ভোলায় আমন ধান চাষ নিয়ে শঙ্কা
· Prothom Alo
বিলে ৪০০ থেকে ৫০০ কৃষক চাষাবাদ করেন। স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পানি থাকার কারণে ৭০৩ হেক্টর জমিতে ধানের চাষ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ভোলা সদর উপজেলার চর পাঙ্গাশিয়া বিলে প্রতিবছর এই সময়ে আমন ধানের চাষ হয়। কিন্তু এবার এই বিলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পানি জমে থাকায় এখন আমনের চারা রোপণ করা যাচ্ছে না। আমন আবাদ নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
Visit moryak.biz for more information.
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে খাল ভরাট, কৃষিজমিতে বসতবাড়ি ও খামার নির্মাণ, রাস্তা তৈরি এবং পানিনিষ্কাশনের প্রাকৃতিক পথ বন্ধ করে দেওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে এবার বেশি বৃষ্টি ও জোয়ারের কারণে বিলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিমাণ পানি জমে আছে। শুধু চর পাঙ্গাশিয়া বিল নয়, ভোলা সদর উপজেলার বিভিন্ন বিলে অস্বাভাবিক পানি জমে থাকার কারণে আমন আবাদে প্রভাব পড়ছে।
সদর উপজেলার পশ্চিম ইলিশা ইউনিয়নে চর পাঙ্গাশিয়া বিল। এ বিলে ৪০০ থেকে ৫০০ কৃষক চাষাবাদ করেন। বিলটিতে এই সময় কৃষকদের ধানের চারা রোপণে ব্যস্ত থাকার কথা। কিন্তু এখন এই বিলে প্রায় কোমরসমান পানি জমে আছে। স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পানি থাকার কারণে এবার ৭০৩ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ নিয়ে লোকসানের মুখে পড়ার আশঙ্কায় আছেন কৃষকেরা।
স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পানি জমে থাকার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে ‘জলাবদ্ধতা’ হিসেবে পরিচিত। ভুক্তভোগী কৃষকেরা একাধিকবার প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কাছে পানিনিষ্কাশনের আবেদন জানিয়ে এবং মানববন্ধন করেও কার্যকর কোনো সমাধান পাননি।
কৃষি বিভাগ বলছে, স্বাভাবিক অবস্থা থাকলে আউশ, আমন ও বোরো মিলিয়ে চর পাঙ্গাশিয়া বিল থেকে প্রায় ১১ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন সম্ভব।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, চর পাঙ্গাশিয়া বিলের মাঝখানে মাটির নিচে ৯ থেকে ১০টি এক হাজার ফুট লম্বা পাইপ স্থাপন করে পূর্ব ও পশ্চিম পাশের খালের সঙ্গে সংযোগ দিলে পানিনিষ্কাশন সম্ভব হবে।
চর পাঙ্গাশিয়া বিল এলাকার কৃষক মো. একরামুল আলম জানান, কয়েক বছর ধরেই বিলে জলাবদ্ধতার সমস্যা থাকলেও এবার পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ। একসময় বছরে তিনটি ফসল উৎপাদিত হলেও এখন আমন ধান চাষ করা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে।
গত রোববার চর পাঙ্গাশিয়া বিলে সরেজমিনে দেখা যায়, শুধু কৃষিজমি নয়, বিলসংলগ্ন অনেক বাড়ির উঠান, রাস্তা, সুপারিবাগান পানিতে তলিয়ে আছে। পশ্চিম ইলিশার চর পাঙ্গাশিয়ার বাসিন্দা নুরে আলম গোলদার বলেন, দুই পাশে খাল থাকলেও এখন জোয়ার ও বৃষ্টির পানি বিলে ঢুকে আর বের হতে পারছে না। ফলে তাঁর বাড়িসহ শতাধিক পরিবারের বাড়ির উঠান, সুপারিবাগান, পুকুর ও পানের বরজ পানির নিচে তলিয়ে আছে।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, চর পাঙ্গাশিয়া বিলের মাঝখানে মাটির নিচে ৯ থেকে ১০টি এক হাজার ফুট লম্বা পাইপ স্থাপন করে পূর্ব ও পশ্চিম পাশের খালের সঙ্গে সংযোগ দিলে পানিনিষ্কাশন সম্ভব হবে। খোলা নালার পরিবর্তে মাটির নিচ দিয়ে পাইপ স্থাপন করা হলে আবাদি জমিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
মো. শাহাবউদ্দিন ফরাজি, সভাপতি, লাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনবিলের অস্বাভাবিক পানিনিষ্কাশন না হলে সরকার যতই প্রণোদনা দিক, আউশ-আমনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। এ সমস্যা নিরসন হলে আবাদের পরিমাণ দ্বিগুণ বাড়বে।পশ্চিম ইলিশা ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন বলেন, পাঙ্গাশিয়া বিলে জলাবদ্ধতার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। বর্তমানে বিএডিসির পাইপলাইন শুধু সেচের জন্য, পানিনিষ্কাশনের জন্য নয়। স্থায়ী সমাধানে নতুন সরকারি প্রকল্প প্রয়োজন।
অন্যান্য বিলেও অস্বাভাবিক পানি
সরেজমিনে চর পাঙ্গাশিয়া বিল ছাড়াও দক্ষিণ চরপাতা বিল, সুদুরচর বিল, বাপ্তা ইউনিয়নের চরপোটকা, চরনাপ্তা, দক্ষিণ চরনোয়াবাদ, ভেলুমিয়ার চরগাজী, শরীফখাঁ বাজার, ভেদুরিয়ার মিয়ার চর ও চরকালি বিলে অস্বাভাবিক পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। তবে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা চর পাঙ্গাশিয়া বিলে।
অস্বাভাবিক পানিনিষ্কাশনে স্থানীয় কৃষকেরা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কাছে করা আবেদনে উল্লেখ করেছেন, ভেদুরিয়া, ধনিয়া, ইলিশা, বাপ্তা, ভেলুমিয়া, আলীনগর, উত্তর ও দক্ষিণ দিঘলদী, চরসামাইয়াসহ ১৩টি ইউনিয়নের প্রায় ৫০ হাজার কৃষকের ১৩ হাজার হেক্টর জমির আমন আবাদ হুমকির মুখে। আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি কৃষকেরা ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়ছেন।
খায়রুল ইসলাম মল্লিক, উপপরিচালক, ভোলা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বেশি পানির কারণে আমন ধানের চাষ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, এমন নয়; তবে বিলম্বিত হচ্ছে। এতে ফলনে ঘাটতি হতে পারে। শুধু খাল খনন করে সমস্যার সমাধান হবে না।বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. শাহাবউদ্দিন ফরাজি বলেন, বিলের অস্বাভাবিক পানিনিষ্কাশন না হলে সরকার যতই প্রণোদনা দিক, আউশ-আমনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। এ সমস্যা নিরসন হলে আবাদের পরিমাণ দ্বিগুণ বাড়বে।
খাল খননের পাশাপাশি পর্যাপ্ত বক্স কালভার্ট, স্লুইসগেট ও ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন স্থাপন ছাড়া স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে জানান ভেলুমিয়া ইউনিয়নের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদ। তিনি বলেন, একই সঙ্গে ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন করতে হবে।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বাপ্তার চরপোটকা বিলের জলাবদ্ধতা দূর করতে ইউএনও, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও বিএডিসির কর্মকর্তারা একাধিকবার এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তবে স্থানীয় মতবিরোধ ও বাড়ির মালিকদের আপত্তির কারণে এখনো কার্যকর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। কৃষি কর্মকর্তারা পানি সরাতে পাইপ বসাতে চাইলে বিলের কিনারার বাড়ির মালিকেরা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। তাঁদের অনেকের কর্মকাণ্ডই বিলে বেশি পরিমাণ পানি জমে থাকার কারণ। সব বিলে প্রায় একই সমস্যা।
ভোলা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খায়রুল ইসলাম মল্লিক প্রথম আলোকে বলেন, বেশি পানির কারণে আমন ধানের চাষ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, এমন নয়; তবে বিলম্বিত হচ্ছে। এতে ফলনে ঘাটতি হতে পারে। শুধু খাল খনন করে সমস্যার সমাধান হবে না। ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিক করা, পানি চলাচলের পথ উন্মুক্ত করা এবং প্রশাসন, কৃষি বিভাগ, পুলিশ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।