মুসলিমদের উপেক্ষা করে অ্যান্ডি বার্নহাম কি যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন

· Prothom Alo

ব্রিটেনে মুসলিম ভোটারদের মধ্যে লেবার পার্টির প্রতি সমর্থন কেন দ্রুত কমছে এবং গাজা যুদ্ধের পর দেশটির মুসলমানদের মধ্যে কী ধরনের অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে এই মতামতধর্মী নিবন্ধটি লিখেছেন ব্রিটিশ লেখক ও গবেষক ইসমাইল প্যাটেল। তিনি ‘দ্য মুসলিম প্রবলেম: ফ্রম দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার টু ইসলামোফোবিয়া’ বইয়ের লেখক, লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক বেসরকারি সংগঠন ফ্রেন্ডস অব আল-আকসার চেয়ারম্যান। নিবন্ধটি গতকাল সোমবার মিডল ইস্ট আইতে প্রকাশ হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন লেবার পার্টি কয়েক দশক ধরে মনে করত, তারাই মুসলিমদের আস্থার একমাত্র ভরসাস্থল। কিন্তু ইতিমধ্যেই তারা সেই আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। এমন অবস্থায় কিয়ার স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হলে দলটির নেতৃত্ব পাবেন অ্যান্ডি বার্নহাম।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

অ্যান্ডি বার্নহামের বোঝা উচিত, মসজিদে গিয়ে ছবি তুলে, ইফতার বা ঈদের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে কিংবা কিছু গতানুগতিক আশ্বাস দিয়ে মুসলিমদের সেই আস্থা ফিরিয়ে আনা যাবে না। যে আস্থা নষ্ট হয়েছে কাজের মাধ্যমে, তা শুধু কাজের মাধ্যমেই ফিরিয়ে আনা সম্ভব।

আস্থা হারানোর এই বিষয় একেবারেই কথার কথা নয়। এটি হাতেনাতে প্রমাণিত। ২০১৯ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টি মুসলিমদের ৮০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালে এটি কমে ৬০ শতাংশের কাছাকাছি এসে থামে। বিশেষ করে যেসব আসনে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা ৩০ শতাংশের বেশি, এমন ২১টি নির্বাচনী এলাকায় দলটির ভোট প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যায়।

২০২৪ সালের নির্বাচনে লেবার পার্টির তৎকালীন পাঁচজন এমপি গাজার সমর্থক স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছে পরাজিত হন। আরও কয়েকজন লেবার দলীয় পার্লামেন্ট সদস্য (এমপি) অল্প কয়েক শ ভোটের ব্যবধানে টিকে যান।

মুসলিমদের এই প্রতিবাদ সাময়িক কোনো বিষয় ছিল না, যা সহজেই মুছে যাবে। গত এপ্রিলের জরিপ অনুযায়ী, লেবার পার্টির প্রতি মুসলিমদের সমর্থন এখন মাত্র ৩৩ শতাংশ। লেবার পার্টিকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে তিনজন মুসলিম ভোটার স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থন দিতে রাজি। লেবার পার্টি মুসলিমদের ভোটারদের কাছে টানতে পারছে না। উল্টো দলটির সঙ্গে প্রতিনিয়ত তাদের দূরত্ব বাড়ছে।

অ্যান্ড বার্নহ্যামের উচিত নিজেকে সৎভাবে প্রশ্ন করা—কেন এমন হচ্ছে?

গাজার যুদ্ধকে কেন্দ্র করেই মূলত এই দূরত্বের শুরু। কিয়ার স্টারমার একসময় বলেছিলেন, অবরুদ্ধ গাজার বেসামরিক জনগোষ্ঠীর পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার অধিকার ইসরায়েলের রয়েছে। যুক্তরাজ্যের অনেক মুসলিম এই বক্তব্যকে ফিলিস্তিনিদের সম্মিলিতভাবে শাস্তি দেওয়ার প্রতি সমর্থন হিসেবে দেখেছেন।

এরপর আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) জানান, গাজায় ফিলিস্তিনিরা গণহত্যা থেকে সুরক্ষা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি বিশ্বাসযোগ্য। এরপরও যুক্তরাজ্যের সরকার এই ইস্যুতে তাদের আগের অবস্থানে অটুট ছিল।

লেবার সরকার গাজায় গণহত্যার সময় ইসরায়েলি সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া যুক্তরাজ্যের প্রায় দুই হাজার নাগরিকের বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোনো তদন্ত করতে রাজি হয়নি। অথচ দেশের ভেতরে ফিলিস্তিনের পক্ষে শান্তিপূর্ণ সংহতি প্রকাশ করাকেও তারা অপরাধ হিসেবে গণ্য করছে।

ফিলিস্তিনের সমর্থকদের প্রতি এই দমন-পীড়ন এখন এক বড় কেলেঙ্কারিতে রূপ নিয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ফিলিস্তিনপন্থী সংগঠন ‘প্যালেস্টাইন অ্যাকশন’ নিষিদ্ধ করার পর থেকে এর বিরোধিতা করার কারণে ২ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাঁদের গড় বয়স ৫৯ বছর।

কেবল একটি প্ল্যাকার্ড বা পিচবোর্ড হাতে ধরার কারণে অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ, ধর্মযাজক ও সাধারণ মেহনতি মানুষকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়েছে। অন্যদিকে, যাঁরা ইসরায়েলের গণহত্যাকে সমর্থন করছেন, তাঁরা অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

যে দেশ নিজের মূল্যবোধ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী, তারা এমনটা করে না। যে সরকারের কাছে কোনো যুক্তি অবশিষ্ট থাকে না, কেবল তারাই এমন পথ বেছে নেয়।

তবে সবচেয়ে গভীর ক্ষতটি তৈরি হয়েছে নিজেদের ঘরের কাছেই—যা হয়তো অ্যান্ডি বার্নহাম নিজেও আশা করেননি। যুক্তরাজ্যের মুসলিমরা এখন আর এই দেশে নিজেদের নিরাপদ মনে করে না। তারা এখন আর বিশ্বাস করে না, লেবার সরকার তাদের পরোয়া করে।

সরকারের নিজস্ব পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে ধর্মীয় কারণে যত অপরাধ ঘটেছে, তার ৪৫ শতাংশই ছিল মুসলিমদের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিষাক্ত সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশের কারণে যুক্তরাজ্যের প্রতি ছয়জন নাগরিকের মধ্যে একজন এখন মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে যুক্তরাজ্যের সংস্কৃতির জন্য হুমকি মনে করেন।

মুসলিমদের কাছে এগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়, বাস্তব অভিজ্ঞতা। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় পূর্ব সাসেক্সে একদল মুখোশধারী একটি মসজিদে আগুন ধরিয়ে দেয়। ওয়ালসালে এক ব্যক্তি এক শিখ নারীর ঘরে ঢুকে তাঁকে মুসলিম বেশ্যা বলে গালি দেন। ওই নারী ওই দুর্বৃত্তের হাতে ধর্ষণের শিকার হন। এডিনবরায় এক হামলাকারী বেশ কয়েকজন মুসলিম পুরুষকে ছুরিকাঘাত করে।

কিন্তু যখন মুসলিমদের জীবন্ত পুড়িয়ে মারা, ধর্ষণ করা ও ছুরিকাঘাতে আহত করা হচ্ছে—তখন সরকারের প্রতিক্রিয়া কেবল নিন্দা ও উদ্বেগ প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে। কোনো জরুরি কোবরা বৈঠক ডাকা হচ্ছে না, কোনো তাৎক্ষণিক পরিদর্শন নেই, রাষ্ট্রের কোনো দৃশ্যমান তৎপরতাও নেই। দেশ যে তার মুসলিম নাগরিকদের পাশে থেকে এই আঘাত সমানভাবে অনুভব করছে—এমন কোনো স্পষ্ট বার্তাই দেওয়া হচ্ছে না।

এর মাধ্যমে যে বার্তাটি পৌঁছাচ্ছে, তা খুবই ভয়াবহ। তা হলো মুসলিমদের জীবন বাঁচানোর কথা মুখে মুখে বলা হলেও তাদের প্রাণহানিকে জাতীয় ক্ষতি হিসেবে শোক প্রকাশ করা হচ্ছে।

অ্যান্ডি বার্নহাম উত্তরাধিকার সূত্রে এই সংকটগুলোর মুখেই পড়তে যাচ্ছেন। তবে এর সমাধানও আছে। এবার আসা যাক সেই সমাধানে।

বার্নহাম মুখে নিজেকে আলাদা দাবি করলেই চলবে না। তাঁকে কাজেও তা প্রমাণ করতে হবে। আর তার প্রথম প্রমাণ হবে—তিনি নিজের পাশে কাদের জায়গা দিচ্ছেন।

শোনা যাচ্ছে, বার্নহাম তাঁর চিফ অব স্টাফ হিসেবে লেবার ফ্রেন্ডস অব ইসরায়েলের একজন সাবেক সভাপতিকে বেছে নিয়েছেন। এই খবর যদি সত্যি হয়, তবে বার্নহাম মুখ খোলার আগেই মুসলিমরা তাঁর মনোভাব বুঝে যাবে।

যে নেতা সত্যিই পরিবর্তন চান, তাঁকে এই ভুল সংশোধন করতে হবে। তাঁকে নিশ্চিত করতে হবে, যেন তাঁর উপদেষ্টামণ্ডলীর মধ্যে প্রগতিশীল বামপন্থী এবং ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়ানো মানুষেরাও থাকেন। কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের নিয়োগ হলো সরকারের নীতিরই একটি দৃশ্যমান রূপ। সরকার কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই জনগণ দেখে নেয়, কাদের দলে রাখা হচ্ছে আর কাদের বাদ দেওয়া হচ্ছে। আর তা দেখেই তারা সিদ্ধান্ত নেয়।

জনবল নিয়োগের বাইরে, সমাধানের পথটি কিন্তু খুব একটা জটিল নয়। প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে এবং ভিন্নমতকে সন্ত্রাসবাদ হিসেবে গণ্য করা বন্ধ করতে হবে। এটা স্বীকার করতে হবে, ফিলিস্তিনিদের জীবন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা একটি সাধারণ গণতান্ত্রিক অধিকার, যা মুসলিম ও অমুসলিম মিলিয়ে কোটি কোটি মানুষ সমর্থন করে। এটি কোনো নিরাপত্তা হুমকি নয়।

আন্তর্জাতিক বিচার আদালত যে যুদ্ধকে জাতিগত নিধন বলছে, সেই যুদ্ধে অংশ নেওয়া যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে হবে। এ ছাড়া একটি মসজিদে হামলা হলে সেটিকে অন্য যেকোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ে হামলার মতোই সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। কারণ, বিপদের দিনে যদি সমান গুরুত্ব না পাওয়া যায়, তবে সমান নাগরিক অধিকারের কোনো অর্থ থাকে না।

সবচেয়ে বড় কথা, বার্নহামকে কোনো পূর্বশর্ত ছাড়াই মুসলিমদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। মুসলিমদের নাম ভাঙিয়ে কথা বলার জন্য কৃত্রিম বা অনুগত কোনো বিকল্প সংগঠন তৈরি না করে, মুসলিম সম্প্রদায় আসলেই যে সংগঠনগুলোকে বিশ্বাস করে, তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে হবে। আলোচনা যখন অস্বস্তিকর হবে, তখনো তাকে ধৈর্য ধরে তা শুনতে হবে—আর এই আলোচনা আসলেই অস্বস্তিকর হবে।

ভোটের অঙ্কটা কিন্তু খুবই নির্মম। আগামী নির্বাচনে লেবার পার্টির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসে প্রায় ৩৯ লাখ মুসলিম বাস করে। নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় তাদের সংখ্যা এত বেশি যে তা অনেক আসনের নির্বাচনী ফলাফল বদলে দিতে পারে। আর মুসলিমরা এখন আর লেবার পার্টির পকেটের ভোটার নন। গ্রিন পার্টি এগিয়ে যাচ্ছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এখন পার্লামেন্টে বসে আছেন। ইউর পার্টিও হাজার হাজার মানুষকে নিজেদের দলে ভেড়াচ্ছে।

লেবার পার্টির এই ধারণা আর খাটবে না যে ক্ষুব্ধ মুসলিমরা শেষ পর্যন্ত নিজেদের পুরোনো দল লেবার পার্টিতেই ফিরে আসবে। কারণ, এখন তাদের মাথা গোঁজার মতো আরও অনেক বিকল্প দল তৈরি হয়েছে।

বার্নহাম হয়তো তাঁর দলকে আবার ক্ষমতায় নিয়ে যেতে পারেন। তবে মুসলিম ভোটারদের কাছে আর একটিবারের জন্যও অন্ধ বিশ্বাস প্রত্যাশা করে তিনি তা করতে পারবেন না। সেই যুগ এখন শেষ। তাঁরা অনেক প্রতিশ্রুতি শুনেছেন, বিবৃতি পড়েছেন এবং অনেক আলোচনায় অংশ নিয়েছেন। এখন তারা লেবার পার্টিকে কেবল একটি মাপকাঠিতেই বিচার করবেন, দলটির কাজ শেষ পর্যন্ত তাদের কথার সঙ্গে মেলে কি না।

Read full story at source