হাইড্রেশন ব্রেক নাকি ফুটবলের আমেরিকানাইজেশন? বিশ্বকাপে নতুন বিতর্কের জন্ম দিল ৩ মিনিটের বিরতি

· Prothom Alo

বিশ্বজুড়ে এখন শুধুই বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা। মাঠের লড়াই, প্রিয় দলের জয়-পরাজয় আর তারকাদের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি এবারের আসরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে আরেকটি বিষয় ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ বা পানি পানের বিরতি।

Visit saltysenoritaaz.com for more information.

৪৮ দল নিয়ে আয়োজিত এবারের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আয়োজনগুলোর একটি। কিন্তু মাঠের উত্তেজনার মাঝেও প্রতি ম্যাচে থাকা এই ৩ মিনিটের বিরতি নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। এটি কি খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য রক্ষার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত, নাকি ফুটবলের বাণিজ্যিক রূপান্তরের আরেকটি ধাপ?

বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচে দুই অর্ধেই দেওয়া হচ্ছে ৩ মিনিট করে হাইড্রেশন ব্রেক। সাধারণত প্রথমার্ধের ২২ মিনিট এবং দ্বিতীয়ার্ধের ৬৭ মিনিটের দিকে এই বিরতি আসে। এই সময় রেফারির ঘড়ি থেমে থাকে না, তবে অর্ধের শেষে অতিরিক্ত সময় হিসেবে তা যোগ হয়ে যায়। ফলে এবারের ম্যাচগুলোতে ৫ থেকে ১০ মিনিট পর্যন্ত বাড়তি সময় দেখা যাচ্ছে।

পানি পানের এই বিরতি কিন্তু এবারই আমরা প্রথম দেখিনি। ২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপেও আমরা ‘কুলিং ব্রেক’ দেখেছি প্রচন্ড গরমের জন্য। তবে এবার যেমন হাইড্রেশন ব্রেক সব খেলাতেই থাকছে, সেবার এমন ছিলনা। ‘ওয়েট-বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার’ নামের এক বিশেষ থার্মোমিটারে ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা দেখালেই শুধু রেফারিরা কুলিং ব্রেক দিতেন। এই থার্মোমিটারে তাপমাত্রা, বাতাসের আদ্রতা-গতিবেগ, সূর্যের বিকিরণ, আকাশের মেঘ; সবকিছু মিলিয়ে তাপমাত্রা পরিমাপ করা হত। বাধ্যতামূলক বিরতি দেয়াতে, এবার কার্যত ৯০ মিনিটের খেলা ৪-ভাগ হয়ে গেছে।

ক্রীড়াবিজ্ঞান বলে, গরম কন্ডিশনে টানা শারীরিক পরিশ্রমের ফলে খুব জলদি ক্লান্তি আসতে পারে। ফিফা বলছে, অতিরিক্ত গরমের মধ্যেও খেলোয়াড়রা যেন নিজেদের সেরাটা দিতে পারে, ক্লান্ত হয়ে না যায়, সেজন্যই এই হাইড্রেশন ব্রেক। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, খেলোয়াড়রা কি এটা চায়? এটা কি খেলার গতি বা ছন্দে বিরূপ প্রভাব ফেলছে না? হাই ভোল্টেজ একটা খেলার মাঝে হঠাৎ এই বিরতি দর্শকরাও কি দেখতে চায়?

বিভিন্ন দলের একাধিক খেলোয়াড় আর ম্যানেজাররা মনে করেন এই ব্রেকগুলো খেলার ছন্দ আর গতিশীলতা নষ্ট করে দিচ্ছে। নেদারল্যান্ড অধিনায়ক ভার্জিল ভ্যান ডিক প্রকাশ্যেই এই নিয়মের সমালোচনা করেছেন। স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র দলের ম্যানেজার মরিসিও পচেত্তিনো এই বিরতিতে খেলার গতিরোধ হবার ব্যাপারটা তুলে ধরেছেন।
তবে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে এর বাণিজ্যিক দিক নিয়ে। সমালোচকদের মতে, হাইড্রেশন ব্রেক এখন শুধু খেলোয়াড়দের বিশ্রামের সময় নয়, বরং টেলিভিশন সম্প্রচারকারীদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞাপনের সুযোগ।

খেলা চলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর একটিতে এই বিরতি আসায় দর্শকরা সাধারণত টিভি ছেড়ে উঠে যান না। ফলে সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানগুলো বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য একটি নিশ্চিত সময় পেয়ে যাচ্ছে। আর বিশ্বকাপের মতো বিলিয়ন ডলারের ইভেন্টে প্রতিটি মুহূর্তের বাণিজ্যিক মূল্য অনেক বেশি।

এই কারণেই কেউ কেউ বলছেন, এটি ফুটবলের ‘আমেরিকানাইজেশন’ যেখানে খেলার আবেগ, বিনোদন এবং দর্শক আকর্ষণকে ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে আরও বড় বাণিজ্যিক কাঠামো।

ফুটবল এমন একটি খেলা যেখানে প্রতিটি সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ। শেষ মুহূর্তের গোল, অতিরিক্ত সময়ে নাটকীয়তা কিংবা নকআউট ম্যাচের টানটান উত্তেজনা, সবকিছুই দর্শকের আবেগের সঙ্গে জড়িত। তাই অনেকে আশঙ্কা করছেন, অতিরিক্ত বাণিজ্যিক পরিকল্পনা ভবিষ্যতে ফুটবলের সেই স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে বদলে দিতে পারে।

তবে বাস্তবতা হলো, নিয়ম যখন তৈরি হয়ে গেছে, তখন দলগুলোও এর সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে। এখন অনেক কোচ এই ৩ মিনিটের বিরতিকে শুধু পানি পানের সময় হিসেবে নয়, বরং ছোট একটি ‘মিনি হাফ টাইম’ হিসেবে ব্যবহার করছেন। বের হয়ে আসছে ল্যাপটপ, হোয়াইট বোর্ড, কৌশলের নতুন পরিকল্পনা যেন ম্যাচের মাঝেই চলছে ছোট্ট ট্যাকটিক্যাল মিটিং।

হাইড্রেশন ব্রেক তাই এখন শুধু পানির বিরতি নয়; এটি হয়ে উঠেছে আধুনিক ফুটবলের পরিবর্তিত চরিত্রের প্রতীক। যেখানে খেলোয়াড়ের ফিটনেস, দর্শকের অভিজ্ঞতা এবং বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা। সবকিছু মিলেই তৈরি হচ্ছে নতুন যুগের ফুটবল।

ছবি: এএফপি

লেখাক: ক্রীড়া ধারাভাষ্যকার ও বিশ্লেষক,
চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তা

Read full story at source