করকাঠামোর ভূতাপেক্ষ পরিবর্তনে করদাতাদের ওপর চাপ বাড়বে

· Prothom Alo

বাংলাদেশ একটি স্থিতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব করব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে—অর্থনৈতিক অংশীজনদের দীর্ঘদিনের দাবি এটিই। একটি দীর্ঘমেয়াদি ও অনুমানযোগ্য করব্যবস্থা না থাকায় অতীতে প্রায় প্রতিটি বাজেট সামনে রেখে করদাতাদের চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হয়। উৎসে করের হার পরিবর্তন ছাড়া অর্থবিলের মাধ্যমে প্রস্তাবিত প্রায় সব বিধানই সাধারণত ভূতাপেক্ষ বা পেছনের সময় থেকে (Retrospective) কার্যকর হতো।

এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার একটি ইতিবাচক প্রয়াস দেখা গিয়েছিল ২০২৪ সালের অর্থবিলে। যখন প্রথম করপোরেট ও ব্যক্তিগত করের ক্ষেত্রে প্রক্ষেপণযোগ্য বা ভবিষ্যৎমুখী করহারের চর্চা শুরু হয়। এবারের অর্থবিলে সেই ধারাবাহিকতা আরও এক ধাপ এগিয়েছে। আগামী ২০৩০-৩১ করবর্ষ পর্যন্ত করহারের একটি প্রক্ষেপণ বা পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে এবার। এই উদ্যোগ অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও করদাতাদের জন্য স্বস্তিদায়ক।

Visit biznow.biz for more information.

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি করহারের ইতিবাচক উদ্যোগকে ম্লান করে দিচ্ছে অর্থবিলের অন্যান্য বিধান; যার বেশির ভাগই আবার সেই পুরোনো ‘ভূতাপেক্ষ’ ভিত্তিতে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আয় বছর শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক দিন আগে এ ধরনের আকস্মিক পরিবর্তন করদাতাদের মধ্যে চরম নীতি-অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এবারের প্রস্তাবিত অর্থবিলে বেশ কিছু উদ্বেগজনক উদাহরণ রয়েছে। সেগুলোর কয়েকটি এখানে তুলে ধরা হলো:

বিনিয়োগ রেয়াতের সুবিধা কমানো

প্রস্তাবিত বাজেটে বিনিয়োগের ওপর বিদ্যমান কর রেয়াত সুবিধা কমিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়বে ব্যক্তি করদাতার ওপর। সর্বোচ্চ কর রেয়াত সুবিধা পেতে হলে করদাতাকে ৩০ জুনের মধ্যে আগের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে।

ধরা যাক, ২০২৫-২৬ আয় বছরে একজন ব্যক্তির করযোগ্য আয় ১০ লাখ টাকা। আগের নিয়মে সর্বোচ্চ কর রেয়াত পেতে তাকে হয়তো ২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হতো। কিন্তু নতুন প্রস্তাবনার কারণে একই পরিমাণ করসুবিধা পেতে তাকে ৩০ জুনের মধ্যে ৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হবে। আয় বছর শেষ হওয়ার আগমুহূর্তে এই অতিরিক্ত তারল্য জোগাড় করা সাধারণ করদাতাদের জন্য একটি বড় ধাক্কা।

সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর

সঞ্চয়পত্রের সুদ থেকে কেটে নেওয়া উৎসে করকে চূড়ান্ত কর দায়ের বদলে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে এবার। তাতে প্রান্তিক বা স্বল্প আয়ের করদাতারা রিটার্ন জমার সময় রিফান্ড বা কর ফেরত পেলেও মধ্য ও উচ্চ আয়ের করদাতাদের ওপর করের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।

উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, কোনো ব্যক্তি করদাতার কার্যকর করের হার ১৫ শতাংশ, তবে তার করের বোঝা আরও ৫ শতাংশ বাড়বে। আয় বছর শেষ হওয়ার মাত্র ১৯ দিন আগে এ ধরনের একটি বড় পরিবর্তন কোনো করদাতার পক্ষেই আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব ছিল না।

নগদ সহায়তার উৎসে কর

রপ্তানি খাতে নগদ সহায়তার ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে এবারের বাজেটে। আপাতদৃষ্টিতে এটিকে ইতিবাচক মনে হতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটিকে চূড়ান্ত করের বিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে কোম্পানিগুলোর তাৎক্ষণিক ক্যাশ ফ্লো বা নগদ প্রবাহের কিছুটা সুবিধা হলেও বছর শেষে রিটার্ন দাখিলের সময় তাদের নিয়মিত হারে কর দিতে হবে। ফলে একটি রপ্তানিমুখী অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে চূড়ান্তভাবে সাড়ে ২৭ শতাংশ হারে কর দিতে হতে পারে। বৈশ্বিক মন্দা ও অভ্যন্তরীণ সংকটে যেখানে দেশের রপ্তানি আয় ধারাবাহিকভাবে কমছে, সেখানে এমন সিদ্ধান্ত রপ্তানি খাতের ওপর বড় ধরনের করের চাপ তৈরি করবে। অনেক কোম্পানি এরই মধ্যে তাদের আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করে ফেলেছে। এ ধরনের স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট খাতের অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে যথাযথ প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা করা জরুরি ছিল।

লভ্যাংশ কর

আয়কর আইন ২০২৩-এর ৭ম তফসিল অনুযায়ী, লভ্যাংশ আয়ের ওপর করের হার ২০ শতাংশে সীমিত ছিল। কিন্তু প্রস্তাবিত অর্থবিলে এই ধারা বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ফলে লভ্যাংশ আয়ের ওপর এখন নিয়মিত করপোরেট করহার প্রযোজ্য হবে। এখন একটি তৈরি পোশাক খাতের কোম্পানিকে লভ্যাংশের ওপর সাড়ে ২৭ শতাংশ, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংককে সাড়ে ৩৭ শতাংশ এবং অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানিকে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হবে।

বিশ্বের অনেক দেশেই ব্যক্তিশ্রেণির বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করতে লভ্যাংশ আয়ের ওপর কর পুরোপুরি মওকুফ থাকে। এ ছাড়া দ্বৈত কর এড়াতে করপোরেট-ব্যক্তিগত সমন্বিত পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। আমাদের দেশে যেখানে বিনিয়োগকারীদের পুনর্বিনিয়োগে উৎসাহিত করা প্রয়োজন, সেখানে লভ্যাংশ করের এই বিপুল বৃদ্ধি পুঁজিবাজার ও বেসরকারি বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করবে। আর বরাবরের মতোই, এই কর ভূতাপেক্ষভাবে কার্যকরের প্রস্তাব করা হয়েছে।

শেষ কথা

অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, বাজেট পাসের পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর পরিপত্রের মাধ্যমে কিছু কিছু বিধান ভবিষ্যৎমুখী হিসেবে সংশোধন করে থাকে। তবে করব্যবস্থার স্থায়ী স্থিতিশীলতার জন্য এই সংস্কৃতির পরিবর্তন দরকার। জাতীয় সংসদে অর্থবিল চূড়ান্তভাবে অনুমোদনের আগে সরকারকে এই ভূতাপেক্ষ বিধানগুলোর নেতিবাচক প্রভাব গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করতে হবে। একটি সত্যিকারের ভবিষ্যৎমুখী ও অনুমানযোগ্য কর ব্যবস্থাপনাই কেবল দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে পারে।

স্নেহাশীষ বড়ুয়া, পরিচালক, এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস

Read full story at source