চাঁদ কীভাবে পৃথিবীতে জোয়ার-ভাটা ঘটায়
· Prothom Alo

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে গেলে দেখা যায়, সাগরের পানি দিনে দুইবার বাড়ে, দুইবার কমে। এই ঘটনাকে আমরা বলি জোয়ার-ভাটা। আবার ভেবো না, এটা শুধু কক্সবাজারে দেখা যায়। পৃথিবীর সব সাগর, মহাসাগরেই নিয়মিত হয় এটা।
Visit afnews.co.za for more information.
জোয়ারের সময় সমুদ্রের তীরে দাঁড়ালে দেখা যায়, পানির স্তর ধীরে ধীরে বাড়ে এবং কূলের দিকে উঠে আসে। আবার একসময় ধীরে ধীরে নেমে যায়। পানি বাড়তে বাড়তে উঁচুতে উঠে যখন তীরের বেশির ভাগ অংশ ভাসিয়ে দেয়, তাকে বলা হয় ভরা জোয়ার। আর পানি নামতে নামতে নিচে নেমে গেলে তাকে বলা হয় ভাটা। কেবল সাগরে নয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বড় হ্রদ ও নদীতেও জোয়ার-ভাটা হয়।
কিন্তু বিশাল এই সাগরগুলোতে পানি কেন এভাবে নড়াচড়া করে? এই প্রশ্নের উত্তর আছে চাঁদের কাছে। পৃথিবী থেকে প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার কিলোমিটার দূরে চাঁদ। এত দূরে থাকা সত্ত্বেও চাঁদের একটি নিজস্ব টান বা অভিকর্ষ বল রয়েছে। এই অভিকর্ষ বলের শক্তির সাহায্যেই চাঁদ প্রতিদিন পৃথিবীর সাগরের পানিকে নিজের দিকে টেনে ধরে।
সমুদ্রের পানির এভাবে নিয়মিত ওঠানামা করাকে বলা হয় জোয়ার-ভাটার চক্র। কোথাও যদি দিনে একবার জোয়ার আর একবার ভাটা হয়, তবে তাকে বলা হয় দৈনিক জোয়ার-ভাটা চক্র। আমাদের এখানে প্রতি ৬ ঘণ্টা পরপর একবার করে জোয়ার বা ভাটা হয়। এই জোয়ার-ভাটার ওপর চাঁদের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি কাজ করে। তবে চাঁদ ছাড়াও সূর্য এবং পৃথিবীর নিজস্ব ঘূর্ণনও সাগরের পানি ওঠানামায় ভূমিকা রাখে।
১০০ মিটার দৌড়ে উসাইন বোল্টের রেকর্ড ভাঙল চীনা রোবটচাঁদের টান ও জোয়ার-ভাটা
চাঁদ মূলত মহাকর্ষ বল বা অভিকর্ষ টানের মাধ্যমে জোয়ার-ভাটা ঘটায়। আমরা যখন ওপরের দিকে লাফ দিই, তখন প্রতিবারই মাটিতে ফিরে আসি। এর কারণ পৃথিবীর অভিকর্ষ বল আমাদের নিচের দিকে টেনে ধরে।
পৃথিবীর মতো চাঁদেরও নিজস্ব অভিকর্ষ বল রয়েছে। এই বল দিয়ে চাঁদ পৃথিবীর সাগর-মহাসাগরকে নিজের দিকে টানে। চাঁদের এই টান পৃথিবীর টানের চেয়ে অনেক দুর্বল, তাই মানুষ হিসেবে আমরা তা অনুভব করি না। তবে সাগরের তরল পানির ওপর এর স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়।
চাঁদের টানে সাগরের পানি সামান্য সরে যায়। ফলে পৃথিবীর যে দিকটা চাঁদের ঠিক মুখোমুখি বা কাছাকাছি থাকে, সেই দিকের পানি ফুলে-ফেঁপে ওঠে এবং জোয়ারের সৃষ্টি হয়।
পৃথিবীর ঘূর্ণন ও বিপরীত দিকের জোয়ার
এখন অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, চাঁদ যে পাশে থাকে, সেই পাশের সাগরের পানি চাঁদের টানে ফুলে ওঠে জোয়ার হয়, তা তো বুঝলাম। কিন্তু চাঁদের ঠিক উল্টো বা বিপরীত দিকে কেন একই সময়ে জোয়ার হয়?
এর কারণ হলো পৃথিবীর নিজস্ব ঘূর্ণন। পৃথিবী নিজের অক্ষের ওপর অনবরত ঘুরছে বলেই দিন ও রাত হয়। আর এই ঘূর্ণনের ফলে তৈরি হওয়া কেন্দ্রবিমুখী বলের কারণে চাঁদের ঠিক বিপরীত পাশের পানিও বাইরের দিকে ফুলে ওঠে।
এই দুটি জায়গায় একসঙ্গে জোয়ার হওয়ার ফলে চারপাশের সমুদ্র থেকে পানি সেদিকে চলে যায়। তাই ওই দুই জোয়ারের মাঝখানের জায়গাগুলোতে পানির স্তর নেমে যায় এবং ভাটার সৃষ্টি হয়।
মঙ্গলের চাঁদ ডিমোসের আকার আলুর মতো কেনজোয়ার-ভাটায় সূর্যের ভূমিকা
চাঁদ ও পৃথিবীর মতো সূর্যেরও নিজস্ব অভিকর্ষ বল রয়েছে। সূর্য চাঁদের চেয়ে অনেক বড় এবং এর আকর্ষণ শক্তিও বেশি। তবে সূর্য পৃথিবী থেকে অনেক দূরে থাকায় জোয়ার-ভাটার ওপর এর প্রভাব চাঁদের টানের অর্ধেকেরও কম।
তবু জোয়ার-ভাটায় সূর্যের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। অমাবস্যা বা পূর্ণিমার দিনে সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী একই সোজা লাইনে চলে আসে। তখন সূর্য ও চাঁদের টান একসঙ্গে কাজ করে। ফলে সাগরে অনেক বেশি উঁচু জোয়ার হয়, যাকে বলা হয় ভরা জোয়ার।
আবার চাঁদ যখন সূর্য ও পৃথিবীর সঙ্গে সমকোণে বা ৯০ ডিগ্রি কোণে থাকে, তখন সূর্যের টান চাঁদের টানকে বাধা দেয়। এর ফলে জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে কম ওঠে, যাকে বলা হয় মরা জোয়ার।
মূলত চাঁদের অভিকর্ষ বলের কারণেই সাগরে জোয়ার-ভাটা হয়। তবে এর পাশাপাশি সূর্যের আকর্ষণী শক্তি এবং পৃথিবীর নিজস্ব ঘূর্ণন গতিও জোয়ার-ভাটার রূপ বদলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আর নদীতে জোয়ার-ভাটা হওয়ার মূল কারণ হলো সাগরের সঙ্গে এর সংযোগ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নদীর নিজস্ব পানিতে চাঁদের টানে সরাসরি জোয়ার হয় না। বরং সাগরের পানি নদীতে প্রবেশ করার ফলে এটি ঘটে। এভাবে চাঁদ সূর্য আমাদের সাগরকে নিয়ন্ত্রণ করে।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ও দ্য কনভার্সেশনহলান্ডের ‘শর্ট হেয়ার, ডোন্ট কেয়ার’