এজলাস থেকে নথি চুরি, কম্পিউটার কম্পোজের দোকানে লেখা হতো ভুয়া রায়

· Prothom Alo

প্রথমে ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের এজলাস থেকে চুরি হয়েছিল একটি অস্ত্র মামলার নথি। পরে একই কায়দায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-৮ আদালত থেকে আরেকটি মাদক মামলার নথি চুরি হয়।

দুটি চুরির ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, নথি চুরির নেপথ্যে রয়েছেন নিজেকে আইনজীবীর সহকারী পরিচয় দেওয়া একই ব্যক্তি—আনোয়ারুল হক ওরফে রাসেল। তাঁকে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে নিম্ন আদালতপাড়ায় জাল কাগজপত্র তৈরির তথ্য।

Visit mwafrika.life for more information.

আদালতপাড়ার একটি কম্পিউটারের দোকান থেকে ইতিমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে বিভিন্ন মামলার ভুয়া খালাসের রায় ও আদেশের কপি। পুলিশের ধারণা, আদালতের নথি চুরি করে সেগুলোর আদলে নিখুঁতভাবে তৈরি করা হতো জাল কাগজপত্র ও ভুয়া রায়ের কপি।

জালিয়াতির বিষয়টি ঢাকতে এবং মামলা সত্যিই খালাস হয়েছে, তা প্রমাণ করতে রাসেল আদালত থেকে মামলার মূল নথিটিই চুরি করার পরিকল্পনা করেন।

আদালতের এজলাস থেকে নথি গায়েবের ঘটনায় আনোয়ারুল হক ছাড়াও তাঁর সহযোগী কম্পিউটার অপারেটর আহসান হাবীবকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে নথি চুরি হওয়া অস্ত্র মামলার আসামি তানভীর আহমেদ তনয় ওরফে রাব্বীর স্ত্রী জামিলা আক্তার ওরফে অর্পাকে। এ ঘটনায় জড়িত বাকি সদস্যদের শনাক্ত ও জাল সিল উদ্ধারে পুলিশের তদন্ত চলছে।

৯০ হাজার টাকায় মামলা থেকে খালাসের চুক্তি

আদালত ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর খিলগাঁও থানার একটি অস্ত্র মামলার আসামি তানভীর আহমেদ তনয় ওরফে রাব্বী চার-পাঁচ বছর ধরে পলাতক। বর্তমানে তিনি সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। অন্যদিকে তানভীরের মামা রবিউল হক ভাটারা থানার একটি মাদক মামলার আসামি। তিনিও পলাতক।

পুলিশ সূত্র জানায়, পলাতক এই দুই আসামিকে মামলা থেকে পুরোপুরি খালাস পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তানভীরের স্ত্রী জামিলা আক্তার ওরফে অর্পার সঙ্গে যোগাযোগ করেন আনোয়ারুল হক। অন্য একটি মামলার কার্যক্রমে আদালতে যাতায়াতের সুবাদে জামিলার সঙ্গে আনোয়ারুলের পরিচয়। নিজেকে আইনজীবীর সহকারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে আনোয়ারুল দুই আসামির মামলা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে জামিলার কাছ থেকে ৯০ হাজার টাকা চুক্তি করেন। জামিলার মায়ের বাসায় গিয়ে আনোয়ারুল এই টাকা নেন।

এজলাস থেকে মূল নথি চুরি

সূত্র জানায়, টাকা নেওয়ার পর আনোয়ারুল প্রথমে জমিলাকে একটি ভুয়া খালাসের নথি তৈরি করে দেন। তবে কিছুদিন পর আদালত থেকে পুনরায় আসামিকে হাজির হওয়ার সমন পাঠানো হলে জামিলার মনে খটকা লাগে। তিনি আনোয়ারুলের কাছে এ বিষয়ে জানতে চান। জালিয়াতির বিষয়টি ঢাকতে এবং মামলা সত্যিই খালাস হয়েছে, তা প্রমাণ করতে আনোয়ারুল আদালত থেকে মামলার মূল নথিটিই চুরি করার পরিকল্পনা করেন।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ২ জুলাই বেলা ২টা ২০ মিনিটের দিকে ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের এজলাসে প্রবেশ করেন আনোয়ারুল। নিজেকে আইনজীবীর সহকারী দাবি করে খিলগাঁও থানার ওই অস্ত্র মামলার নথিটি দেখতে চান তিনি। আদালতের উমেদার নাজমুল হাসান তাঁকে নথিটি দেখতে দিয়ে বিচারকের ডাকে পাশের খাসকামরায় যান। ৫ মিনিট পর খাসকামরা থেকে ফিরে এসে নাজমুল দেখেন—আনোয়ারুল নেই, মামলার নথিটিও নেই।

ঘটনার দিনই সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী খায়রুল আলম বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় নথি চুরির মামলা করেন। খায়রুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘অস্ত্র মামলার আসামি তানভীর পলাতক থাকায় আমরা সমন পাঠিয়েছিলাম। আসামি আসেনি, মামলা চলমান। আমরা আনোয়ারুলকে আগে থেকে চিনতাম না, শুধু জানতাম সে আইনজীবীর সহকারী।’

মাদক মামলার নথি চুরি

প্রথম চুরির ঘটনার পর ৩ আগস্ট ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-৮ আদালতে গিয়ে একইভাবে রবিউল হকের বিরুদ্ধে হওয়া মাদক মামলার নথি দেখতে চান আনোয়ারুল। সেই নথিও চুরি করে নিয়ে যান তিনি। এ ঘটনায় আদালতের অফিস সহায়ক সুমন তালুকদার বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় আরেকটি মামলা করেন।

উভয় মামলার তদন্তে নেমে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশ আদালতের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে নথি চুরির জন্য আনোয়ারুল হক ওরফে রাসেলকে শনাক্ত করে। গত ২১ আগস্ট ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে শ্যামপুরের একতা হাউজিং এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

পুলিশ তদন্তে জানতে পারে, আনোয়ারুল আইনজীবী আবদুস সাত্তারের চেম্বারের পিয়ন হিসেবে কাজ করতেন। আইনজীবী আবদুস সাত্তার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আনোয়ারুলের কাজ ছিল চা আনা ও ফাইল রক্ষণাবেক্ষণ করা। প্রায় আড়াই বছর তাঁর চেম্বারে কাজ করার পর চলতি বছরের ১৬ মার্চ থেকে হঠাৎ সে কাজে আসা বন্ধ করে দেয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আনোয়ারুল আমার চেম্বার ছাড়ার আগে সব মক্কেলের ফোন নম্বর ছবি তুলে নিয়ে যায়। পরে সে আমার ক্লায়েন্টদের ফোন দিয়ে মামলা খালাস ও জামিন করিয়ে দেওয়ার নাম করে প্রতারণা শুরু করে। সে আমার আরেক ক্লায়েন্টের কাছ থেকে জামিন করানোর কথা বলে দুই হাজার টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল।’

কম্পিউটারের দোকানে ভুয়া রায়ের কপি

আনোয়ারুলকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নিম্ন আদালতপাড়ার কম্পিউটার অপারেটর আহসান হাবীবকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। হাবীবের কম্পিউটারের একটি ফোল্ডার থেকে জামিলাকে দেওয়া দুটি মামলার খালাসের রায়ের ভুয়া কপিসহ অন্তত ১০টি মামলার ভুয়া রায় ও আদেশের কপি উদ্ধার করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তা এসআই দেবাশীষ হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, হাবীবের কম্পিউটারে কীভাবে এই আদালতের নথিগুলো এল এবং চুরির পেছনে তাঁর কী ভূমিকা ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে জালিয়াতিতে ব্যবহৃত নকল সিলগুলো এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

জামিলার স্বীকারোক্তি

গ্রেপ্তারের পর গত ২১ আগস্ট জামিলা ও আনোয়ারুলকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের মাধ্যমে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। গত সোমবার জামিলা ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আলবিরুনী মীরের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। পরে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। অন্যদিকে আনোয়ারুল ও কম্পিউটার অপারেটর আহসান হাবীব বর্তমানে রিমান্ডে রয়েছেন।

জামিলার আইনজীবী আলমগীর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘জামিলা আদালতের নথি চুরির বিষয়ে কিছুই জানতেন না। ওই ব্যক্তি (আনোয়ারুল) নিজেকে আইনজীবীর সহকারী পরিচয় দিয়ে মামলা খালাস করিয়ে দেওয়ার কথা বলে তাঁর সঙ্গে চুক্তি করেন। পরে সেই ব্যক্তি আদালত থেকে মামলার মূল নথি চুরি করে জামিলাকে বলেন, ‘“এটি আপনার স্বামীর খালাসের কাগজ, এটি যত্ন করে রাখুন।” জামিলা সরল বিশ্বাসে নথিটি বাসায় রেখে দিয়েছিলেন। তিনি যদি জানতেন এটি চুরি করা নথি, তবে কখনোই নিজের ঘরে রাখতেন না।’

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আদালতের এজলাস থেকে নথি চুরি এবং ভুয়া রায় তৈরি করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। এই জালিয়াতি চক্রের কঠোর শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। এর সঙ্গে যদি কোনো আইনজীবীও জড়িত থাকেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তাঁর বার কাউন্সিল সদস্যপদ বাতিল করা হবে।’

Read full story at source