মৌচাক আকৃতির লেন্সের বহির্ভাগ প্রিজম দিয়ে তৈরি। প্রিজমের ভেতর দিয়ে আলোকরশ্মি বিবর্ধনকারী কাচের মধ্য দিয়ে প্রেরণ করে উজ্জ্বল আলোর বিস্তার ঘটানো হতো, যা প্রায় ৩৪ কিলোমিটার দূর থেকে দেখা যেত। কেরোসিন লন্ঠনের ৮ পাশযুক্ত লেন্সের ৪টিতে লাল কাচের আবরণ দেওয়া ছিল, যাতে পর্যায়ক্রমে লাল-সাদা রশ্মি প্রক্ষেপণ করা যায়। ১৯৬৩ সালে বাতিঘরটিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকেত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। প্রশান্ত মহাসাগরের এ পথে চলাচলকারী জাহাজের নাবিকদের সোয়া শ বছর ধরে পথনির্দেশ করা ঐতিহাসিক বাতিঘরটি ২০১৪ সালে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। কিন্তু দর্শনার্থীদের জন্য বাইরে থেকে দেখার ব্যবস্থা আছে, ভেতরে প্রবেশের জন্য আগে থেকে জেনে আসা প্রয়োজন।
ওরিগনের উপকূল অঞ্চলের মনোমুগ্ধকর ও চিত্তাকর্ষক ভূপ্রকৃতি সৃষ্টির পেছনের কাহিনি এবার সংক্ষেপে জানার চেষ্টা করি। তীরের দিক থেকে মহাসাগরের ভেতর মাথা ঢুকিয়ে দেওয়া সুউচ্চ কালো পাহাড়সহ অন্য পাহাড়গুলো প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ বছর আগের ব্যাসাল্ট নামের আগ্নেয়শিলায় গঠিত। সমুদ্রতল হতে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ের খাড়া দেয়ালে দৃশ্যমান শিলাগুলো শত লাখ বছরের অতীত ইতিহাস ধারণ করে আছে। পূর্ব দিকের অনেক দূর হতে আসা লাভার প্রবাহ লাখ লাখ বছর ধরে একে অপরের ওপর জমা হয়েছে। লাভার প্রবাহ বারবার এসেছে, তা হাজার হাজার কিংবা লাখ লাখ বছর ব্যবধানে। লাভার উপাদানগত ভিন্নতা ও গলিত লাভা ঠান্ডা হয়ে ব্যাসাল্ট শিলায় পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়ায় ভিন্নতার প্রকাশ আমরা বর্তমানে দেখছি দেয়ালের ব্যাসাল্ট শিলার রং ও গঠনের (কলামনার ও পিলো) পার্থক্যে। তবে দেয়ালের সবচেয়ে ওপরের অংশে হলুদ রঙের বেলেপাথর নামক পাললিক শিলার স্তর দেখা যায়, যা ভিন্ন প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়েছে এবং বয়সেও অনেক নবীন।
শুধু এ অঞ্চল নয়, উপকূলজুড়ে আমরা যা কিছু দেখছি, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় ও আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটগুলোর সক্রিয়তা। সবই ঘটছে দীর্ঘ, জটিল, বিস্ময়কর ও বহু ভূতাত্ত্বিক বিবর্তনপ্রক্রিয়ায়। ভূমির উত্থান-অবনমন ঘটেছে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের ওঠানামা হয়েছে নানা হারে বিভিন্ন সময়ে, সবই এখনো গতিশীল আছে। আগ্নেয়গিরির উপস্থিতি, বিশ্বের অন্যতম চ্যুতি রেখা, ভূকম্পন ইত্যাদি তারই কিছু প্রমাণ। কাজেই প্রক্রিয়াগুলো, সেগুলোর ক্রম ও ইতিহাস উন্মোচন অর্থাৎ পুরো ব্যবস্থাটি জানার আগ্রহ যেকোনো ভূবিজ্ঞানীর জন্য স্বাভাবিক হলেও স্বল্প পরিসরের দেখায় তা অসম্ভব। তাই অতৃপ্তি সত্ত্বেও চমৎকার অভিজ্ঞতা ও অবিস্মরণীয় স্মৃতিসহ আমি ফিরে এলাম ওরিগন থেকে।
লেখক: এ কে এম খোরশেদ আলম; রিচল্যান্ড, ওয়াশিংটন, যুক্তরাষ্ট্র।