সিরিয়া কি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়াবে?
· Prothom Alo

হিজবুল্লাহর বিষয়ে সিরিয়ার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা আবার নতুন করে শুরু হয়েছে। সম্প্রতি বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার বক্তব্যে বিষয়টি সামনে আসে। গত মঙ্গলবার লেবাননের সংগঠন হিজবুল্লাহ আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছে। তারা প্রকাশ্যে প্রথমবারের মতো দামেস্কের সঙ্গে আলোচনার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন।
Visit mwafrika.life for more information.
হিজবুল্লাহর নেতা শেখ নাইম কাসেম এক টেলিভিশন ভাষণে বলেন, ‘দুই পক্ষের সুবিধাজনক সময়ে সিরিয়ার নেতৃত্বের সঙ্গে আমাদের আনুষ্ঠানিক বৈঠকে কোনো বাধা নেই।’
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিরিয়াকে কাজে লাগানোর প্রস্তাব দেন। গত মাসে হোয়াইট হাউসে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের সঙ্গে বৈঠকে তিনি হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণে সিরিয়াকে যুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘[সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট] সেখানে ঢুকতে চান। আপনারা জানেন, তারা লড়াই করছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে লড়ছেন। এটি খুব কার্যকর হতে পারে বলে আমি মনে করি। তাই আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবছি।’
ইরান যুদ্ধে হিজবুল্লাহ যেভাবে ‘ফিনিক্স পাখি’র মতো জেগে উঠলইসরায়েলের আক্রমণ সামলে হিজবুল্লাহ যেভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেট্রাম্পের এই মন্তব্য এক ধারাবাহিক বক্তব্যের অংশ। তিনি লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সিরিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপকে সমর্থন জানিয়ে আসছেন। তাঁর মতে, প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা নাকি এ কাজে অত্যন্ত আগ্রহী।
সিরিয়া কর্তৃক হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ধারণাটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে গত বছরের নভেম্বরে। মার্কিন দূত টম বারাক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি পোস্ট করেন।
শারার প্রথম ওয়াশিংটন সফরের পর বারাক লেখেন, ‘আইএস (ইসলামিক স্টেট), আইআরজিসি (ইরানি রেভোল্যুশনারি গার্ড), হামাস, হিজবুল্লাহ ও অন্যান্য সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের অবশিষ্টাংশ মোকাবিলা ও ধ্বংস করতে দামেস্ক আমাদের সক্রিয়ভাবে সহায়তা করবে। বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তারা আমাদের অন্যতম বিশ্বস্ত অংশীদার হবে।’
সিরিয়া কীভাবে সহায়তা করবে, তা বারাক স্পষ্ট করেননি। তবে রয়টার্স পরে এক প্রতিবেদনে জানায়, ওয়াশিংটন দামেস্ককে লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালাতে অনুরোধ করেছিল। কিন্তু অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার ঝুঁকির কথা ভেবে সিরিয়ার কর্মকর্তারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। যদিও বারাক রয়টার্সের এই প্রতিবেদন অস্বীকার করেছিলেন।
প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা
ট্রাম্পের একের পর এক মন্তব্যের পরও শারা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ইচ্ছা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তবে সিরিয়া থেকে হিজবুল্লাহর কাছে অস্ত্র যাওয়ার পথ বন্ধ করতে তিনি অভিযান জোরদার করেছেন।
সম্প্রতি আল-জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শারা বলেন, ‘আমরা সামরিক হস্তক্ষেপের কথা ভাবছি না। তবে লেবানন সরকার চাইলে ব্যবহারের জন্য সিরিয়া বেশ কিছু প্রস্তাব বা কার্ড দিতে পারে।’ তিনি লেবানন রাষ্ট্রের হাতে সব অস্ত্র কেন্দ্রীভূত করার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন।
সামরিক পদক্ষেপ ছাড়া কীভাবে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করা সম্ভব, তা নিয়ে শারা স্পষ্ট কিছু বলেননি। তবে বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা, সিরিয়া হয়তো লেবাননে তাদের সমর্থিত একটি ‘সুন্নি ভিত্তি’ গড়ে তুলে চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করছে।
গত জুলাই মাসে সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদ আল-শাইবানি লেবাননের উত্তরাঞ্চলীয় ত্রিপোলি শহর সফর করেন। এ সফর নিয়ে তৈরি হয় ব্যাপক জল্পনা। অনেকে এটাকে লেবাননের ত্রিপোলিকেন্দ্রিক ‘সুন্নি প্রভাব’ বাড়ানোর চেষ্টা হিসেবে দেখেন। ধারণা করা হয়, এর মাধ্যমে সিরিয়া হয়তো হিজবুল্লাহকে নিষ্ক্রিয় করতে চায়।
হিজবুল্লাহ বলেছে, তারা শত্রুর বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা প্রতিহত করতে প্রস্তুততবে সমস্যা হলো, এই পথ ধরলে সুন্নি বনাম শিয়া সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তীব্র হবে। আইএসের মতো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এই বিভাজনের সুযোগ নিয়েই টিকে থাকে। এর ফলে আইএস লেবাননে নতুন করে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে, যেমনটা তারা সিরিয়া ও ইরাকে করেছিল। আর সেখান থেকে তারা সিরিয়া সরকারকে পতনের মূল এজেন্ডা নিয়ে কাজ করতে পারবে।
সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় এই আশঙ্কা আরও বেড়েছে। গত মাসে লেবাননের কর্তৃপক্ষ এক জ্যেষ্ঠ আইএস নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে। সে সিরিয়ার দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে আইএসের কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্ত ছিল বলে ধারণা করা হয়। এর কয়েক দিন পরেই সিরিয়ায় আইএসকে অর্থ জোগানের অভিযোগে আরও একজনকে আটক করা হয়।
সুন্নি-শিয়া উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে আইএসের বিরুদ্ধে সিরিয়া ও লেবাননের যৌথ সামরিক প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হবে। দুর্বল হয়ে পড়তে পারে লেবাননের বহুজাতিক সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। আইএসকে দূরে রাখার চেষ্টা করা সিরিয়া সরকারের জন্য এটি হবে বড় ধরনের বিপর্যয়।
উত্তেজনা বৃদ্ধি
আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে লেবানন এখন সিরিয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তথ্য বিনিময়ের মাধ্যমে একটি সন্ত্রাসী সেলকে শনাক্ত ও নির্মূল করা সম্ভব হয়েছিল। এই দলটি জুলাইয়ের শুরুতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর দামেস্ক সফরের সময় বোমা হামলার পরিকল্পনা করেছিল।
শারার প্রকাশ্য মন্তব্য সত্ত্বেও কিছু পর্যবেক্ষক ভিন্ন কথা বলছেন। তাঁদের মতে, সিরিয়া সরকারের ভেতরে থাকা উগ্রপন্থী অংশকে শান্ত রাখতে শারা হয়তো লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে সেনা পাঠাতে পারেন। কারণ, এই গোষ্ঠীগুলো শারার বিরুদ্ধে জিহাদের পথ থেকে সরে আসার অভিযোগ তুলছে। কিন্তু এই পদক্ষেপও শেষ পর্যন্ত আইএসের সুবিধাই করে দেবে।
ট্রাম্পের প্রকাশ্যে উসকানির পর হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামলে শারাকে ‘আমেরিকার হাতের পুতুল’ বলে মনে করা হবে। এটি সিরিয়ার উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তুলবে। এতে শারা-বিরোধী আইএসের প্রচারণাও শক্ত ভিত্তি পাবে। ফলে সিরিয়ার সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনী থেকে সদস্য সংগ্রহের জন্য আইএস বাড়তি সুবিধা পাবে।
একই সঙ্গে লেবাননের শীর্ষ কর্মকর্তারা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যেকোনো সিরীয় সামরিক হস্তক্ষেপের প্রস্তাব বাতিল করে দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট আউন বলেছেন, অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ সম্পূর্ণ তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এমনকি হিজবুল্লাহর তীব্র বিরোধী হিসেবে পরিচিত লেবানিজ ফোর্সেস পার্টির নেতা সামির গেয়াগেয়াও এমন প্রস্তাবকে ‘বাস্তবসম্মত নয়’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সমাবেশএর মূল কারণ হলো, আসাদ পরিবারের শাসনামলে লেবাননে সিরিয়ার আধিপত্য ছিল। ফলে লেবাননে সিরিয়ার কোনো ভূমিকা সাধারণ মানুষ ভালো চোখে দেখে না। হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সিরিয়ার সামরিক পদক্ষেপ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নষ্ট করবে। এর ফলে আইএসের বিরুদ্ধে দুই দেশের যৌথ লড়াইও ব্যাহত হতে পারে।
হিজবুল্লাহ ও শারার মধ্যে তিক্ত অতীত ইতিহাস রয়েছে। তবে আইএসের সঙ্গে তার শত্রুতা আরও বেশি গভীর। তা ছাড়া আইএসের মতো হিজবুল্লাহ কখনোই সিরিয়া সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেনি, কিংবা দামেস্কের প্রাণকেন্দ্রে হামলাও চালায়নি।
কাজেই সিরিয়াকে নতুন করে গড়ে তোলার সময় শারার জন্য আইএসই হলো একমাত্র অস্তিত্বের হুমকি।
চলতি সপ্তাহে হিজবুল্লাহ নেতার ইতিবাচক বার্তাও শারার সতর্ক হওয়ার আরেকটি কারণ। হিজবুল্লাহর সঙ্গে একটি অনাবশ্যক যুদ্ধে জড়িয়ে আইএসের বিরুদ্ধে মূল প্রয়োজনীয় লড়াইটিকে তিনি নিশ্চয়ই ঝুঁকির মুখে ফেলবেন না।
আলী রিজক লেখক, একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক। মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত।