উচ্চ কোলেস্টেরল: ভালো না মন্দ?
· Prothom Alo

কোলেস্টেরল শরীরের জন্য অপরিহার্য, কিন্তু রক্তে অতিরিক্ত এলডিএল দীর্ঘ মেয়াদে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই কোলেস্টেরল নিয়ে প্রচলিত ধারণার বাইরে প্রয়োজন সঠিক তথ্য, ব্যক্তিগত ঝুঁকি মূল্যায়ন ও সচেতন জীবনযাপন।
Visit bettingx.bond for more information.
কোলেস্টেরল নিয়ে আমাদের মধ্যে অনেক ভুল ধারণা আছে। কেউ মনে করেন, কোলেস্টেরল মানেই ক্ষতিকর; আবার কেউ মনে করেন, শরীর নিজেই যেহেতু কোলেস্টেরল তৈরি করে, তাই বেশি কোলেস্টেরল নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।
আসলে সত্যিটা এর মাঝামাঝি।
কোলেস্টেরল শরীরের একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। কোষের ঝিল্লি, কিছু হরমোন, ভিটামিন ডি এবং পিত্তরস তৈরিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শরীর প্রয়োজনীয় কোলেস্টেরলের বড় একটি অংশ নিজেই তৈরি করতে পারে। তাই কোলেস্টেরলকে ‘বিষ’ হিসেবে দেখা যেমন ঠিক নয়, তেমনি রক্তে এর মাত্রা বেশি হলেও তা উপেক্ষা করা ঠিক নয়।
কোলেস্টেরল কখন সমস্যা হয়ে ওঠে
কোলেস্টেরল নিজে কোনো রোগ নয়। সমস্যা তৈরি হয় যখন রক্তে নির্দিষ্ট ধরনের লাইপোপ্রোটিন, বিশেষ করে এলডিএল-সি দীর্ঘ সময় ধরে বেশি থাকে।
এলডিএল বা লো-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন রক্তের মাধ্যমে কোলেস্টেরল শরীরের বিভিন্ন কোষে পৌঁছে দেয়। কিন্তু রক্তে এলডিএল-সি বেশি থাকলে ধমনির দেয়ালে কোলেস্টেরলসমৃদ্ধ কণার জমা হওয়ার মাধ্যমে অ্যাথেরোসক্লেরোসিস বা ধমনিতে প্লাক তৈরির প্রক্রিয়া বাড়তে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে এটি হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
অন্যদিকে এইচডিএল সাধারণত অতিরিক্ত কোলেস্টেরলকে টিস্যু থেকে লিভারের দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে শুধু এইচডিএল বেশি বা কম দেখেই একজন মানুষের সামগ্রিক হৃদ্রোগের ঝুঁকি নির্ধারণ করা যায় না।
অর্থাৎ কোলেস্টেরলকে শুধু ‘ভালো’ ও ‘খারাপ’—এই দুই ভাগে দেখলে বিষয়টি অতিরিক্ত সরলীকৃত হয়ে যায়।
এলডিএল কি সব সময় একই রকম
এলডিএল কণার আকার ও বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। স্মল ডেন্স এলডিএলের সঙ্গে হৃদ্রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা রয়েছে। তবে এখান থেকে এই সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক নয় যে লার্জ বয়্যান্ট এলডিএল সম্পূর্ণ নিরাপদ।
সাধারণ এলডিএল-সি পরীক্ষাই অনেক মানুষের কার্ডিওভাসকুলার রিস্ক মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চিকিৎসক এপোবি, এলপি(এ), নন-এইচডিএল-সি কিংবা অন্যান্য পরীক্ষাও বিবেচনা করতে পারেন।
তাই শুধু একটি রিপোর্ট দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, ওজন এবং আগে হৃদ্রোগের ইতিহাস আছে কি না—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।
শরীর নিজেই কোলেস্টেরল তৈরি করে কেন
কারণ, কোলেস্টেরল শরীরের জন্য প্রয়োজনীয়।
কোষের গঠন ও বিভিন্ন জৈবিক প্রক্রিয়ায় এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। খাবার থেকে কোলেস্টেরল কম পেলেও শরীর প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেই কোলেস্টেরল তৈরি করতে পারে।
কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে—শরীরের প্রয়োজনীয় কোলেস্টেরল থাকা এবং রক্তে অতিরিক্ত এলডিএল থাকা এক বিষয় নয়।
শরীর কোলেস্টেরল তৈরি করে বলেই রক্তে অতিরিক্ত এলডিএল ক্ষতিকর নয়—এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। বরং দীর্ঘ সময় ধরে বেশি এলডিএলের সংস্পর্শ ধমনিতে অ্যাথেরোসক্লেরোসিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
খাবার কি কোলেস্টেরল বাড়ায়
স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকা খাবার এলডিএল-সি বাড়াতে পারেএখানেও বিষয়টি একটু জটিল।
খাবারে থাকা ডায়েটারি কোলেস্টেরল ও রক্তের এলডিএল-সি এক জিনিস নয়। একজন মানুষ কী খাচ্ছেন, তাঁর মোট খাদ্যাভ্যাস কেমন, কতটা স্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণ করছেন, শরীরের ওজন, শারীরিক কার্যকলাপ এবং জেনেটিক কারণ—সবকিছুই রক্তের লিপিড প্রোফাইলে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি থাকা খাবার এলডিএল-সি বাড়াতে পারে। তাই শুধু খাবারের কোলেস্টেরল নয়, পুরো খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
স্ট্রেস ও কোলেস্টেরল
স্ট্রেস অনুঘটক হতে পারে তবে কোলেস্টেরল বাড়ায় সেটা নয়দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শরীরের বিভিন্ন হরমোন ও বিপাকীয় প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। ঘুমের সমস্যা, অস্বাস্থ্যকর খাবার, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও ওজন বৃদ্ধির মতো বিষয়ও এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
তবে ‘স্ট্রেস হলেই শরীর বেশি কোলেস্টেরল তৈরি করে এবং সেটিই উচ্চ কোলেস্টেরলের মূল কারণ’—এভাবে সরলীকরণ করা ঠিক নয়।
উচ্চ কোলেস্টেরলের পেছনে জেনেটিক কারণ, খাদ্যাভ্যাস, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, কিছু রোগ, ওষুধসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
কম কোলেস্টেরল কি বিপজ্জনক
এখানেও একটি প্রচলিত ভুল ধারণা পরিষ্কার করা দরকার।
শরীরের প্রয়োজনীয় কোলেস্টেরল অবশ্যই দরকার। কিন্তু চিকিৎসার মাধ্যমে এলডিএল-সি কমানো মানেই শরীর প্রয়োজনীয় কোলেস্টেরল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে—এমন ধারণার পক্ষে বর্তমান চিকিৎসাবিজ্ঞানে যথেষ্ট প্রমাণ নেই।
বরং যাঁদের হৃদ্রোগের ঝুঁকি বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে এলডিএল-সি কমিয়ে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো যায়। তাই এলডিএল কত হওয়া উচিত, তা ব্যক্তিভেদে নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ।
স্ট্যাটিন কি সবার জন্য
না।
স্ট্যাটিন একটি গুরুত্বপূর্ণ কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ এবং অনেক উচ্চঝুঁকির মানুষের ক্ষেত্রে এটি হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে কার্যকর। তবে সবার জন্য একই মাত্রায় বা একইভাবে স্ট্যাটিন প্রয়োজন হয় না।
ওষুধ প্রয়োজন কি না, তা নির্ধারণে এলডিএল-সির মাত্রার পাশাপাশি বয়স, ডায়াবেটিস, রক্তচাপ, ধূমপান, পারিবারিক ইতিহাস এবং সামগ্রিক কার্ডিওভাসকুলার রিস্ক বিবেচনা করা হয়।
যাঁদের আগে কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ হয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে এলডিএল কমানোর চিকিৎসা আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া স্ট্যাটিন শুরু বা বন্ধ করা উচিত নয়।
জীবনযাত্রার পরিবর্তন কেন গুরুত্বপূর্ণ
উচ্চ কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের প্রথম ধাপগুলোর একটি হলো স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।
খাদ্যাভ্যাসে স্যাচুরেটেড ফ্যাট কমিয়ে শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম, বীজ ও সলিউবল ফাইবার-সমৃদ্ধ খাবার বাড়ানো যেতে পারে। মাছ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর আনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের উৎসও খাদ্যতালিকায় রাখা যায়।
অন্যদিকে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, ট্রান্স ফ্যাট ও অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট কমানো গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত ব্যায়াম
নিয়মিত ব্যায়াম করা জরুরিশারীরিক কার্যকলাপ শুধু কোলেস্টেরলের জন্য নয়, সামগ্রিক কার্ডিওভাসকুলার স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
সপ্তাহজুড়ে নিয়মিত ব্রিস্ক ওয়াকিং, সাইক্লিং, সাঁতার বা অন্য কোনো মডারেট-ইনটেনসিটি এক্সারসাইজ করা যেতে পারে। পাশাপাশি সপ্তাহে কয়েক দিন স্ট্রেংথ ট্রেনিং যোগ করা উপকারী।
ওজন বেশি হলে স্বাস্থ্যকর উপায়ে ওজন কমানোও লিপিড প্রোফাইল এবং সামগ্রিক হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
শেষ কথা
কোলেস্টেরলকে ভয় পাওয়ার প্রয়োজন নেই, আবার অবহেলা করারও সুযোগ নেই।
কোলেস্টেরল শরীরের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু রক্তে দীর্ঘদিন অতিরিক্ত এলডিএল-সি থাকা হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই শুধু ‘কোলেস্টেরল আছে’—এই তথ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না।
প্রথমে জানতে হবে কোন ধরনের কোলেস্টেরল কতটা আছে এবং আপনার সামগ্রিক কার্ডিওভাসকুলার রিস্ক কতটা।
তারপর প্রয়োজন অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস, ব্যায়াম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
সুস্থ থাকার জন্য তাই কোলেস্টেরলকে শত্রু ভাবার চেয়ে কোলেস্টেরল সম্পর্কে সঠিক ধারণা তৈরি করাই বেশি জরুরি।
লেখক: খাদ্য ও পথ্যবিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র
ছবি: এআই ও পেকজেলসডটকম