জুলাইয়ের স্থায়ী সাফল্য নির্ভর করবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মৌলিক রূপান্তরে
· Prothom Alo

জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কেবল একটি কোটা সংস্কার আন্দোলনের পরিণতি ছিল না। এটি ছিল রাষ্ট্র, সমাজ ও রাজনীতির গভীর সংকটের বিরুদ্ধে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এক ঐতিহাসিক প্রতিরোধ। এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসান ঘটায়। আন্দোলনের স্থায়ী সাফল্য ধরে রাখতে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মৌলিক রূপান্তর প্রয়োজন।
আজ সোমবার বিকেলে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (এনএসইউ) ও জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এ কথাগুলো বলেন। এনএসইউ মিলনায়তনে ‘জুলাই অভ্যুত্থান ২০২৪ স্মরণানুষ্ঠান’ শীর্ষক এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভার শুরুতে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। অনুষ্ঠানে একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও জুলাইয়ের থিম সংগীতও পরিবেশন করা হয়।
Visit umafrika.club for more information.
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় শুধু আইন বা সংবিধান সংশোধন করলেই চলবে না। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও মানুষের মানসিকতার পরিবর্তন। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সুরক্ষায় বিভিন্ন সাংবিধানিক ব্যবস্থা থাকলেও ক্ষমতায় গিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো সেগুলো বাতিল করেছে। কাগজে-কলমে আইন থাকলেই তা কার্যকর হয় না; বরং রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের মধ্যে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলা জরুরি।
রুহুল কবির রিজভী আরও বলেন, একটি জাতির প্রকৃত শক্তি শুধু তার ভূখণ্ড বা অর্থনীতির ওপর নির্ভর করে না। এর আসল ভিত্তি হলো দেশের ইতিহাস, স্মৃতি ও মূল্যবোধ। জাতীয় স্মৃতি কোনো অতীত চর্চা নয়; বরং একটি জাতির আত্মপরিচয় ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি। যে জাতি তার সত্যনিষ্ঠ ইতিহাস ধারণ করতে পারে, তারা অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে অর্জনগুলো ধরে রাখতে পারে।
আলোচনা সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এনএসইউর মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি শুধু ভোটাধিকার নয়; বরং স্বাধীনতা ও সমতার নিশ্চিত মেলবন্ধন। কোনো সমাজে মানুষের অধিকার ও সুযোগের সমতা না থাকলে প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না। তাঁর মতে, দেশের সবচেয়ে বড় সংস্কার হওয়া উচিত সামাজিক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে শিক্ষা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে। স্বাধীনতার এত বছর পরেও সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারাকে তিনি অগ্রাধিকারের বড় সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন।
সলিমুল্লাহ খান আরও বলেন, বাংলাদেশে সবচেয়ে কম আলোচিত কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হলো ‘ফ্যাসিবাদ’। কেবল সরকার পরিবর্তন বা কিছু সংস্কারই যথেষ্ট নয়। যে রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামো ফ্যাসিবাদী শাসনকে জন্ম দেয় এবং টিকিয়ে রাখে, তা পুরোপুরি বদলানো প্রয়োজন। অনেক আন্দোলনই কেবল সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কারণে অতীতে ব্যর্থ হয়েছে। স্থায়ী পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্র ও সমাজের কাঠামোগত রূপান্তর। জুলাইয়ের অভ্যুত্থান কি সেই রূপান্তরের পথে এগোবে, নাকি কেবল সাধারণ কিছু সংস্কারেই থমকে যাবে, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
জাতীয় নাগরিক কমিটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এখন নিজেদের রাজনৈতিক ইতিহাস নিজেরাই নির্মাণ করছেন। এটি ভবিষ্যতে দেশের গণতান্ত্রিক ও অধিকারভিত্তিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আন্দোলনে নারীদের নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই লড়াইয়ের অন্যতম চালিকা শক্তি ছিল নারীদের অংশগ্রহণ। তবে তাঁদের এই অবদান এখনো যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়নি।
এনএসইউ বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্য ও সাবেক চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। সরকার ও বিরোধী দল যদি একসঙ্গে কাজ করে, তবে বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থেই একটি সফল ও বৈষম্যহীন দেশ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সহ–উপাচার্য নেছার উদ্দিন আহমেদের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল হান্নান চৌধুরী। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) কামাল আকবর।
এ ছাড়া প্যানেল আলোচনায় আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষকদের পক্ষে স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম ও ইসিই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রিয়াসাত খান তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। শিক্ষার্থীদের পক্ষে আয়াতুল্লাহ বেহেস্টি, কাউসার হাবিব ও এম এস মোস্তাফিজুর রহমান জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করেন।