কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মসূচি ঘিরে ফেসবুকে ছড়াচ্ছে ভুয়া তথ্য
· Prothom Alo

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে নানা ভুয়া তথ্য।
ছড়ানো হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নামে একটি ভুয়া মন্তব্য। ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দামের নামেও একটি ভুয়া মন্তব্য ছড়িয়েছে। সেনাবাহিনীর সদস্যদের পুরোনো ভিডিও ছড়িয়েও তৈরি করা হচ্ছে বিভ্রান্তি।
Visit grenadier.co.za for more information.
দুই বছর আগে জুলাই অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতারা আত্মগোপনে থেকে আজ মঙ্গলবার দলের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কর্মী–সমর্থকদের মিছিল বের করার আহ্বান জানান। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হয়, নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা থেকে সেনা মোতায়েনের জন্য চিঠিও দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আওয়ামী লীগকে ঠেকাতে জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন দল আজ কর্মসূচি ডাকে।
এসব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে একটি ফটোকার্ড ছড়িয়েছে ফেসবুকে। তাতে তাঁকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে—‘ইউনূস ও বিএনপির ব্যর্থতায় আওয়ামী লীগ আজ গণমানুষের দল। ঠেকানোর সাধ্য আমাদের নেই।’
লিংক: এখানে
‘আওয়ামীলীগ পরিবার’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ থেকে এই পোস্ট দেওয়া হয় কালের কণ্ঠের ফটোকার্ডের নকশায়। তবে এই শিরোনামের কোনো সংবাদ কালের কণ্ঠসহ কোনো সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যায়নি।
ফটোকার্ডটিতে কালের কণ্ঠের লোগো রয়েছে এবং এটি প্রকাশের তারিখ ২২ জুন, ২০২৬ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই দিন এমন কোনো ফটোকার্ড সংবাদপত্রটির ফেসবুক পেজে পাওয়া যায়নি। তা ছাড়া কালের কণ্ঠের প্রচলিত ফটোকার্ডের শিরোনামের ফন্টের সঙ্গে আলোচিত ফটোকার্ডটির ফন্টের পার্থক্যও দেখা যায়।
তবে কালের কণ্ঠের ফেসবুক পেজে ২২ জুন প্রকাশিত একটি ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়, যার সঙ্গে আলোচিত ফটোকার্ডটির আংশিক সাদৃশ্য রয়েছে।
লিংক: এখানে
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, কালের কণ্ঠে প্রকাশিত ফটোকার্ডের লোগো, তারিখ এবং সালাহউদ্দিন আহমদের ছবির সঙ্গে এখন ছড়ানো ফটোকার্ডের মিল থাকলেও শিরোনামে ভিন্নতা রয়েছে। ওই কার্ডের শিরোনাম ছিল—‘আওয়ামী লীগ নামে কোনো সংগঠন নাই: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী’।
অর্থাৎ পুরোনো ফটোকার্ডটি সম্পাদনা করে শিরোনাম বদলে নতুন কার্ডটি তৈরি করা হয়েছে। নতুন তৈরি করা ছবির ডান পাশে গুগলের এআই প্ল্যাটফর্ম জেমিনির লোগোও দেখা যায়। তাতে বোঝা যায়, ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে সম্পাদনা করা হয়।
জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দামের ছবি সংযুক্ত করে আরেকটি ফটোকার্ড ছড়িয়েছে, যেখানে তাঁকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ‘আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে ছাত্রশিবির কোনো বাধা দেবে না। জামায়াতের সঙ্গে বেঈমানির শাস্তি বিএনপির প্রাপ্য।’
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক
যাচাই করে নুরুল ইসলাম সাদ্দামের অফিশিয়াল ফেসবুক প্রোফাইলে এমন কোনো পোস্ট পাওয়া যায়নি। কোনো সংবাদমাধ্যমেও আসেনি তাঁর এমন কোনো বক্তব্য।
প্রচারিত পোস্টে দাবির সপক্ষে কোনো তথ্যসূত্র উল্লেখ করা হয়নি। প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করে তাঁর এমন কোনো বক্তব্য অনলাইনে পাওয়া যায়নি।
একটি ফেসবুক পেজে ২২ জুন আলোচিত মূল ফটোকার্ডটি পোস্ট হতে দেখা যায়।
পেজটির নাম ও প্রোফাইল ছবি পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট যে এটি একটি ব্যঙ্গাত্মক নাম। এ ছাড়া পেজটি পর্যবেক্ষণ করলে এরূপ আরও নানা ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট পাওয়া যায়। এ থেকে স্পষ্ট যে আলোচিত পোস্টটিও মূলত ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট হিসেবেই তৈরি করা হয়েছে।
ফেসবুকের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ১৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ছড়িয়ে ক্যাপশনে দাবি করা হয়েছে, ‘সেনাবাহিনী সাহসী পদক্ষেপ..আগামীকাল ২৩শে জুন আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি ঘিরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে।’
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক
ভিডিওতে একজন সেনাসদস্যকে বলতে শোনা যায়, ‘বাংলাদেশ আর্মি একদম স্পষ্ট ভাষায় বলে দিচ্ছে, বাংলাদেশ আর্মি জাস্টিসের পক্ষে। যেটা জাস্টিস হবে, সেটার পক্ষে আমরা থাকব। ইনসাফ, নো কমপ্রোমাইজ উইথ ইনসাফ, কামস হোয়াটস হু মে বি, জাস্টিসের পক্ষে আমরা অবশ্যই অবশ্যই স্ট্যান্ডফার্স্ট এবং দৃঢ়।’
যাচাই করতে গিয়ে গত বছরের অক্টোবর মাসে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ভিডিওটি পাওয়া যায়। ওই ভিডিওর শেষের দিকের বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমানে ছড়ানো ভিডিওর হুবহু মিল রয়েছে।
তবে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলায় ২৫ জন সেনা কর্মকর্তার বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সেনা সদর দপ্তরের অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামানের বক্তব্য এটি। তিনি ২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর ঢাকা সেনানিবাসে সংবাদ সম্মেলনে এই কথা বলেছিলেন।
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক
অর্থাৎ পুরোনো সংবাদ সম্মেলনের খণ্ডিত একটি অংশকে আওয়ামী লীগের কর্মসূচির সঙ্গে জড়িয়ে এখন ভিডিওটি নতুন করে ছড়ানো হচ্ছে।
১৩ সেকেন্ডের আরেকটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে একই দাবি করা হচ্ছে। ভিডিওতে এক সেনাসদস্যকে বলতে শোনা যায়, সেনাবাহিনী কোনো ব্যক্তি বা দলের পক্ষে নয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সব সময় ন্যায়ের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিপক্ষে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের পক্ষে।
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক, চতুর্থ লিংক, পঞ্চম লিংক
অনুসন্ধানে বেসরকারি টেলিভিশন নাগরিক টিভির ইউটিউব চ্যানেলে একটি ভিডিও পাওয়া যায়। গত বছরের ৭ নভেম্বরে প্রকাশিত ওই ভিডিওর শিরোনাম, ‘গাজীপুরে শীর্ষ স/ন্ত্রা/সীর গ্রেপ্তার নিয়ে নতুন করে যা জানালো সেনাবাহিনী’। সেই ভিডিওর একটি অংশের সঙ্গে এখন ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির হুবহু মিল পাওয়া যায়।
প্রথম লিংক, দ্বিতীয় লিংক, তৃতীয় লিংক
তবে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গাজীপুরে ‘চিহ্নিত সন্ত্রাসী’ এনামুল হক মোল্লাকে গ্রেপ্তারের ঘটনাকে ঘিরে অপপ্রচারের প্রতিবাদ জানিয়ে গাজীপুর সেনা ক্যাম্পে ওই সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. লুৎফর রহমান।
অর্থাৎ এর সঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচির কোনো সম্পর্ক নেই।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সমর্থক বিভিন্ন ফেসবুক প্রোফাইল পেজ থেকে পুরোনো নানা ভিডিও এখনকার দাবি করে ছড়াতে দেখা যায়।
যেমন ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট ২৩ জুন একটি ভিডিও পোস্ট করে দাবি করা হয়, এটি এখনকার কর্মসূচি।
কিন্তু যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওটি ২০২৪ সালের ৬ আগস্টের।
লিংক:
জি এম সাহাবউদ্দিন আজম নামের এক ব্যক্তির ফেসবুক প্রোফাইলে ভিডিওটি তখন পোস্ট করা হয়েছিল। প্রোফাইলে তিনি নিজেকে গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক উল্লেখ করেছেন।
সূত্রটি ধরে কি–ওয়ার্ড সার্চে প্রথম আলোর ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট প্রকাশিত একটি ভিডিও প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়—‘পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ।’
লিংক: