এক নান্দনিক শহরে

· Prothom Alo

ইউরোপের যে দেশগুলো পর্যটননির্ভর, তাদের অন্যতম হচ্ছে পর্তুগাল। লিসবন ও আলগ্রাব হচ্ছে পর্তুগালের জনপ্রিয় পর্যটন স্পট। ফারো হচ্ছে আলগ্রাবের রাজধানী। অনেক দিন ধরে পর্তুগালে যাওয়ার ইচ্ছা। কিন্তু বউ-ছেলের পছন্দ অন্য। আমার এক বন্ধু থাকে পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে। একদিন সে বলল—তুই আর জাহিদ পর্তুগাল এসে ঘুরে যা। দাওয়াত পেয়ে, আমি ও আমার সুইডেনপ্রবাসী বন্ধু জাহিদ একটা পরিকল্পনা সাজালাম। গ্রীষ্মকালে লিসবন যাব। আমি যাব লন্ডন থেকে, জাহিদ সুইডেন থেকে। আর পর্তুগালে তো বন্ধু আবু হেনা আছেই। তিন বন্ধু মিলে ঘুরব আর আড্ডা দেব।

Visit mchezo.co.za for more information.

গ্রীষ্মকাল এল। কিন্তু বেঁকে বসল জাহিদ। জাহিদের ব্যবসায় সমস্যা। সে আসতে পারবে না। একা যাব? না থাক।

অবস্থা যখন এই, হঠাৎ ১৮ বছর বয়সী ছেলে অনুভব, একদিন বলল—বাবা, চলো, কোথাও ঘুরে আসি ।

কোথায় যাওয়া যায়?

ছেলে বলল—তার এক বন্ধু কিছুদিন আগে পর্তুগালের ফারোতে গিয়েছিল। জায়গাটা খুব সুন্দর। এখন সে–ও যেতে চায়।

ঠিক আছে, দেখো সস্তায় কোন ডিল মিলে কি না।

অনলাইনে সার্চ করে, হঠাৎ ছেলে চিৎকার দিয়ে উঠল—বাবা, সস্তায় টিকিট পেয়েছি। উইজ এয়ারে (Wizz Air)। দুজনের রিটার্ন মাত্র ৮০ পাউন্ড ( ১৩,০০০ টাকা )। উইজ এয়ার বাজেট এয়ারলাইনস, হাঙ্গেরির। খুব একটা খারাপ নয়। এর আগে এই এয়ারলাইনসে আমরা সৌদি গিয়েছিলাম।

ছেলেকে বললাম—এত সস্তা টিকিট যখন, তাহলে কেটেই ফেল। কিন্তু টিকিট দুটি কেন! তোর মাও তো যাবে।

কিন্তু সে তার মাকে নিতে চায় না। মা সবকিছুতে হস্তক্ষেপ করে, সে স্বাধীন থাকতে চায়। অবশেষে অনেক বুঝিয়ে রাজি করালাম।

টিকিট তিনটি কাটা হলো। ১৩০ পাউন্ড দিয়ে ( ২১,০০০ টাকা ) । তারপর হোটেল সার্চ। বুকিং ডটকমে গিয়ে, সুন্দর একটা অ্যাপার্টমেন্ট পেয়ে গেলাম। দুই বেডের। সুইমিংপুলও আছে। তিন রাতের ভাড়া ১৬০ পাউনড (২৬,০০০ টাকা)। অ্যাপার্টমেন্ট বুক করে ফেললাম।

অতঃপর যাওয়ার প্রস্তুতি। কিছু ইউরো কিনলাম। পর্তুগালের মুদ্রা। এখন চিন্তা—ওইখানে তো বাঙালি রেস্তোরাঁ নেই। ভাত ছাড়া আমার চলে না। তাহলে?

বউ কিছু চাল, ডাল, মসলা সঙ্গে নিল। আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে চুলা আছে। রান্না করা যাবে। লন্ডন থেকে রান্না করে, মুরগির মাংসও নিল। যাতে রাতে অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছেই খেতে পারি আমরা। ছেলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে—ভাত-তরকারিতে সে নাই। ওখানে গিয়ে ভিনদেশি খাবার খাবে।

সমস্যা নেই।

লন্ডনের গেটউইক এয়ারপোর্ট থেকে আমরা যাত্রা করলাম বেলা তিনটায়। আজ লন্ডনের আবহাওয়া খুব ঠান্ডা নয়, গরমও নয়। কিন্তু পর্তুগালের আবহাওয়া? অনলাইনে চেক করে মন খারাপ হয়ে গেল। আমরা ওখানে যে তিন দিন থাকব, তার দুই দিন-ই বৃষ্টি। বেড়ানো!

সন্ধ্যায় আমরা ফারো পৌঁছলাম। কিন্তু এয়ারপোর্টে আমাদের জন্য ট্যাক্সি থাকার কথা। কিন্তু ট্যাক্সিওয়ালা কোথায়?

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর ট্যাক্সিওয়ালাকে পেলাম। সে নির্ধারিত সময়ের পরে এসছে। ১০ মিনিট বিলম্ব। অবশ্য সে মার্জিত। ইংরেজিও বলতে পারে। আমাদের ব্যাগ টেনে তুলল। ২০ মিনিট পর আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে। কিন্তু অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকতে একটু বেগ পেতে হল। অনেকগুলো অ্যাপার্টমেন্ট, কোনটা আমাদের? তারপর মেইন দরজার পিন নাম্বার, রুমের পিন নাম্বার খুঁজে খুঁজে বের করতে হলো নিজেকেই। একজন আফ্রিকান, মধ্য বয়স্ক হোটেল কর্মী আমাদের সাহায্য করলেন। রুমে ঢুকেই বউ তার পুরোনো অভ্যাস চালু করে দিল—অ্যাপার্টমেন্টের এটা নাই কেন, ওইটা এমন কেন, ওইটা ছোট কেন। বাপ-ছেলে দুজনই বিরক্ত হলাম। যত দামি হোটেলই হোক না কেন, সে খুত ধরবেই। যাক, ফ্রেশ হয়ে আমরা টুকটাক শপিংয়ের জন্য বেরুলাম। বিশেষ করে খাওয়ার পানির জন্য। পাশেই একটা শপিং মল। প্রায় দোকান-ই ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, তবে নিচতলায় সুপারস্টোর খোলা। সেখান থেকে পানি ও টুকটাক বাজার করলাম। রুমে ফিরে ভাত খেলাম। লন্ডন থেকে আনা তরকারি দিয়ে। আর ছেলে খেল টরটিল্লা। তবে দুঃখজনক ব্যাপার হলো লন্ডন থেকে আনা চাল-ডাল, রেস্টহাউসের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা, না বুঝে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছে, আমাদের অবর্তমানে। কী আর করা। এখন হয়তো বিদেশি খাবার খেয়েই দিন পার করতে হবে।

অলংকরণ: মাসুক হেলাল

রাতে বেশ ভালো ঘুমই হলো অ্যাপার্টমেন্টে। সকালে উঠে বারান্দায় বেরুতেই মন ভালো হয়ে গেল। আবহাওয়ার পূর্বাবাস বলেছিল—আজ বৃষ্টি হবে এখানে কিন্তু বাইরে চকচকে রোদ। ঠান্ডাও নেই। তাপমাত্রা ২১ ডিগ্রি। বারান্দায় রোদ পোহাতে পোহাতে, আশপাশের বাড়িঘর দেখতে দেখতে সকালের নাশতা খেলাম। বাটার টোস্ট ও কলা। আশপাশের বেশির ভাগ বাড়ি একতলা বা দুতলা। ফুটপাত মসৃণ নয়। ছোট ছোট পাথরের টুকরা দিয়ে সব ফুটপাত বানানো । একটা- দুটি পাথর কোনো কারণে এদিক-সেদিক সরে গেলেই রাস্তা অসমতল হয়ে উঠে। হাঁটতে গেলে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ হয় না। পর্তুগালের এই ব্যাপার ভালো লাগেনি।

দূর পরবাসে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]

দুপুর ১২টার দিকে রেস্টহাউস থেকে বেরুলাম। আমাদের রেস্টহাউসের নাম আরবান ব্লিস। এটা ফারো শহরের মধ্যস্থলেই পড়েছে। রাস্তায় নেমেই ছেলেকে বললাম—পাউন্ড থেকে ইউরো বানানো দরকার। অনলাইনে সার্চ করে দেখ তো, আশেপাশে কোন মানি একচেঞ্জ আছে কি না? ছেলে মুঠোফোন টিপে বলল—বাবা, মানি একচেঞ্জ পেয়েছি। নাম—বিডি মানি একচেঞ্জ। সম্ভবত বাংলাদেশি হবে।

দেখি, দেখি ।

সে মানি একচেঞ্জের পেজে গিয়ে বলল—বাবা, ওদের অফিসের ভেতরে, শেখ হাসিনার বাবার ছবি (বঙ্গবন্ধু) দেখা যাচ্ছে।

বলিস কী!

একটু হেঁটেই অফিসটা পেয়ে গেলাম। অফিসের ভেতর ১০ বা ১২ জন লোক। আমাদের তিনজনকে ঢুকতে দেখে, অফিসের একজন কর্মী, কম্পিউটার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।

আমি বললাম—ভাই, পাউন্ড ভাঙানো যাবে?

না ভাই। আমরা মূলত দেশে টাকা পাঠাই।

ওহ্‌। আচ্ছা, এখানে কোন বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ নেই?

আছে ১টা। নাম বিডি কাবাব অ্যান্ড ক্যাফে। তারপর লোকেশন বুঝিয়ে বললেন—৫ মিনিট হাঁটলেই পেয়ে যাবেন।

বাংলাদেশি রেস্তোরাঁর হদিস পেয়ে মনটা আনন্দে ভরে উঠল। যাক বাবা, ভাত-মাছ খাবার ব্যবস্থা হলো। যে শহরে তেমন বাঙালি নেই শুনেছিলাম, সেই শহরে বাংলাদেশি ভাত পাব, মাছ পাব, এটা তো লটারি পাওয়ার মতে।

আমরা খুশিতে নাচতে নাচতে সামনের দিকে হাঁটতে লাগলাম। বাংলাদেশি রেস্তোরাঁ খুঁজতে। মিনিট তিনেক হাঁটার পর, হঠাৎ খেয়াল করলাম— দুজন ভদ্রলোক হেঁটে আসছেন আমাদের দিকেই। বাঙালি বাঙালি লাগছে। কাছে আসতেই জিজ্ঞাসা করলাম—ভাই, আপনারা কি বাংলাদেশি?

জি।

তাঁরা দাঁড়িয়ে গেলেন। তারপর তাঁদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কথা বললাম। তাঁরা জানালেন—এই শহরে প্রায় ৪০০ বাংলাদেশি থাকেন।

আচ্ছা, এখানে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁটা চেনেন?

চিনি মানে! এটা তো আমারই রেস্তোরাঁ। যে মানি একচেঞ্জ পেয়েছিলেন, সেটাও আমার। তারপর তিনি আমাদের রেস্তোরাঁর পথ দেখালেন। একটু হেঁটেই রেস্তোরাঁ পেয়ে গেলাম। ভেতরে ঢুকে বাংলাদেশি দুই ভাইকে পেলাম, যাঁরা রান্না করছেন, তাঁদের সঙ্গে শুরু করে দিলাম গল্প। ছেলে বলল—তোমরা এখানে বসে বাঙালি খাও, আমি গেলাম জাপানি ফুড খেতে। এই এলাকার চারদিকে রেস্তোরাঁ।

বাংলাদেশি রেস্তরাঁর কর্মীরা জানালেন, এখানে রোজ ৩০ জন বাংলাদেশি ভাত খান মাস চুক্তিতে। কেউ এক বেলা/দুই বেলা খেতে চাইলে, আগে থেকে বলতে হয়। নরমালি তারা কাবাব বেচেন। আমরা বাংলাদেশি স্টাইলের চা খেতে খেতে রাতের খাবারের অর্ডার দিয়ে আসলাম। তাঁরা জানালেন, রাতের মেনু চিকেন আর ডাল। দুপুরে আমরা একটা পর্তুগিজ রেস্তোরাঁয় ঢুকলাম। পর্তুগাল মাছের জন্য বিখ্যাত। পর্তুগাল এলাম, আর মাছ খাব না, এটা তো হয় না। আমরা গ্রিল সি-বাছ মাছ, এগ রাইস, সবজি, ও চিপসের (ফ্রাইজ) অর্ডার করলাম। মিনিট পাঁচেক পর, পর্তুগিজ ওয়েটার এসে জানাল- সি-বাছ ফিস শেষ হয়ে গেছে। সি-ব্রম আছে, দেবে কি না।

দাও।

১৫ মিনিট পর খাবার এল। বিশাল গ্রিল করা সি-ব্রম ফিস। কিন্তু ভাত নেই। দিয়েছে—একটা ওমলেট। ব্যাপার কী! অর্ডার তো দিলাম, এগ রাইস, ওমলেট কেন!

ওয়েটার কিচেন থেকে ফিরে এসে বলল—একটা রাইস দিয়ে দিই, ওমলেটের সঙ্গে মিলিয়ে খেয়ে ফেলেন।

আজব সমাধান তো !

ঠিক আছে, নিয়ে আসেন।

রাইস নিয়ে এল। মোটা মোটা ভাত। খেতে খারাপ লাগছে না। সম্ভবত রাইসের সঙ্গে অলিভ অয়েল মিশিয়ে দিয়েছে। গ্রিল মাছও দারুণ। কিন্তু পর্তুগাল আসার আগে যেভাবে শুনেছিলাম—খাবার খুব সস্তা। বাস্তবে তা মনে হচ্ছে না। বউ খেতে খেতে বলতে লাগল—এসব রেস্তোরাঁয় আর আসার দরকার নেই। পেটও ভরে না, খরচও বেশি। ইতোমধ্যে ছেলে, জাপানি সুশি খেয়ে ফিরেছে। এসে বলল—আজব রেস্তোরাঁয় খেয়েছে সে। যত ইচ্ছা খাও, ১৫ ইউরো। খাবার নষ্ট করলে, ২০ ইউরো জরিমানা।

ভালো-ই তো ।

খাওয়াদাওয়া শেষ করে হাঁটতে লাগলাম পুরান শহরের দিকে। ওল্ড টাউন অনেক খ্যাতিমান। এই ফারো শহর খুব বড় নয়। এক ঘণ্টা ঘুরলে এক মাথা থেকে আরেক মাথায় যাওয়ার মতো। পুরান শহরে ঐতিহাসিক, নান্দনিক নির্মাণ, দৃষ্টি কারার মতো। সেখানে শপিংমলও আছে। টুকটাক কাপড় কিনলাম। ইংল্যান্ডের তুলনায় সস্তা। ছেলেও কিনল। হাঁটতে-হাঁটতে পা ব্যথা হয়ে গেছে। ফিরে গেলাম বাঙালি রেস্তোরাঁয় ভাত খাওয়ার জন্য। গিয়ে দেখি, দুই তলায় মালিক বন্ধুবান্ধব নিয়ে তাস খেলছে। তাঁদের সঙ্গে আড্ডায় বসে গেলাম। তৃপ্তি নিয়ে মোরগের তরকারি দিয়ে ভাত খেলাম। রেস্তোরাঁর মালিকের সৌজন্যে চা-ও এল। মনে হলো—পর্তুগাল নয়, বাংলাদেশেই আছি। রাতে খাবারদাবার পর, হেঁটে হেঁটে রেস্টহাউসে ফিরলাম। এই রেস্টহাউসটা উন্নতই কিন্তু রুমে চা-কফির সুবিধা নেই। কমনরুমে খেতে হয়।

পরদিন সকালে উঠে , রেস্টহাউসেই দুই বাংলাদেশির সঙ্গে দেখা। তাঁরা এখানে পরিচ্ছন্নতার কাজ করেন। একজনের বাড়ি ঢাকা। দীর্ঘদিন বেলজিয়াম ছিলেন। পর্তুগাল এসেছেন লিগ্যাল হতে। এখানে লিগ্যাল হওয়া আগে সহজ ছিল। বর্তমান সরকার অনেক কঠিন করে ফেলেছে। তিনি জানালেন—যেদিন লিগ্যাল হবেন, পরদিনই পর্তুগাল ছেড়ে চলে যাবেন অন্য কোথাও। পর্তুগাল দেশ ভালো কিন্তু আয়রোজগার কিছুটা কম। দুপুরে রেস্টহাউস থেকে বেরুব, অমনি এগিয়ে এলেন বয়স্ক এক মহিলা। তিনি এই রেস্টহাউসের মালিক। আমাদের বললেন—এখানে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো ?

একটা অসুবিধা, বেসিনের টেপে গরম পানি আসছে না।

তিনি এসে সমস্যার সমাধান করলেন। স্মার্ট মহিলা। কর্মীদের সঙ্গে নিজেও কাজ করেন। কাপড় শুকানো, ইস্ত্রি করা। দুপুরে আমি ও আমার ছেলে হটটবে নামলাম, তিনি এসে গরম পানির মাত্রা বাড়িয়ে দিলেন। বললেন—ভালো রিভিউ দিবেন কিন্তু।

অবশ্যই।

গোসল করে, বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয় গিয়ে পরোটা , ডিমবাজি, ডাল ও চা খেলাম। দুজনের বিল ৭ ইউরো ( ১০০০ টাকা) । ছেলে চলে গেল পর্তুগিজ রেস্তোরাঁয় স্তেইক খেতে। এসে বলল—বাবা, কত টাকা বিল দিয়েছি জানো?

কত ?

৫৫ ইউরো (৯০০০ টাকা)

একজনের বিল বেশি হয়ে গেল না!

বিকেলে গেলাম ফারো মেরিনায়। প্রথম ঢুকেই যখন বিস্তৃত জলরাশি দেখলাম, মনে হলো সুনামগঞ্জের হাওরের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। একটু এগোতেই দেখি অনেক পর্যটন তরি পানিতে নোঙর করা। এগুলো নিয়ে ঘুরতে যাওয়া যায়। অনেকগুলো বুট টুর এর অফিস। ছেলেকে বললাম, চল ঘুরতে যাই কিন্তু ছেলে রাজি নয়। নৌকায় চড়লে তার বমি বমি লাগে। কী আর করা। জায়গাটা খুব সুন্দর পানির মধ্যে সুন্দর স্থাপনা। একপাশে বড় করে, নান্দনিক স্টাইলে লেখা আছে শহরের নাম—ফারো। এই স্থাপনার পাশে দাঁড়িয়ে অনেকই ছবি তুলছেন। আমরাও তুললাম। একপাশে কুটির শিল্পের দোকান। স্ত্রী ও বন্ধুদের জন্য গিফট কিনল। মেরিনা ঘুরে আমরা গেলাম—একটা শপিং সেন্টারে। উবারে। সেখানে গিয়ে শপিং করলাম। কফি খেলাম। তারপর আবার উবার ডাকলাম। উবারচালক বললেন—তাঁর বাড়ি বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ কোথায় ?

সিলেটের বিয়ানীবাজার।

উবারচালক জানালেন, ২৫ বছর তিনি দুবাইতে ট্যাক্সি চালিয়েছেন। এখানে এসেছেন আট মাস। মেসে থাকেন। আয়রোজগার ভালোই। তিনি কথা বলতে বলতে জানালেন—আমাদের রেস্টহাউসের কাছেই একটি পাকিস্তানি রেস্তোরাঁ আছে এবং তার পাশে মসজিদও। তাঁকে বললাম তাহলে পাকিস্তানি রেস্তোরাঁয় আগে যাই, খাবার নিয়ে রুমে ফিরব।

গেলাম পাকিস্তানি রেস্তোরাঁয়। কিন্তু সেখানে মনের মতো খাবার পেলাম না। চেয়েছিলাম বিরিয়ানি খেতে কিন্তু তাঁরা জানাল, বিরিয়ানি শুধু শুক্রবারে রান্না হয়। কী আর করা।

রুমে ফিরলাম। রাতে ছেলে জানাল—পাশেই একটি পাকিস্তানি কাবাব শপ আছে। কাবাব খাবে সে। রাত ৮টার দিকে তিনজন বেরুলাম। কিছুদূর হেঁটে একটা দোকানের সামনে এসে থামলাম। ছেলে বলল—বাবা, দেখো এই মেশিনে টাকা ঢুকালে, বার্গার বেরিয়ে আসে ।

বাহ্‌, দারুণ তো!

কাবাব শপ খুঁজে পেলাম। শপে কোনো খদ্দের নেই। মালিক একা বসে দোকান পাহারা দিচ্ছে। ইয়ামেনি মালিক। কী ব্যাপার, কাস্টমার কই!

আজ রোববার তো!

যাক, আমরা ডোনার কাবাব খেলাম আর চিপস।

রাতে রেস্টহাউসে ফিরে, বাপ-ছেলে লেগে গেলাম পোল খেলতে। আজ রাতে বেশ ঠান্ডা লাগছে। রুমে এসে ছেলেকে দেখালাম, রুমের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র থেকে, কীভাবে গরম বাতাস বের করতে হয়।

পরদিন সকালে উঠে, সামনের সুপার স্টোরে গেলাম। সেখানকার কফি শপে ঢুকে, বউ চা ও ক্রসেন নিল আর আমি কফি ও সমুচা। ছেলে তখনো ঘুমাচ্ছে। আসার সময় কিছু খাবার কিনলাম, বিমানে বসে খাবার জন্য। বিমানে খাবার অনেক দাম। আজ আমরা লন্ডন ফিরে যাব। পর্তুগাল তিন দিন থেকে মায়া পড়ে গেছে। দুপুর ১২টায় গেস্টহাউস ছেড়ে, চলে গেলাম বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয়। রুই মাছ দিয়ে ভাত খেলাম। সঙ্গে ডাল। দুজনের বিল ২২ ইউরো। রেস্তোরাঁর ম্যানেজার বললেন—ভাই, ২০ ইউরো (৩০০০ টাকা) দিলেই হবে। মনেমনে বললাম—২০ ইউরো অনেক বেশি। এখানে যারা মাস হিসেবে খান—এক বেলা (৩০ দিন) খেলে দেন—৭৫ ইউরো, দুই বেলা খেলে ১৪০ ইউরো। আমার এক দিনের এক বেলার, সেইম খাবর ২০ ইউরো! বেশি না!

যাক, বাংলা খাবার যে পেয়েছি, সেটাই বেশি। ওখানে যত লোক পেলাম, তাতে গোপালগঞ্জ আর চাঁপাইনবাবগঞ্জের লোকই বেশি পেলাম। ভাত খেয়ে, ট্যাক্সি নিয়ে গেলাম সমুদ্রসৈকতে। বালুর সমুদ্রসৈকত। তবে আমাদের কক্সবাজারের তুলনায় তেমন কিছুই নয়। তারপরও এখানে ভিড় লেগে থাকে কেন! আমাদের কক্সবাজারে বিদেশিরা আসে না কেন! নিরাপত্তার অভাব। সৈকতে আবর্জনা, ময়লার ছড়াছড়ি। মেয়েমানুষ, মদ অবাধ নয়। আসবে কেন!

সৈকতে একটু ঘুরে, আবার উবার ডাকলাম। উবার ডেকে ছেলে বলল—বাবা, ড্রাইভারের নাম—তইবুর রহমান। বাংলাদেশি হতে পারে।

হতে পারে।

ট্যাক্সি এল। ট্যাক্সিতে উঠেই জিজ্ঞাসা করলাম—ভাইয়ের বাড়ি কই?

বাংলাদেশ।

তারপর গল্পের শুরু। ওবার চালক খুবই সুদর্শন ও ভদ্র । সে জানাল, তার বাড়ি টাঙ্গাইল। দীর্ঘদিন অস্ট্রিয়া ছিল। আইটিতে কাজ করত। আড়াই বছর আগে পর্তুগাল এসেছে, লিগ্যাল হতে। কয়েক দিনের মধ্যে তাঁর স্ত্রীও এখানে আসবেন। লিগ্যাল হওয়ার পর, ইউরোপের অন্য কোনো দেশে চলে যাবে সে। তবে অস্ট্রিয়া যাবে না। সেখানে বর্ণবাদ বেশি। সে আমাদের এয়ারপোর্টে নামিয়ে দিয়ে হাওয়া হলো। আমাদের ফ্লাইটের আর আড়াই ঘণ্টা বাকি। স্ত্রীকে বললাম—চলো কফি খাই। কফিশপে ঢুকলাম। ছেলে চলে গেল, মোবাইলে চার্জ দিতে। কফিশপে ঢুকে দেখি, ১ কাপ কফির দাম—সাড়ে ৫ ইউরো (৮০০ টাকা) । স্ত্রী বলল—সে কফি খাবে না।

কী আর করা। ইমিগ্রেশন লাইনে গিয়ে দাঁড়ালাম। লন্ডন ইমিগ্রেশনের আগে ২ লিটার পর্যন্ত পানি বহন করা যায় কিন্তু পর্তুগাল কর্তৃপক্ষ বলল ১০০ মিলি লিটার। সব পানি ফেলে দিতে হলো এবং ইমিগ্রেশন পাড়ি দিয়ে, একই পানি কিনতে হলো তিন গুণ দামে। ফারো এয়ারপোর্ট খুব ব্যস্ত এয়ারপোর্ট নয়। মোটামুটি নিরিবিলি। যথাসময়ে আমাদের বিমান আকাশে উড়ল এবং তিন ঘণ্টার বদলে, আড়াই ঘণ্টায় পৌঁছে গেল লন্ডন গেটউইক এয়ারপোর্ট। বিমান থেকে নেমে টের পেলাম শীত কাকে বলে। পর্তুগাল যেদিন ছেড়েছি, সেদিন সেখানকার তাপমাত্রা ছিল ২৪ ডিগ্রি। আর লন্ডনের ২ ডিগ্রি। যা–ই হোক—আমাদের সঙ্গে পর্যাপ্ত শীতের কাপড় আছে। সেগুলো পড়ে ইমিগ্রেশনের দিকে হাঁটলাম। ছেলে-বউ, ই-গেইট দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে গেল পাসপোর্ট স্ক্যান করে কিন্তু আমি আটকে গেলাম। প্রতিবার-ই এমন হয়। অথচ আমার পাসপোর্ট আধুনিক চিপযুক্ত। বউ-ছেলে টিটকারি দিয়ে বলতে লাগল—তুমি যে ধরা খাবা, আমরা তো জানিই।

ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়ালাম। অবশ্য লাইন লম্বা না। সামনে শুধু একজন মানুষ। ইমিগ্রেশন অফিসার যখন আমাকে ডাকল, তার হাতে পাসপোর্ট দিয়ে বললাম—এমন হচ্ছে কেন! স্ক্যান করলে আমার পাসপোর্টে কাজ হচ্ছে না কেন?

মধ্যবয়স্ক, স্মার্ট ইমিগ্রেশন অফিসার মৃদু হেসে বলল—আপনার নাম তো মোহাম্মদ, মনে হয় সে জন্য সন্দেহ করতেছে ( সন্ত্রাসী কি না?) ।

এখন উপায় !

অফিসার আবার মৃদু হাসল—এক কাজ করেন, নাম বদলিয়ে ফেলেন। নাম রেখে ফেলেন—স্মিত।

তাঁর কথা শুনে হাসি পেল। হাসলাম। আর মনেননে বললাম—যত সমস্যাই থাকুক। মোহাম্মদই থাকব। মোহাম্মদই । তারপর দ্রুত হেঁটে ইমিগ্রেশন পাড়ি দিলাম। তারপর ট্রেনে চড়ে বাসায়। বাসায় ফিরেও, পর্তুগাল চোখে ভাসছে। পর্তুগাল। পর্তুগাল।

Read full story at source