আফগানিস্তানে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে কীভাবে মোকাবিলা করবে তালেবান সরকার

· Prothom Alo

আফগানিস্তানে তালেবানের ক্ষমতায় ফেরার পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে ১৫ আগস্ট (গতকাল শনিবার)। এই পাঁচ বছরে তালেবানবিরোধী অনেক সশস্ত্র গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। তবে তারা নির্দিষ্ট কোনো একটি ফ্রন্ট বা নেতৃত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

২০২১ সালের আগস্টে তৎকালীন আফগান সরকারের পতনের পর থেকে বিভিন্ন নামে ও ব্যানারে এসব সশস্ত্র গোষ্ঠী সামনে এসেছে। তারা দেশটির বিভিন্ন প্রদেশে সরকারি বাহিনীর ওপর হামলার দায় স্বীকার করছে। গত কয়েক মাসে ইন্টারনেটে তাদের সরব উপস্থিতি বিশেষভাবে চোখে পড়ছে।

Visit likesport.biz for more information.

এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন হলো, সশস্ত্র ফ্রন্টের এই ক্রমবর্ধমান সংখ্যা কি বিরোধীদের প্রকৃত শক্তি বৃদ্ধির লক্ষণ? নাকি এটি তাদের নেতৃত্বের মধ্যকার বিভক্তি ও অনৈক্যের ফলাফল?

নতুন লড়াই

বাদাখশান প্রদেশের জেবাক এলাকায় তালেবান ও আফগানিস্তান ফ্রিডম ফ্রন্টের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে। বিষয়টি এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। জাতিসংঘ বলছে, তালেবানবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় থাকলেও তারা এখন পর্যন্ত আফগানিস্তানের নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি। তালেবান শাসনের প্রতি বড় কোনো চ্যালেঞ্জ তৈরির সক্ষমতাও তাদের নেই।

করিম আমিনি, নিরাপত্তা বিশ্লেষকমার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর সাবেক সরকারের রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিরা তালেবানকে চাপে ফেলতে সশস্ত্র ফ্রন্ট তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে তাঁরা আবির্ভূত হতে পারেননি।

কাবুলের পতনের পর ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট (এনআরএফ) নামের একটি সশস্ত্র সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে। তখন তালেবানের বিরুদ্ধে এটাই ছিল সবচেয়ে বড় সশস্ত্র গোষ্ঠী।

তৎকালীন সরকারের পতনের পর সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনীর শত শত সদস্য অস্ত্রশস্ত্র ও সরঞ্জাম নিয়ে কাবুলের উত্তরে পানশির উপত্যকায় জড়ো হয়েছিলেন। তাঁরা সেখানে তালেবানের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের কেন্দ্র গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তালেবানের বড় অভিযানের মুখে পানশিরের পতন ঘটে। এর পর থেকে লড়াই মূলত বিচ্ছিন্ন সংঘাত ও সীমিত অভিযানে রূপ নেয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক করিম আমিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর সাবেক সরকারের রাজনৈতিক ও সামরিক ব্যক্তিরা তালেবানকে চাপে ফেলতে সশস্ত্র ফ্রন্ট তৈরির চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ে প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে তাঁরা আবির্ভূত হতে পারেননি।’

বাদাখশান প্রদেশের জেবাক জেলায় তালেবান ও আফগানিস্তান ফ্রিডম ফ্রন্টের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হয়েছে। বিষয়টি এখন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

এর কারণ হিসেবে আমিনি বলেন, ‘এসব গোষ্ঠীর বেশির ভাগই বিদেশের মাটিতে গঠিত। ফলে আফগানিস্তানের ভেতরে তারা কোনো শক্তিশালী সামাজিক ভিত্তি তৈরি করতে পারছে না।’

এই নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘তালেবানের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতের এই পথ এমন এক আফগান সমাজের মুখোমুখি, যারা কয়েক দশকের যুদ্ধে ক্লান্ত। সাধারণ মানুষ আর নতুন কোনো যুদ্ধের চক্রে জড়াতে প্রস্তুত নয়।’

আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে মার্কিন দূতাবাসের কাছে একটি সড়কে কাবুল পতনের বার্ষিকী উদ্‌যাপন করছেন তালেবান সদস্যরা

পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে ব্যর্থতা

করিম আমিনির মতে, চার দশকের যুদ্ধের পর আফগান সমাজে যে পরিবর্তন এসেছে, তা বুঝতে অনেক বিরোধী শক্তি ব্যর্থ হয়েছে। তারা সশস্ত্র বিরোধিতাকে একটি রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তরাধিকার হিসেবে দেখেছে, যা বিদেশ থেকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। কিন্তু তারা আফগানদের অগ্রাধিকার ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।

আবদুল করিম খান, নিরাপত্তা বিশ্লেষককোনো একটি এলাকা কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন দখলে রাখা আসল পরীক্ষা নয়। আসল পরীক্ষা হলো সেটি ধরে রাখা, সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা, যোদ্ধাদের সংখ্যা বাড়ানো ও তালেবানকে তাদের সামরিক অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য করা।

আফগান সমাজ যুদ্ধ চায় না উল্লেখ করে এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, ‘ফলে এসব (বিদ্রোহী) গোষ্ঠী স্থায়ী উপস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় স্থানীয় পরিবেশ খুঁজে পাচ্ছে না। যে আন্দোলন আফগানিস্তানের বাস্তবতা ও জনগণের প্রয়োজন থেকে উঠে আসবে না, তাদের পক্ষে দেশের ভেতরে শক্ত অবস্থান তৈরি করা কঠিন।’

করিম আমিনির মতে, এসব গোষ্ঠীর জন্য আসল চ্যালেঞ্জ বিচ্ছিন্ন হামলা চালানো নয়। বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষের আস্থা অর্জন করা, সামাজিক ভিত্তি তৈরি করা এবং একটি গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক পরিকল্পনা সামনে আনা।

এরই মধ্যে তালেবানবিরোধী অনেকগুলো গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। সবাই মাঠে না থাকলেও এই তালিকা বেশ দীর্ঘ।

সম্প্রতি বাদাখশানের লড়াই বিরোধীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। গত জুলাইয়ে ফ্রিডম ফ্রন্ট দাবি করেছে, তারা জেবাক এলাকায় তালেবানের ওপর হামলা চালিয়ে কয়েকটি ছাউনি দখল করেছে এবং তালেবানের ক্ষয়ক্ষতি করেছে।

তালেবান অবশ্য সেই হামলা প্রতিহত করার ও হামলাকারীদের কয়েকজনকে হত্যার দাবি করেছে। সেখানে বেশ কয়েক দিন ধরে লড়াই চলেছে। সশস্ত্র বিরোধীদের চিরাচরিত চোরাগোপ্তা হামলার তুলনায় এটি ছিল অনেক বেশি ভিন্ন।

আসল পরীক্ষা

আরেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক আবদুল করিম খান আল–জাজিরাকে বলেন, জেবাকের লড়াই বিরোধীদের সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি বড় পরীক্ষা। তারা চোরাগোপ্তা হামলার বাইরে দীর্ঘ লড়াইয়ের দিকে যেতে পারছে কি না, এখান থেকে সেটা বোঝার বিষয় ছিল। তবে যতক্ষণ না দেশের অন্যান্য প্রান্তে একই ধরনের লড়াই দেখা যাচ্ছে, ততক্ষণ একে ‘কৌশলগত পরিবর্তন’ বলা যাবে না।

খালিদ আহমদী, রাজনৈতিক বিশ্লেষকবিরোধীদের সংখ্যা বৃদ্ধি মানেই নতুন গৃহযুদ্ধ নয়। তবে এটি একটি বিষয় প্রমাণ করে, তা হলো আগের সরকারের পতনের মাধ্যমে আফগানিস্তানে সংঘাতের অবসান ঘটেনি।

আবদুল করিম খান বলেন, ‘কোনো একটি এলাকা কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন দখলে রাখা আসল পরীক্ষা নয়। আসল পরীক্ষা হলো সেটি ধরে রাখা, সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা, যোদ্ধাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং তালেবানকে তাদের সামরিক অবস্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য করা।’

এরই মধ্যে তালেবানবিরোধী অনেকগুলো গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। সবাই মাঠে না থাকলেও এই তালিকা বেশ দীর্ঘ। এনআরএফ ও ফ্রিডম ফ্রন্ট ছাড়া হোমল্যান্ড আর্মি, ফ্রিডম অ্যান্ড জাস্টিস মুভমেন্ট, ইউনাইটেড ফ্রন্ট অব আফগানিস্তান, গ্রিন মুভমেন্ট, ন্যাশনাল ইনডিপেনডেন্স ফ্রন্ট, রিপাবলিকান ফ্রন্ট, পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট, ন্যাশনাল গার্ড মুভমেন্ট, ন্যাশনাল রেভোল্যুশনারি ফ্রন্ট অব আফগানিস্তান, ফ্রিডম অ্যান্ড ডেমোক্রেসি ফ্রন্ট ও ন্যাশনাল ফ্রন্ট অব লিবারেটরসসহ নানা গোষ্ঠীর নাম শোনা যাচ্ছে।

তবে কোনো গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করলেই যে তারা আক্রমণ করেছে, এমনটা নিশ্চিত নয়। অনেক সময় একই হামলার দায় একাধিক গোষ্ঠী দাবি করছে। আবার কখনো বিদেশের মাটিতে থাকা গোষ্ঠীগুলো এমন হামলার দায় নিচ্ছে, যা অন্য কেউ ঘটিয়েছে।

ডিজিটাল মিডিয়া বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ নুরির মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন দ্বিতীয় রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মাঠের লড়াইয়ের মতোই অনলাইনেও তাদের অস্তিত্ব প্রমাণের চেষ্টা করছে। তাঁর ভাষ্যমতে, ‘হামলার দাবির সত্যতা যাচাই করতে ছবি, ভিডিও, হামলার স্থান ও স্থানীয় লোকজনের সাক্ষ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। শুধু বিবৃতি কোনো প্রমাণ নয়।’

আফগানিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সমীকরণ এখন আগের চেয়ে ভিন্ন। বড় সামরিক সংঘাতের চেয়ে সশস্ত্র বিরোধীরা এখন ছোট ছোট দলের ওপর নির্ভর করছে। অন্যদিকে তালেবান চেষ্টা করছে যেকোনো বিদ্রোহ অঙ্কুরেই বিনাশ করতে।

আফগান সরকারের প্রতিক্রিয়া

তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহউল্লাহ মুজাহিদ এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, তাদের উপস্থিতি মূলত সাইবার জগতে, বাস্তবে নয়। পুরো আফগানিস্তান এখন সরকারের নিয়ন্ত্রণে। কোনো অস্থিতিশীলতা তৈরির সক্ষমতা এই গোষ্ঠীগুলোর নেই।

কাবুলে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন আফগান সরকারের মুখপাত্র জাবিহউল্লাহ মুজাহিদ। ১২ অক্টোবর ২০২৫

জাবিহউল্লাহ মুজাহিদ আরও বলেন, আফগান জনগণ শান্তি ও স্থিতিশীলতা চায়। তারা আর পুরোনো ‘যুদ্ধবাজদের’ ফিরে আসা সমর্থন করবে না। তাঁর দাবি, আগের অভিজ্ঞতা থেকে জনগণ নতুনভাবে সশস্ত্র সংঘাত প্রত্যাখ্যান করেছে। বিরোধীরা সাইবার জগতে সক্রিয় থাকলেও মাঠের বাস্তবতা পরিবর্তনের শক্তি তাদের নেই।

তালেবান বর্তমানে পুরো আফগানিস্তানের শহর ও প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। অন্যদিকে সশস্ত্র বিরোধীদের লক্ষ্য এখন শহর দখল নয়; বরং ছোট ছোট হামলার মাধ্যমে তালেবানকে ব্যতিব্যস্ত রাখা। এর ফলে তালেবানকে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সেনা মোতায়েন রাখতে হচ্ছে এবং চোরাগোপ্তা হামলাকারীদের পেছনে ছুটতে হচ্ছে।

ভিন্ন সমীকরণ

বিশ্লেষক রফিউল্লাহ কাকারের মতে, বিরোধীদের জন্য বড় এলাকা দখল করা এখনই জরুরি নয়। তারা মূলত তালেবানের রসদ ও জনবল ক্ষয় করার কৌশল নিয়েছে।

এই বিশ্লেষক সতর্ক করে বলেন, ‘শুধু এই ক্ষয় দিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসবে না। এর জন্য সামাজিক ভিত্তি ও গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।’

আফগানিস্তানের বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সমীকরণ এখন আগের চেয়ে ভিন্ন। বড় সামরিক সংঘাতের চেয়ে সশস্ত্র বিরোধীরা এখন ছোট ছোট দলের ওপর নির্ভর করছে। অন্যদিকে তালেবান চেষ্টা করছে যেকোনো বিদ্রোহ অঙ্কুরেই বিনাশ করতে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক খালিদ আহমদী বলেন, বিরোধীরা তাদের সক্ষমতা অনেক সময় বাড়িয়ে বলে। কিন্তু তালেবান–পরবর্তী আফগানিস্তান নিয়ে তাদের কোনো ঐক্যবদ্ধ পরিকল্পনা নেই।

অন্যদিকে তালেবানের শক্ত নিয়ন্ত্রণে থাকলেও তাদের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির সংকটে রয়েছে। বিরোধীদের সংখ্যা বৃদ্ধি মানেই নতুন গৃহযুদ্ধ নয়। তবে এটি একটি বিষয় প্রমাণ করে, তা হলো আগের সরকারের পতনের মাধ্যমে আফগানিস্তানে সংঘাতের অবসান ঘটেনি।

Read full story at source