শিল্পে গ্যাস–সংযোগ বন্ধ: অনিশ্চয়তায় উদ্যোক্তারা

· Prothom Alo

  • ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কাছে ১ হাজার ৮৫৭ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আবেদন অপেক্ষমাণ।

  • জ্বালানিসংকট না কাটা পর্যন্ত নতুন শিল্পে গ্যাস-সংযোগ বন্ধ রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত।

    Visit casino-promo.biz for more information.

চট্টগ্রামে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে কর্ণফুলী স্টিল মিলস নামের কারখানা করেছে টি কে গ্রুপ। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য ১২ মেগাওয়াট সক্ষমতার ক্যাপটিভ জেনারেটরও স্থাপন করেছে তারা। গ্যাস না পাওয়ায় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ দিয়ে উৎপাদন করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ–বিভ্রাটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে পণ্য।

শুধু টি কে গ্রুপ নয়, ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কাছে ১ হাজার ৮৫৭ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আবেদন অপেক্ষমাণ। এর মধ্যেই জ্বালানিসংকট না কাটা পর্যন্ত নতুন শিল্পে গ্যাস-সংযোগ এবং পুরোনো কারখানায় লোড বৃদ্ধি বন্ধ রাখার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় ১৪ জুলাই এক চিঠিতে পেট্রোবাংলাকে বিষয়টি জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তে গ্যাসের অপেক্ষায় থাকা শিল্পমালিকেরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। অনেকে গ্যাস–সংযোগের অভাবে বসে আছেন। কারখানা চালু করতে না পারলেও ব্যাংকের কিস্তি দিতে হচ্ছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান উৎপাদন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিলেও গ্যাসের লোড বৃদ্ধির আশ্বাস না পেয়ে থমকে আছেন।

বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) সূত্র জানায়, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসিসহ ছয়টি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির কাছে শিল্প সংযোগের ১ হাজার ৮৫৭টির বেশি আবেদন জমা আছে। এর মধ্যে ৫৫০টির মতো প্রতিষ্ঠান সব প্রক্রিয়া শেষ করে সংযোগের (প্রতিশ্রুত সংযোগ) অপেক্ষায় রয়েছে। মানে হলো, তারা গ্যাস-সংযোগের জন্য টাকাও জমা দিয়েছে; কিন্তু গ্যাস পাচ্ছে না।

মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তে গ্যাসের অপেক্ষায় থাকা শিল্পমালিকেরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। অনেকে গ্যাস–সংযোগের অভাবে বসে আছেন। কারখানা চালু করতে না পারলেও ব্যাংকের কিস্তি দিতে হচ্ছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান উৎপাদন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিলেও গ্যাসের লোড বৃদ্ধির আশ্বাস না পেয়ে থমকে আছেন।

টি কে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকারের কাছে আমাদের আবেদন, গ্যাস-সংকট দ্রুত নিরসনে ব্যবস্থা নিন। অন্যথায় সব শিল্পকারখানা বিপদে পড়বে।’

বর্তমান বিএনপি সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি ডলারের অর্থনীতি এবং উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে রূপান্তরের ঘোষণা দেয়। আর সরকার গঠনের পর ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল গঠনসহ বেশ কিছু উদ্যোগও নিয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন এফআইসিসিআইয়ের আয়োজিত বিনিয়োগ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশি ও বিদেশি উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ ও ব্যবসা প্রসারের আহ্বানও জানিয়েছেন।

ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরীবিভিন্ন শিল্পকারখানায় ব্যাংকের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ আছে। গ্যাস–সংযোগ না পেয়ে কারখানাগুলো বর্তমানে এলপিজি বা এলএনজি ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ব্যাংকের ঋণের কিস্তি নিয়মিতভাবে পরিশোধ করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানগুলো।

তবে একাধিক শিল্পোদ্যোক্তা প্রথম আলোকে বলেন, গ্যাসের নতুন সংযোগ ও লোড বৃদ্ধি বন্ধ থাকলে গ্যাসভিত্তিক নতুন শিল্পকারখানায় বিনিয়োগ আসবে না। তাতে নতুন কর্মসংস্থানও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হবে না। এমনকি এ সিদ্ধান্তে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ভুল সংকেত দেবে। নতুন বিনিয়োগ আহ্বানের সঙ্গে নতুন শিল্পে গ্যাস না দেওয়ার সিদ্ধান্ত পরস্পরবিরোধী বার্তা দিচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি করেন তাঁরা।

জানতে চাইলে ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহসান জামান চৌধুরী গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ব্যাংকের বড় অঙ্কের বিনিয়োগ আছে। গ্যাস–সংযোগ না পেয়ে কারখানাগুলো বর্তমানে এলপিজি বা এলএনজি ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় তিন গুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। ব্যাংকের ঋণের কিস্তি নিয়মিতভাবে পরিশোধ করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানগুলো।

বিনিয়োগ থমকে আছে

ময়মনসিংহের ভালুকার একটি পোশাক কারখানা অধিগ্রহণ করেছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী স্কয়ার গ্রুপ। সেখানে সোয়েটার ও অন্তর্বাস উৎপাদনের পরিকল্পনা করছে তারা। কারখানাটিতে গ্যাস-সংযোগ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে তা সচল নেই। সংযোগটি সচল করতে আবেদন করেছে স্কয়ার গ্রুপ। এ ছাড়া বিভিন্ন বস্ত্রকলের পাঁচটি গ্যাস-সংযোগের লোড বাড়ানোর আবেদন করেছে শিল্পগ্রুপটি। গ্রুপটি জানায়, চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পেলে আগামী পাঁচ বছরে তাদের বস্ত্র কারখানায় ২০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান হবে। আর গ্যাস না পেলে বিনিয়োগ শ্লথ করে দিতে হবে।

দেশের আরেক শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই) ৭ হাজার ৩২০ কোটি টাকা বিনিয়োগে কুমিল্লা অর্থনৈতিক অঞ্চলে কাচ ও রড তৈরির দুটি কারখানা করেছে। কাচ তৈরির কারখানাটি নির্মাণ শেষ হয়েছে আড়াই বছর আগে; আর রডের কারখানা দেড় বছর আগে। গ্যাস-সংযোগের অভাবে কারখানা দুটি চালু হয়নি। যদিও এই বড় বিনিয়োগের শুরুতে গ্যাস-সংযোগের আশ্বাস পেয়েছিল তারা। উৎপাদন শুরু না হলেও দুই কারখানার ঋণের বিপরীতে মাসে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা সুদ দিচ্ছে এমজিআই।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী গত ২০ এপ্রিল কারখানায় গ্যাস-সংযোগ না পাওয়া নিয়ে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ সচিবকে একটি চিঠি দেন। চিঠিতে তিনি পাঁচটি কারখানার কথা উল্লেখ করেন, যার মধ্যে দুটি এমজিআইয়ের। আশিক চৌধুরী বলেন, গ্যাস-সংযোগ দিতে না পারলে দেশে নতুন কর্মসংস্থান হবে না। ভবিষ্যতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হবেন।

গ্যাস-সংযোগের অভাবে কারখানা দুটি চালু হয়নি। যদিও এই বড় বিনিয়োগের শুরুতে গ্যাস-সংযোগের আশ্বাস পেয়েছিল তারা। উৎপাদন শুরু না হলেও দুই কারখানার ঋণের বিপরীতে মাসে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা সুদ দিচ্ছে এমজিআই।

অন্যদিকে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় ১০৮ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত নিজেদের অর্থনৈতিক অঞ্চলে পাঁচটি শিল্পকারখানা গ্যাসের অভাবে চালু করতে পারছে না সিটি গ্রুপ। সিমেন্ট, চিনি, কাগজ, জাহাজ ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) কারখানায় তাদের প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ পড়ে রয়েছে। গ্রুপের কর্মকর্তারা জানান, ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নিজেরা পাইপলাইন তৈরি করে দেওয়ার পরও সরকার গ্যাস দিতে পারেনি। গ্যাস পেলে কারখানাগুলো ২০২২ সালে চালু হয়ে যেত।

ভোলা সদর উপজেলার ভেদুরিয়া এলাকায় এক হাজার একর জমিতে ছয় হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে শিল্পপার্ক গড়ে তুলতে চায় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। এতে ২৫ হাজারের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। ভোলার গ্যাস কাজে লাগিয়েই এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে গ্রুপটি। ইতিমধ্যে গ্যাসের জন্য আবেদনও করেছে তারা।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার এ পরিস্থিতি তৈরি করে গেছে। অনুমোদন দিয়ে গেছে, গ‍্যাসের ব্যবস্থা তো করে যায়নি। তাই আগে গ‍্যাসের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন একটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের আলোচনা চলছে। গ‍্যাসের সরবরাহ বাড়লেই শিল্পে সংযোগ দেওয়া শুরু হবে।

সিপিডি গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমজ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ভেতরে একটি পক্ষ নতুন কূপ খননের বিরুদ্ধে কাজ করে। তার বাইরে গাড়ি ও সেচে ডিজেলের ব্যবহার কমিয়ে আনতে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করতে হবে।

বিশেষজ্ঞ মতামত

দেশে গ্যাস-সংকট নতুন নয়। এ নিয়ে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রথম আলোকে বলেন, ভ্রান্ত নীতি ও এলএনজি লবির কারণে দেশের জ্বালানি খাত অতিমাত্রায় আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। উচ্চ মূল্যের কারণে আমদানিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে কম খরচে গ্যাস পাওয়ার সুযোগ ছিল।

সমাধান হিসেবে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম আরও বলেন, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া দরকার। কোনো অবস্থাতেই এলএনজি আমদানিনির্ভর কোনো পরিকল্পনা করা যাবে না। ভোলা ও বরিশালের গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে আনা দরকার। বাপেক্স দুই বছরের মধ্যে ৪৮ কূপ খননের যে লক্ষ্য নিয়েছে, সেটি যথাযথভাবে করতে হবে। কারণ, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের ভেতরে একটি পক্ষ নতুন কূপ খননের বিরুদ্ধে কাজ করে। তার বাইরে গাড়ি ও সেচে ডিজেলের ব্যবহার কমিয়ে আনতে বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করতে হবে।

Read full story at source