অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বন্যা ৭ জেলায়, মৃত্যু ৪৪ জনের
· Prothom Alo
পানিবন্দী পরিবারের সংখ্যা ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮।
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ।
Visit livefromquarantine.club for more information.
বন্যাক্রান্ত ৭ জেলার প্রশাসকদের দেওয়া হয়েছে ১.৪৫ কোটি টাকা এবং ২,৬৫০ টন চাল।
শিশু দুটি নিজেদের বাড়ির উঠানে ছিল। হঠাৎ আসে পাহাড়ি ঢল। তাতে ভেসে যায় তারা। পরে উদ্ধার করা হয় তাদের মৃতদেহ।
শিশু দুটির নাম মোহাম্মদ আশিক (৭) ও মোহাম্মদ মিরাজ (৩)। দুই মৃত্যুর ঘটনা গত শুক্রবারের। ঘটনাস্থল চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলা। স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা যায়, বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কয়েক দিন ধরে উপজেলার বেশ কিছু এলাকা ডুবে আছে। এর মধ্যেই পাহাড়ি ঢলে শিশু দুটির মৃত্যু হয়েছে।
অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে ক্ষয়ক্ষতি এবং ত্রাণ সরবরাহ নিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ১১ জুলাইয়ের দৈনিক প্রতিবেদন বলছে, গতকাল শনিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত দেশের সাতটি জেলা—খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ বন্যাকবলিত হয়েছে। বন্যাপ্লাবিত হয়েছে এসব জেলার ৫৮টি উপজেলা।
বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৪। আহত হয়েছেন ৩৯ জন। বন্যায় পানিবন্দী পরিবারের সংখ্যা ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ।
দেশে মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ৪ জুলাই থেকে ভারী বর্ষণ শুরু হয়। গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ১ হাজার ১৬৯ মিলিমিটার। গত মঙ্গলবার সর্বোচ্চ ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। চট্টগ্রামের পর সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জেও বন্যা শুরু হয়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দৈনিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে ১ হাজার ১৩১টি। সেসব আশ্রয়কেন্দ্রে ৪৪ হাজার ৪৫৭ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও পাহাড়ধসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৪। আহত হয়েছেন ৩৯ জন। বন্যায় পানিবন্দী পরিবারের সংখ্যা ২ লাখ ৬৭ হাজার ৯১৮। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১০ লাখ ২২ হাজার ৯৬৩ জন মানুষ।
বৃষ্টি কমেছে
এদিকে বিগত দুই দিনের তুলনায় গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি কমে আসায় পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা কিছুটা কমেছে। যদিও নতুন করে ফেনী, সিলেট ও উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে তিস্তার পানি বেড়ে যাওয়ায় সেখানে সাময়িক বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের গতকাল সন্ধ্যা ছয়টার বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশের ছয় জেলার পাঁচটি নদীর সাতটি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রে পানি এখনো বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এগুলো হলো বান্দরবানে সাঙ্গু নদের বান্দরবান ও মাতামুহুরী নদীর লামা পয়েন্ট; চট্টগ্রামে সাঙ্গু নদের দোহাজারী পয়েন্ট; কুশিয়ারা নদীর সুনামগঞ্জের মারকুলি ও সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্ট; মৌলভীবাজারে মনু নদ ও নেত্রকোনায় সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দা পয়েন্ট।
—গওহার নঈম ওয়ারা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞএখন স্থানীয় সরকার নেই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। সংকট ত্রাণ বা টাকার নয়, সমস্যা সমন্বয়ের।বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান গতকাল রাত আটটার দিকে প্রথম আলোকে বলেন, শনিবার মোট পাঁচটি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। নদীগুলো হলো মনু, কুশিয়ারা, সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও সোমেশ্বরী। শুক্রবার চারটি নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে ছিল। গতকাল তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সোমেশ্বরী।
সরদার উদয় রায়হান আরও বলেন, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টায় চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে ফেনী, সিলেট ও উত্তরাঞ্চলে বিশেষ করে তিস্তার পানি বেড়ে যাওয়ায় সেখানে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। যদিও আগামী তিন দিনের মধ্যেই এসব এলাকার পানি কমতে শুরু করবে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর গতকাল সন্ধ্যায় জানায়, গতকাল দেশে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছে ফরিদপুরে—১৪৪ মিলিমিটার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়েছিল চট্টগ্রামের আমবাগান এলাকায়—১০৬ মিলিমিটার। এ ছাড়া রাঙামাটিতে ৯০, বান্দরবানে ৮৮, কক্সবাজারে ৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়।
কেউ স্বজন হারিয়েছেন, কেউ সহায়
বন্যা ও পাহাড়ধসে কোনো কোনো পরিবার স্বজন হারিয়েছে। কোনো কোনো পরিবার হারিয়েছে সহায়সম্বল।
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শেখেরখিল ইউনিয়নের বোচারপাড়ায় গতকাল দুপুরে গিয়ে দেখা যায়, নিজের বাড়িতে ঘরের ভাঙা দেয়াল কোদাল দিয়ে সরাচ্ছেন আবদুল কাদের। পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর স্ত্রী রিনা আক্তার। কথা বলতে বলতে বারবার চোখ মুছছিলেন তিনি।
রিনা আক্তার বললেন, ‘মাটির ঘরটাই ছিল আমাদের সম্বল। বুধবার রাতে হঠাৎ বন্যার ঢল এল। মুহূর্তেই ঘর তলিয়ে গেল। মাটির দেয়াল ভেঙে পড়তে শুরু করল। ছোট বাচ্চাদের নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে বের হয়ে আসি। এখন কোথায় থাকব, কী খাব—কিছুই জানি না।’
পাঁচ কক্ষের ওই মাটির ঘরেই আবদুল কাদের ও তাঁর বড় ভাই নূর কাদেরের পরিবার থাকত। দুই পরিবারে সদস্য ১৫ জন। দুই ভাই-ই দিনমজুর। প্রতিদিন কাজ করলে চুলা জ্বলে, না করলে চলে না সংসার। নতুন করে ঘর তোলার সামর্থ্য তাঁদের নেই। ভাঙা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আবদুল কাদের বলেন, ‘এক রাতেই সব শেষ হয়ে গেল।’
সহায়তা কত
ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৭ জুলাই থেকে মানবিক সহায়তা হিসেবে বিতরণের জন্য দেশের ৬৪ জেলার প্রশাসকদের ৬ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন চাল এবং ৩ কোটি ৪৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বন্যায় আক্রান্ত সাত জেলার প্রশাসকদের দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং ২ হাজার ৬৫০ টন চাল।
কিন্তু অনেকেই বলছেন সহায়তা না পাওয়ার কথা। যেমন চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার পশ্চিম আমিরাবাদ মঙ্গলনগর বণিকপাড়ার সুকুমার আচার্যের (৪২) বাড়িতে কোনো সহায়তা যায়নি।
সুকুমারের স্ত্রী অর্পণা আচার্য প্রথম আলোকে বলেন, ‘খবর পাচ্ছি জনপ্রতিনিধিসহ অনেকে ত্রাণসহায়তা দিচ্ছেন। কিন্তু আমাদের খবর কেউ নেয়নি। ঘরের চুলা নষ্ট হয়ে গেছে। মুদিদোকান থেকে আনা অল্প শুকনা খাবার খেয়ে দিনাতিপাত করছি।’
বন্যার মতো দুর্যোগ যেমন খাবার ও সুপেয় পানির সংকট তৈরি করে, তেমনি সন্তানসম্ভবা মা, শিশুরা, প্রবীণেরা ঝুঁকিতে পড়েন। অসুস্থ মানুষের ওষুধের প্রয়োজন হয়, চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা প্রথম আলোকে বলেন, এখন স্থানীয় সরকার নেই। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) পক্ষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। সংকট ত্রাণ বা টাকার নয়, সমস্যা সমন্বয়ের। সহায়তা-সংকটে থাকা মানুষের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছানোই কঠিন। তিনি বলেন, সম্ভানসম্ভবা নারী ও প্রবীণদের মতো ভালনারেবল (ঝুঁকিতে থাকা) মানুষকে উদ্ধার করা এবং তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া জরুরি। এসব কাজে রেডক্রস, রেড ক্রিসেন্ট, স্কাউট, গার্লস গাইডসহ বিভিন্ন সংগঠনকে কাজে লাগাতে হবে।