ভালোবাসার শেষ রাত
· Prothom Alo

মূল গল্প: ল্যাম্ব টু দ্য স্লটার, ভাষান্তর: আবুল বাসার
Visit turconews.click for more information.
ঘরটি ছিল উষ্ণ ও পরিপাটি। জানালায় পর্দা টানা। দুটি টেবিল ল্যাম্পই জ্বলছিল—একটি তার পাশে, অন্যটি উল্টো দিকের খালি চেয়ারটির পাশে। তার পেছনের সাইডবোর্ডে সাজানো সোডা ওয়াটার, হুইস্কি আর দুটো উঁচু গ্লাস। আর থার্মোসের বরফদানিতে টাটকা বরফের টুকরা।
মেরি ম্যালনি কাজ শেষে স্বামীর বাড়ি ফেরার অপেক্ষা করছিল।
মাঝে মাঝেই সে দেয়ালঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিল। তবে তার দৃষ্টিতে কোনো উদ্বেগ ছিল না। স্রেফ নিজেকে এই ভেবে আনন্দ দেওয়া যে প্রতিটি মুহূর্ত পার হওয়ার সাথে সাথে তার স্বামীর আসার সময় ঘনিয়ে আসছে। তার মুখের হাসিতে আর প্রতিটি কাজের ভেতরেই একধরনের ধীরস্থির ভাব। সেলাইয়ের ওপর ঝুঁকে থাকা তার মাথা নামানোর ভঙ্গিটিতে ছিল অদ্ভুত এক প্রশান্তি। সে অন্তঃসত্ত্বা—ছয় মাস চলছে। তাই তাঁর ত্বকে এক আশ্চর্য স্বচ্ছ কোমলতা। ঠোঁট নরম, আর চোখজোড়ায় নতুন এক প্রশান্তির ছাপ। চোখ দুটো আগের চেয়ে যেন বড় আর গাঢ় দেখাচ্ছিল। ঘড়িতে ৪টা ৫০ বাজল। সে কান পেতে রইল। কয়েক মুহূর্ত পরেই বরাবরের মতো সময়মতো বাইরের নুড়ি বিছানো পথে গাড়ির টায়ারের শব্দ পাওয়া গেল। এর পরপরই গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ, জানালার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া পায়ের শব্দ এবং তালায় চাবি ঘোরানোর শব্দ শুনতে পেল সে। সেলাইয়ের কাজটা এক পাশে রেখে উঠে দাঁড়াল মেরি ম্যালনি। তার স্বামী ঘরে ঢুকতেই তাকে চুমু খাওয়ার জন্য এগিয়ে গেল।
‘হ্যালো, ডার্লিং,’ মেরি ম্যালনি বলল।
‘হ্যালো,’ তার স্বামী উত্তর দিল।
স্বামীর কোটটা হাতে নিয়ে আলমারিতে ঝুলিয়ে রাখল মেরি। এরপর এগিয়ে গিয়ে ড্রিংক বানাল। স্বামীর জন্য একটু কড়া আর নিজের জন্য হালকা। সবশেষে সেলাই নিয়ে সে আবার তার চেয়ারে গিয়ে বসল।
সামনের উল্টো দিকের চেয়ারটায় তার স্বামী বসে পড়ল। দুহাতে উঁচু গ্লাসটা ধরে রেখে একটু দোলাচ্ছিল, যাতে বরফের টুকরাগুলো গ্লাসের গায়ে লেগে টুংটাং শব্দ তোলে।
মেরির জন্য দিনের এই সময়টা সব সময়ই পরম আনন্দের। সে জানত প্রথম গ্লাস শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার স্বামী খুব একটা কথা বলতে চায় না। সে–ও সারা দিন একা একা থাকার পর চুপচাপ বসে স্বামীর সান্নিধ্য উপভোগ করতেই সন্তুষ্ট থাকত।
এই মানুষটির পাশে থাকতে তার ভীষণ ভালো লাগে। তাদের একান্তে কাটানো মুহূর্তে স্বামীর কাছ থেকে আসা উষ্ণ পুরুষালি দীপ্তিটি নিজের গায়ে মেখে নিতে ভালোবাসত—ঠিক যেমন রোদে গা ভাসানো মানুষ সূর্যের উত্তাপ উপভোগ করে।
মানুষটার চেয়ারে আলতো করে বসার ভঙ্গি, দরজায় ঢোকার ধরন কিংবা লম্বা লম্বা পদক্ষেপে ধীরে ধীরে ঘরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে হেঁটে যাওয়া—সবকিছুই ভালোবাসত মেরি। তার ওপর যখন মানুষটার চোখের গভীর ও দূরদর্শী দৃষ্টি এসে পড়ত, সেই দৃষ্টিকেও ভালোবাসত সে। ভালোবাসত তার স্বামীর মুখের অদ্ভুত গঠন। বিশেষ করে ভালোবাসত ক্লান্তির মুখেও তার চুপচাপ থাকার ধরনটি—হুইস্কির ঘোরে কিছুটা ক্লান্তি কেটে না যাওয়া পর্যন্ত শান্তভাবে বসে থাকা।
‘তোমার কি ক্লান্ত লাগছে, ডার্লিং?’
‘হ্যাঁ,’ মানুষটা বলল। ‘আমি বেশ ক্লান্ত।’
এ কথা বলতে বলতেই মানুষটা অদ্ভুত একটা কাজ করল। গ্লাসে তখনো অন্তত অর্ধেকটা পানীয় বাকি। তবু সে গ্লাসটা তুলে এক ঢোকে পুরোটা গিলে ফেলল।
মেরি সরাসরি তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে ছিল না। কিন্তু সে বুঝতে পারল তার প্রিয় মানুষটা কী করেছে। কারণ, তার স্বামী হাত নিচে নামানোর সময় খালি গ্লাসের তলায় বরফের টুকরাগুলো আছড়ে পড়ার শব্দ পেয়েছিল সে।
মানুষটা চেয়ারে সামনের দিকে ঝুঁকে এক মুহূর্ত থামল। এরপর উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে নিজে আরেকটি ড্রিংক ঢেলে নিতে গেল।
‘আমি এনে দিচ্ছি!’ লাফিয়ে উঠে বলল মেরি।
‘বসো,’ সে বলল।
মানুষটা ফিরে আসার পর মেরি খেয়াল করল হুইস্কির আধিক্যের কারণে নতুন পানীয়টি গাঢ় কস্তুরী রঙের হয়ে উঠেছে।
‘ডার্লিং, তোমার চটি জোড়া এনে দেব?’
মেরি দেখল, মানুষটা গাঢ় হলুদ রঙের পানীয়তে চুমুক দিতে শুরু করেছে। পানীয়টি এতই কড়া ছিল যে তার ওপর তৈলাক্ত ঢেউয়ের মতো দাগ দেখা যাচ্ছিল।
‘আমার মনে হয় ব্যাপারটা খুবই অন্যায়,’ মেরি বলল, ‘তোমার মতো এত সিনিয়র পুলিশ অফিসারকে সারা দিন পায়ে হেঁটে ডিউটি করানো।’
তার স্বামী কোনো উত্তর দিল না। মেরি আবারও মাথা নিচু করে সেলাই করে যেতে লাগল। কিন্তু মানুষটা প্রতিবার যখনই গ্লাসটা ঠোঁটে তুলছিল, গ্লাসের গায়ে বরফের টুংটাং শব্দ পাচ্ছিল মেরি।
‘ডার্লিং,’ মেরি বলল। ‘তোমার জন্য কিছুটা পনির নিয়ে আসব? আজকে বৃহস্পতিবার বলে রাতের খাবার তৈরি করিনি।’
‘না,’ সে বলল।
‘বাইরে গিয়ে খেতে যদি তোমার খুব ক্লান্তি লাগে,’ মেরি বলতে লাগল, ‘এখনো খুব বেশি দেরি হয়নি। ফ্রিজারে প্রচুর মাংস আর অন্যান্য জিনিস আছে। তুমি এখানেই বসে খেতে পারো, চেয়ার থেকে উঠতেও হবে না।’
উত্তরের আশায় তার চোখ স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইল—হয়তো একটা হাসি, হয়তো ছোট্ট একটা মাথা নাড়ানোর দেখার আশায়। কিন্তু কোনো সাড়া মিলল না।
‘যাই হোক,’ মেরি আবার বলল, ‘আমি আগে তোমার জন্য কিছু পনির আর ক্র্যাকার্স নিয়ে আসি।’
‘আমার কিছু লাগবে না,’ সে বলল। চেয়ারে অস্বস্তি নিয়ে নড়েচড়ে বসল মেরি। তার ডাগর চোখ দুটো তখনো মানুষটার মুখের দিকে নিবন্ধ। ‘কিন্তু তোমাকে তো রাতের খাবার খেতেই হবে। আমি সহজেই এখানে বানিয়ে ফেলতে পারি। আমার নিজেরও ইচ্ছে করছে করতে। আমরা ল্যাম্ব চপ খেতে পারি। অথবা পর্ক। তুমি যা চাও। ফ্রিজারে সবই আছে।’
‘বাদ দাও তো,’ সে বলল।
‘কিন্তু ডার্লিং, তোমাকে খেতেই হবে! আমি যা–ই হোক বানিয়ে ফেলছি। তারপর তোমার ইচ্ছে হলে খেয়ো, না হলে খেয়ো না।’
উঠে দাঁড়াল মেরি। সেলাইয়ের জিনিসগুলো তুলে রাখল ল্যাম্পের পাশের টেবিলে।
‘বসো,’ সে বলল। ‘এক মিনিটের জন্য বসো তো।’
ঠিক তখনই কেন যেন মেরি ভয় পেতে শুরু করল।
‘বসো বলছি,’ সে বলল। ‘এখানে বসো।’
মেরি ধীরে ধীরে আবারও চেয়ারে গিয়ে বসল। সেই ডাগর বিভ্রান্ত চোখে সব সময় তার স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইল।
মানুষটা তার দ্বিতীয় ড্রিংকটাও শেষ করে ফেলল। এরপর কপাল কুঁচকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল হাতের গ্লাসটার দিকে।
‘শোনো,’ সে বলল, ‘তোমাকে আমার একটা কথা বলার আছে।’
‘কী কথা, ডার্লিং? কী হয়েছে?’ একেবারে স্থির হয়ে গেল মেরি। মাথাটা নিচু করে রাখল। পাশের ল্যাম্পের আলো তার মুখের ওপরের অংশে পড়ে আর থুতনি ও মুখটা ছায়ায় ঢেকে গেল। মেরি লক্ষ করল, তার বাঁ চোখের কোণে একটা পেশি থরথর করে কাঁপছে।
‘আমি ভয় পাচ্ছি খবরটা তোমাকে বেশ বড় একটা ধাক্কা দেবে,’ সে বলল। ‘কিন্তু আমি ব্যাপারটা নিয়ে অনেক ভেবেছি। আমার মনে হয়েছে, কথাটা তোমাকে এখনই বলে দেওয়াই সবচেয়ে ভালো হবে। আশা করি, তুমি আমাকে খুব বেশি দোষ দেবে না।’
এরপর মেরিকে সবটা বলল তার স্বামী।
কথাগুলো বলতে খুব বেশি সময় লাগল না। বড়জোর চার বা পাঁচ মিনিট।
পুরোটা সময় মেরি একদম নিশ্চল হয়ে বসে রইল। একধরনের আচ্ছন্ন আতঙ্ক নিয়ে তাকিয়ে রইল তার স্বামীর দিকে। কারণ, তার প্রতিটি শব্দের সাথে সাথে সে যেন মেরি থেকে আরও দূরে, আরও দূরে সরে যাচ্ছিল।
‘তো এই হলো ব্যাপার,’ সে আরও যোগ করল। ‘আমি জানি, খবরটা জানানোর জন্য সময়টা খুবই খারাপ। কিন্তু সত্যি বলতে আর কোনো উপায় ছিল না। অবশ্যই আমি তোমাকে টাকা দেব। তোমার যাতে কোনো অসুবিধা না হয়, তা দেখব। কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে বেশি হইচই করার দরকার নেই। আমি অন্তত তা-ই আশা করি। আমার চাকরির জন্য সেটা মোটেই ভালো হবে না।’
মেরির প্রথম অনুভূতি ছিল এসবের কিছুই বিশ্বাস না করে পুরো ব্যাপারটাকে উড়িয়ে দেওয়া। তার মনে হলো, মানুষটা হয়তো কোনো কথাই বলেনি। পুরো বিষয়টাই তার নিজের কল্পনা। হয়তো সে যদি আগের মতোই স্বাভাবিক কাজকর্ম করে যায় আর এমন ভাব দেখায় যেন সে কিছুই শোনেনি, তাহলে পরে সে মানসিকভাবে আবার সচেতন হওয়ার পর হয়তো দেখবে—এসবের কিছুই ঘটেনি।
‘আমি রাতের খাবারটা বানিয়ে আনি,’ কোনোমতে বিড়বিড় করে বলল মেরি। এবার মানুষটা তাকে আর থামাল না।
মেরি ঘরের মধ্য দিয়ে হেঁটে গেল। কিন্তু তার মনে হলো, তার পা দুটো যেন মেঝে স্পর্শই করছে না। হালকা গা-গোলানো আর বমি ভাব ছাড়া সে কিছুই অনুভব করতে পারছিল না।
সবকিছু এখন যন্ত্রের মতো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘটছিল—সিঁড়ি দিয়ে নিচে বেজমেন্টে নামা, লাইটের সুইচে হাত দেওয়া, ডিপ ফ্রিজার খোলা, আর ক্যাবিনেটের ভেতরে হাত বাড়িয়ে যে জিনিসটা প্রথম হাতে ঠেকল, সেটা ধরে নেওয়া। সে ওটা বের করে এনে তাকাল। কাগজ দিয়ে মোড়ানো ছিল। কাগজটা ছাড়িয়ে আবার সেটার দিকে তাকাল মেরি। ভেড়ার পেছনের একটি গোটা পা।
ঠিক আছে তাহলে, আজ রাতের খাবারে ভেড়ার মাংসই হবে।
হাড়ের সরু প্রান্তটা দুই হাতে ধরে সেটাকে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে তুলে আনল মেরি। ড্রয়িংরুম দিয়ে যাওয়ার সময় সে দেখল তার স্বামী জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। পিঠটা তার দিকে ঘোরানো।
কী ভেবে যেন থমকে দাঁড়াল মেরি।
‘দোহাই তোমার,’ মেরির সাড়াশব্দ পেয়ে না ঘুরেই বলল মানুষটা। ‘আমার জন্য খাবার তৈরি কোরো না। আমি বাইরে যাচ্ছি।’
ঠিক সেই মুহূর্তে, নিঃশব্দে তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল মেরি ম্যালনি। কোনো দ্বিধা ছাড়াই ভেড়ার সেই বিশাল জমে যাওয়া পা-খানা শূন্যে উঁচু করে তুলল। তারপর সবটুকু শক্তি দিয়ে লোকটির মাথার পেছনে সজোরে বসিয়ে দিল মেরি।
মনে হলো, যেন ইস্পাতের কোনো বড়সড় লাঠি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে।
মেরি এক পা পেছনে সরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো তার স্বামী অন্তত চার-পাঁচ সেকেন্ড সেখানে মৃদু হেলেদুলে দাঁড়িয়ে রইল। এরপর কাটা কলাগাছের মতো কার্পেটের ওপর আছড়ে পড়ল ধপাস করে।
পড়ে যাওয়ার বিকট শব্দ আর ছোট টেবিলটা উল্টে যাওয়ার শব্দ—সব মিলিয়ে মেরিকে আগের সেই ঘোরের ভেতর থেকে বের করে আনতে সাহায্য করল।
ধীরে ধীরে সে সতেজ হয়ে উঠল, একধরনের হিমশীতল অনুভূতি ও বিস্ময় নিয়ে সে কিছুক্ষণ লাশটির দিকে তাকিয়ে চোখ পিটপিট করল। তার হাতে তখনো মাংসের অদ্ভুত টুকরাটা দুহাতে শক্ত করে ধরা।
ঠিক আছে, সে নিজেকেই বলল। তাহলে আমি তাকে মেরেই ফেলেছি।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, হঠাৎ করে তার মস্তিষ্ক পরিষ্কার ও সচল হয়ে উঠল। সে খুব দ্রুত চিন্তা করতে লাগল।
একজন ডিটেকটিভের স্ত্রী হিসেবে সে খুব ভালো করেই জানত—এর শাস্তি কী হতে পারে। সেটা ঠিক আছে। তাতে তার কিছুই যায়-আসে না। সত্যি বলতে, ওটা তো একধরনের স্বস্তিই হবে। কিন্তু অন্যদিকে, পেটের বাচ্চার কী হবে? অনাগত সন্তানসহ খুনিদের ব্যাপারে আইনের বিধান কী? তারা কি মা আর সন্তান দুজনকেই মেরে ফেলে? নাকি দশম মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করে? তারা আসলে কী করে?
তা জানত না মেরি ম্যালনি। সে কোনো ঝুঁকি নিতে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না।
সে মাংসটা রান্নাঘরে নিয়ে গিয়ে একটা প্যানে রাখল। ওভেনের তাপমাত্রা বাড়িয়ে চালু করে ভেতরে ঢুকিয়ে দিল ওটা। এরপর হাত ধুয়ে ছুটে গেল ওপরে শোবার ঘরে।
সে আয়নার সামনে বসে চেহারাটা ঠিকঠাক করল। ঠোঁট ও মুখে হালকা মেকআপ দিল। হাসার চেষ্টা করল মেরি। কিন্তু হাসিটা নিজের কানেই বেশ অদ্ভুত শোনাল। কিন্তু সে আবার চেষ্টা করল।
‘হ্যালো স্যাম,’ বেশ প্রফুল্ল গলায় শব্দ করে বলল মেরি।
নিজের গলার স্বরটাও কেমন যেন অদ্ভুত শোনাল নিজের কানে।
‘স্যাম, আমাকে কিছু আলু দাও তো। হ্যাঁ, আর মনে হয় এক ক্যান মটরশুঁটিও লাগবে।’
এবার বেশ ভালো হয়েছে। হাসি আর গলার আওয়াজ—দুটোই এখন বেশ স্বাভাবিক শোনাচ্ছে। সে আরও কয়েকবার এটার মহড়া দিল। এরপর নিচে নেমে এসে কোটটা গায়ে চাপাল। পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে বাগান পেরিয়ে রাস্তায় গিয়ে উঠল।
তখনো ছয়টা বাজেনি। মুদিদোকানে তখনো আলো জ্বলছিল।
‘হ্যালো স্যাম,’ কাউন্টারের পেছনের লোকটির দিকে তাকিয়ে উজ্জ্বলভাবে হেসে বলল মেরি।
‘আরে, শুভ সন্ধ্যা, মিসেস ম্যালনি। কেমন আছেন?’
‘স্যাম, আমাকে কিছু আলু দাও তো। আর হ্যাঁ, এক ক্যান মটরশুঁটিও লাগবে মনে হয়।’
লোকটি ঘুরে পেছনের তাক থেকে মটরশুঁটির ক্যান নেওয়ার জন্য হাত বাড়াল।
‘প্যাট্রিক বলল সে খুব ক্লান্ত। তাই আজ রাতে আর বাইরে গিয়ে খাবে না,’ মেরি তাকে বলল। ‘তুমি তো জানোই আমরা সাধারণত বৃহস্পতিবার রাতে বাইরে খাই। কিন্তু আজ ঘরে কোনো শাকসবজিও নেই।’
‘তাহলে মাংসের কী হবে, মিসেস ম্যালনি?’ ‘না, মাংস আমার আছে, ধন্যবাদ। ফ্রিজার থেকে ভেড়ার সুন্দর একটা পা পেয়েছি।’
‘ওহ।’
‘জমে যাওয়া বরফসহ রান্না করাটা আমি খুব একটা পছন্দ করি না, স্যাম। তবে এবার একটা ঝুঁকি নিয়েই ফেলছি। তোমার কি মনে হয় কোনো সমস্যা হবে?’
‘আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো,’ মুদিদোকানদার বলল, ‘এতে কিছু যায়-আসে না। আপনি কি এই আলুগুলো নেবেন?’
‘ও হ্যাঁ, ওটাই ভালো হবে। ওখান থেকে দুটো দাও।’
‘আর কিছু লাগবে?’ দোকানদার মাথাটা এক পাশে কাত করে তার দিকে বেশ বন্ধুভাবাপন্ন চোখে তাকাল। ‘তারপর খাবারের শেষে মিষ্টিমুখ করার জন্য কী দেবেন? মিষ্টি কিছু দেবেন না?’
‘তুমিই বলো স্যাম, কী দেওয়া যায়?’
লোকটি তার দোকানজুড়ে একবার চোখ বোলাল। ‘চিজকেকের চমৎকার একটা বড় স্লাইস হলে কেমন হয়? আমি জানি, ওটা উনি পছন্দ করেন।’
‘দারুণ,’ মেরি বলল। ‘ওটা সে খুব ভালোবাসে।’
সবকিছু মোড়ানো হয়ে গেল। দাম মেটানো শেষ হলে নিজের সবচেয়ে উজ্জ্বল হাসিটা উপহার দিয়ে মেরি বলল, ‘ধন্যবাদ, স্যাম। শুভরাত্রি।’
‘শুভরাত্রি, মিসেস ম্যালনি। আপনাকেও ধন্যবাদ।’
এবার দ্রুত পায়ে বাড়ি ফেরার পথে সে নিজেকে বলল—এখন তার স্বামীর কাছে বাড়ি ফিরছে। রাতের খাবারের জন্য অপেক্ষা করছে মানুষটা।
তাকে ভালো রান্না করতে হবে, যতটা সম্ভব সুস্বাদু করতে হবে। কারণ, আহা বেচারা মানুষটা খুব ক্লান্ত হয়ে আছে।
ঘরে ঢুকে সে যদি কোনো অস্বাভাবিক, মর্মান্তিক বা ভয়াবহ কিছু দেখতে পায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সে ভীষণ ধাক্কা খাবে। শোক ও আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে পড়বে। মনে রেখো, সে অস্বাভাবিক কিছুই আশা করছে না। সে স্রেফ শাকসবজি নিয়ে বাড়ি ফিরছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় স্বামীর জন্য রাতের খাবার রাঁধতে শাকসবজি নিয়ে বাড়ি ফিরছেন মিসেস প্যাট্রিক ম্যালনি।
এটাই সঠিক উপায়—নিজেকে বলল মেরি। সবকিছু ঠিকঠাক আর স্বাভাবিকভাবে করো। সবকিছু একদম স্বাভাবিক রাখো। তাহলে অভিনয় করার প্রয়োজনই পড়বে না।
পেছনের দরজা দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে সে মৃদু গুঞ্জন তুলে গান গাইতে লাগল। তার মুখে ছিল হাসি।
‘প্যাট্রিক!’ ডেকে উঠল মেরি। ‘কেমন আছ ডার্লিং?’
প্যাকেটটা টেবিলে রেখে ড্রয়িংরুমের দিকে এগিয়ে গেল মেরি।
সেখানে মানুষটাকে মেঝের ওপর পা গুটানো আর একটা হাত শরীরের নিচে মোচড়ানো অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখল মেরি। সত্যি সত্যিই মেরির জন্য সেটা ছিল অনেক বড় একটা ধাক্কা।
মানুষটার প্রতি পুরোনো সব ভালোবাসা আর ব্যাকুলতা তার ভেতরে উথলে উঠল।
স্বামীর দিকে ছুটে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল মেরি।
ব্যাপারটা খুব সহজ ছিল। কোনো অভিনয়ের দরকার পড়ল না। কয়েক মিনিট পর উঠে দাঁড়িয়ে ফোনের কাছে গেল মেরি। পুলিশ স্টেশনের নম্বর তার জানাই ছিল। ফোনের ওপাশের লোকটি উত্তর দিতেই সে কেঁদে উঠে বলল, ‘তাড়াতাড়ি! প্লিজ, তাড়াতাড়ি আসুন! প্যাট্রিক মারা গেছে!’
‘কে বলছেন?’
‘মিসেস ম্যালনি। মিসেস প্যাট্রিক ম্যালনি।’
‘আপনি বলতে চাচ্ছেন প্যাট্রিক ম্যালনি মারা গেছেন?’
‘আমার তো তা-ই মনে হচ্ছে,’ আবারও ফুঁপিয়ে কেঁদে বলল মেরি। ‘সে মেঝের ওপর পড়ে আছে। আমার মনে হচ্ছে সে মারা গেছে।’
‘আমরা এখনই আসছি,’ লোকটি বলল।
পুলিশের গাড়ি বেশ দ্রুতই চলে এল।
মেরি সামনের দরজা খুলতেই দুজন পুলিশ সদস্য ভেতরে ঢুকে পড়ল। দুজনকেই চিনত সে—আসলে ওই থানার প্রায় সব পুলিশকেই সে চিনত।
মেরি কাঁদতে কাঁদতে ছুটে গিয়ে জ্যাক নুনানের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। লোকটা খুব কোমলভাবে একটি চেয়ারে বসিয়ে দিল মেরিকে। এরপর অন্য পুলিশ অফিসারটির কাছে গেল মেরি। ওই লোকটা তখন প্যাট্রিকের দেহের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে ছিল। তার নাম ও’ম্যালি।
‘সে কি মারা গেছে?’ আবারও কেঁদে উঠল মেরি।
‘তা-ই তো মনে হচ্ছে। কী ঘটেছিল?’ ও’ম্যালি জিজ্ঞেস করল।
মেরি সংক্ষেপে তার গল্পটা বলল—কীভাবে সে মুদিদোকানে গিয়েছিল, আর ফিরে এসে স্বামীকে মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখেছে।
সে কথা বলছিল, কাঁদছিল, আবার কথা বলছিল।
এই সময় নুনান মৃতদেহের মাথায় জমাট বাঁধা রক্তের একটি ছোট দাগ দেখতে পেল। সে ও’ম্যালিকে ডেকে সেটা দেখাল। সাথে সাথেই উঠে দাঁড়িয়ে হনহন করে ফোনের দিকে গেল ও’ম্যালি।
একটু পরেই ঘরের মধ্যে অন্য লোকজন আসতে শুরু করল।
প্রথমে এল একজন ডাক্তার। তারপর দুজন ডিটেকটিভ—তাদের একজনকে মেরি নামে চিনত।
কিছুক্ষণ পর একজন পুলিশ ফটোগ্রাফার এসে ছবি তুলল। এরপর এল আঙুলের ছাপ বিশেষজ্ঞ একজন লোক।
লাশের পাশে অনেক ফুসফুস আর ফিসফিসানি চলছিল। গোয়েন্দারাও মেরিকে নানা প্রশ্ন করে যাচ্ছিল। তবে তারা সব সময় তার সাথে কোমল আচরণ করছিল।
মেরি আবার তার গল্পটা বলল। এবার একদম শুরু থেকে—প্যাট্রিক যখন বাড়িতে ঢুকল, তখন সে সেলাই করছিল। প্যাট্রিক বেশ ক্লান্ত ছিল। এতই ক্লান্ত যে সে রাতে বাইরে গিয়ে খেতে চায়নি। সে বলল কীভাবে সে ওভেনে মাংস রেখেছিল—‘ওটা এখনো ওখানেই আছে, সেদ্ধ হচ্ছে’—আর কীভাবে সে সবজির জন্য মুদিদোকানে গিয়েছিল। আর ফিরে এসে তাকে মেঝের ওপর পড়ে থাকতে দেখেছে।
‘কোন মুদিদোকান?’ গোয়েন্দাদের একজন জিজ্ঞাসা করল।
দোকানের নাম বলল মেরি।
গোয়েন্দা লোকটা ঘুরে অন্য গোয়েন্দার কানে কানে ফিসফিস করে কিছু একটা বলল। দ্বিতীয় লোকটা প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বাইরে রাস্তায় বেরিয়ে গেল।
পনেরো মিনিটের মধ্যে এক পাতা নোট নিয়ে ফিরে এল লোকটা। এরপর সেখানে আবারও ফিসফিসানি শুরু হলো।
কান্নার ফাঁকে ফাঁকে ফিসফিস করে বলা কয়েকটি কথা শুনতে পেল মেরি—’...একদম স্বাভাবিক আচরণ করছিল খুব প্রফুল্ল...তাকে একটা ভালো নৈশভোজ দিতে চেয়েছিল... মটরশুঁটি...চিজকেক...সে যে করেছে তা অসম্ভব...’
কিছুক্ষণ পর ফটোগ্রাফার ও ডাক্তার চলে গেল। অন্য দুজন লোক এসে লাশটি স্ট্রেচারে করে নিয়ে গেল। এরপর চলে গেল আঙুলের ছাপের লোকটিও। শুধু দুই গোয়েন্দা রয়ে গেল, আর সাথে দুই পুলিশ সদস্যও।
মেরির সাথে অসাধারণ ভালো ব্যবহার করতে লাগল তারা।
জ্যাক নুনান জিজ্ঞাসা করল, সে অন্য কোথাও যেতে চায় কি না—হয়তো তার বোনের বাড়ি। অথবা চাইলে নুনানের নিজের স্ত্রীর কাছেও যেতে পারে। আজকের রাতের জন্য তার স্ত্রী মেরির যত্ন নিতে পারবে। তার থাকারও ব্যবস্থা করে দিতে পারবে।
না, মেরি বলল। এই মুহূর্তে সে এক গজ দূরত্বও সরতে পারবে বলে মনে করছে না। সে একটু ভালো বোধ না করা পর্যন্ত যেখানে আছে, সেখানেই থাকতে চায়। সে এই মুহূর্তে খুব একটা ভালো বোধ করছে না, সত্যিই করছে না।
তাহলে তার কি গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়া উচিত নয়? জ্যাক নুনান জিজ্ঞাসা করল।
না, মেরি বলল, সে যেখানে আছে, ঠিক সেখানেই থাকতে চায়—এই চেয়ারটায়। একটু পরে হয়তো সে একটু ভালো বোধ করবে। তখন সে নড়াচড়া করবে।
তাই তারা মেরিকে সেখানেই রেখে যার যার কাজে চলে গেল। সারা বাড়ি তল্লাশি করতে লাগল।
মাঝে মাঝে গোয়েন্দাদের একজন তাকে টুকটাক প্রশ্ন করছিল। মাঝে মাঝে জ্যাক নুনান পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার সাথে মৃদুস্বরে কথা বলছিল।
জ্যাক তাকে বলল, তার স্বামীকে মাথার পেছনে একটি ভারী ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। অস্ত্রটা প্রায় নিশ্চিতভাবেই ধাতুর তৈরি বড় কোনো বস্তু। তারা অস্ত্রটি খুঁজছিল। খুনি হয়তো সেটা সাথে করে নিয়ে গেছে। কিন্তু অন্যদিকে সে হয়তো সেটা ফেলেও দিয়ে থাকতে পারে কিংবা বাড়ির আশপাশেই কোথাও লুকিয়ে রাখতে পারে।
‘সেই পুরোনো কথা,’ জ্যাক নুনাক বলল। ‘অস্ত্রটা খুঁজে পেলেই লোকটাকে ধরে ফেলা যাবে।’
পরে গোয়েন্দাদের একজন এসে মেরির পাশে বসল। সে জিজ্ঞেস করল, মেরি জানে কি না যে বাড়িতে এমন কিছু আছে কি না, যা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে? সে কি চারপাশটা একটু ঘুরে দেখে বলবে কিছু হারিয়েছে কি না—যেমন খুব বড় একটা স্প্যানার, অথবা ধাতুর তৈরি ভারী কোনো ফুলদানি?
তাদের কোনো ভারী ধাতুর ফুলদানি ছিল না, মেরি জবাব দিল।
‘কিংবা বড় কোনো স্প্যানার?’ তার মনে হয় না তাদের কোনো বড় স্প্যানার ছিল। তবে গ্যারেজে হয়তো ওরকম কিছু থাকতে পারে।
গোয়েন্দাদের তল্লাশি চলতেই থাকল।
মেরি জানত, বাড়ির চারপাশের বাগানে আরও পুলিশ সদস্য রয়েছে। সে বাইরে নুড়ি পাথরের ওপর তাদের পায়ের শব্দ শুনতে পাচ্ছিল। মাঝে মাঝে পর্দার ফাঁক দিয়ে টর্চের আলোর ঝলক দেখতে পাচ্ছিল।
রাত বাড়তে শুরু করল, ফায়ারপ্লেসের ওপরের ঘড়িতে সে লক্ষ করল প্রায় নয়টা বাজে। ঘরগুলো তল্লাশি করা চারজন লোককে এখন বেশ ক্লান্ত আর কিছুটা বিরক্ত মনে হচ্ছিল।
‘জ্যাক,’ সার্জেন্ট নুনান যখন পাশ দিয়ে যাচ্ছিল, তখন মেরি বলল। ‘আমাকে কি দয়া করে একটু পানীয় দেওয়া যাবে?’
‘অবশ্যই দেব। এই হুইস্কির কথা বলছ?’
‘হ্যাঁ, প্লিজ। তবে খুব সামান্য। হয়তো এটা খেয়ে একটু ভালো লাগবে।’
গ্লাসটা মেরির হাতে দিল লোকটা।
‘আপনি নিজেও কেন একটু নিচ্ছেন না,’ সে বলল। ‘আপনি নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত। দয়া করে নিন না। আপনি আমার সাথে খুব ভালো ব্যবহার করেছেন।’
‘তা,’ সে উত্তর দিল। ‘কড়া নিয়ম অনুযায়ী এটা নিষেধ। তবে নিজেকে একটু চাঙা রাখতে সামান্য এক চুমুক নেওয়া যেতেই পারে।’
একে একে অন্যরাও ভেতরে এল। অল্প করে হুইস্কি খেতে সবাই রাজি হলো। তারা হাতে গ্লাস নিয়ে কেমন যেন অস্বস্তিকরভাবে চারপাশে দাঁড়িয়ে রইল। তার উপস্থিতিতে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারছিল না। তাকে সান্ত্বনামূলক কথা বলার চেষ্টা করছিল।
সার্জেন্ট নুনান হেঁটে রান্নাঘরে গিয়ে দ্রুত বেরিয়ে এসে বলল, ‘দেখুন, মিসেস ম্যালনি। আপনার ওই ওভেনটা কিন্তু এখনো জ্বলছে। মাংসটা ভেতরেই রয়ে গেছে।’
‘ওহ ঈশ্বর!’ চিৎকার করে উঠল মেরি। ‘তাই তো!’
‘আমি ওটা বন্ধ করে দিই, কী বলেন?’
‘একটু করে দেবেন, জ্যাক? আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।’
সার্জেন্ট দ্বিতীয়বার ফিরে এলে মেরি তার বড় বড়, গাঢ়, অশ্রুসজল চোখে তার দিকে তাকাল। ‘জ্যাক নুনান,’ সে বলল।
‘বলুন?’
‘আপনি আর এই বাকিরা কি আমার একটি ছোট উপকার করবেন?’
‘আমরা চেষ্টা করে দেখতে পারি, মিসেস ম্যালনি।’
‘আসলে,’ মেরি বলল। ‘আপনারা সবাই এখানে আছেন, আপনারা প্রিয় প্যাট্রিকের কত ভালো বন্ধু ছিলেন। তাকে যে লোকটা মেরেছে, তাকে ধরতে সাহায্য করছেন। আপনাদের নিশ্চয়ই ভীষণ খিদে পেয়েছে। কারণ আপনাদের রাতের খাবারের সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। আমি জানি প্যাট্রিক আমাকে কখনোই ক্ষমা করবে না—ঈশ্বর তার আত্মার মঙ্গল করুন—আমি যদি তার বাড়িতে আপনাকে যথাযথ আপ্যায়ন না করে রেখে দিই। ওভেনে রাখা ভেড়ার মাংসটা আপনারা খেয়ে নিচ্ছেন না কেন? এতক্ষণে ওটা একদম ঠিকঠাক সেদ্ধ হয়ে গেছে।’
‘স্বপ্নেও ওরকম কিছু ভাবতে পারি না,’ সার্জেন্ট নুনান বলল।
‘দয়া করে,’ মেরি মিনতি করল। ‘দয়া করে আপনারা এটা খান। ব্যক্তিগতভাবে আমি তো কোনো কিছু ছোঁয়া তো দূরের কথা, বিশেষ করে সে যখন ঘরে ছিল তখনকার কোনো খাবার তো ছুঁতেই পারব না। কিন্তু আপনাদের জন্য তো সেটা ঠিক আছে। আপনারা যদি ওটা খেয়ে ফেলেন, তাহলে আমার বড় একটা উপকার করা হবে। এরপর আপনারা আবার নিজেদের কাজ চালিয়ে যেতে পারবেন।’
চারজন পুলিশের মধ্যে বেশ খানিকটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব চলল। কিন্তু তারা সত্যি সত্যিই ক্ষুধার্থ ছিল।
শেষ পর্যন্ত তাদেরকে রান্নাঘরে গিয়ে নিজেদের মতো খাবার বেড়ে নিতে রাজি করানো গেল।
মেরি যেখানে ছিল, সেখানেই রয়ে গেল। খোলা দরজার ভেতর দিয়ে লোকগুলোর কথা শুনতে লাগল। সে শুনতে পাচ্ছিল, তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। মুখে মাংসে ভরা থাকায় তাদের গলার আওয়াজ জড়িয়ে অস্পষ্ট আসছিল।
‘আরেকটু নেবে নাকি চার্লি?’
‘না। সবটা শেষ না করাই ভালো।’
‘উনি তো চাচ্ছেন আমরা যাতে সবটা শেষ করি। উনি নিজেই তো বললেন। ওনার একটা উপকারই হবে।’
‘ঠিক আছে তাহলে। আমাকে আরেকটু দাও।’
‘বেচারা প্যাট্রিককে মারার জন্য লোকটা নির্ঘাত বড়সড় লোহার দণ্ড ব্যবহার করেছে,’ তাদের একজন বলল। ‘ডাক্তার বলেছে ওর মাথার খুলি একদম চুরমার হয়ে গেছে—একেবারে বড় হাতুড়ি দিয়ে পেটালে যেমন হয়।’
‘সে জন্যই তো ওটা খুঁজে পাওয়া সহজ হওয়ার কথা।’
‘আমিও তো ঠিক সে কথাই বলছি।’
‘যে-ই খুনটা করে থাকুক, কাজ শেষ হওয়ার পর ওরকম একটা জিনিস সে নিশ্চয়ই সাথে করে বয়ে নিয়ে বেড়াবে না।’
তাদের একজন ঢেকুর তুলল।
‘ব্যক্তিগতভাবে আমার মনে হয়, ওটা এখানেই বাড়ির ভেতরেই কোথাও আছে।’
‘হয়তো ঠিক আমাদের নাকের ডগাতেই আছে। তুমি কী বলো, জ্যাক?’
অন্য ঘরে বসে খিল খিল করে হাসতে লাগল মেরি ম্যালনি।
মূল গল্প: ল্যাম্ব টু দ্য স্লটার
লেখক পরিচিতি: ব্রিটিশ লেখক রোয়াল্ড ডালকে (১৯১৬–১৯৯০) বলা হয় বিশ শতকের অন্যতম জনপ্রিয় শিশু-কিশোর সাহিত্যিক। ‘চার্লি অ্যান্ড দ্য চকলেট ফ্যাক্টরি’, ‘মাতিল্ডা’, ‘দ্য বিএফজি’র মতো বই তাঁকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে। তবে ডাল শুধু শিশুদের জন্য লেখেননি; প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তাঁর ছোটগল্পগুলোও বিখ্যাত। ‘ল্যাম্ব টু দ্য স্লটার’ তাঁর সবচেয়ে পরিচিত প্রাপ্তবয়স্ক ছোটগল্পগুলোর একটি। গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৫৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হারপার’স ম্যাগাজিনে।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মেরি ম্যালনি—অন্তঃসত্ত্বা, শান্ত স্বভাবের এক গৃহবধূ। স্বামীর কাছ থেকে এক ভয়াবহ খবর শোনার পর মুহূর্তেই তাঁর জীবন বদলে যায়। এরপর ঘটে এমন এক খুন, এমন এক অদ্ভুত অস্ত্রের ব্যবহার, আর এমন এক বুদ্ধিদীপ্ত পরিণতি—যা একই সঙ্গে শিউরে উঠতে, হাসতে এবং অবাক হতে বাধ্য করে। গল্পটির সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই—ডাল ভয়কে কখনো সরাসরি সামনে আনেন না; বরং স্বাভাবিক, শান্ত গৃহস্থজীবনের ভেতরেই ধীরে ধীরে অস্বস্তি তৈরি করেন। এরপর শেষ মুহূর্তে পাঠককে টেনে নেন কালো হাস্যরসের এক নিখুঁত ফাঁদে।