লিখতে পারেন না, দাগ কেটেই চায়ের দোকানের হিসাব রাখেন মান্নু

· Prothom Alo

সিমেন্টের খুঁটিতে চকের দাগ। এক, দুই, তিন—এভাবে পাশাপাশি টানা অসংখ্য দাগ। মান্নুর চায়ের দোকানে এটাই বাকির খাতা। কোন দাগ কার, সেটিও মুখস্থ ৬৮ বছর বয়সী মান্নুর। নাম লিখতে পারেন না, কিন্তু তিন দশক ধরে দাগ কেটেই চায়ের দোকানের হিসাব রাখছেন।

Visit turconews.click for more information.

এই ছোট্ট দোকান ঘিরেই বদলে গেছে একটি জায়গার পরিচয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট-শিবগঞ্জ সড়কের কাশিয়াবাড়ি মিরপুর গ্রামের কাছে মোড়টির নাম ‘মান্নুর মোড়’। প্রায় ৩০-৩৫ বছর আগে সেখানে প্রথম চায়ের দোকানটি দিয়েছিলেন মান্নু। বাসের সহকারী, চালক ও স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে একসময় মোড়টির নাম হয়ে যায় মান্নুর মোড়। সেই নাম আজও টিকে আছে।

দাগেই চলে বাকির হিসাব

মান্নু লেখাপড়া জানেন না। সহজ-সরল, হাসিখুশি মানুষ হিসেবে এলাকায় তাঁর পরিচিতি। সড়কের পাশে সিমেন্টের খুঁটির ওপর টিনের ছাউনির ছোট্ট দোকান। দোকানে ঢুকলেই চোখে পড়ে সিমেন্টের খুঁটিতে চকের আঁচড়। পাশাপাশি লম্বা লম্বা দাগ। দাগগুলোই তাঁর বাকির হিসাব। এক কাপ চা বাকিতে গেলে একটি দাগ। টাকা পরিশোধ হলে সেই দাগ মুছে দেন। দীর্ঘ এই সময়ে বাকি নিয়ে খরিদ্দারের সঙ্গে তাঁর বড় কোনো বিরোধ হয়নি।

মান্নুর দোকানে চা পান করছেন স্থানীয় লোকজন। বুধবার বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট-শিবগঞ্জ সড়কের কাশিয়াবাড়ি মিরপুর গ্রামের কাছে মান্নুর মোড়ে

মান্নুর দোকানে প্রতিদিন চা পান করতে আসেন স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল হালিম। তিনি দোকানে বসে বলেন, ‘মান্নু যদ্দিন থ্যাকা এ মোড়ে চায়ের দোকান দিয়াছে, হামি তদ্দিনকার খরিদ্দার। চায়ের দোকানের বয়স বাড়ছে, হামারঘেও বয়স বাড়ছে। চুল–দাড়ি সব প্যাকা গেল। হাম্মো বাকি খাই। মান্নু আঁক দিয়া থয়। শোধ দিলে মুছিয়া দেয়। কুনুদিনও দুকথা হয়নি। দুবেলায় আসি প্রত্যেক দিন। নাহিল হামারঘে প্যাটের ভাতই হজম হইবে না, এ রকুম ব্যাপার। ওর (মান্নুর) চা ভালো। মানুষখানটাও ভালো।’

মুরব্বিদের আড্ডাখানা

মান্নুর দোকানের আরেকটি পরিচয় আছে। এটি এলাকার বয়স্ক মানুষের মিলনমেলা। ৪০ থেকে ৭০–৭৫ বয়সী মানুষই এখানে বেশি আসেন। সকাল-বিকেল কিংবা দিনের অন্য সময় সুযোগ পেলেই তাঁরা এসে বসেন। চায়ের কাপ হাতে চলে গল্প, হাসিঠাট্টা ও মতবিনিময়।

বুধবার বিকেলে দোকানে গিয়ে দেখা গেল, সামনে খোলা আকাশের নিচে টেবিল পাতা। দুই পাশে বসে আছেন কয়েকজন প্রবীণ। কারও চুল পেকে সাদা, কারও মুখভর্তি দাড়ি। কেউ অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক, কেউ মসজিদের ইমাম, কেউ গ্রামের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। দোকানের ভেতরেও আট-দশজন। প্রায় সবাই ৪৫ বছরের বেশি বয়সী। গ্রামের সাধারণ মানুষের বেশভূষা। কেউ সুরুৎ সুরুৎ শব্দ করে চায়ে চুমুক দিচ্ছেন, কেউ গল্পে মগ্ন।

তিন কিলোমিটার পথ পেরিয়েও আড্ডায় আসেন মজিদ

অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক আব্দুল মজিদের (৭৫) বাড়ি ভোলাহাটের বড়গাছি গ্রামে। মান্নুর দোকান থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে। তবু বন্ধুদের সঙ্গে চা পান আর আড্ডা দিতে প্রায় প্রতিদিনই তিনি এখানে আসেন।

দোকানের বাইরে বসেও অনেকে চা পান করছেন। বুধবার বিকেলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট-শিবগঞ্জ সড়কের কাশিয়াবাড়ি মিরপুর গ্রামের কাছে মান্নুর মোড়ে

আব্দুল মজিদ বলেন, ‘মান্নুর চা ভালো, মান্নু মানুষটাও ভালো। চা বিক্রি করে ভালোই রোজগার করে। লেখাপড়া না শিখলে কী হয়েছে? হিসাব রাখার লাগসই কায়দা শিখে ঠিকই ব্যবসা করছে। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ উপায় বের করে নেয়।’ মান্নুর চার ছেলে। দুই ছেলে আমের ব্যবসা করেন, অন্য দুই ছেলে পাওয়ার টিলার চালান। ছেলেদের দাঁড় করানোর পেছনে মান্নুরই বড় অবদান বলে মনে করেন আব্দুল মজিদ।

চায়ের টেবিলেই গ্রামের গল্প

কালীনগর জামে মসজিদের ইমাম ও একটি নূরানী মাদ্রাসার শিক্ষক আব্দুল মালেকও নিয়মিত আসেন মান্নুর দোকানে। তিনি বলেন, ‘ঠিক কত বছর আগে এই নাম হয়েছে, তা জানি না। তবে ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি মান্নুর মোড়ের কথা। এখানে মুরব্বিরা চা পান করতে আসেন। আমিও নিয়মিত আসি। মুরব্বিদের সঙ্গে মতবিনিময় হয়। ভালোই লাগে।’

মান্নুর দোকানে শুধু চা বিক্রি হয় না, জমে মানুষের গল্পও। সুখ-দুঃখ, সংসারের কথা, গ্রামের সমস্যা থেকে শুরু করে দেশ-বিদেশের নানা প্রসঙ্গ—সবই উঠে আসে চায়ের টেবিলে।

মান্নুর মোড়সংলগ্ন গ্রামের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘চায়ের টেবিলে মানুষের মধ্যে নানা গল্প হয়। মানুষের সুখ-দুঃখের গল্প, স্থানীয় সমস্যা থেকে দেশ-বিদেশের নানা গল্প। মানুষের সঙ্গে গালগল্পে মেতে ওঠা প্রতিদিনকার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। এক দিন না হলে দিনটা কেমন পানসে মনে হয়।’ গল্পের ফাঁকে উঠে আসে গ্রামের সমস্যার কথাও। কথা বলতে বলতে রাকিবুল যেমন স্থানীয় মানুষের আড্ডার কথা বললেন, তেমনি তুলে ধরলেন এলাকার একটি সড়কের বেহালের কথাও।

সিমেন্টের খুঁটিতে চক দিয়ে চায়ের হিসাব রাখেন মান্নু। মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের হিসাব অবশ্য কোনো খাতায় ওঠেনি। তিন দশক ধরে এক কাপ চা, একটুখানি আড্ডা আর আন্তরিকতায় সেই হিসাবই জমেছে তাঁর দোকানে।

Read full story at source