পড়াশোনায় এআই—সহযাত্রী নাকি নির্ভরতার ফাঁদ
· Prothom Alo

রাত বাড়ছে, পরদিনই অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেওয়ার শেষ সময়। একসময় এমন রাতে বইয়ের পাতা উল্টে কিংবা গুগলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত শিক্ষার্থীদের। কিন্তু সেই দৃশ্য এখন বদলে গেছে। কয়েকটি শব্দ লিখে দিলেই চ্যাটজিপিটি বা জেমিনাইয়ের মতো এআই টুলস মুহূর্তেই সাজিয়ে দিচ্ছে অ্যাসাইনমেন্টের খসড়া, প্রেজেন্টেশন কিংবা জটিল কোনো তত্ত্বের সহজ ব্যাখ্যা।
Visit betsport24.es for more information.
নতুন এই প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনায় এক নীরব পরিবর্তন এনে দিয়েছে। সময় বাঁচানো এবং কঠিন বিষয় সহজে বোঝার ক্ষেত্রে এআই এখন শিক্ষার্থীদের নিত্যসঙ্গী। তবে সুবিধার পাশাপাশি বড় একটি প্রশ্নও সামনে আসছে—এআই কি শিক্ষার্থীদের দক্ষ করছে, নাকি ধীরে ধীরে কমিয়ে দিচ্ছে তাঁদের নিজস্ব চিন্তাশক্তি ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা?
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই এআইকে শেখার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করছেন। তবে অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে নিজের চিন্তা ও গভীর পড়াশোনার অভ্যাস কমে যাওয়ার কথাও স্বীকার করেছেন অনেকেই।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী রুবাইয়েত হোসেন বলেন, ‘এআই ব্যবহারের ফলে কাজ দ্রুত হচ্ছে এবং কঠিন বিষয় সহজে বোঝা যাচ্ছে সত্যি, তবে এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা গভীর চিন্তা ও সৃজনশীলতার চর্চা কমিয়ে দিচ্ছে।’
সুবিধার পাশাপাশি এআইয়ের ভুল তথ্য অনেক সময় শিক্ষার্থীদের বিপাকে ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তিটি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করে, যা সহজে বোঝা যায় না। এ বিষয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান বলেন, ‘এআই অনেক সময় ভুল তথ্য দেয়। বিষয়ভিত্তিক পূর্বধারণা না থাকলে এআইয়ের ভুল ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে অনেক সময় বিপাকে পড়তে হয়।’
তথ্যগত বিভ্রান্তি এড়াতে সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দিচ্ছেন প্রযুক্তিবিশ্লেষকেরাও। কম্পিউটার প্রকৌশলী এন এ নোমান বলেন, ‘এআইয়ের সব তথ্য অন্ধভাবে বিশ্বাস করা ঠিক নয়। অনেক সময় এটি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্যও উপস্থাপন করে। তাই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করা জরুরি। পাশাপাশি এআই ব্যবহার করে ভুয়া ছবি, ডিপফেক ভিডিও বা জাল খবর তৈরি করা সহজ হয়ে ওঠায় ডিজিটাল সচেতনতা বাড়ানোও প্রয়োজন।’
নিজেকে গড়ছেন, নাকি শুধু চাকরি খুঁজছেনশিক্ষকেরাও এআইকে শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করেন। তবে তাঁরা দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী বলেন, ‘এআই দ্রুত তথ্য পেতে সাহায্য করে সত্যি; কিন্তু গভীর জ্ঞান অর্জন ও সৃজনশীলতা বাড়াতে বই পড়া ও নিজের মতো করে ভাবার বিকল্প নেই। তাই এআইকে কেবল সহায়ক হিসেবেই নেওয়া উচিত।’
একসময় ক্যালকুলেটর আর ইন্টারনেট নিয়েও নানা শঙ্কা ছিল। সময়ের সঙ্গে সেগুলো শিক্ষাব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে। এআইও হয়তো সেই পথেই এগোচ্ছে। তবে প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, শেখার মূল ভিত্তি থাকবে মানুষের কৌতূহল, যুক্তিবোধ ও সৃজনশীল চিন্তা। এআই সেই পথের সহযাত্রী হতে পারে, কিন্তু শেখার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত মানুষের নিজেরই।
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়