প্রযুক্তির যুগে মুমিনের সম্পর্কের নতুন বাস্তবতা
· Prothom Alo

মানুষ সামাজিক জীব। জন্মের পর পরিবার যেমন তার প্রথম আশ্রয়, তেমনি পরিবার থেকে বেরিয়ে মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয় হয়ে ওঠে বন্ধু। বন্ধু কেবল অবসরের সঙ্গী নয়; সে চিন্তার সঙ্গী, চরিত্র গঠনের সহযাত্রী এবং জীবনের সুখ-দুঃখের অংশীদার।
তাই ইসলাম বন্ধুত্বকে শুধু সামাজিক সম্পর্ক হিসেবে দেখেনি; বরং মানুষের ইমান, চরিত্র ও ভবিষ্যৎ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছে।
Visit extonnews.click for more information.
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে বন্ধুত্বের ধরনও বদলেছে। একসময় বন্ধুত্ব গড়ে উঠত দীর্ঘ পরিচয়, পারস্পরিক বিশ্বাস ও একসঙ্গে সময় কাটানোর মাধ্যমে। আজ প্রযুক্তির কল্যাণে কয়েক সেকেন্ডেই মানুষ ‘বন্ধু’ হয়ে যায়।
একটি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট, একটি ফলো কিংবা কয়েকটি মেসেজেই যেন সম্পর্কের সূচনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই দ্রুত তৈরি হওয়া সম্পর্কগুলো কি সত্যিই বন্ধুত্বের গভীরতা ধারণ করে?
একসময় কোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে হলে তার বাড়িতে যেতে হতো। ফোন করতে হলেও আগে তার বাবা-মায়ের সঙ্গে কথা বলতে হতো। পরিবার জানত, সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কী ধরনের পরিবেশে যাচ্ছে।
লেখক, বক্তা, খেলোয়াড় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব—তাঁদের প্রতিদিনের পোস্ট, ছবি, মতামত আমাদের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
বন্ধুত্ব তখন ছিল বাস্তব উপস্থিতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। একসঙ্গে খেলাধুলা, পড়াশোনা, আড্ডা কিংবা সমস্যার সময় পাশে দাঁড়ানো—এসবই ছিল সম্পর্কের ভিত্তি।
অন্যদিকে আজকের পৃথিবীতে বন্ধুত্বের বড় অংশ গড়ে ওঠে ভার্চ্যুয়াল জগতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষকে দূরত্বের সীমা ভেঙে একত্র করেছে, এতে সন্দেহ নেই। পৃথিবীর এক প্রান্তে বসেও অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে মুহূর্তে যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে।
কিন্তু একই সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা অনেক ক্ষেত্রে কমে এসেছে। পরিচয়ের আগেই আমরা মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের অসংখ্য তথ্য জেনে যাচ্ছি। ফলে পরিচয়ের স্বাভাবিক সৌন্দর্য, ধীরে ধীরে মানুষকে আবিষ্কার করার আনন্দ অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
আমরা এমন বহু মানুষকে অনুসরণ করি, যাঁরা আমাদের অস্তিত্ব সম্পর্কেই জানেন না। কোনো লেখক, বক্তা, খেলোয়াড় কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব—তাঁদের প্রতিদিনের পোস্ট, ছবি, মতামত আমাদের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে।
অথচ এই একমুখী সম্পর্ক আমাদের চিন্তা, রুচি ও আচরণে গভীর প্রভাব ফেলতে থাকে। তাই কাদের অনুসরণ করছি, কাদের লেখা পড়ছি, কাদের ভিডিও দেখছি—এগুলোও আজ বন্ধুত্ব নির্বাচনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কেন শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর বেশি প্রিয়এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেন, ‘সৎ ও অসৎ বন্ধুর উদাহরণ আতর বিক্রেতা ও কামারের মতো। আতর বিক্রেতার কাছ থেকে হয় তুমি আতর পাবে, নয়তো অন্তত তার সুঘ্রাণ পাবে। আর কামারের কাছে গেলে হয় তোমার কাপড় পুড়ে যাবে, নয়তো দুর্গন্ধে আক্রান্ত হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১০১)
অর্থাৎ, মানুষের সংস্পর্শ কখনো নিরপেক্ষ থাকে না। ভালো মানুষের সঙ্গ যেমন অজান্তেই চরিত্রকে সুন্দর করে, তেমনি মন্দ মানুষের সঙ্গ ধীরে ধীরে নৈতিকতা নষ্ট করে দেয়।
আরেকটি হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর ধর্ম (স্বভাব ও জীবনাচার) এর ওপর থাকে। তাই তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ করে, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৭)
আধুনিক মনোবিজ্ঞানও আজ একই সত্যের কথা বলছে। মানুষ যাদের সঙ্গে বেশি সময় কাটায়, তাদের চিন্তাভাবনা, ভাষা, অভ্যাস ও মূল্যবোধ ধীরে ধীরে নিজের মধ্যে গ্রহণ করতে শুরু করে। ফলে অনলাইন হোক বা অফলাইন—সঙ্গ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৪৭মানুষ তার বন্ধুর ধর্মের ওপর থাকে। তাই তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ করে, সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি বড় সমস্যা হলো অতিরিক্ত যোগাযোগের ভ্রম। আমরা মনে করি, সারাক্ষণ অনলাইনে যুক্ত থাকাই সম্পর্কের গভীরতা। বাস্তবে দেখা যায়, শত শত মানুষের সঙ্গে প্রতিদিন যোগাযোগ হলেও নিজের পরিবার, আত্মীয় কিংবা ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে মন খুলে কথা বলার সময়ই পাওয়া যায় না। একই ঘরে বসে সবাই নিজ নিজ মুঠোফোনে ব্যস্ত, অথচ পারস্পরিক হৃদ্যতা ক্রমেই কমে যাচ্ছে।
বাস্তব সম্পর্কের সৌন্দর্য হলো—সেখানে ভুল–বোঝাবুঝি হলেও মানুষ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। মতভেদ হলে আলোচনা হয়, অভিমান হলে মিলন হয়। কিন্তু ভার্চ্যুয়াল জগতে সম্পর্ক ভাঙাও খুব সহজ। এক ক্লিকে আনফ্রেন্ড, ব্লক কিংবা আনফলো। ফলে সহনশীলতা ও ক্ষমাশীলতার চর্চা কমে যাচ্ছে।
ইসলাম মানুষকে ভারসাম্যের শিক্ষা দিয়েছে। অতিরিক্ত ভালোবাসা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি অতিরিক্ত ঘৃণাও ধ্বংস ডেকে আনে। আলী ইবন আবি তালিব (রা.)–এর বিখ্যাত উপদেশ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘তোমার বন্ধুকে পরিমিতভাবে ভালোবাসো। কারণ, একদিন সে তোমার শত্রু হতে পারে। আর শত্রুকেও পরিমিতভাবে ঘৃণা করো। কারণ, একদিন সে তোমার বন্ধু হতে পারে।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ২৩৩৬)
একইভাবে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন, ‘তোমাদের ভালোবাসা যেন নির্বুদ্ধিতায় পরিণত না হয় এবং তোমাদের ঘৃণা যেন ধ্বংসাত্মক না হয়।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ১৩৩৬)
আজকের অনলাইন সংস্কৃতিতে এই উপদেশগুলোর প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কারণ, একসময় ব্যক্তিগত আলাপ কেবল দুজন মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত।
এখন একটি স্ক্রিনশট মুহূর্তেই হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। তাই ব্যক্তিগত তথ্য, পারিবারিক সমস্যা কিংবা আবেগের মুহূর্তের বক্তব্য প্রকাশের আগে বহুবার চিন্তা করা প্রয়োজন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি ভয়াবহ দিক হলো ঈর্ষা বা হাসাদ বৃদ্ধি করা। মানুষ সাধারণত নিজের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোই প্রকাশ করে। ভ্রমণ, আনন্দ, সাফল্য কিংবা হাসিমুখের ছবিগুলো দেখে অন্যরা মনে করে—সবাই সুখে আছে, কেবল তার জীবনেই কষ্ট।
অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রত্যেক মানুষের জীবনেই সুখ-দুঃখ পাশাপাশি থাকে। তাই অন্যের সাজানো জীবনের সঙ্গে নিজের বাস্তব জীবনের তুলনা করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, ফ্রেন্ডলিস্টে থাকা সবাই প্রকৃত বন্ধু নয়। ফলোয়ার মানেই শুভাকাঙ্ক্ষী নয়। সময় ও পরিস্থিতিই প্রকৃত বন্ধু চেনার সবচেয়ে বড় মানদণ্ড।
কোরআনের আলোয় সন্তানের সঙ্গে বাবার সম্পর্কবর্তমান সময়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ডিজিটাল পরিচয়ের ভিত্তিতে দ্রুত বিশ্বাস করা। কেউ আমাদের মতো চিন্তা করে, আমাদের প্রশংসা করে কিংবা নিয়মিত যোগাযোগ রাখে বলেই যে সে বিশ্বস্ত বন্ধু হবে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। প্রকৃত বন্ধুত্বের ভিত্তি হলো চরিত্র, বিশ্বস্ততা, ত্যাগ এবং দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত সম্পর্ক।
তাই আমাদের প্রয়োজন সচেতন ডিজিটাল জীবন। যেসব পেজ, আইডি কিংবা কনটেন্ট আমাদের মনে অশান্তি, ঈর্ষা, অশ্লীলতা, হতাশা বা গিবতের প্রবণতা সৃষ্টি করে, সেগুলো থেকে দূরে থাকা উচিত।
প্রয়োজন হলে আনফলো, মিউট কিংবা ব্লক করতে দ্বিধা করা উচিত নয়। যেমন একজন ক্রীড়াবিদ শরীরকে সুস্থ রাখতে ক্ষতিকর খাবার বর্জন করেন, তেমনি একজন মুমিনেরও নিজের হৃদয় ও চিন্তাকে ক্ষতিকর কনটেন্ট থেকে রক্ষা করা প্রয়োজন।
প্রযুক্তি আল্লাহর একটি নেয়ামত। এটি মানুষের উপকারের জন্য, সম্পর্ক ধ্বংস করার জন্য নয়। তাই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে ইসলামের নৈতিকতা ও আদবের আলোকে।
এর পাশাপাশি বাস্তব সম্পর্ককে সময় দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। পরিবারের সঙ্গে বসে কথা বলা, আত্মীয়দের খোঁজ নেওয়া, পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা, অসুস্থ বন্ধুর পাশে দাঁড়ানো কিংবা বিপদে সহযোগিতা করা—এসবই প্রকৃত বন্ধুত্বের পরিচয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু প্রকাশ করার আগে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করা যেতে পারে—এটি কি সত্যিই প্রয়োজন? এতে কি কারও ঈর্ষা সৃষ্টি হবে? এতে কি আমার বা অন্য কারও সম্মান ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা আছে? যদি উত্তর ইতিবাচক না হয়, তবে নীরব থাকাই উত্তম।
প্রযুক্তি আল্লাহর একটি নেয়ামত। এটি মানুষের উপকারের জন্য, সম্পর্ক ধ্বংস করার জন্য নয়। তাই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করতে হবে ইসলামের নৈতিকতা ও আদবের আলোকে। যুগ বদলাবে, যোগাযোগের মাধ্যম বদলাবে, কিন্তু সত্যিকারের বন্ধুত্বের মূলনীতি কখনো বদলাবে না।
সৎ মানুষের সঙ্গ গ্রহণ, মন্দ সঙ্গ পরিহার, সম্পর্কে ভারসাম্য রক্ষা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সংরক্ষণ এবং বাস্তব সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেওয়া—এসব নীতিই আমাদের ব্যক্তিজীবন, পরিবার ও সমাজকে সুস্থ ও সুন্দর রাখতে পারে।
আমাদের এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পুরোনো মূল্যবোধের সমন্বয় করা। কারণ, বন্ধুত্বের প্রকৃত সৌন্দর্য লাইক, কমেন্ট কিংবা ফলোয়ারের সংখ্যায় নয়; বরং বিপদের দিনে যে হাতটি নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে আসে, সত্যের পথে যে বন্ধু সংশোধন করে, আর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে সম্পর্ক টিকে থাকে—সেই বন্ধুত্বই চিরস্থায়ী ও কল্যাণময়।
এআই যুগে ইসলাম: চিন্তাকে গভীর করতে নবীজির শেখানো ৫ অভ্যাস