নিরাপত্তাকর্মীর ‘নিরাপত্তাহীন’ জীবন

· Prothom Alo

রাজধানীর মোহাম্মদপুরে শেখেরটেক এলাকায় বেসরকারি একটি ব্যাংকের এটিএম বুথে নিরাপত্তা প্রহরীর কাজ করেন ৫৮ বছর বয়সী অহিদুল ইসলাম। ১৬ বছর আগে যখন এ পেশায় এসেছিলেন, তখন অহিদুলের মূল বেতন ছিল প্রায় আড়াই হাজার টাকা; এখন পান ৯ হাজার ৩৩৩ টাকা। আর অতিরিক্ত সময় কাজ করলে মাস শেষে বেতন বেড়ে দাঁড়ায় ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, সারা দেশে ব্যাংকগুলোর ১৬ হাজারের বেশি শাখা–উপশাখা এবং প্রায় ১০ হাজারের বেশি এটিএম বুথ রয়েছে। এসব ব্যাংক ও বুথে নিয়োজিত নিরাপত্তাকর্মীদের প্রায় সবাই বিভিন্ন নিরাপত্তাসেবা কোম্পানির সরবরাহ করা ‘আউটসোর্স’ কর্মী।

Visit syntagm.co.za for more information.

শুধু ব্যাংক খাতেই নয়, বিভিন্ন অফিস, বাণিজ্যিক ভবন, শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে কূটনৈতিক মিশন— সবখানেই এখন বেসরকারি বিভিন্ন নিরাপত্তা কোম্পানির কর্মীদের দেখা যায়। তাঁদের সংখ্যার কোনো সুনির্দিষ্ট হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে এ খাতের কোম্পানিগুলোর অন্যতম বড় সংগঠনটি বলছে, সারা দেশ মিলিয়ে পাঁচ লাখের বেশি নিরাপত্তাকর্মী রয়েছেন।

প্রথম আলোর অনুসন্ধান বলছে, নিরাপত্তাকর্মীদের প্রধান সমস্যা কম বেতন। অন্যান্য অসুবিধার মধ্যে রয়েছে—দৈনিক ১২-১৬ ঘণ্টা কাজ, দেরিতে বেতন পাওয়া, সাপ্তাহিক ছুটি না থাকা আর ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অভাব। ঘুম, চিকিৎসা এবং খাওয়া নিয়েও ভোগান্তিতে পড়তে হয়।

অন্যদিকে, আইন ও বিধি অনুসারে দেশে বেসরকারি নিরাপত্তা কোম্পানিগুলোকে মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার এবং কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) কাছ থেকে আলাদা নিবন্ধন নিতে হবে। কিন্তু এই নিবন্ধন নেওয়ার নজির প্রায় নেই। রয়েছে তদারকির অভাবও। কোম্পানিগুলো প্রক্রিয়াগত জটিলতার কথা বলছে।

দুই মাসে ঢাকা ও ঢাকার বাইরের অন্তত ৮০ জন নিরাপত্তাকর্মীর সঙ্গে প্রথম আলো কথা বলেছে। এ–সংক্রান্ত বিভিন্ন নথিপত্র যাচাই করা হয়েছে। কথা হয়েছে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা, নিয়োগদাতা ও সেবাগ্রহীতা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সমিতি এবং শ্রম বিশেষজ্ঞের সঙ্গে।

শ্রম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেসরকারি নিরাপত্তা খাতে রাষ্ট্রীয় কোনো তদারকি সংস্থার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। এ খাতের জন্য একটি নিম্নতম মজুরি কাঠামো ঘোষণা করা আছে। শ্রম বিধিমালায় আউটসোর্স করার ক্ষেত্রে মজুরি নির্ধারণের আলাদা শর্তও আছে। তবে এসব মানা হচ্ছে না।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলছেন, বড় বড় কয়েকটি নিরাপত্তা কোম্পানি হয়তো কিছু ক্ষেত্রে মানদণ্ড মেনে চলে। কিন্তু অধিকাংশই নজরদারির বাইরে। নিরাপত্তাকর্মীদের সমস্যাগুলো নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয় না।

পেট চলে না

নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা প্রতিদিন অন্তত ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা কাজ করেন। বেশির ভাগ কর্মী আট ঘণ্টা কাজ করলে বেতন পান প্রায় ৮ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। অতিরিক্ত সময় অর্থাৎ ওভারটাইম করলে আয় দাঁড়ায় ১৪ থেকে ১৬ হাজার টাকা। এই চিত্র ব্যাংক থেকে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত মোটামুটি একই। অবশ্য কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করা কর্মীরা ১৮-২০ হাজার টাকা বেতনও পান। তবে সেই সংখ্যা কম। কিছু কোম্পানি কর্মীদের সামান্য বোনাস ও ঝুঁকিভাতা দেয়, বাকীরা দেয় না।

বেসরকারি নিরাপত্তাসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর একাধিক সংগঠন রয়েছে। বড় কোম্পানিগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ প্রাইভেট সিকিউরিটি সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন (বিপিএসএসপিএ)। সংগঠনটির তথ্য অনুসারে, নিরাপত্তাকর্মীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ রাজধানী ঢাকায় কাজ করেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীতে কর্মরত বেশির ভাগ নিরাপত্তাকর্মী পরিবারকে গ্রামে রাখেন। তেমনই একজন ইসরাফিল হোসেন। তিনি রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় একটি বহুজাতিক কোম্পানির অফিসে কাজ করেন। ইসরাফিল বলেন, ‘২০০৪ সাল থেকে এ কাজে আছি। এত বছর ঢাকায় থাকি। ফ্যামিলি লগে থাকা তো দূর, তাগো ঢাকায় আইনা কয়দিন রাখুম, সেই সাহসও করি না। যা বেতন পাই, তাতে পেট চলে না।’

শ্রম বিধিমালা অনুসারে, একজন কর্মীকে একই দিনে একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করানো যাবে না।

২০২২ সালে বেসরকারি নিরাপত্তা খাতের জন্য নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করে শ্রম মন্ত্রণালয়। সে অনুসারে, এই খাতে বিভাগীয় শহর ও সিটি করপোরেশন এলাকায় সর্বনিম্ন মজুরি ৯ হাজার ৮০০ টাকা এবং জেলা শহর ও অন্যান্য এলাকায় ৯ হাজার ১৪০ টাকা। এই প্রতিবেদনের জন্য কথা বলা ৮০ জনের মধ্যে অন্তত ৩০ জন বলেছেন, তাঁরা এর চেয়ে কম বেতন পান।

শ্রম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েক বছরের মূল্যস্ফীতি হিসাবে নিলে এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিক খাতের তুলনায় নির্ধারিত নিম্নতম মজুরিটিই অনেক কম। যেমন, তৈরি পোশাক খাতে বর্তমানে নিম্নতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা।

বিপিএসএসপিএ বলছে, নিরাপত্তারক্ষীদের বিদ্যমান মজুরি পর্যালোচনার জন্য তারা ধারাবাহিকভাবে ‘বাংলাদেশ সর্বনিম্ন মজুরি বোর্ড’ পুনর্গঠনের দাবি জানিয়ে আসছে। বিপিএসএসপিএ সভাপতি লে. কর্নেল (অব.) খালিদ আজম বলেন, ‘সম্প্রতি শ্রম মন্ত্রণালয় আমাদের জানিয়েছে যে, তারা বোর্ড পুনর্গঠন করবে। আমরা আশা করছি, এবার একটি উন্নত ও টেকসই মজুরি নির্ধারিত হবে।’

মজুরির অন্য হিসাব

মজুরির অন্য হিসাবও আছে। ২০২২ সালে সংশোধিত শ্রম বিধিমালায় বলা হয়েছে, আউটসোর্স করা কর্মীরা যে প্রতিষ্ঠানে কাজ করবেন, ওই খাতের সর্বনিম্ন মজুরিই তাঁরা পাবেন। সরবরাহকারী কোম্পানি তার চেয়ে কম মজুরি দিতে পারবে না। শ্রম বিধিমালায় আরও বলা আছে, ঠিকাদার সংস্থা ও কর্মী নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার চুক্তিতে প্রত্যেক কর্মীর জন্য যে মজুরি ও ভাতা ধার্য করা হবে, তাঁকে তার চেয়ে কম টাকা দেওয়া যাবে না। কিন্তু এসব নিয়ম মানার নজির কম।

বিভিন্ন বেসরকারি সিকিউরিটি কোম্পানির অধীনে নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে কাজ করছেন তাঁরা। ধানমন্ডি, ঢাকা।

২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছিল, বিভাগীয় শহরে ব্যাংকের পরিচ্ছন্ন কর্মী, নিরাপত্তাকর্মী ও অফিস সহায়কদের মতো পদে ন্যূনতম বেতন-ভাতা হবে ২৪ হাজার টাকা। আউটসোর্স করা কর্মীদেরও সেই অনুপাতে বেতন দিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রজ্ঞাপনটি অবশ্যই মানতে হবে। আউটসোর্স করা কর্মীদের বেতনের সঙ্গে স্থায়ী সম পদের মধ্যে বড় পার্থক্য বা বৈষম্য থাকা চলবে না।

এদিকে বিপিএসএসপিএ বলছে, কোনো নিরাপত্তাসেবা কোম্পানি চুক্তির চেয়ে কম বেতন দিচ্ছে এমন অভিযোগ তাদের কাছে নেই। তবে বেশির ভাগ চুক্তিতে শুধু সার্ভিস চার্জের উল্লেখ থাকে, কর্মীর বেতন নয়।

বিপিএসএসপিএর মহাসচিব ফারহান কুদ্দুস বলছেন, সমস্যাটি দ্বিমুখী। একদিকে, গ্রাহকেরা বেশি টাকা দিতে চান না এবং কম রেটে কাজ করানোর জন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে কৃত্রিম প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করেন। অন্যদিকে, কাজ পাওয়ার জন্য সিকিউরিটি কোম্পানিগুলোও মরিয়া থাকে। তিনি মনে করেন, সর্বনিম্ন মজুরির নিচে সেবা বিক্রি করার জন্য এককভাবে সিকিউরিটি কোম্পানি দায়ী নয়, বরং সর্বনিম্ন মজুরি আইন লঙ্ঘনের জন্য গ্রাহক প্রতিষ্ঠানকেও জবাবদিহির মধ্যে আনা উচিত।

এদিকে ২০২৫ সালের এপ্রিলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাসেবা আউটসোর্স করার ক্ষেত্রে আনসার সদস্যদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। ঢাকা মহানগরীতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে তাঁদের সর্বনিম্ন বেতন ১৮ হাজার ১৮০ টাকা। হাতেগোনা যে কয়টি সরকারি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী নেয়, সেগুলোর মধ্যে আছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখানে এই কর্মীরা ১৮ হাজার টাকা বেতন পান। টাকাটা সরাসরি তাঁদের ব্যাংক হিসাবে ঢোকে। কোম্পানির সার্ভিস চার্জের টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক আলাদা দেয়।

দিন-রাতের ঠিক নেই

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের একটি করপোরেট ভবনে কাজ করেন নিরাপত্তাকর্মী শহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমার নরমাল ডিউটি ১২ ঘণ্টা। ওভারটাইম থাকলে ১৪-১৬ ঘণ্টা কাজ হয়। মাঝে মধ্যে টাকার সমস্যায় পড়লে স্যারগো টানা ওভারটাইম দিতে বলি।’

নিরাপত্তাকর্মীদের নিয়ে ২০১৭ সালে একটি গবেষণা করেছিল বেসরকারি সংস্থা বিলস। গবেষণার তথ্য অনুসারে, এ খাতের ৮০ শতাংশের বেশি কর্মী দিনে ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন। ১৫ ঘণ্টার বেশি সময় কাজ করেন ২৪ শতাংশ কর্মী। গবেষণায় দেখা যায়, নিরাপত্তাকর্মীদের অর্ধেকের বেশি বিরতি ছাড়া একটানা কাজ করেন। এমনকি ৮৮ শতাংশ কর্মী মে দিবসেও ছুটি পান না। এ খাতের কর্মীদের কোনো ট্রেড ইউনিয়ন নেই।

অনেক নিরাপত্তাকর্মী এ কাজকে দীর্ঘমেয়াদি পেশা হিসেবে নিতে চান না, বিশেষ করে তরুণ বয়সীরা। ঢাকায় ৩৮ জন নিরাপত্তাকর্মী এ প্রতিবেদককে বলেছেন, অন্য কাজের সুযোগ পেলে এ পেশা ছেড়ে দেবেন। এর পেছনে তাঁরা তিনটি প্রধান কারণের কথা বলেছেন—কম বেতন; বেশি কর্মঘণ্টা এবং রাতে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটা। আরও আছে খাওয়ার সমস্যা, রোদের মধ্যে টানা ডিউটি, টয়লেট ও বিশ্রামের সুযোগ কম থাকা।

রাজধানীর আদাবর এলাকার একটি এটিএম বুথের নিরাপত্তাকর্মী রাজ্জাক হোসেন বলেন, ‘বুথ ছেড়ে কোথাও বেশি সময়ের জন্য যাওয়া যায় না। নামাজ পড়ি বুথের মধ্যেই। এই বিল্ডিংয়ে একটা মেসের টয়লেট কয়জন মিলে ব্যবহার করি। কিন্তু প্রায়ই সিরিয়াল দিতে হয়।’

হাতেগোনা যে কয়টি সরকারি প্রতিষ্ঠান বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মী নেয়, সেগুলোর মধ্যে আছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সেখানে এই কর্মীরা ১৮ হাজার টাকা বেতন পান। টাকাটা সরাসরি তাঁদের ব্যাংক হিসাবে ঢোকে। কোম্পানির সার্ভিস চার্জের টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক আলাদা দেয়।

শ্রম বিধিমালা অনুসারে, একজন কর্মীকে একই দিনে একাধিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করানো যাবে না। কিন্তু এর উল্টো নজির আছে। রাজধানীর গুলশানে একটি ব্যাংকের অফিসে নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করেন জিব্রাইল হোসেন। সেখানে আট ঘণ্টা কাজ শেষে দুই ঘণ্টা বিরতি দিয়ে সরবরাহদাতা কোম্পানি তাঁকে আবার আধা কিলোমিটার দূরের আরেকটি বহুজাতিক কোম্পানিতে ছয় ঘণ্টা কাজের জন্য পাঠায়।

বিপিএসএসপিএর মহাসচিব ফারহান কুদ্দুস অবশ্য বলছেন, কম মজুরির কারণে গার্ডরাই নিজেদের আয় বাড়ানোর জন্য একটানা অতিরিক্ত সময় কাজের দাবি জানান। সিকিউরিটি কোম্পানিগুলো এই চর্চাকে নিরুৎসাহিত করে।

নারী কর্মীদের দশা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় শপিং মল, করপোরেট অফিস ও পোশাক কারখানায় নারী নিরাপত্তাকর্মীদের নিয়োগ করা হচ্ছে। ঢাকায় ১৩ জন নারীকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছ, তাঁরা কর্মক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে পুরুষদের চেয়ে বৈষম্যমূলক পরিস্থিতির শিকার হন। অনেক জায়গায় নারী গার্ডদের জন্য আলাদা পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ থাকে না। নারীদের অনেকে ওভারটাইম করতে পারেন না।

গুলশানে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অফিসে নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করেন সালমা বেগম। তিনি বলেন, ‘আমরা টাকা একটু কমই পাই। মাঝেমধ্যে কোম্পানি দূরে (ইভেন্টে) ডিউটিতে পাঠায়। তখন বেশি অসুবিধা হয় খাওয়া আর টয়লেট নিয়ে।’

বিশেষ মুহূর্তের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন নিরাপত্তা কর্মীরা

নিবন্ধনের জটিলতা, তদারকি নেই

দেশে বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৮ সালে। এরপর গত প্রায় চার দশকে এই খাতে অনেক কোম্পানি যুক্ত হয়েছে। বিপিএসএসপিএ ২০২০ সালে একটি জরিপ করে বৈধ ট্রেড লাইসেন্সধারী প্রায় ৩৬৯টি কোম্পানির তথ্য পেয়েছিল। তখন তাদের আনুমানিক কর্মী (প্রহরী) ছিল প্রায় পাঁচ লাখ। সংগঠনটি বলছে, বর্তমানে এই সংখ্যা আরও বেড়েছে।

শ্রমবিষয়ক সংস্থা বিলসের ২০১৭ সালের গবেষণাটি বলছে, তখন দেশে ৩৫০ থেকে ৪০০টি নিরাপত্তা সংস্থা কাজ করছিল। কর্মীসংখ্যা ছিল তিন লাখের কিছু বেশি, যার ৯২ শতাংশই পুরুষ।

বেসরকারি নিরাপত্তা সেবা আইন ২০০৬ অনুসারে, বেসরকারি নিরাপত্তাসেবা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কাছ থেকে নিবন্ধন নিতে হবে। আবার শ্রম বিধিমালা অনুসারে, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর্মী সরবরাহের জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই) থেকেও নিবন্ধন নিতে হবে।

বাড়ি ও অফিসের নিরাপত্তায় ১০ লাখ কর্মীর হাজার কোটি টাকার সেবা

ডিআইএফই–এর যুগ্নমসচিব মর্যাদার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশব্যাপী মোট ১ হাজার ৫৬০টি আউটসোর্সিং কোম্পানি তাদের অধিদপ্তরে নিবন্ধিত ছিল। তবে নিরাপত্তা কোম্পানি কতগুলো তা আলাদা করা নেই।

ইসরাফিল, নিরাপত্তাকর্মী২০০৪ সাল থেকে এ কাজে আছি। এত বছর ঢাকায় থাকি। ফ্যামিলি লগে থাকা তো দূর, তাগো ঢাকায় আইনা কয়দিন রাখুম, সেই সাহসও করি না। যা বেতন পাই, তাতে পেট চলে না।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়েও বেসরকারি নিরাপত্তা কোম্পানি নিবন্ধনের কোনো তথ্য নেই। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে জানান, তাঁরা মাসখানেক আগে বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তাতে সারা দেশে মোট ৩২৩টি কোম্পানির তথ্য পাওয়া গেছে, যার মধ্যে রাজধানী ঢাকায় রয়েছে ২২৬টি প্রতিষ্ঠান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার নিয়াজ মেহেদী প্রথম আলোকে বলেন, ইতিপূর্বে বেসরকারি নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ডিএমপি থেকে আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন ছাড়াই কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। তবে বেসরকারি নিরাপত্তা কোম্পানিগুলোকে ২ মাসের মধ্যে নিবন্ধন নিতে ১৯ আগস্ট একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আশা করা হচ্ছে, এখন কোম্পানিগুলো নিবন্ধন নিবে।

বিপিএসএসপিএর সভাপতি লে. কর্নেল (অব.) খালিদ আজম বলেন, নিরাপত্তাসেবা আইন অনুযায়ী তাদের ডিএমপির মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে লাইসেন্স নেওয়ার কথা। কোম্পানিগুলো লাইসেন্স নিতে মোটেও অনিচ্ছুক নয়। তবে ডিআইএফই–এর নিবন্ধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। কারণ, ডিআইএফই কোম্পানিগুলোকে কর্মী নিরাপত্তা তহবিলে টাকা জমা দিতে বলছে, যেটা বাড়তি একটা খরচ। বড়  কোম্পানিগুলো এমনিতেই গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ড ফান্ড, ছুটি, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, চিকিৎসা ইত্যাদির জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিশ্চিত করে থাকে।

করণীয় কী

বিলস-এর নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, বেসরকারি নিরাপত্তাখাতকে অবশ্যই শ্রম আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হিসেবে নির্ধারিত ন্যূনতম সুরক্ষা ও মানদণ্ডগুলো নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর মতে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ব্যবস্থা নেই, শ্রম আদালতও নেই। তারা নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট নিবন্ধন ও যাচাইয়ের কাজ করতে পারে। যেমন, অস্ত্রের নিবন্ধন। বাকি দায়িত্ব শ্রম মন্ত্রণালয়ের।

সুলতান উদ্দিনের সুপারিশ, এ খাতে কর্মী নিয়োগ এবং সরবরাহ চুক্তির মজুরি ও কর্মঘণ্টার একটা মানদণ্ড থাকা উচিত। থাকা উচিত উপযুক্ত পরিদর্শন ব্যবস্থা, তাঁদের অভিযোগ ও দাবি জানানোর সুযোগ এবং সংগঠিত হওয়ার অধিকার।

Read full story at source