আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ মিসরকে বদলে দিয়েছেন যে যমজ দুই ভাই
· Prothom Alo
দায়িত্বটা তাঁকে দেওয়ার সময় একটু দ্বিধা ছিল কারও কারও। তা তিনি যতই কিংবদন্তি ফুটবলার হোন, কোচ হিসেবে তো আর খুব বড় কোনো সাফল্য নেই। তবু হোসেম হাসানকে মিসরের কোচ করা হয়েছিল দেশের প্রতি তাঁর আবেগের কারণে।
Visit likesport.biz for more information.
একবার তো তিনি এমনও বলেছিলেন, মাঠের মধ্যে যদি গুলির পর গুলিও চলতে থাকে, তবু মিসরের হয়ে মাঠে নামতে দ্বিধা করবেন না এতটুকুও।
২০২৪ সালে আফ্রিকান কাপ অব নেশনসে (আফকন) কোনো ম্যাচ না জিতেই বিদায় নেওয়ার পর মিসরীয়দের মধ্যে রব উঠেছিল, জাতীয় দলের দায়িত্বটা এমন কাউকে দিতে হবে, যাঁর দেশের হয়ে খেলার জন্য ফুটবলারদের মধ্যে দরদ তৈরির সামর্থ্য আছে।
এমন কাউকে খুঁজতে গিয়েই ডাক পড়ে হোসেম হাসান আর ইব্রাহিম হাসানের। মিসরের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হোসেম কোচ আর অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার ইব্রাহিম দায়িত্ব নেন টিম ডিরেক্টর হিসেবে। দুই ভাই আরও একবার মিসরকে পথ দেখানোর কাজে নেমে পড়েন একসঙ্গে।
পরের গল্পটা হয়তো এখন অনেকেরই জানা—ফুটবলারদের তাঁরা আগলে রেখেছেন, তাতিয়ে দিয়েছেন দেশের হয়ে খেলতে, সাফল্যও এসেছে। অপারজেয় থেকে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের পথ পাড়ি দিয়ে এসে গত পরশু রাতে মিসর বিশ্বকাপের প্রথম জয়টাও পেয়েছে দুই ভাই ডাগআউটে থাকতেই।
একসঙ্গে দুজন খেলেছেন বিশ্বকাপেওদুই ভাইয়ের বয়স ছিল ৫৯। তাঁদের সাফল্যের গল্পটা অবশ্য পুরোনো। দুজনের বয়সের ব্যবধান ৫ মিনিট। পরের পুরো পথই তাঁরা পাড়ি দিয়েছেন একসঙ্গে। দুই ভাই মিলে ৫৬ বছর পর ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে নিয়ে আসেন মিসরকে। মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের আসর আফকনেও চ্যাম্পিয়ন করেছেন দুবার।
হোসেম অবশ্য আফকনে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ পেয়েছেন তিনবার। সেবার তাঁর ভাই ইব্রাহিম নিষিদ্ধ ছিলেন টুর্নামেন্টে। কারণটাও ছিল অদ্ভুত—মরক্কোর সমর্থকদের দুয়োধ্বনির জবাব দিতে গিয়ে মধ্যাঙ্গুলি দেখিয়ে দিয়েছিলেন তিনি!
দুই ভাইয়ের জন্য এমন অদ্ভুত ঘটনা সেবারই প্রথম বা শেষ নয়। কায়রোর ক্লাব আল আহলিতে বেড়ে উঠে মূল দলে খেলেছেন একসঙ্গে। মাঝখানে ইউরোপ ঘুরে দুজন আবার ফিরে গেছেন আল আহলিতে। ৩০ পেরিয়ে যাওয়ার পর স্ট্রাইকার হোসেমকে রাখতে চাইলেও রাইট ব্যাক ইব্রাহিমের সঙ্গে নতুন চুক্তি করতে রাজি ছিল না আল আহলি। কিন্তু ভাইয়ের জন্য হোসেমও সিদ্ধান্ত নেন ক্লাবটা ছেড়ে দেবেন তিনিও।
মিসরের অনুশীলনেও নজর রাখছেন তারাশুধু ক্লাব ছেড়েছেন বললে ঘটনাটা আসলে হালকাই মনে হয়। দুই ভাই একসঙ্গে গিয়ে যোগ দেন আল আহলির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব জামালেকে। আহলির সঙ্গে তাদের ম্যাচের উত্তেজনা তখন এতটাই বেশি যে বেশির ভাগ সময়ই ম্যাচগুলো দুই দলের কারও মাঠেই করা যেত না, খুঁজতে হতো নিরপেক্ষ ভেন্যু।
হোসেম ও ইব্রাহিমের জামালেকে যাওয়ায় সেই উত্তাপে বারুদ বেড়েছিল বহুগুণ। ঘটনাটা এতই বড় ছিল যে কারও কারও কাছে তা ছিল ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ’ শুরু হয়ে যাওয়ার মতো। জামালেককে একের পর এক শিরোপা জিতিয়ে আহলি সমর্থকদের বিষাদ কেবল বাড়িয়েছেন দুজন।
এসব বেদনা–বিষাদের গল্প ছাপিয়ে মিসরের ফুটবল লোকগাথায় ইব্রাহিম আর হোসেন অবশ্য ঢুকে গেছেন অনেক আগেই। হোসেম তো তাঁদের ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবলারও। ভুল ভাববেন না, সালাহকে মাথায় না রেখে কথাটা বলা নয়।
ইউরোপের ফুটবলে সালাহর সাফল্য আছে সত্যি। লিভারপুলের হয়ে প্রিমিয়ার লিগ জিতেছেন, চ্যাম্পিয়নস লিগও। খ্যাতিও কুড়িয়েছেন অনেক, হয়তো মিসরের প্রথম বৈশ্বিক তারকাও বলা যায় তাঁকে। কিন্তু দেশের হয়ে সালাহর সাফল্য বলতে এখনো বিশ্বকাপ বাছাইপর্ব পার করে দেওয়া—বয়স ৩৪ হয়ে গেলেও এখনো জেতা হয়নি আফকন।
সালাহ তাই অ্যানফিল্ডে জাদুকরী রূপ তৈরি করতে পারেন সত্যি, কিন্তু মিসরীয় কেউ অটোগ্রাফের জন্য তাঁর চেয়েও বেশি খুঁজে বেড়ান হোসেম–হাসনাকেই। যাঁরা একসঙ্গে মিসরকে শিরোপা জিতিয়েছেন, মাঠের বাইরে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের গল্প লিখেছেন। সাফল্যের জন্য তাঁদের ওপর মিসরীয়রা ভরসা করেছে আরও একবার, এবার তাঁরা তাঁদের প্রতিদান দিচ্ছেন ডাগআউটে দাঁড়িয়েও।
‘অশুভ দৃষ্টি’ এড়াতে কী করে আর্জেন্টিনা দল