চট্টগ্রামের পাহাড় দখল এখনই থামাতে হবে
· Prothom Alo

চট্টগ্রাম নগরের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বরইতলী এলাকায় যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা নিছক অবৈধ বসতি গড়ে ওঠার ঘটনা নয়; এটি সরকারি ভূমি দখল, নির্বিচার পাহাড় কাটা এবং একটি পরিকল্পিত ভূমিদখল চক্রের ক্রমবিস্তার সম্পর্কে গুরুতর সতর্কসংকেত।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, বরইতলীর প্রায় ৯৪ দশমিক ৪৫ একর খাসজমির বড় অংশে ইতিমধ্যে বসতি গড়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের হিসাবে শুধু বরইতলীতেই তিন শতাধিক পরিবার রয়েছে। আশপাশের পাহাড়েও ছড়িয়ে পড়েছে কয়েক শ ঘর। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বসতি স্থাপনের পাশাপাশি পাহাড় কেটে ছোট ছোট প্লট তৈরি করে তা অর্থের বিনিময়ে হাতবদল করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে কথা বলা অন্তত ৩০ জন বাসিন্দার কেউই বৈধ মালিকানার দলিল দেখাতে পারেননি। পরিবেশ অধিদপ্তর ১৪টি স্থান পরিদর্শন করে ১৮ হাজার ৯৯৪ ঘনফুট পাহাড়ি মাটি কাটার প্রমাণ পেয়েছে। পাহাড় কাটা শুধু পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনে না; এটি ভূমিধস, জলাবদ্ধতা, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় এবং নগরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করার ঝুঁকি বাড়ায়।
Visit h-doctor.club for more information.
সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্নটি হচ্ছে, এত দিন ধরে এসব কীভাবে চলল? বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে গত ১০ বছরে বরইতলীতে কোনো উচ্ছেদ অভিযানের তথ্য পাওয়া যায়নি। চলতি বছরের জুনে অভিযোগ পাওয়ার পর ভূমি অফিস এলাকা পরিদর্শন করে। এরপর পরিবেশ অধিদপ্তর ১৪টি স্থানে পাহাড় কাটার প্রমাণ পায় এবং ৪ আগস্ট ১৪ জনকে মোট ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। কিন্তু জরিমানা দিয়েই যদি সরকারি জমি দখলমুক্ত না হয় এবং কাটা পাহাড়ে অবৈধ স্থাপনা বহাল থাকে, তাহলে এ ধরনের শাস্তি যে কার্যত নিরর্থক, তা বলা বাহুল্য।
অবৈধ দখলদারদের মধ্যে নিম্নবিত্ত ও অসহায় মানুষের উপস্থিতি রয়েছে—এ বাস্তবতাও প্রশাসনের বিবেচনায় রাখতে হবে। কারণ, তাঁদের সামনে রেখে কোনো প্রভাবশালী চক্র যদি সরকারি জমি দখল ও পাহাড় কাটার বাণিজ্য পরিচালনা করে থাকে, তাহলে কেবল বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করে সমস্যার সমাধান হবে না। নেপথ্যের ভূমিদস্যু, দালাল, মধ্যস্থতাকারী এবং প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। সরকারি জমি কীভাবে অবৈধভাবে লিজ বা বিক্রি হচ্ছে, সেটিও অনুসন্ধান করা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে জঙ্গল সলিমপুরের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য যথেষ্ট সতর্কবার্তা। সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরেও পাহাড় দখল, প্লট তৈরি, অর্থের বিনিময়ে জমি হস্তান্তর এবং পর্যায়ক্রমে স্থায়ী বসতি গড়ে উঠেছিল। কয়েক দশকে তা বিশাল জনপদে পরিণত হওয়ায় পরবর্তী সময়ে উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ে। বরইতলীতে এখনো সেই পর্যায় আসেনি। অতএব, জঙ্গল সলিমপুরের পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর এটাই উপযুক্ত সময়।
এ প্রেক্ষাপটে সরকারকে অন্তত চারটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। প্রথমত, অবিলম্বে বরইতলী ও দক্ষিণ পাহাড়তলীর সরকারি জমির পূর্ণাঙ্গ জরিপ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নতুন করে পাহাড় কাটা ও স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে এবং ইতিমধ্যে কাটা পাহাড়ে নতুন বসতি স্থাপনের সুযোগও দেওয়া যাবে না। তৃতীয়ত, সরকারি জমি দখল ও অবৈধভাবে বিক্রির সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও ভূমি আইনে ব্যবস্থা নিতে হবে। চতুর্থত, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পাশাপাশি প্রকৃত অসহায় পরিবারগুলোর জন্য মানবিক ও আইনসম্মত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ভূমি প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, সিটি করপোরেশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত নজরদারি, জবাবদিহি এবং পুনর্দখল রোধের ব্যবস্থা থাকতে হবে।