দুঃখ ভুলতে একটি মজার দিন মাইলস্টোনের শিক্ষার্থীদের
· Prothom Alo

একসময় পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দেখত ১২ বছর বয়সী নূরে জান্নাত ইউসা। এখন বিমান উড়ে গেলেই ভয় পেয়ে দুই হাত দিয়ে কান চেপে ধরে সে। আর পাইলট হওয়ার ইচ্ছা নেই তার।
Visit afnews.co.za for more information.
গত বছরের ২১ জুলাই রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনায় আহত হয়েছিল নূরে জান্নাত; কিন্তু এখনো সে স্বাভাবিক হতে পারেনি। তার হাতের ফোলাভাব পুরোপুরি কমেনি। প্রতি মাসে একবার করে লেজার থেরাপি নিতে হয়। তেমনি বের হতে পারেনি মানসিক আঘাত থেকেও।
ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী নূরে জান্নাত জানায়, সেদিন স্কুল ছুটির পর দোতলা থেকে নিচতলায় নামার সময় হঠাৎ বিকট শব্দ হয়। এরপর আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফিরেছিল হাসপাতালে। দুর্ঘটনার প্রায় এক বছর পরও তার হাতের ফোলাভাব পুরোপুরি কমেনি। লিখতে কষ্ট হয়। পড়াশোনাতেও আগের মতো মন বসে না। বলল, স্কুলে বন্ধুদের সঙ্গে দোলনায় খেলতে তার খুব ভালো লাগত। এখন দোলনায় উঠলেই নিহত বন্ধুদের কথা মনে পড়ে।
নূরে জান্নাতের মতো মাইলস্টোন দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের মানসিক ট্রমা কাটিয়ে উঠতে আজ বৃহস্পতিবার গাজীপুরের পুবাইলে ছুটি রিসোর্টে ‘সবুজের মাঝে অমর তোমরা’ শিরোনামে এক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এর আগে গত বছরের ২৮ অক্টোবর ‘হিলিং টুগেদার উইথ মাইলস্টোনস ব্রেভ হার্টস’ শিরোনামে হয়েছিল ব্যতিক্রমী এ আয়োজন। এই কর্মসূচির আয়োজক রোটারি ক্লাব অব বনানী, ঢাকা ও ছুটি রিসোর্ট।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণি মিলিয়ে মোট ৬৩ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয় এই আয়োজনে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এসেছিলেন তাদের চার শিক্ষক। আয়োজনের শুরুতে শিশুদের শ্বাসপ্রশ্বাসের ব্যায়াম ও মাইন্ডফুল এক্সারসাইজ করান ইনোভেশন ফর ওয়েলবিং ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা মনিরা রহমান।
মাইলস্টোনের দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে ৩৫টি গাছ লাগায় শিক্ষার্থীরা। ছুটি রিসোর্ট, পুবাইল, গাজীপুর। ১৬ জুলাইএরপর ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা দুই দলে ভাগ হয়ে ফুটবল খেলে মেয়েরা। এ খেলায় রেফারি হিসেবে ছিলেন জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার রেহানা পারভীন। তিনি বলেন, ‘এই যে এখন ওরা খেলাধুলা করছে, ওরা কিন্তু বাকি সব ভুলে আছে। এই শিশুদের যদি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত রাখা যায়, তাহলে ধীরে ধীরে তাদের ট্রমা অনেকটাই কেটে যাবে।’ ফুটবল খেলা শেষে নিজেদের ইচ্ছেমতোও খেলাধুলা করে তারা।
মাইলস্টোনের দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্মরণে ৩৫টি গাছ লাগায় শিক্ষার্থীসহ উপস্থিত সবাই। এ ছাড়া শিক্ষার্থীরা গাছ এঁকে তাতে তাদের বন্ধুদের নাম ও তাদের কষ্টের কথা লেখে।
ছুটি রিসোর্ট পুবাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সামসুল ইসলাম মাসুদ বলেন, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দুর্ঘটনার স্মৃতি ও মানসিক আতঙ্ক (ট্রমা) কাটিয়ে উঠতে এবং স্বজনহারা শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে আয়োজনটি করা হয়। ভবিষ্যতে এমন আয়োজন আরও করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন রোটারি ক্লাব অব বনানী ঢাকার প্রেসিডেন্ট মো. শরীফউল্লাহও।
‘সবুজের মাঝে অমর তোমরা’র দ্বিতীয় পর্বের আয়োজন করে রোটারি ক্লাব অব বনানী, ঢাকা ও ছুটি রিসোর্ট। ছুটি রিসোর্ট, পুবাইল, গাজীপুর। ১৬ জুলাইএই আয়োজনের চিন্তা প্রথম করেছিলেন সাংবাদিক ও রোটারিয়ান শাহনাজ শারমীন। গত বছর পেশাগত কাজে টানা ১২ দিন তাঁকে মাইলস্টোনের শিশুদের সংবাদ সংগ্রহ করতে বার্ন ইনস্টিটিউটে যেতে হয়েছিল। এরপর নিজের ট্রমা কাটাতে বিরতি নিয়ে অন্য বিটে সাংবাদিকতা করেন। তখন থেকেই ভয়াবহ অবস্থায় ভেতর দিয়ে যাওয়া শিশুদের নিয়ে কী করা যায়, তা ভাবতে থাকেন শাহনাজ।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, রোটারি ক্লাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং ছুটি রিসোর্টের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।
গত বছরের ২১ জুলাই উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমানবাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। এতে ৩৬ জন নিহত হন। তাঁদের মধ্যে ২৮ জনই শিক্ষার্থী। বিমানের পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মো. তৌকির ইসলামও নিহত হন।