মেট্রোরেলে বসে অনেকেই যে গেম খেলছেন

· Prothom Alo

রাজধানী ঢাকার মেট্রোরেলে চড়ার সময় প্রায় সবার হাতেই মুঠোফোন দেখা যায়। কেউ গান শুনছেন, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দেখছেন, আবার কেউ গেম খেলছেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে মেট্রোরেলের আশপাশে উঁকি দিলে অনেককেই ‘অ্যারোজ’ নামের একটি গেম খেলতে দেখা যায়। চারপাশের কোলাহল এড়িয়ে, সিটে বসে কিংবা হাতল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের স্মার্টফোনের পর্দায় একটু উঁকি দিলেই চোখে পড়বে এ গেম খেলার দৃশ্য। মুঠোফোনের পর্দাজুড়ে অসংখ্য ছোট তির বা অ্যারো দেখা যায়। কেউ খুব মনোযোগ দিয়ে স্ক্রিনে ট্যাপ করছেন আর একেকটি তির গ্রিড থেকে মুক্ত হয়ে ছুটে যাচ্ছে। কোনো তাড়া নেই, কোনো টাইমারের টিকটিক শব্দ নেই, অথচ চারপাশের শত শত মানুষের মনোযোগ কেড়ে নিয়েছে একটি মিনিমালিস্ট মোবাইল গেম। গেমটির নাম ‘অ্যারোজ: পাজল এস্কেপ’।

অ্যারোজ: পাজল এস্কেপ

জার্মানির বিখ্যাত মোবাইল গেম স্টুডিও লেসমোর জিএমবিএইচ ২০১৫ সালে এ গেম প্রকাশ করে। গেমটি গত কয়েক মাসে বিশ্বজুড়ে এক অভাবনীয় উন্মাদনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে এসে এর নামানোর চিত্র আকাশচুম্বী। গুগল প্লে স্টোর ও অ্যাপল অ্যাপ স্টোরে ইতিমধ্যে এটি পাঁচ কোটির বেশি ডাউনলোডের মাইলফলক স্পর্শ করেছে। ১৫ লাখের বেশি রিভিউসহ এর রেটিং এখন ৪.৪ থেকে ৪.৫ তারকার ঘরে। কিন্তু কেন আচমকা একটি সাধারণ পাজল গেম এভাবে বিশ্বজুড়ে মেট্রো, বাস বা ক্যাফের অলস সময়ের সঙ্গী হয়ে উঠল?

Visit newssport.cv for more information.

সহজ কিন্তু গভীর মনস্তাত্ত্বিক খেলা

নানা প্রয়োজনে চলার পথে দিনে ২-৩ বার মেট্রোরেলে চড়েন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কে এম ইমরুল হাসান। তিনি বলেন, ‘ট্রেনে আসতে কিছুটা তো সময় লাগে। এ সময় আমি গেম খেলি। অন্য সব অ্যাকশন গেমের চেয়ে এখানে মাথা খাটাতে হয় বেশি। অ্যারোজ: পাজল এস্কেপ একবার শুরু করলে মাথায় আটকে থাকে। তিন ক্যাটাগরির পাজল সমাধান করতে হয় গেমটিতে। কখনো ৩০ সেকেন্ড লাগে আবার কখনো ৩-৪ মিনিট লেগে যায়। অ্যারোজ: পাজল এস্কেপ গেমটির মূল খেলার নিয়ম অত্যন্ত সহজ, যা একে অন্য যেকোনো জটিল গেমের চেয়ে আলাদা করেছে। গেমটির মূল লক্ষ্য হলো, কোনো ধরনের সংঘর্ষ বা কলিশন ছাড়া স্ক্রিনের প্রতিটি তিরকে গ্রিড থেকে বের করে দেওয়া।’

পর্দার বোর্ডটি মূলত একটি গোলকধাঁধার মতো, যেখানে প্রতিটি তির বা অ্যারো নির্দিষ্ট কোনো একটি দিকে মুখ করে থাকে। আপনি যখন একটি তিরের ওপর ট্যাপ করবেন, সেটি তার নির্দেশিত অভিমুখে সোজা ছুটে গিয়ে স্ক্রিনের বাইরে চলে যাবে। চ্যালেঞ্জটি এখানেই! যদি আপনার ট্যাপ করা তিরটি ছুটে যাওয়ার সময় অন্য কোনো তিরের গায়ে ধাক্কা খায়, তাহলে আপনি একটি লাইফ বা হার্ট হারাবেন। ফলে পুরো পাজলটি নিখুঁতভাবে সমাধান করতে হলে আপনাকে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ক্রমানুসারে একটির পর একটি তিরকে মুক্ত করতে হবে। কোনো টাইমার বা সময়ের বাধ্যবাধকতা না থাকায় খেলোয়াড়েরা নিজেদের গতিতে, কোনো মানসিক চাপ ছাড়াই এটি খেলতে পারেন। গেমটিতে রয়েছে হাজার হাজার হাতে তৈরি লেভেল, যা শুরুর দিকে সহজ মনে হলেও ধীরে ধীরে জটিল ও বুদ্ধির পরীক্ষায় রূপ নেয়। কোনো লেভেলে আটকে গেলে সহযোগিতার জন্য রয়েছে একটি চমৎকার হিন্ট সিস্টেম।

কেন গেমটি এত জনপ্রিয়

অফিস থেকে বাড়িতে ফেরার সময় গেমটি খেলেন উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি খেলতে খেলতে জানান, মাথা খাটানোর খেলা এটি। দিনের শেষে খেলতে খারাপ লাগে না। মেট্রোতে বসে যেতে যেতে কয়েকটা লেভেল পার হয়ে যাই। মোবাইল গেমিং ইন্ডাস্ট্রির প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ ও গেম ডেভেলপমেন্ট কনসালট্যান্ট টম স্টর গেমটির অবিশ্বাস্য উত্থান নিয়ে একটি চমৎকার বিশ্লেষণ দিয়েছেন লিংকডইনে। তাঁর মতে, মে মাসে অ্যারোজ: পাজল এস্কেপ প্রায় ২ কোটি ৮৮ লাখবার ডাউনলোড হয়েছে। একই সময়ে এর নিকটবর্তী প্রতিযোগী গেম অ্যামেজ গো ডাউনলোড হয়েছে ২ কোটি ৩৯ লাখবার।

দুটি ভিন্ন স্টুডিওর তৈরি করা প্রায় একই ধরনের এই গেম দুটি প্রমাণ করে, নতুন কোনো গেমিং মেকানিকস বাজারে এলে ব্যবহারকারীরা তা কত দ্রুত লুফে নেন। টম স্টর এ গেমের মেকানিকসকে সিমপ্লিফায়েড পার্কিং-জ্যাম পাজল বা সহজ পার্কিং জ্যাম ধাঁধার সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, এ গেমের বিভিন্ন লেভেল মৃদু চ্যালেঞ্জিং এবং খেলোয়াড়েরা তাঁদের নিজস্ব গতিতে খেলতে পারেন, যা মূলত দীর্ঘ মেয়াদে ব্যবহারকারীদের গেমটির সঙ্গে ধরে রাখতে সাহায্য করছে। গেমটির জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ হলো এর বিজ্ঞাপন কৌশল। সাধারণত অন্যান্য হাইপার-ক্যাজুয়াল গেমের বিজ্ঞাপনে ভুয়া বা ভিন্ন গেমপ্লে দেখানো হলেও, অ্যারোজের ক্ষেত্রে আসল গেমপ্লেকেই বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হয়েছে।

আর নতুন ও আরামের অভিজ্ঞতার খোঁজে থাকা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুঠোফোন ব্যবহারকারী এতেই আকৃষ্ট হয়েছেন। মে মাসে এ ঘরানার অন্যান্য ক্লোন গেম বাজারে আসার পরও অ্যারোজ: পাজল এস্কেপের ডাউনলোড প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৮ শতাংশ! অ্যান্ড্রয়েড ৭.০ বা তার ওপরের যেকোনো সংস্করণে এবং মাত্র ১৭১ মেগাবাইটের হালকা গেমটি যেকোনো সাধারণ স্মার্টফোনেও অনায়াস চলে। প্রতিদিনের কর্মব্যস্ত জীবন, ট্রাফিকের ক্লান্তি কিংবা মেট্রোরেলের যান্ত্রিক ভ্রমণে অ্যারোজ: পাজল এস্কেপ মানুষের মস্তিষ্ককে কোনো বাড়তি চাপ না দিয়ে একধরনের শান্ত ও কৌশলগত আনন্দ দিচ্ছে।

ভিড়ের ভেতর দাঁড়িয়ে এক হাত দিয়ে কোনোরকমে মেট্রোর হ্যান্ডেল ধরে, অন্য হাতের এক আঙুলের ট্যাপে গ্রিড থেকে তিরগুলো মুক্ত করার যে সরল তৃপ্তি, তাতেই বুঁদ হয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন প্রজন্মের মানুষ। প্রযুক্তি ও সরলতার এ মেলবন্ধনই অ্যারোজকে করে তুলেছে বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা মেট্রোরেল গেম।

গেমটি নামানো যাবে এই ওয়েবসাইট থেকে।

সূত্র: লিংকডইন

Read full story at source