জুলাই ফাউন্ডেশনের টিকে থাকার লড়াই
· Prothom Alo

পাঁচ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না ফাউন্ডেশনের কর্মীরা। কার্যালয়ের ১২ মাসের অফিস ভাড়া বকেয়া। সরকারের কাছে অর্থ চেয়ে আবেদন।
Visit zeppelin.cool for more information.
পাঁচ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের কর্মীরা। পাননি ঈদ বোনাসও। রাজধানীর শাহবাগ কার্যালয়ের ১২ মাসের অফিস ভাড়ার ২৪ লাখ টাকা বকেয়া। আবর্তক বা পরিচালন ব্যয়ের তহবিলে অর্থ না থাকায় দৈনন্দিন কাজ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।
যে ফাউন্ডেশনের দায়িত্ব জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের আর্থিক, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়া, সেই প্রতিষ্ঠানই এখন টিকে থাকার সংকটে। গত ঈদুল আজহার আগে কর্মীরা যাতে একেবারে খালি হাতে বাড়ি না ফেরেন, সে জন্য ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লে. কর্নেল (অব.) কামাল আকবর ব্যক্তিগত উদ্যোগে ফাউন্ডেশনকে ১০ লাখ টাকা বিনা সুদে ঋণ দিয়েছেন।
ফাউন্ডেশন সূত্র জানিয়েছে, বেতন–ভাতা, প্রশাসনিক ব্যয়, অফিস ভাড়া, যানবাহন কেনা ও ভাড়া করা, জ্বালানি, ভ্রমণ ব্যয়, আসবাব কেনাসহ আনুষঙ্গিক খরচের জন্য ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার বিভাগ তিন কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছিল। তা দিয়ে দুই অর্থবছর চলেছে।
হতাশ কর্মীদের অনেকে অবৈতনিক ছুটি কাটাচ্ছেন। কেউ কেউ নিয়মিত অফিসে আসছেন না। কেউ আবার ফাউন্ডেশনের কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। একাধিক কর্মী বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবন কাটানোর কথা বলেছেন।
সিইও কামাল আকবর প্রথম আলোকে বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে বারবার ধরনা দিয়েও যখন কিছু পাইনি, তখন নিজেই ঋণ দিয়েছি। ফাউন্ডেশন যখন পারবে শোধ করবে। আমি নিজেও কয়েক মাস ধরে বেতন নিচ্ছি না।’
কামাল আকবর, সিইও, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনস্থায়ী ভবন তৈরি এবং ফাউন্ডেশনের জন্য সরকার যথাযথ বরাদ্দ দিলে আর কোনো জটিলতাই থাকবে না।২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এনজিওবিষয়ক ব্যুরো ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীন জুলাই ফাউন্ডেশন নিবন্ধিত হয়। ফাউন্ডেশনে বর্তমান কর্মী ৩৯ জন। হতাশ কর্মীদের অনেকে অবৈতনিক ছুটি কাটাচ্ছেন। কেউ কেউ নিয়মিত অফিসে আসছেন না। কেউ আবার ফাউন্ডেশনের কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। একাধিক কর্মী বেতন না পেয়ে মানবেতর জীবন কাটানোর কথা বলেছেন।
জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম গত ২৮ জুন সংসদে বলেছেন, জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন অর্থের অভাবে চলতে পারছে না। তিনি সরকারের কাছে ফাউন্ডেশনের জন্য অর্থ বরাদ্দের দাবি জানান।
ফাউন্ডেশনের সিইও জানান, শহীদ এবং আহত ব্যক্তিদের সহায়তার জন্য প্রয়োজন ছিল ৩৮৩ কোটি টাকা; আর দেওয়া হয়েছিল ১০০ কোটি টাকা। এখন শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের সহায়তা দিতে আরও ২৬৩ কোটি টাকা প্রয়োজন।
গত ৯ জুন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বরাবর ফাউন্ডেশনের সার্বিক অবস্থা তুলে ধরে লিখিত আবেদন করেন ফাউন্ডেশনের সিইও। এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি তীব্র আর্থিক সংকটের কথা উল্লেখ করে সব সংসদ সদস্যের প্রতি তাঁদের এক মাসের বেতন ফাউন্ডেশনকে অনুদান হিসেবে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এ ছাড়া ফাউন্ডেশনের সিইও বলেন, ফাউন্ডেশনটি সচল রাখতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিবছর অন্তত ১০ কোটি টাকার আবর্তক ব্যয়ের স্থায়ী বরাদ্দ প্রয়োজন। একই সঙ্গে গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ, ডিজিটাল আর্কাইভ এবং পুনর্বাসনের মতো দীর্ঘমেয়াদি কাজেও পৃথক অর্থায়ন দরকার।
সরকারের কাছে হাত পেতে জুলাই ফাউন্ডেশন আর কত দিন চলতে পারবে১০০ কোটি টাকা অনুদানে যাত্রা শুরু
২০২৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ১০০ কোটি টাকা অনুদান নিয়ে যাত্রা শুরু করে এ ফাউন্ডেশন। তখন ফাউন্ডেশনের সভাপতি ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। ওই দিন সরকারের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারকে দেখাশোনার যে দায়িত্ব সরকার নিয়েছে, তা এই ফাউন্ডেশন থেকে পরিচালিত হবে।
ফাউন্ডেশনের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, অনুদানের মোট ১২৪ কোটি (অন্যান্য ব্যক্তি ও সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া অনুদানসহ) টাকার মধ্যে এখন ফাউন্ডেশনের হাতে আছে ৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। বর্তমানে সরকারের প্রজ্ঞাপনভুক্ত জুলাই শহীদের সংখ্যা ৮৪৩। মোট আহত যোদ্ধার সংখ্যা ১৪ হাজার ৩৭০।
ফাউন্ডেশনের সিইও জানান, শহীদ এবং আহত ব্যক্তিদের সহায়তার জন্য প্রয়োজন ছিল ৩৮৩ কোটি টাকা; আর দেওয়া হয়েছিল ১০০ কোটি টাকা। এখন শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের সহায়তা দিতে আরও ২৬৩ কোটি টাকা প্রয়োজন। ৮৩১টি শহীদ পরিবারকে ৫ লাখ টাকা করে প্রায় ৪২ কোটি টাকা এবং ৬ হাজার ১২৭ জন আহত ব্যক্তিকে ৭৮ কোটি টাকাসহ মোট ১২০ কোটি টাকা জরুরি আর্থিক সহায়তা দিয়েছে ফাউন্ডেশন।
তবে আর্থিক সংকট সত্ত্বেও ফাউন্ডেশনটি হুট করে বন্ধ হয়ে যাবে বলে মনে করেন না সিইও কামাল আকবর। তিনি বলেন, সরকারের অনুমোদনেই এটি গঠিত। রাজধানীর বিজয়নগরে প্রায় চার কাঠা জমি দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সেখানে স্থায়ী ভবন তৈরি এবং ফাউন্ডেশনের জন্য সরকার যথাযথ বরাদ্দ দিলে আর কোনো জটিলতাই থাকবে না।
জুলাই ফাউন্ডেশন পরিচালনায় টাকা নেই, অনিশ্চয়তায় কর্মীদের বেতনপুনর্বাসন ও স্মৃতি সংরক্ষণ করছে ফাউন্ডেশন
ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, ১৫০টি পরিবারকে পুনর্বাসনের আওতায় আনা হয়েছে। ফাউন্ডেশন বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে ৪১ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৭টি পরিবারকে বিভিন্ন জেলায় পুনর্বাসন করেছে। পুনর্বাসনের জন্য ৪ হাজার ৯৩৮টি শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ, পর্যালোচনা ও সংরক্ষণ করেছে। একইভাবে গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতি সংরক্ষণ খাতেও ফাউন্ডেশনের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই।
ফাউন্ডেশন শুরু থেকেই শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই ও ডেটাবেজ তৈরির কাজ করছে। অজ্ঞাত শহীদদের পরিচয় শনাক্ত করতেও সম্পৃক্ত এ ফাউন্ডেশন। ফাউন্ডেশনে এসে ভুয়া শহীদ ও আহত হিসেবে চিহ্নিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের কাজটিও করছে। ফাউন্ডেশনে আর্থিক সহায়তাসহ বিভিন্ন আবেদনকে ডিজিটাল নথিভুক্ত করার কাজ শুরু করেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের বর্তমান সভাপতি সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথম আলোকে বলেন, আর্থিক সংকটে থাকলেও ফাউন্ডেশনটির টিকে থাকা নিয়ে কোনো সংশয় নেই। এটি সরকার অনুমোদিত। সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় অর্থ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। সরকার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছে।