আমার টাকা ছিল না, ছিল সাহস আর অগাধ বিশ্বাস: নাসরিন নওরোজ স্বপ্না
· Prothom Alo

তরুণ উদ্যোক্তাদের হাত ধরেই তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন ব্যবসা ও সম্ভাবনার গল্প। তবে একটি উদ্যোগ শুরু করা থেকে সেটিকে টিকিয়ে রাখা ও এগিয়ে নেওয়ার পথ সহজ নয়। নানা চ্যালেঞ্জ, সিদ্ধান্ত ও শেখার অভিজ্ঞতা পেরিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা কীভাবে গড়ে তুলছেন নিজেদের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান—সেই সব গল্প নিয়েই প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো ‘লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-৩’। এই পর্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় অতিথি ছিলেন ‘ক্যাফে দোতালা’র স্বত্বাধিকারী নাসরিন নওরোজ স্বপ্না।
‘আমার হাতে যখন মাত্র ৫ হাজার টাকা ছিল, তখন আমি ক্যাফে করার স্বপ্ন দেখি। পর্যাপ্ত টাকা ছিল না, কিন্তু ছিল সাহস। আর আমি বিশ্বাস করতাম, শুরু করার জন্য অনেক টাকা নয়, দরকার শুধু একটু সাহস আর এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা।’
পডকাস্টে অংশ নিয়ে কথাগুলো বলেন নাসরিন নওরোজ স্বপ্না। পর্বটি প্রচারিত হয় গতকাল শনিবার প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে।
Visit betsport24.es for more information.
পডকাস্টের শুরুতেই নাসরিন নওরোজ স্বপ্নার কাছে সঞ্চালক জানতে চান, গৃহিণী থেকে উদ্যোক্তা হওয়ার সিদ্ধান্ত কেন নিলেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার ইচ্ছা ছিল, নিজের একটা পরিচয় তৈরি করব। মানুষ যেন আমাকে নাসরিন নওরোজ স্বপ্না নামেই চেনে, সেটাই চেয়েছি। বিয়ের পর ভাবলাম, সংসারের পাশাপাশি কিছু করা দরকার। তখন ঘরে বসে পটারি ডেকোরেশন করতাম। আমার স্বামী কখনো ২০ টাকা, কখনো ৫০ টাকা দিতেন। একদিন রং কিনতাম, আরেক দিন পটারি। টিভিতে এ রকম অনুষ্ঠান দেখে নিজের মতো করে ডেকোরেশন করতাম। দুই-তিন মাসের মধ্যে বেশ কিছু পণ্য তৈরি করে ফেলি।’
নাসরিন নওরোজ স্বপ্না আরও বলেন, ‘২০১৩ সালে আমরা যে হাউজিংয়ে থাকতাম, তার নিচে বৈশাখ উপলক্ষে একটি ছোট মেলার আয়োজন করা হয়। সেখানে আমার তৈরি পটারি, কাপড়ের পুতুল, হাতি-ঘোড়া, ফুলসহ বিভিন্ন পণ্য রাখি। মানুষ সেগুলো দেখে পছন্দ করল এবং বিক্রিও হলো। তখনই বুঝলাম, চেষ্টা করলে আমি ধীরে ধীরে এই কাজটা এগিয়ে নিতে পারি।’
২০২০ সালে নাসরিন নওরোজ স্বপ্নার জীবনে কঠিন একটি সময় আসে। তাঁর স্বামী অসুস্থ হয়ে পড়েন। সঞ্চালক সেই সময়ের কথা জানতে চাইলে নাসরিন নওরোজ স্বপ্না বলেন, ‘২০২০ সালে আমার জীবনের একটা বড় অধ্যায় শুরু হয়। আমার স্বামীর দ্বিতীয় স্টেজের ক্যানসার ধরা পড়ে। কেমো দেওয়ার পর উল্টো প্রতিক্রিয়া হয়ে তাঁর শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয়। পরে একটি বড় অস্ত্রোপচার হয়। সেই সময় চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন ছিল। আর করোনার সময় যখন কেউ কারও কাছে যেতে চাইত না, তখন অসুস্থ স্বামী ও তিন সন্তানকে সামলে আমি তাঁর চিকিৎসার জন্য ছুটেছি। এর মধ্যেই আমার বাবাও মারা যান।’
প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, সেই পরিস্থিতিতে কীভাবে সব কিছু সামলালেন?
উত্তরে নাসরিন নওরোজ স্বপ্না বলেন, ‘চিকিৎসা শেষে যখন বাসায় ফিরলাম, তখন আমার হাত একেবারেই খালি। সন্তানদের কীভাবে খাওয়াব, স্বামীর বাকি চিকিৎসা কীভাবে করাব—কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আত্মীয়স্বজন সাহায্য করলেও প্রতিদিনের খাবারের দায়িত্ব তো তাঁদের পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়। তখন ২০২১ সালের দিকে “স্বপ্না’স ফুড কর্নার” নামে একটি পেজ খুলি। ঘরে বসে অল্প অল্প করে অর্ডারের খাবার রান্না করে ডেলিভারি দিতে শুরু করি। সেখান থেকে যে আয় হতো, তা দিয়ে সন্তানদের পড়াশোনার খরচ এবং স্বামীর চিকিৎসা চালাতাম।’
এরপর তো আপনি শুরু করলেন ‘ক্যাফে দোতলা’। এই যাত্রা কীভাবে শুরু হলো? সঞ্চালকের প্রশ্নের উত্তরে নাসরিন নওরোজ স্বপ্না বলেন, ‘অনলাইনে খাবারের ব্যবসা করে সংসার ও চিকিৎসার খরচ একসঙ্গে চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছিল। তখন আমার খালাতো ভাইয়ের স্ত্রী তানজিনা নাহিদ আমার পাশে দাঁড়ান। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে তাঁদের ‘‘পোশাক বাই তাননাস’’ আউটলেটের দোতলায় একটি রুম, বারান্দা ও কিচেনের স্পেস দিয়ে তিনি আমাকে “ক্যাফে দোতলা বাই স্বপ্না’স ফুড কর্নার” করার সুযোগ দেন। তানজিনা নাহিদ এবং তাঁর দুই বন্ধু নাসরিন শিকদার হেনা ও আইরিন মাহমুদও আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন।’
এ পর্যায়ে সঞ্চালক জানতে চান, একটি ক্যাফে শুরু করতে তো বেশ কিছু অর্থের প্রয়োজন হয়। তখন আপনার হাতে কত টাকা ছিল?
নাসরিন নওরোজ স্বপ্না বলেন, ‘আমার হাতে তখন মাত্র ৫ হাজার টাকা ছিল। তানজিনা ভাবি যখন ক্যাফে করার প্রস্তাব দেন, তখন বলেছিলাম, আমি এটা কীভাবে করব? আমার তো টাকা নেই। তখন তানজিনা ভাবী, নাসরিন শিকদার হেনা ও আইরিন মাহমুদ—তিনজন আমাকে সাহস দেন এবং ক্যাফেটি গড়ে তুলতে সহযোগিতা করেন। টেবিল-চেয়ার থেকে শুরু করে ফ্রিজ পর্যন্ত তাঁরা দিয়েছেন। আজ প্রায় এক বছর হয়ে যাচ্ছে, এখনো তাঁরা নিঃস্বার্থভাবে আমাকে সহযোগিতা করে যাচ্ছেন।’
ক্যাফেটি চালু করার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে নাসরিন নওরোজ স্বপ্না বলেন, ‘আমার ক্যাফেটিতে একসঙ্গে ১২ থেকে ১৫ জন বসতে পারেন। ২০২৩ সালের অক্টোবরের দিকে শুরু করি। প্রথম দিকে এক-দুজন করে কাস্টমার আসতেন। খুব বেশি প্রচারও করতে পারতাম না। পরে তানজিনা ভাবি ক্যাফেটির নানা রকম ভিডিও করে ইনস্টাগ্রামে প্রচার শুরু করেন। ধীরে ধীরে আমাদের কাস্টমার বাড়তে শুরু করে।’
অনলাইনে খাবারের অর্ডার নেওয়া বা বিক্রির ক্ষেত্রে এমন কোনো অভিজ্ঞতা আছে, যা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য শিক্ষণীয়? সঞ্চালক জানতে চাইলে নাসরিন নওরোজ স্বপ্না বলেন, ‘সাহস ও বিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। অর্থ না থাকলেও চেষ্টা থামানো যাবে না। আমার কাছে যখন টাকা থাকত না, তখন প্রতিদিনের উপার্জনের ৫০০ টাকা দিয়ে আবার বাজার করতাম। কখনো মুদিদোকান থেকে বাকিতে পণ্য নিতাম, কখনো বন্ধুর কাছ থেকে ধার করে কাজ চালাতাম। নতুন উদ্যোক্তাদের বলব, ভয় পাবেন না।’
এরপর সঞ্চালক বলেন, ‘আপনার তিন মেয়ের কথা বলি। তাঁরা কী করছেন এবং আপনার ব্যবসায় কীভাবে সহযোগিতা করছেন?’
নাসরিন নওরোজ স্বপ্না জানান, তাঁর বড় মেয়ে হোম ইকোনমিকসে ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশনে ফাইনাল ইয়ারে পড়ছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়ে ২০২৬ সালে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। তিনজনই তাঁকে ক্যাফের কাজে সহযোগিতা করে। তিনি যখন এখানে সাক্ষাৎকার দিতে এসেছেন, তখন তাঁর ছোট দুই মেয়ে ক্যাফে সামলাচ্ছে।
আলোচনার শেষ পর্যায়ে সঞ্চালক বলেন, ‘প্রথম আলোর আয়োজনে “আমার গল্প, আমার শক্তি” শীর্ষক একটি ক্যাম্পেইনে আপনার গল্প ছাপা হয়। সেটি কি আপনার জীবনের একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট বলে মনে করেন?’
নাসরিন নওরোজ স্বপ্না বলেন, ‘অবশ্যই। নাসরিন শিকদার হেনা আপুই মূলত আমাকে ওই ক্যাম্পেইনের কথা জানায়। এর মাধ্যমে মানুষ আরও ভালোভাবে আমার এবং আমার ক্যাফের কথা জানতে পারে।’
ঢাকায় অনেক ক্যাফে ও রেস্টুরেন্ট কিছুদিন চলার পর নানা কারণে বন্ধ হয়ে যায়। এ ব্যবসার মূল চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে নাসরিন নওরোজ স্বপ্না বলেন, ‘এখানে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, খাবারের বৈচিত্র্য থাকতে হবে। অন্য ক্যাফেগুলোর চেয়ে আমাদের খাবার ও পরিবেশ একটু আলাদা। যেমন আমাদের ক্যাফেতে বাঙালিয়ানার ছোঁয়া আছে। দ্বিতীয়ত, কাস্টমারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি করতে হবে।’