প্রতি উপজেলায় ১০ জন তরুণ উদ্যোক্তা পাবেন ঋণ ও অনুদান
· Prothom Alo

৫০০ কোটি টাকার তহবিল গঠিত হচ্ছে।
অনুদান ও কম সুদে অর্থায়ন করা হবে।
Visit freshyourfeel.org for more information.
মোট ৫,০৩০ উদ্যোক্তাকে অর্থায়নের পরিকল্পনা।
দেশের প্রতিটি উপজেলায় ১০ জন তরুণ উদ্যোক্তা চিহ্নিত করে তাঁদের প্রত্যেককে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত তহবিল দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
প্রতিটি জেলায় একটি করে ব্যাংক এই দায়িত্ব পালন করবে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা অফিস, ব্যাংক ও বিশেষজ্ঞ—এই তিন পক্ষ মিলে উদ্যোক্তা নির্বাচনের কাজটি করবে। এই কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে ‘উপজেলা ভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, উদ্যোক্তাভেদে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকা দেওয়া হবে। অর্থায়ন হবে ঋণ ও শর্তসাপেক্ষ অনুদানের সমন্বয়ে। মূলত যে উদ্যোক্তা যে খাতের, তাঁকে সে খাতের পুনঃ অর্থায়ন তহবিল থেকে টাকা দেওয়া হবে। এই ঋণের সুদের হার হবে ৪ থেকে ৭ শতাংশ। আর অনুদানটি দেওয়া হবে ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) খাতের তহবিল থেকে। অনুদানের অর্থের যথাযথ ব্যবহার হলে সিএসআরের টাকা ফেরত দিতে হবে না। কিন্তু যথাযথ ব্যবহার না হলে তা ঋণে রূপান্তর হবে।
জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে দেশের ৮ বিভাগের ৮ জেলায় এই কর্মসূচি শুরু করা হবে। এতে সফল হলে পরবর্তী সময় তা সব জেলা ও উপজেলায় ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
উদ্যোক্তা অর্থায়নবিষয়ক পরামর্শক শওকত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘উদ্যোগটি খুবই ভালো। যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে এর সফলতা। এর আগেও ইইএফ তহবিলের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন করা হয়েছিল, যার পুরোটাই লুট হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে এবার ভালো ব্যাংকগুলোকে শুধু উদ্যোক্তা নির্বাচনের কাজে দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের এর বাইরে রাখতে হবে।’
কারা পাবেন এই অর্থ
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের গত ৩০ আগস্ট অনুষ্ঠিত সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উদ্যোক্তাসংক্রান্ত উদ্যোগের প্রসারে তরুণদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের প্রত্যন্ত ও উপজেলা পর্যায়ে অনেক সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তা ব্যবসায়িক ধারণা থাকলেও প্রাথমিক পুঁজি, ব্যবসায়িক পরামর্শ, প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক ও অর্থায়নের অভাবে তা বাস্তবায়ন করতে পারেন না। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কর্মসূচিটির আওতায় উদ্যোক্তাদের আবেদন গ্রহণ, যাচাই-বাছাই ও সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত করার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাদের নির্বাচনের মাধ্যমে উদ্যোক্তা নির্বাচন করা হবে। প্রত্যেক উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক সম্ভাবনা ও ঋণ মূল্যায়নের মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের প্রকৃত ব্যবসায়িক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে অর্থায়ন করা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই কার্যবিবরণীতে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রত্যন্ত উপজেলা পর্যায়ের তরুণ উদ্যোক্তারা ব্যাংকঋণের পাশাপাশি শর্তসাপেক্ষ অনুদান পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং উদ্যোগগুলোকে টেকসই করার সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, উদ্যোক্তাদের যথাযথ অর্থায়নের সুযোগ না থাকা ও বিকাশে কার্যকর কোনো উদ্যোগ না থাকায় অনেকেই অল্প সময়ে ঝরে পড়ছেন। এ জন্য সম্ভাবনা আছে, এমন উদ্যোক্তাদের পাশে থাকবে বাংলাদেশ ব্যাংক। তাঁদের খুঁজে বের করে অর্থায়নের পাশাপাশি বিকাশে যথাযথ ভূমিকা রাখার চেষ্টা করা হবে। এর মাধ্যমে লক্ষ্যের অর্ধেক উদ্যোক্তাও যদি যথাযথভাবে গড়ে উঠে, সেটাই হবে বড় সফলতা। এতে দেশে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অর্থনীতির চিত্র বদলে যেতে পারে।
৫০০ কোটি টাকার তহবিল
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ৮টি বিভাগের ৬৪টি জেলায় মোট ৫০৩টি উপজেলা রয়েছে। সে আলোকে প্রতি উপজেলায় ১০ জন করে মোট ৫ হাজার ৩০ জন উদ্যোক্তাকে অর্থায়নের পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য ৫০০ কোটি টাকার একটি তহবিল অনুমোদন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। এর মধ্যে ২৫০ কোটি টাকা জোগান দেবে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং বাকি ২৫০ কোটি টাকা দেবে ব্যাংকগুলো। টাকার একটি অংশ দেওয়া হবে ব্যাংকগুলো ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা খাতের কর্মসূচি থেকে।
এই কর্মসূচির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো অর্থায়ন হবে ঋণ ও শর্তসাপেক্ষ অনুদানের সমন্বয়ে। শুরুর খরচ মেটাতে প্রথমে অনুদানের একটি অংশ দেওয়া হবে। বাকি অংশটি আলাদা হিসাবে সংরক্ষিত থাকবে, যা উদ্যোক্তার ঋণ পরিশোধের আগ্রহ ও নির্দিষ্ট মূল্যায়নের ভিত্তিতে পরবর্তী সময় ব্যবহারের সুযোগ মিলবে। এতে উদ্যোক্তারা শুধু প্রাথমিক সহায়তাই পাবেন না, বরং ব্যবসা টেকসই করতে ও ঋণ শোধে উৎসাহিত হবেন।
তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি, কর্মসংস্থান ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যের সঙ্গে মিল রেখে ব্যাংকগুলোর অব্যবহৃত সিএসআর তহবিল থেকে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে, যা সিএসআর অর্থের লক্ষ্যভিত্তিক ও ফলপ্রসূ ব্যবহার নিশ্চিত করবে।
উপজেলা পর্যায়ে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা চিহ্নিত করা, প্রচার, আবেদন যাচাই, সভা-কর্মশালা, ধারণার মূল্যায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিশেষ ব্যয় ধরা হয়েছে। এসব প্রশাসনিক ও বাস্তবায়নসংক্রান্ত খরচ বহন করা হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএমএসএমই তহবিল থেকে।
এই উদ্যোগ কীভাবে সফল হতে পারে, তা নিয়ে জানতে চাইলে ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তারেক রেফাত উল্লাহ খান প্রথম আলোকে বলেন, উদ্যোক্তা নির্বাচনটা পেশাদারত্বের সঙ্গে করতে হবে। উদ্যোক্তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর অর্থায়ন করতে হবে। যে অনুদান দেওয়া হবে, তা ধাপে ধাপে দিতে হবে। তাহলে এই উদ্যোগ থেকে বড় ফলাফল আসতে পারে।