সায়েন্টিফিক আমেরিকানের সেরা তরুণ বিজ্ঞানীর তালিকায় বাংলাদেশের অনন্যা
· Prothom Alo

সায়েন্টিফিক আমেরিকান ম্যাগাজিনের প্রথম ‘ইয়াং আমেরিকান সায়েন্টিস্টস’ তালিকায় স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী তনিমা তাসনিম অনন্যা। এই তালিকায় স্থান পেয়েছেন এমন সব গবেষক, যাঁরা কর্মজীবনের শুরুতেই বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসাধারণ অবদান রাখছেন এবং ভবিষ্যতে নিজেদের ক্ষেত্রকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারেন।
Visit playerbros.org for more information.
এই বিজ্ঞানীদের খুঁজে বের করতে বিশ্বের শত শত খ্যাতিমান গবেষকের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তাঁদের মতে আগামী দিনের বিজ্ঞানকে নেতৃত্ব দেবেন কারা? কারা নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করছেন, যুগান্তকারী আবিষ্কার করছেন এবং আগামী কয়েক দশকের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিকে প্রভাবিত করতে পারেন? এসব প্রশ্নের উত্তর থেকেই তৈরি হয়েছে এই তালিকা। এই তালিকায় স্থান পেয়েছেন বিশ্বের মোট ২৮ জন তরুণ গবেষক।
মনোনীত ব্যক্তিরা বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান কিংবা অলাভজনক সংস্থায় কাজ করতে পারেন। কেউ মৌলিক গবেষণা করছেন, কেউ নতুন প্রযুক্তি বা পণ্য উন্নয়নে কাজ করছেন। তবে একটি বিষয় সবার মধ্যে মিল রয়েছে—তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানচর্চার সঙ্গে যুক্ত। এই ২৮ জন গবেষকের সবাই নিজেদের কর্মজীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছেন। তাঁরা সবাই বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা করছেন।
মহাবিশ্বের অজানা রহস্যের সমাধান খুঁজছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী তনিমা তাসনিম অনন্যা। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েইন স্টেট ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞান ও জ্যোতির্বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। পিএইচডি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল বা অতিভারী কৃষ্ণগহ্বর।
‘কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান থাকতে হবে সব সময়’—তনিমা তাসনিম অনন্যাছোট্ট তাসনিম প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করেন, পৃথিবীর বাইরেও অসংখ্য জগৎ রয়েছে। আমাদের গ্রহটি মহাবিশ্বের তুলনায় কত ক্ষুদ্র, সেটাও তাঁর মনে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
তনিমা তাসনিম অনন্যার বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার গল্পটি বেশ মজার। তাঁর বয়স তখন মাত্র পাঁচ বা ছয় বছর। বাংলাদেশের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠছিলেন তিনি। তাঁর মা গৃহিণী। এক দিন খবরের কাগজে মঙ্গল গ্রহে অবতরণ করা একটি মহাকাশযানের খবর পড়ে তাঁর মা খুব উত্তেজিত হয়ে সেটি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। সেটি ছিল মার্স পাথফাইন্ডার মিশনের সাফল্যের খবর।
মায়ের সেই উচ্ছ্বাস ছোট্ট তাসনিমের মনেও কৌতূহল তৈরি করে। তিনি প্রথমবারের মতো উপলব্ধি করেন, পৃথিবীর বাইরেও অসংখ্য জগৎ রয়েছে। আমাদের গ্রহটি মহাবিশ্বের তুলনায় কত ক্ষুদ্র, সেটাও তাঁর মনে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তখনই তিনি ভাবতে শুরু করেন, পৃথিবীর বাইরে নিশ্চয়ই আরও অনেক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটছে। বিশাল এই মহাবিশ্বে কত অজানা রহস্য ছড়িয়ে আছে!
সেই কৌতূহলই আজ তাঁকে নিয়ে এসেছে কৃষ্ণগহ্বর গবেষণার জগতে। মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় বস্তুগুলোর একটি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করছেন তিনি।
অনন্যা সায়েন্টিফিক আমেরিকানকে বলেন, ‘ঢাকায় বড় হওয়ার সময় লোডশেডিংয়ের সময়গুলোই ছিল তারার দিকে তাকানোর সবচেয়ে ভালো সুযোগ। তখন প্রতিবেশীদের দেখতে পাওয়া যায়, আকাশ দেখতে পাওয়া যায়। আর এভাবেই আকাশের প্রতি মানুষের মুগ্ধতা তৈরি হয়।’
ব্ল্যাকহোলের রহস্য উন্মোচনে বাংলাদেশি বিজ্ঞানীএক দিন খবরের কাগজে মঙ্গল গ্রহে অবতরণ করা একটি মহাকাশযানের খবর পড়ে তাসনিমের মা খুব উত্তেজিত হয়ে সেটি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। সেটি ছিল মার্স পাথফাইন্ডার মিশনের সাফল্যের খবর।
আমাদের ছায়াপথ মিল্কিওয়ের কেন্দ্রে আছে একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল। এর নাম স্যাজিটেরিয়াস এ*। সূর্যের চেয়ে কয়েক মিলিয়ন গুণ বেশি ভরবিশিষ্ট এই কৃষ্ণগহ্বর বর্তমানে তুলনামূলকভাবে শান্ত অবস্থায় আছে। তবে বিজ্ঞানীরা যখন গামা রশ্মি ও এক্সরে পর্যবেক্ষণ করেন, তখন দেখা যায়, ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে বিশাল বিশাল বুদ্বুদের মতো কাঠামো ওপরে ও নিচের দিকে ছড়িয়ে রয়েছে। এসব কাঠামো ইঙ্গিত দেয়, অতীতে এই কৃষ্ণগহ্বর অনেক সক্রিয় ছিল। ভবিষ্যতেও এটি আবার সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
এই বিশাল শক্তির প্রভাব শুধু কৃষ্ণগহ্বরের আশপাশেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি পুরো ছায়াপথের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এটিই অনন্যার গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল কীভাবে ছায়াপথকে প্রভাবিত করে?
ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপের সাহায্যে তোলা স্যাজিটেরিয়াস এ* ব্ল্যাকহোলের ছায়ার প্রথম ছবিযেসব সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল সবচেয়ে দ্রুতগতিতে পদার্থ গ্রাস করে, সেগুলো সৃষ্টি করে অ্যাকটিভ গ্যালাকটিক নিউক্লিয়াস বা এজিএন। ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা এই শক্তিশালী অঞ্চলগুলোকে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বোঝার চেষ্টা করছেন। কারণ, এগুলো এক দিকে নতুন নক্ষত্র ও গ্যালাক্সির বিকাশে ভূমিকা রাখে, অন্যদিকে ধ্বংসাত্মক প্রভাবও ফেলতে পারে।
অনেক সময় এগুলোকে ঘিরে থাকে গ্যাস ও ধূলিকণার বিশাল বলয়, যাকে বলা হয় টোরাস। এই টোরাস অনেকটা পর্দার মতো কাজ করে। ফলে ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রীয় অংশ সরাসরি দেখা কঠিন হয়ে যায়।
এশিয়ার সেরা ১০০ বিজ্ঞানীর তালিকায় বাংলাদেশের ৩ নক্ষত্রবিজ্ঞানীরা যখন গামা রশ্মি ও এক্সরে পর্যবেক্ষণ করেন, তখন দেখা যায়, ছায়াপথের কেন্দ্র থেকে বিশাল বিশাল বুদ্বুদের মতো কাঠামো ওপরে ও নিচের দিকে ছড়িয়ে রয়েছে।
জটিল এই সমস্যার সমাধান খুঁজতে কাজ করছেন অনন্যা। তিনি দৃশ্যমান আলো, অবলোহিত রশ্মি এবং এক্সরে পর্যবেক্ষণ একসঙ্গে বিশ্লেষণ করে এজিএনের বৈশিষ্ট্যগুলো বোঝার চেষ্টা করছেন। তাঁর গবেষণা থেকে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ একটি ধারণা হলো, যে টোরাস ব্ল্যাকহোলকে আড়াল করে রাখে, সেটিই আবার ব্ল্যাকহোলের আচরণ বোঝার একটি কার্যকর সূত্র হতে পারে।
অনন্যার গবেষণায় আরও দেখা গেছে, অ্যাক্রিশন ডিস্ক থেকে নির্গত বিকিরণই সম্ভবত টোরাসের আকার ও অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্র এবং তাকে ঘিরে থাকা গ্যাস-ধূলার বলয়ের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে সায়েন্টিফিক আমেরিকানকে অনন্যা বলেন, ‘এগুলো সত্যিই দানবাকার। যে ছায়াপথে এরা অবস্থান করে, সেই ছায়াপথের বিকাশে এদের বড় প্রভাব রয়েছে। মনে হয় ব্ল্যাকহোল এবং ছায়াপথ একসঙ্গে বিবর্তিত হয়। কিন্তু এদের এই সম্পর্কের অনেক দিক এখনো রহস্যে ঘেরা।’
তরুণ এই বিজ্ঞানীদের হাত ধরেই হয়তো তৈরি হবে আগামী দিনের বড় আবিষ্কার, নতুন চিকিৎসা, উন্নত প্রযুক্তি কিংবা মহাবিশ্ব সম্পর্কে আরও গভীর বোঝাপড়া। এ কারণেই তাঁদের বলা হচ্ছে আগামীর বড় বিজ্ঞানী।
লেখক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, কিশোর আলোসূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকানঅন্ত্রের জটিল রোগের চিকিৎসায় বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর নতুন গবেষণা