ফুটবল–উৎসবের রং চট্টগ্রামজুড়ে
· Prothom Alo

চেরাগী পাহাড় মোড় পেরিয়ে শরিফ কলোনি। সরু গলিতে ঢুকতেই মনে হলো, শহরটা যেন দুই রঙে ভাগ হয়ে গেছে। দেয়ালে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। পাশে ব্রাজিলের তারকা নেইমার। একটু সামনে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। মাথার ওপর বাতাসে দুলছে আকাশি-সাদা আর হলুদ-সবুজ পতাকা। বৈদ্যুতিক খুঁটি, গাছের ডাল, বাড়ির বারান্দা—যেদিকেই চোখ যায়, ফুটবল যেন সেখানেই।
Visit newsbetsport.bond for more information.
গতকাল শনিবার সকালে হলুদ বল পায়ে নিয়ে শরিফ কলোনির গলির ভেতর খেলছিল একটি শিশু। তার মাথার ওপর পাশাপাশি উড়ছে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের পতাকা। দেয়ালের দুই পাশে যেন তাকিয়ে আছেন মেসি আর নেইমার। বিশ্বকাপের মাঠে তাঁরা প্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু এই গলিতে তাঁরা একই উৎসবের অংশ।
শরিফ কলোনির এই দৃশ্যই এখন চট্টগ্রামের প্রতিচ্ছবি। বিশ্বকাপ শুরু হতেই ছাদে ছাদে উঠেছে পতাকা। অলিগলি সেজেছে প্রিয় দলের রঙে। মোড়ে মোড়ে বসছে বড় পর্দা। নিউমার্কেট আর স্টেডিয়ামপাড়ার জার্সির দোকানগুলোতে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ভিড়। আড্ডায়, চায়ের দোকানে, অফিসে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে—আলোচনার কেন্দ্র একটাই, ফুটবল।
জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক মামুনুল ইসলাম চট্টগ্রামেরই সন্তান। ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। দেশের হয়ে খেলেছেন ৬৭টি ম্যাচ। তাঁর চোখে বিশ্বকাপ এখন শুধু টেলিভিশনের পর্দার খেলা নয়; এটি শহরের সামাজিক উৎসব।
মামুনুল প্রথম আলোকে বলেন, নারী-পুরুষ, শিশু, বৃদ্ধ—সবাই এই উৎসবে শামিল হন। প্রতিবার বিশ্বকাপ এলেই এই দৃশ্য দেখা যায়। এবার উচ্ছ্বাসটা আরও বেশি চোখে পড়ছে। বন্ধুরা একসঙ্গে খেলা দেখছেন, কে সেরা, তা নিয়ে তর্ক করছেন, কোথাও কোথাও মাঠেও খেলা চলছে। এই উচ্ছ্বাসের জোয়ারে সবাই ভেসে যাচ্ছে।
জার্সি থেকে বড় পর্দা
দুপুর গড়াতেই চট্টগ্রাম আরেক রূপ নেয়। নিউমার্কেটের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ শোনা যায়, ‘ভাই, একটা মেসির জার্সি দিন।’ পাশের দোকানে আরেক কিশোর ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের জার্সি খুঁজছে। একটু দূরে একজন বাবা ছেলের গায়ে মেপে দেখছেন ছোট্ট একটি আর্জেন্টিনার জার্সি। দোকানের সামনে ঝুলছে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেন, ফ্রান্স, পর্তুগালের পতাকা। বাতাস লাগলেই একসঙ্গে দুলে ওঠে সব কটি। বিশ্বকাপ ফুটবল শুরুর পর এই দৃশ্যই চোখে পড়ছে।
দোকানিরা বলছেন, বিশ্বকাপ এলেই বদলে যায় বাজারের চেহারা। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের জার্সি। মেসির ১০ নম্বর জার্সির চাহিদা সবচেয়ে বেশি। তবে নেইমার, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, লামিনে ইয়ামাল, কিলিয়ান এমবাপ্পে কিংবা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জার্সিও কম বিক্রি হচ্ছে না।
নিউমার্কেট থেকে কাজীর দেউড়ির দিকে এগোতেই উৎসবের রং আরও গাঢ় হয়। স্টেডিয়ামপাড়ার দোকানগুলোর সামনে সারি সারি পতাকা।
এবার চোখ রাখা যাক শহরের সাজে। শহরের অলিগলিও বাদ যায়নি। চান্দগাঁওয়ের খতিবপাড়া এখন সবুজ-হলুদ রঙে মোড়া একটি গলি। দেয়ালে পেলে, রোমারিও, রোনালদিনহো, নেইমারের অবয়ব। রংতুলিতে ধরা পড়েছে মেসি আর ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। স্থানীয় লোকজন এখন এই গলিকে পুরোনো নামে ডাকেন না। সবার মুখে একটাই নাম—‘ব্রাজিল গলি’।
সন্ধ্যার পর শহরের রং বদলে যায় আবার। মোড়ে মোড়ে জ্বলে ওঠে বড় পর্দা। কেউ প্লাস্টিকের চেয়ার নিয়ে আসেন। কেউ মাদুর পেতে বসেন। চায়ের দোকানের বিক্রি বাড়ে। রিকশাচালক, দোকানদার, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী—সবাই একসঙ্গে খেলা দেখেন।
নগরের দুই নম্বর গেট, প্রবর্তক মোড়, কাজীর দেউড়ি, চকবাজার, হালিশহর বিডিআর মাঠ, উত্তর কাট্টলি ও মাদারবাড়ি এলাকায় বড় পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থা হয়েছে। আজ রোববার সকাল আটটায় আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হবে জর্ডানের। এ উপলক্ষে এসব এলাকায় তৈরি হয়েছে উৎসবের আবহ। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় তরুণদের উদ্যোগেও আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের খেলা দেখার আয়োজন করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য স্নাতক শেষ করেছেন বেলাল হাশেম। তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপ এলেই আমাদের দিন-রাতের রুটিন বদলে যায়। বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে খেলা দেখি। কোন দল ভালো খেলছে, কে চ্যাম্পিয়ন হবে—এসব নিয়ে চলে তর্কবিতর্ক। এবারের বিশ্বকাপেও প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ একসঙ্গে দেখছি। আর্জেন্টিনার একটি ম্যাচ দেখেছি নগরের দুই নম্বর গেটের বড় পর্দায়। শত শত মানুষের সঙ্গে বসে খেলা দেখার আনন্দই আলাদা।’
শত বছরের শিকড়
চট্টগ্রামের এই ফুটবল উন্মাদনা শুধু এবারের বিশ্বকাপের গল্প নয়। এর শিকড় অনেক গভীরে। ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ব্রিটিশ আমলে রেলওয়ে ও বন্দরকেন্দ্রিক প্রশাসনিক বিস্তারের সঙ্গে ফুটবলও ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রামে। বিশ শতকের শুরুর দশকে প্রতিষ্ঠিত আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশন এ অঞ্চলের সংগঠিত ফুটবলের অন্যতম প্রাচীন প্রতিষ্ঠান। রেলওয়ের কর্মীদের দল মাঠে নামত। ধীরে ধীরে স্থানীয় তরুণেরাও যোগ দেন সেই খেলায়। সাহেবদের অবসর বিনোদন দ্রুত হয়ে ওঠে চট্টগ্রামের মানুষের নিজের খেলা।
পরে পলোগ্রাউন্ড, প্যারেড মাঠ আর নিয়াজ স্টেডিয়াম (আজকের চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়াম) ঘিরে তৈরি হয় শহরের ফুটবল সংস্কৃতি। দেশভাগের আগে রেলওয়ে, পোর্ট ট্রাস্ট ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দল খেলত। পরে স্থানীয় ক্লাবগুলো সেই জায়গা নেয়। গ্যালারিতে ভিড় বাড়ে। ফুটবল ঢুকে পড়ে পাড়া-মহল্লার আলোচনায়।
স্বাধীনতার পর সেই আবেগ আরও বিস্তৃত হয়। সত্তর ও আশির দশকে চট্টগ্রাম ছিল দেশের অন্যতম বড় ফুটবল ‘ভান্ডার’। এখানকার অসংখ্য ফুটবলার নিয়মিত খেলেছেন ঢাকার শীর্ষ লিগে। আশীষ ভদ্র, ইকবাল খান, পরে মামুনুল ইসলামের মতো খেলোয়াড়েরা জাতীয় দলেও প্রতিনিধিত্ব করেছেন এই শহরকে। একসময় চট্টগ্রাম আবাহনী ও চট্টগ্রাম মোহামেডানকে ঘিরে যে সমর্থক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তার রেশ এখনো রয়ে গেছে প্রবীণদের স্মৃতিতে।
চট্টগ্রামের ফুটবল ইতিহাসের দীর্ঘ পথচলার একজন সাক্ষী সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক আবুল মোমেন। ছোটবেলায় বর্তমান এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে নিয়মিত খেলা দেখতে যেতেন তিনি। তখন স্টেডিয়ামের টিকিটের দাম ছিল মাত্র চার আনা। বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে খেলা দেখতেন। ফেরার পথেও চলত ফুটবল নিয়ে তর্কবিতর্ক।
আবুল মোমেন বলেন, ব্রিটিশ আমলেই চট্টগ্রামে ফুটবলের প্রসার শুরু হয়। বন্দর, কাস্টমস, রেলওয়ের মতো প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব দল ছিল। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অনেকেই ভালো ফুটবল খেলতেন। পরে ইয়াং স্টার, মোহামেডানসহ একের পর এক ক্লাব গড়ে ওঠে। শহরজুড়ে ফুটবল নিয়ে তৈরি হয় আলাদা এক সংস্কৃতি।
টেলিভিশন আসার পর সেই সংস্কৃতি আরও বিস্তৃত হয়। মাঠের পাশাপাশি মানুষ ঘরে বসেও খেলা দেখতে শুরু করে। নারী-পুরুষ, শিশু-বয়স্ক—সবাই মিলে বিশ্বকাপ কিংবা বড় ম্যাচ উপভোগ করতেন।
তবে এত ইতিহাস ও আগ্রহের পরও চট্টগ্রামের ফুটবল তার সম্ভাবনা অনুযায়ী এগোতে পারেনি বলে মনে করেন আবুল মোমেন। তিনি বলেন, দর্শকের আগ্রহ কখনো কম ছিল না; কিন্তু সেই আগ্রহের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। মানসম্মত মাঠের অভাব, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি ও বয়সভিত্তিক খেলোয়াড় তৈরির উদ্যোগ না থাকায় চট্টগ্রাম থেকে দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পর্যায়ে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ফুটবলার উঠে আসছে না।
তারপরও বিশ্বকাপ এলেই শহরটি আবার ফুটবলের কাছে ফিরে যায়। ছাদে পতাকা ওঠে। গলিতে গলিতে রং লাগে। বড় পর্দার সামনে জমে ওঠে রাতের শহর। শিশুদের পায়ে বল আসে। প্রজন্ম বদলায়, দল বদলায়, তারকার নাম বদলায়। কিন্তু চট্টগ্রামের ফুটবলপ্রেম বদলায় না।