ছায়ার ভেতর পবিত্রতা
· Prothom Alo

দক্ষিণ আফ্রিকার আলোকচিত্রী সান্তু মোফোকেংয়ের ‘চেসিং শ্যাডোস’ একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্র সিরিজ। পোস্ট-অ্যাপার্টহেইড বলতে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক অবসানের পরবর্তী সময়কালকে বোঝায়। ‘চেসিং শ্যাডোস’ সেই সময়ের ধর্মীয় আচার, পবিত্র ভূদৃশ্য এবং বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের পারস্পরিক মেলবন্ধন। একই সঙ্গে সিরিজটি দক্ষিণ আফ্রিকার আধ্যাত্মিক জীবনকে গভীরভাবে অনুসন্ধান করে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
মোফোকেংয়ের আলোকচিত্রের কেন্দ্রে রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার কয়েকটি পবিত্র স্থান, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ফ্রি স্টেট ও লেসোথোর সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মটোউলেং ও মাউৎসে গুহা। গুহাগুলো শুধু মাটি, পাথর আর অন্ধকারের সমষ্টি নয়; বরং মানুষের স্মৃতি, পূর্বপুরুষের উপস্থিতি এবং সম্মিলিত বিশ্বাস এই স্থানগুলোকে একটি জীবন্ত আধ্যাত্মিক পরিসরে পরিণত করেছে।
মোফোকেংয়ের ক্যামেরায় তাই ল্যান্ডস্কেপ নিছক প্রকৃতির ছবি হয়ে থাকে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় মানুষের ইতিহাস, বিশ্বাস ও আত্মিক অস্তিত্বের গল্প।
‘চেসিং শ্যাডোস’ (১৯৯৬–২০১৪)সিরিজের ছবিগুলো বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে স্পষ্ট হয়, এগুলো নিছক কোনো ধর্মীয় সমাবেশের তথ্যচিত্র নয়। প্রতিটি ফ্রেম যেন একেকটি জটিল দৃশ্যপাঠ। যেখানে ইতিহাসের সঙ্গে আধ্যাত্মিকতা, ভূমির সঙ্গে স্মৃতি, ব্যক্তির সঙ্গে সম্প্রদায় এবং দৃশ্যমানের সঙ্গে অদৃশ্যের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে মোফোকেং ঔপনিবেশিক আলোকচিত্রের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিকেও প্রশ্ন করেন। তাঁর ক্যামেরা শুধু মানুষকে দেখায় না; বরং এমন কিছু অনুভূতি, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক উপস্থিতিকে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করে, যেগুলো প্রকৃতিগতভাবেই ক্যামেরার চোখের নাগালের বাইরে থাকে।
আলোকচিত্রগুলোর দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে ভূগর্ভস্থ সমাবেশের স্থান এবং খোলা আকাশের নিচে গড়ে ওঠা পবিত্র আশ্রয়গুলো। এসব জায়গায় সমবেত হয়েছেন কৃষ্ণাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকান নারী, পুরুষ ও শিশু। বেলেপাথরের গুহার অন্ধকার গভীরে তাঁদের দেখা যায় ঐতিহ্যবাহী পোশাকে, আফ্রিকান স্বাধীন চার্চগুলোর ধর্মীয় পোশাকে, কিংবা স্থানীয় ও খ্রিষ্টীয় সংস্কৃতির মিশ্রিত পোশাকে। সাদা আলখাল্লা, মাথা ঢাকা কাপড় এবং কাঁধ থেকে নেমে আসা সাদা চাদর তাঁদের শরীরকে ঘিরে একটি বিশেষ দৃশ্যমান আবহ তৈরি করেছে।
‘চেসিং শ্যাডোস’ (১৯৯৬–২০১৪)কোনো কোনো ছবিতে মোমবাতির ক্ষীণ আলোয় আলোকিত গুহার দেয়াল দেখা যায়। সেখানে উপাসকেরা স্যাঁতসেঁতে মাটির একেবারে কাছে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন। অন্য কোনো ফ্রেমে চোখ বন্ধ করে নারীরা সম্মিলিত কণ্ঠে গান গাইছেন; চারপাশে ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে ধোঁয়া। আবার কোথাও পাথরের দেয়ালে সারি সারি জ্বলন্ত সাদা মোমবাতি, কোথাও বলির পশুর অবশেষ, কোথাও পাথর দিয়ে ঘেরা ছোট ছোট পরিসর, কিংবা গুহার ভেতরের আশ্রয়স্থলে দড়িতে শুকাতে দেওয়া সাদা পোশাক—সবকিছু মিলে গড়ে উঠেছে এক স্বতন্ত্র ধর্মীয় ল্যান্ডস্কেপ। এই ভূদৃশ্যের কোনো অংশই নিছক পটভূমি নয়।
পাথর, মাটি, ধোঁয়া, মোমবাতি, পোশাক ও মানুষের শরীর—সবকিছু মিলে যেন আচারটির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে গুহাটি কেবল উপাসনার স্থান নয়; সেটি নিজেই যেন উপাসনায় অংশগ্রহণকারীতে পরিণত হয়েছে। এখানে অন্ধকারও নিছক আলোর অনুপস্থিতি নয়; বরং সেই অন্ধকারের ভেতরেই ক্ষুদ্র মোমবাতির শিখা, সাদা পোশাক ও মানুষের মুখ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। আলো যেন অন্ধকারকে দূর করে না; বরং অন্ধকারের গভীরতাকে আরও অনুভবযোগ্য করে তোলে।
মোফোকেংয়ের ‘চেসিং শ্যাডোস’ সিরিজের ঐতিহাসিক তাৎপর্য বুঝতে হলে ১৯৯৪ সালের পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকার দিকে তাকাতে হয়। দীর্ঘ অ্যাপার্টহেইড শাসনের আনুষ্ঠানিক অবসানের পর দেশটি সাংবিধানিক গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসে, রাজনৈতিক অধিকার সম্প্রসারিত হয় এবং বর্ণভিত্তিক শাসনের দীর্ঘ ইতিহাসের বিরুদ্ধে একটি নতুন জাতীয় কল্পনাও তৈরি হতে শুরু করে। কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তন মানেই সামাজিক বাস্তবতার তাৎক্ষণিক পরিবর্তন নয়।
গ্রামীণ ও টাউনশিপ অঞ্চলের বহু মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক বৈষম্য, বঞ্চনা ও বিচ্ছিন্নতার দীর্ঘ ছায়া রয়ে গেল। অ্যাপার্টহেইডের আইন শেষ হয়ে গেলেও তার তৈরি সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর অনেক ক্ষত তখনো অমোচনীয়। এই পরিবর্তনশীল সময়েই পবিত্র গুহাগুলোর দিকে মানুষের তীর্থযাত্রা একটি বিশেষ ঐতিহাসিক তাৎপর্য অর্জন করে।
এখানে আফ্রিকার আদিবাসী আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য, বিশেষত পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা বা ‘বাডিমো’ খ্রিষ্টীয় ধর্মাচারের সঙ্গে এক জটিল ও জীবন্ত সম্পর্ক তৈরি করেছে। বাডিমো দক্ষিণ আফ্রিকার সোথো ভাষাগোষ্ঠীর একটি শব্দ। সহজভাবে বলতে গেলে এর অর্থ পূর্বপুরুষের আত্মা বা পূর্বপুরুষগণ। আফ্রিকার বহু ঐতিহ্যবাহী বিশ্বাসব্যবস্থায় পূর্বপুরুষেরা মৃত হয়ে সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যান না। তাঁরা জীবিতদের জগতের সঙ্গে একধরনের আত্মিক সম্পর্ক বজায় রাখেন বলে বিশ্বাস করা হয়। তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, তাঁদের উদ্দেশে প্রার্থনা করা কিংবা তাঁদের আশীর্বাদ কামনা করা সেই আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের অংশ। এই সম্পর্ককে সরলভাবে ‘দুটি ধর্মের মিশ্রণ’ বলা যথেষ্ট নয়; বরং এটি এমন এক খাপ খাইয়ে নেওয়ার সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়া, যেখানে স্থানীয় বিশ্বাস, পূর্বপুরুষের স্মৃতি, নিরাময়ের আচার এবং খ্রিষ্টীয় প্রতীক নিজেদের স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে না ফেলে পরস্পরের সঙ্গে বসবাস করতে শিখেছে।
এখানেই মোফোকেংয়ের কাজের ঐতিহাসিক গুরুত্ব।
বিশ শতকের শেষভাগের সংবাদ আলোকচিত্রে কৃষ্ণাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের জীবনকে প্রায়ই রাজনৈতিক সংঘাত, দমন-পীড়ন, দারিদ্র্য ও শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখানো হতো। সেসব চিত্রে তাঁদের রাজনৈতিক শরীর দৃশ্যমান ছিল; কিন্তু তাঁদের অন্তর্জগৎ প্রায় অনুপস্থিত। মোফোকেং সেই প্রচলিত দৃষ্টির বাইরে ভিন্ন নজরে তাকালেন।
মোফোকেং তাঁর ক্যামেরায় ধারণ করলেন মানুষের প্রার্থনা, বিশ্বাস, স্মৃতি, আধ্যাত্মিক অনুসন্ধান ও নৈঃশব্দ্যের ছবি। ফলে তাঁর আলোকচিত্রে দক্ষিণ আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ মানুষ আর কেবল ইতিহাসের শিকার নন, তাঁরা নিজেদের আধ্যাত্মিক জগতের নির্মাতা ও উত্তরাধিকারী, যা নিছক একটি ‘সাবজেক্ট’ নির্বাচনের পরিবর্তন নয়; বরং একটি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
সান্তু মোফোকেংমোফোকেংয়ের ছবিগুলো সরাসরি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান বহন করে না। কোথাও রাষ্ট্রীয় পতাকা নেই, রাজনৈতিক নেতার মুখ নেই, নেই মিছিল কিংবা প্রতিবাদের দৃশ্য। তবু এই আলোকচিত্রগুলোর মধ্যে একটি গভীর রাজনৈতিক বক্তব্য সক্রিয়, যা ভূমির ওপর মানুষের অধিকার এবং নিজের সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের ওপর মানুষের অধিকারকে তুলে ধরে।
গুহাগুলো অবস্থিত প্রত্যন্ত ও তুলনামূলক বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে। এই ভৌগোলিক দূরত্বই তাদের একটি বিশেষ স্বাধীনতা দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় নজরদারি কিংবা করপোরেট ভূমি মালিকানার সরাসরি উপস্থিতির বাইরে এই স্থানগুলো যেন সাময়িকভাবে অন্য এক সামাজিক ব্যবস্থা তৈরি করে।
এখানে মানুষ নিজেদের নিয়মে প্রার্থনা করে, গান গায়, আচার পালন করে, নিরাময়ের সন্ধান করে এবং পূর্বপুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ করে। অর্থাৎ গুহা হয়ে ওঠে একধরনের স্বায়ত্তশাসিত সাংস্কৃতিক পরিসর।
যে মানুষগুলো ইতিহাসের দীর্ঘ সময়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রান্তিকতার শিকার হয়েছে, তারা এখানে নিজেদের জন্য এমন এক জায়গা তৈরি করে নেয়, যেখানে তাদের পরিচয় অন্য কেউ সংজ্ঞায়িত করে না। ভূমি তখন শুধু বসবাসের জায়গা নয়; তা হয়ে ওঠে স্মৃতির আধার, বিশ্বাসের আশ্রয় এবং সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের ভিত্তি। এই অর্থে গুহাগুলো একধরনের পাল্টা বয়ান নির্মাণ করে।
প্রধান ধারার রাষ্ট্রীয় ইতিহাস হয়তো তাদের রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক বঞ্চনা কিংবা সামাজিক সংগ্রামের কথা বলেছে। কিন্তু এই ছবিগুলো বলছে মানুষের ইতিহাসের আরেকটি অংশ রয়েছে, যা রাষ্ট্রের নথিতে লেখা হয়নি। এখানে রয়েছে গান, প্রার্থনা, পূর্বপুরুষের স্মৃতি, পবিত্র ভূমি এবং সম্মিলিত আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে।
গুহার এই সমাবেশে বর্ণ, লিঙ্গ ও শ্রেণির পারস্পরিক সম্পর্কও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, বহু ক্ষেত্রে নারীরাই আচার-অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন এবং পবিত্র স্থানগুলোর সামাজিক ও ধর্মীয় ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। ফলে গুহার ভেতরের এই আধ্যাত্মিক জীবনকে কেবল ধর্মীয় কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখা যায় না। এটি একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক ক্ষমতারও একটি প্রকাশ ঘটায়।
‘চেসিং শ্যাডোস’ (১৯৯৬–২০১৪)একটি আলোকচিত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কখনো কখনো ছবির মধ্যে যা দেখা যায় তা নয়; বরং যা দেখা যায় না তা। মোফোকেংয়ের ছবিতেও সেই অনুপস্থিতির গুরুত্ব অসীম। সাদা পোশাক পরা মানুষদের আমরা দেখি, দেখি মোমবাতি, গুহার দেয়াল, ধোঁয়া, মাটি ও পাথর। কিন্তু ছবির বাইরে রয়ে যায় আধুনিক টাউনশিপ, শিল্পশ্রমের কঠোর বাস্তবতা, দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং অ্যাপার্টহেইড-পরবর্তী দক্ষিণ আফ্রিকার অসম সামাজিক কাঠামো। এই অনুপস্থিত জগতের বিপরীতে গুহা যেন এক অন্তর্বর্তী সীমারেখা।
একদিকে রয়েছে কঠিন বস্তুগত পৃথিবী; অন্যদিকে গুহার গভীরে এমন এক আধ্যাত্মিক পরিসর, যা ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের তৈরি পরিচয় ও ক্ষমতার কাঠামোর বাইরে নিজস্ব অর্থে টিকে আছে।
সাদা পোশাকগুলো অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক। এগুলো একদিকে পবিত্রতা, অন্যদিকে সুরক্ষা এবং সম্মিলিত আশ্রয়ের ধারণা বহন করে। ইতিহাসের দীর্ঘ ক্ষত ও সামাজিক আঘাতের বিপরীতে সাদা পোশাক যেন একটি দৃশ্যমান আশ্রয়। মানুষের শরীরকে ঘিরে রাখা এক সামষ্টিক আধ্যাত্মিক আবরণ।
এখানে মোফোকেংয়ের ক্যামেরার অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দূর থেকে মানুষদের পর্যবেক্ষণ করেন না। তাঁর ক্যামেরা থাকে প্রায় চোখের সমতলে, আচার-অনুষ্ঠানের অন্তরঙ্গ বৃত্তের ভেতরে। ফলে দর্শকও কোনো বিচ্ছিন্ন নৃতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষক হয়ে ওঠেন না; বরং একধরনের সম্মানজনক সাক্ষীতে পরিণত হন।
ঔপনিবেশিক নৃতাত্ত্বিক আলোকচিত্রে যে দূরত্ব প্রায়ই দেখা যায়—‘আমি দেখছি, তুমি প্রদর্শিত হচ্ছ’, মোফোকেং সেই দূরত্বকে ভেঙে দেন। এখানে মানুষ প্রদর্শনীর বস্তু নয়। তাঁরা নিজেদের জগতের মধ্যে অবস্থানরত মানুষ আর ক্যামেরা সেই জগতের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন অতিথি।
মোফোকেংয়ের সাদাকালো আলোকচিত্রের নন্দনতত্ত্ব অসাধারণ সংযত, অথচ গভীরভাবে আবেগময়। হাই কনট্রাস্ট, সমৃদ্ধ গ্রেইন আর নাটকীয় আলোর ব্যবহার তাঁর ছবিগুলোকে এমন এক আবহ দেয়, যেখানে দৃশ্যমান বাস্তবতা ধীরে ধীরে একধরনের স্বপ্নময় অভিজ্ঞতায় রূপ নেয়।
গুহার ভারী বেলেপাথরের দেয়াল ছবিতে একটি দৃঢ় শারীরিক উপস্থিতি তৈরি করে। মনে হয়, পাথর শুধু ছবির পটভূমি নয়, সে নিজেই বহু শতাব্দীর স্মৃতি বহন করছে। এর বিপরীতে ক্ষুদ্র মোমবাতির শিখা অত্যন্ত কোমল। ধোঁয়া সেই আলোর চারপাশে ছড়িয়ে গিয়ে অন্ধকারকে ভেদ করে এক অস্পষ্ট দৃশ্যমানতা তৈরি করে।
এই আলো কেবল আলোকসজ্জা নয়; এটি আধ্যাত্মিকতার একটি রূপকও।
মোমবাতির ক্ষুদ্র শিখা যেন বিশাল অন্ধকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষুদ্র কিন্তু অবিনাশী বিশ্বাসের প্রতীক। আলো অন্ধকারকে পরাজিত করে না; বরং তার ভেতরেই নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করে। মোফোকেংয়ের টেক্সচার ব্যবহারের মধ্যেও এই দ্বৈততা লক্ষণীয়। খসখসে বেলেপাথর, নরম কাপড়, ভেজা মাটি এ মানুষের ত্বক—চারটি সম্পূর্ণ ভিন্ন স্পর্শানুভূতি একই ফ্রেমে এসে একধরনের দেহাত্মক অনুভূতি তৈরি করে। ফলে ছবিগুলো একই সঙ্গে পার্থিব ও অপার্থিব। তাদের পা মাটিতে; কিন্তু দৃষ্টি যেন অন্য কোথাও।
‘চেসিং শ্যাডোস’ (১৯৯৬–২০১৪)সেমিওটিক দৃষ্টিতে মোফোকেংয়ের ছবির প্রতিটি উপাদান একাধিক অর্থ বহন করে। একটি জ্বলন্ত মোমবাতিকে প্রত্যক্ষ অর্থে দেখা যায় অন্ধকার গুহাকে আলোকিত করার একটি ক্ষুদ্র উৎস হিসেবে। কিন্তু সাংকেতিক অর্থে সেই আলো হয়ে ওঠে প্রার্থনা, আশা এবং পূর্বপুরুষের নির্দেশনার প্রতীক।
অন্ধকারের মধ্যে মোমবাতির শিখা আমাদের জানান দেয়—সবকিছু দৃশ্যমান না হলেও সবকিছু অনুপস্থিত নয়।
গুহাটিও একটি শক্তিশালী প্রতীক। তার গভীরতা, অন্ধকার এবং পৃথিবীর অভ্যন্তরে অবস্থান তাকে একধরনের মাতৃগর্ভের প্রতীকে পরিণত করে। গর্ভ যেমন জন্মের উৎস, তেমনি গুহাও এখানে উৎস, আশ্রয় ও পুনর্জন্মের সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, গুহা মানুষের শরীরকে মাটির কাছাকাছি নিয়ে আসে। এই নৈকট্য মানুষ ও ভূমির মধ্যকার সম্পর্ককে দৃশ্যমান করে। পূর্বপুরুষেরা যেন কোনো দূরবর্তী অতীতের মানুষ নন; তাঁদের উপস্থিতি এই মাটির মধ্যেই নিহিত।
বলির পশুর অবশেষও এই প্রতীকী ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ; তা জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্ক, উৎসর্গ, পারস্পরিক দায়বদ্ধতা ও বিশ্বাসের ধারাবাহিকতার দিকে ইঙ্গিত করে। এই সব চিহ্ন একত্রে আফ্রিকান স্বাধীন চার্চগুলোর ধর্মীয় সমন্বয়বাদের একটি প্রাণবন্ত দৃশ্য নির্মাণ করে। এখানে স্থানীয় ঐতিহ্য, পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা ও খ্রিষ্টীয় ধর্মচিহ্ন পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে না গিয়ে এক জটিল সাংস্কৃতিক সহাবস্থান তৈরি করেছে।
সান্তু মোফোকেংয়ের ‘চেসিং শ্যাডোস’ বোঝার জন্য তাঁর নিজের একটি মৌলিক প্রশ্ন মনে রাখা জরুরি। আলোকচিত্র কি সত্যিই সেই সবকিছু ধারণ করতে পারে, যা মানুষ অনুভব করে?
মোফোকেং আলোকচিত্রের তথাকথিত বস্তুনিষ্ঠ ‘সত্য’ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাঁর কাছে ক্যামেরা এমন কোনো যন্ত্র নয়, যা বাস্তবতাকে নিখুঁতভাবে ধরে ফেলে। বরং ক্যামেরা এমন একটি মাধ্যম, যা বাস্তবতার কিছু অংশকে দৃশ্যমান করে এবং একই সঙ্গে অসংখ্য অংশকে অদৃশ্য রেখে যায়।
তাই মোফোকেংয়ের অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে ওঠে এমন কিছু, যা ক্যামেরার পক্ষে সরাসরি ধারণ করা প্রায় অসম্ভব। যেমন: ছায়া, স্মৃতি, বিশ্বাস, পূর্বপুরুষের উপস্থিতি, আধ্যাত্মিকতা।
‘চেসিং শ্যাডোস’ (১৯৯৬–২০১৪)‘চেসিং শ্যাডোস’ সিরিজের ধর্মীয় ঐতিহ্যের এই মিশ্রণকে হোমি কে ভাভার ‘হাইব্রিডিটি’ ধারণার আলোতেও পড়া যায়। ভাভার মতে, সংস্কৃতি কোনো স্থির বা বিশুদ্ধ সত্তা নয়; বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা, ক্ষমতার সম্পর্ক ও ঐতিহাসিক মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তার নতুন রূপ তৈরি হয়। মোফোকেংয়ের ছবিতে আফ্রিকান পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য, স্থানীয় নিরাময়প্রথা এবং খ্রিষ্টধর্মীয় প্রতীকের সহাবস্থান তারই একটি উদাহরণ। এখানে কোনো একটি ঐতিহ্য অন্যটিকে সম্পূর্ণভাবে মুছে দেয়নি; বরং তাদের দীর্ঘ সহাবস্থান থেকে তৈরি হয়েছে একটি নতুন সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক পরিসর।
এই হাইব্রিড ধর্মীয় পরিসরকে তাই ‘বিশুদ্ধ’ আফ্রিকান ঐতিহ্য কিংবা ‘বিশুদ্ধ’ খ্রিষ্টীয় ধর্ম—কোনোটির মধ্যেই সম্পূর্ণভাবে আবদ্ধ করা যায় না। বরং এটি ইতিহাসের সংঘাত, ঔপনিবেশিকতার উত্তরাধিকার, সংস্কৃতিকে মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া এবং মানুষের নিজস্ব বিশ্বাসের পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে তৈরি একটি চলমান পরিচয়।
ফ্রান্তজ ফ্যাননের ঔপনিবেশিকতা–বিষয়ক চিন্তা দিয়ে ‘চেসিং শ্যাডোস’ পড়লে ছবিগুলোর আরেকটি গভীর মাত্রা উন্মোচিত হয়। ফ্যাননের মতে, ঔপনিবেশিক শাসন শুধু একটি জনগোষ্ঠীর ভূমি, শ্রম ও রাজনৈতিক অধিকার দখল করে না; মানুষের আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা এবং নিজের সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। দীর্ঘদিন ধরে শাসিত মানুষকে এমন একটি দৃষ্টির সামনে দাঁড়াতে হয়, যেখানে তার নিজস্ব সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও জীবনযাপনকে প্রায়ই ‘আদিম’, ‘অসভ্য’ কিংবা ‘পিছিয়ে থাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ফলে ঔপনিবেশিকতার প্রভাব রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বাইরে মানুষের মনোজগতেও ছড়িয়ে পড়ে।
দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে বিষয়টির গুরুত্ব আরও গভীর। অ্যাপার্টহেইড কেবল কৃষ্ণাঙ্গ মানুষকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত করেনি; তাদের ভূমি, সংস্কৃতি, পরিচয় ও সামাজিক অস্তিত্বকেও নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে। এই দীর্ঘ ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে মোফোকেংয়ের ছবিতে পবিত্র গুহাগুলোকে শুধু ধর্মীয় উপাসনার স্থান হিসেবে দেখা যায় না। এগুলো হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও আত্মপরিচয় পুনরুদ্ধারের পরিসর।
গুহার ভেতরে মানুষ যখন পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে, গান গায়, প্রার্থনা করে, ঐতিহ্যবাহী আচার পালন করে কিংবা নিজেদের বিশ্বাসের সঙ্গে নতুনভাবে সম্পর্ক স্থাপন করে, তখন তারা কেবল ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নেয় না, তারা নিজেদের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বকেও আবার দৃশ্যমান করে তোলে। যে বিশ্বাস ও আচারকে ঔপনিবেশিক দৃষ্টি ‘অন্য’ বা ‘অযৌক্তিক’ বলে চিহ্নিত করতে চেয়েছিল, সেই বিশ্বাসই এখানে মানুষের আত্মপরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে।
‘চেসিং শ্যাডোস’ (১৯৯৬–২০১৪)এই অর্থে মোফোকেংয়ের ক্যামেরা কোনো হারিয়ে যাওয়া অতীতের ছবি তুলছে না; বরং সে এমন এক সাংস্কৃতিক জগতের উপস্থিতি নথিবদ্ধ করছে, যা ঔপনিবেশিক আধিপত্যের মধ্যেও টিকে ছিল এবং পরবর্তী সময়ে নতুন অর্থে নিজেকে প্রকাশ করেছে। তাঁর ছবির মানুষগুলো তাই কেবল ইতিহাসের ভুক্তভোগী নয়; তাঁরা নিজেদের স্মৃতি, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিকতার সক্রিয় নির্মাতা।
ফ্যাননের ‘মানসিক মুক্তি’র ধারণার সঙ্গে এখানেই মোফোকেংয়ের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পরও যদি মানুষ নিজের সংস্কৃতিকে অন্যের চোখ দিয়ে দেখতে থাকে, তবে মুক্তি সম্পূর্ণ হয় না। প্রকৃত মুক্তির একটি অংশ হলো নিজের ইতিহাস, নিজের সংস্কৃতি ও নিজের বিশ্বাসকে নিজের চোখে পুনরাবিষ্কার করা। ‘চেসিং শ্যাডোস’-এর গুহাগুলো সেই পুনরাবিষ্কারের এক প্রতীকী স্থান হয়ে ওঠে।
এখানে তাই গুহার অন্ধকারকে পরাজয়ের প্রতীক হিসেবে দেখা যায় না; বরং সেই অন্ধকারের মধ্যেই জ্বলতে থাকা মোমবাতি, সাদা পোশাক, প্রার্থনামগ্ন মুখ এবং পূর্বপুরুষের স্মৃতি একধরনের সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদার আলো তৈরি করে। ঔপনিবেশিকতার দীর্ঘ ছায়ার মধ্যেও যে বিশ্বাস নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারে, সেই বিশ্বাসই শেষ পর্যন্ত মুক্তির এক ভাষা হয়ে ওঠে।