মিসরে ইবনে খালদুন: এক বহুমাত্রিক জীবনের শেষ অধ্যায়
· Prothom Alo

মুসলিম ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ সমাজবিজ্ঞানী ওলিউদ্দিন আবু জাইদ আবদুর রহমান ইবনে খালদুন আল-হাদরামি (মৃ. ১৪০৬ খ্রি.) মিসরীয়দের নিয়ে একটা চমৎকার পর্যবেক্ষণ লিখে গেছেন যে, তাদের মেজাজে যেন সব সময় আনন্দ আর ভবিষ্যৎ নিয়ে এক অদ্ভুত নিশ্চিন্ততা কাজ করে।
Visit freshyourfeel.org for more information.
মিসরকেই তিনি তাঁর বিখ্যাত আল–মুকাদ্দিমা গ্রন্থে সর্বোচ্চ প্রশংসা করে লিখেছেন, এটা বিশ্বের উদ্যান, মানবজাতির মিলনমেলা। এই পর্যবেক্ষণ ছিল মানবসভ্যতার ওঠাপড়া নিয়ে তার গভীর সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির একটা অংশ।
উত্তর আফ্রিকা ও আন্দালুসের রাজদরবারে দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েনে বিপর্যস্ত হয়ে ৭৮৪ হিজরিতে (১৩৮২ খ্রি.) ইবনে খালদুন মিসরে আশ্রয় নেন। জীবনের শেষ দুই দশক তিনি কাটান কায়রো শহরে, আর এই সময়ই তাঁর চিন্তাভাবনাকে এক বৈশ্বিক রূপ দেয়।
কায়রোয় পৌঁছামাত্র ইবনে খালদুনের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। মামলুক সুলতান জাহির বারকুক তাঁকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেন, আল-আজহারে বিশেষ শিক্ষাদানের আসন দেন।
কায়রোয় নতুন জীবন
কায়রোয় পৌঁছামাত্র ইবনে খালদুনের পরিচিতি ছড়িয়ে পড়ে। মামলুক সুলতান জাহির বারকুক তাঁকে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেন, আল-আজহারে বিশেষ শিক্ষাদানের আসন দেন এবং পরে মিসরের মালেকি ফিকহের প্রধান মাদ্রাসা ‘আল-মাদরাসাতুল ক্বমহিয়্যা’র প্রধান অধ্যাপক নিযুক্ত করেন। (আল-মাকরিজি, আস-সুলুক লি-মা’রিফাতি দুওয়ালিল মুলুক, বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যা, ১৯৯৭)
পরে তিনি ‘খানকাহ বাইবার্স’-এর মতো মিসরের বড় আধ্যাত্মিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বও পান।
মক্কার অনুর্বর উপত্যকায় বসতি ও ভাষার প্রশ্নকিন্তু সাফল্যের পাশাপাশি সংঘাতও তাঁর সঙ্গী হয়। মালেকি মাজহাবের প্রধান বিচারপতি হয়ে তিনি আদালতে ছড়িয়ে থাকা দুর্নীতি ও প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়ায় চলা জালিয়াতি দেখে কঠোর অভিযান শুরু করেন। (ইবনে খালদুন, আত-তা’রিফ বিইবনি খালদুন ওয়া রিহলাতুহু গারবান ওয়া শারকান, কায়রো, ১৯৫১)
এই আপসহীনতার কারণে স্থানীয় আমলা-আলেমদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তীব্র হয়ে ওঠে এবং সাত বছরে ছয়বার তাঁকে প্রধান বিচারপতির পদ থেকে বরখাস্ত ও পুনর্বহাল করা হয়।
অভ্যুত্থানকে বৈধতা দিতে আমিররা কায়রোর চার মাজহাবের শীর্ষ আলেমদের একটি ফতোয়ায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন, ইবনে খালদুনও সেই তালিকায় ছিলেন।
রাজনৈতিক ঝুঁকি
৭৯১ হিজরিতে (১৩৮৯ খ্রি.) মামলুক আমির ইয়ালবুগা আল-নাসেরি সুলতান বারকুকের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটান। এই অভ্যুত্থানকে বৈধতা দিতে আমিররা কায়রোর চার মাজহাবের শীর্ষ আলেমদের একটি ফতোয়ায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেন, ইবনে খালদুনও সেই তালিকায় ছিলেন। (জাইনুদ্দিন আবদুল বাসিত ইবনে শাহিন আল-মালাতি, নাইলুল আমাল ফি জাইলিদ দুওয়াল, কায়রো, ২০০২)
কিন্তু আট মাসের মধ্যেই বারকুক ক্ষমতা ফিরে পান। ইবনে খালদুন তখন একটা ক্ষমা-প্রার্থনামূলক কাসিদা রচনা করে বোঝান যে তলোয়ারের মুখে জিম্মি হয়েই তাঁকে স্বাক্ষর করতে হয়েছিল, আর বারকুক তাঁকে ক্ষমা করে আগের পদে ফিরিয়ে দেন।
বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা
ইবনে খালদুনকে নিয়ে প্রচলিত আছে যে, তিনি উসমানীয় সাম্রাজ্যের হাতে মিসরের পতনের ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তাঁর ছাত্র ইবনে হাজার আল-আসকালানি লিখেছেন, ইবনে খালদুনকে তিনি বহুবার বলতে শুনেছেন, ‘মিসরের রাজত্বের জন্য একমাত্র আশঙ্কার কারণ ইবনে উসমান।’ (আসকালানি, রাফউল ইস্র আন কুদাতি মিসর, কায়রো: আল-হাইয়াতুল মিসরিয়্যা, ১৯৯৮)
ইমাম শাফেয়ি (রহ.): আলেম কবি, তত্ত্বজ্ঞানী ইমাম ও উসুল শাস্ত্রের পথিকৃৎএই উদ্ধৃতি সত্য, কিন্তু এর ব্যাখ্যায় একটা ভুল বোঝাবুঝি আছে বলে মনে করা হয়। ইতিহাসবিদদের মতে ‘ইবনে উসমান’ এখানে তাঁর সমকালীন উসমানীয় সুলতান প্রথম বায়েজিদকে বোঝানো হয়েছে, যিনি তখন প্রকৃতপক্ষেই অঞ্চলের জন্য হুমকি ছিলেন (এবং ১৪০২ সালে আঙ্কারার যুদ্ধে তিমুরের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন)।
তবে ঘটনাক্রমে ১১১ বছর পর ১৫১৭ সালে ভিন্ন এক উসমানীয় সুলতান সেলিম প্রথম সত্যিই মামলুক মিসর জয় করেছিলেন।
ইবনে খালদুনের সমাজবিজ্ঞানের প্রশংসা করলেও তাহা হোসাইন তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রের কড়া সমালোচনা করেন।
উত্তরসূরি ও বিতর্ক
ইবনে খালদুনের চিন্তাধারা মিসরের ইতিহাসচর্চায় গভীর প্রভাব রাখে। ঐতিহাসিক মাকরিজি তাঁর আল–মুকাদ্দিমা সম্পর্কে লিখেছিলেন, এর কোনো বিকল্প পৃথিবীতে তৈরি হয়নি। ইবনে তাগরিবার্দি ও ইমাম সুয়ুতিও তার ঐতিহাসিক পদ্ধতি অনুসরণ করেছিলেন বলে জানা যায়।
তবে আধুনিক মিসরে ইবনে খালদুনকে নিয়ে বিতর্কও কম নয়। ১৯১৭ সালে তাহা হোসাইন প্যারিসের সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইবনে খালদুনের সমাজদর্শনের ওপর তাঁর ফরাসি ডক্টরেট থিসিস সম্পন্ন করেন, যেখানে তিনি ইবনে খালদুনের সমাজবিজ্ঞানের প্রশংসা করলেও তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রের কড়া সমালোচনা করেন।
আরও পরে বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে অধ্যাপক মাহমুদ ইসমাইল তাঁর একটা গ্রন্থে দাবি করেন, ইবনে খালদুনের সমাজবিজ্ঞান মৌলিক নয়, বরং হিজরি চতুর্থ শতকের ‘ইখওয়ানুস সাফা’ দলের রচনা থেকে নেওয়া।
যদিও এই ধরনের দাবি মূলধারার ইতিহাসবিদদের কাছে ব্যাপকভাবে গৃহীত নয় এবং একটা বিতর্কিত, সংখ্যালঘু মতামত হিসেবেই বিবেচিত হয়।
হারিয়ে যাওয়া মাজহাবগুলোর কথা