মমতা-শারদ পাওয়ার কি আবার কংগ্রেসে ফিরবেন, ভারতের রাজনীতিতে হঠাৎ কেন এ আলোচনা
· Prothom Alo

ভাঙনের ফলে তৃণমূল, শিবসেনা ও এনসিপির মতো আঞ্চলিক দলগুলো বর্তমানে রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে।
দুর্বল বিরোধী শিবিরের সুযোগ নিয়ে বিজেপি সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে দল ভাঙার রাজনীতি শুরু করেছে।
Visit umafrika.club for more information.
অস্তিত্ব রক্ষার্থে মমতা ও শারদ পাওয়ারের মতো একসময়ের কংগ্রেসি নেতাদের আবার কংগ্রেসে ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
দলগুলো কংগ্রেসে ফিরলে পুরোনো ক্ষোভ ভুলে তৃণমূল কর্মীদের মেলবন্ধন ও রাহুলের নেতৃত্ব মেনে নেওয়াটাই প্রধান চ্যালেঞ্জ।
২০২৪ সালের ভারতের লোকসভা নির্বাচনের প্রচারের সময় শারদ পাওয়ার একটি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বেশ কয়েকটি আঞ্চলিক দল কংগ্রেসের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে অথবা তারা কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যাওয়ার কথাও ভাবতে পারে।’
মহারাষ্ট্রের শহর সাতারায় গভীর রাতে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শারদ পাওয়ার এ কথা বলেছিলেন। তখন আমি তাঁর নিজের দল ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির (শারদচন্দ্র পাওয়ার) কথা জানতে চেয়েছিলাম। জবাবে পাওয়ার বলেছিলেন, তিনি তাঁর দল ও কংগ্রেসের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখেন না।
শারদ পাওয়ারের এ সাক্ষাৎকার বেশ সাড়া ফেলেছিল। কারণ, তিনি কখনোই না ভেবেচিন্তে কথা বলেন না। তাঁর প্রতিটি কথা হয় মাপা এবং তিনি খুব ভেবেচিন্তে সময় বেছে নিয়ে কথা বলেন। কংগ্রেস এ কথায় কেমন প্রতিক্রিয়া দেখায়, মূলত সেটা যাচাই করতেই তিনি এ কৌশল নিয়েছিলেন।
এক বছর আগেই এনসিপি দুই ভাগ হয়ে যায়। দলের বড় অংশটি তাঁর ভাতিজা (বর্তমানে প্রয়াত) অজিত পাওয়ারের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। তাই প্রবীণ নেতা শারদ পাওয়ার হয়তো রাজ্যের আসন্ন নির্বাচনে পরিস্থিতি নিজের অনুকূলে আনার আশা করেছিলেন। পাশাপাশি জাতীয় রাজনীতিতে আরও বড় কোনো ভূমিকা পালনের সুযোগ খুঁজছিলেন।
কয়েক মাস পর, আমি এমন একজনের সঙ্গে কথা বলি, যিনি পাওয়ারের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। আমি জানতে চেয়েছিলাম, পাওয়ারের সেই ভাবনার কী হলো। তাঁর উত্তর ছিল খুবই ছোট, কংগ্রেসের পক্ষ থেকে কোনো সাড়াই পাওয়া যায়নি।
লোকসভা নির্বাচনে ৯৯টি আসন পেয়ে কংগ্রেস যে ভালো একটা অবস্থানে গিয়েছিল, তারা সেটাকে কাজে লাগায়নি। কংগ্রেস যদি শারদ পাওয়ার ও তাঁর মাধ্যমে অন্য আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করত, তবে হয়তো এ সুযোগ কাজে লাগানো যেত।
যদি কংগ্রেস এটা করত, তাহলে কি হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র ও দিল্লির বিধানসভা নির্বাচনের ফল অন্য রকম হতো? কারণ, এসব নির্বাচনের জয় বিজেপিকে নতুন করে প্রাণশক্তি জুগিয়েছে। কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা সম্ভবত শারদ পাওয়ারের প্রতি তাঁদের পুরোনো অবিশ্বাস কাটিয়ে উঠতে পারেননি। কারণ, পাওয়ার ১৯৭৮ সালে প্রথমবার কংগ্রেস ছেড়েছিলেন। পরে ১৯৮৬ সালে ফিরে এলেও ১৯৯৯ সালে সোনিয়া গান্ধীর বিদেশি নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি আবার দল ছাড়েন এবং এনসিপি গঠন করেন।
আর এখন, ঠিক দুই বছর পর পাওয়ারের সেই ভবিষ্যদ্বাণী যেন নতুন করে জীবন পেতে চলেছে। আঞ্চলিক দলগুলো এখন বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং বিজেপি দ্রুত তাদের আধিপত্য বিস্তার করছে। নতুন করে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠা শাসক দল বিজেপি এখন সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে মরিয়া। এ জন্য তারা বিরোধী দলগুলোতে ভাঙন ধরাতে উৎসাহ দিচ্ছে।
একসময়ের অজেয় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু পশ্চিমবঙ্গে হারেননি, তাঁর দলও বিস্ময়কর দ্রুতগতিতে ভেঙে পড়ছে। তাঁর দলের দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক এবং লোকসভার সদস্যরা তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন।
দলত্যাগবিরোধী আইনের হাত থেকে বাঁচতে লোকসভার তৃণমূলদলীয় ২০ জন বিদ্রোহী সংসদ সদস্য ‘এনসিপিআই’ নামে একটি অখ্যাত দলের সঙ্গে মিশে গেছেন। তাঁরা স্পষ্টভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা এখন বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটকে সমর্থন করবেন।
অন্যদিকে পশ্চিম ভারতে শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে) হঠাৎ করেই নতুন করে ভাঙনের মুখে পড়েছে বলে গুঞ্জন উঠেছে। গত রোববার উদ্ধব ঠাকরের ডাকা একটি বৈঠকে দলের নয়জন লোকসভা সদস্যের মধ্যে পাঁচজনই উপস্থিত ছিলেন না।
শারদ পাওয়ারের দল এনসিপিতেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। দলের লোকসভার আট সংসদ সদস্যের মধ্যে অনেকেই অজিত পাওয়ারের এনসিপির সঙ্গে আবার যোগ দেওয়ার আশা করছিলেন। কিন্তু চলতি বছরের শুরুতে এক উড়োজাহাজ দুর্ঘটনায় ‘অজিত দাদা’র মৃত্যু হওয়ায় সেই প্রক্রিয়া থমকে যায়।
বিজেপি এখন আসন সীমানা নির্ধারণ বিল পাস করাতে এবং নারী সংরক্ষণ আইন কার্যকর করতে চায়। এ জন্য তারা ডিএমকে দলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। অভিনেতা বিজয়ের দল টিভিকের সঙ্গে হাত মেলানোয় ডিএমকে এখন কংগ্রেসের ওপর ক্ষুব্ধ।
এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, বিজেপি নীরবে ডিএমকে নেতাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। ২২ জন লোকসভা সদস্য থাকা এই দ্রাবিড় দলটিকে নিজেদের পক্ষে টানতে বিজেপি আসন সীমানা নির্ধারণ বিলগুলোতেও পরিবর্তন আনছে।
এসব ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে কংগ্রেস ৮ জুন ‘ইন্ডিয়া’ জোটের বৈঠক ডাকে। দুই বছর পর এ বৈঠক হলো। বিরোধী জোট নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আগে খুব একটা আগ্রহ ছিল না। কিন্তু এবার তাঁকে সোনিয়া গান্ধীকে আন্তরিকভাবে জড়িয়ে ধরতে দেখা যায়।
এরপর হঠাৎ করেই এমন গুঞ্জন ছড়ায়, মমতা ও শারদ পাওয়ার তাঁদের দুর্বল হয়ে পড়া দলগুলোকে কংগ্রেসের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে পারেন। কংগ্রেস ও তৃণমূলের মুখপাত্ররা এ খবর অস্বীকার করেছেন। তবে রাজস্থানের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট বলেছেন, যাঁরা একসময় কংগ্রেসের অংশ ছিলেন, তাঁদের সবার এখন ‘ঘর ওয়াপসি’ (ঘরে ফেরা) প্রয়োজন।
শারদ পাওয়ারের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত শিবসেনা (উদ্ধব ঠাকরে) নেতা সঞ্জয় রাউতও একই ধরনের কথা বলেছেন। পাওয়ারের নাতি (সম্পর্কে) ও এনসিপি নেতা রোহিত পাওয়ারও এ সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। তিনি বলেছেন, ‘সঠিক সময়ে এক হয়ে যাওয়াটা অবশ্যই সম্ভব।’
প্রশ্ন থেকেই যায়
এই ‘ঘরে ফেরা’র ধারণাটি বেশ আকর্ষণীয়। এটি মানুষের মনোজগতে একটি বড় প্রভাবও ফেলবে। কিন্তু এটি বাস্তবে কতটা সম্ভব? যেসব ছেলেমেয়ে নিজেদের পথ নিজেরাই তৈরি করবে বলে ঘর ছেড়েছিল, তারা আবার ঘরে ফিরলে কি তাদের খোলা হাতে স্বাগত জানানো হবে? বিষয়টা কতটা কাজে দেবে?
কারণ, দল ভাঙা বা ছাড়া সব সময়ই খুব সহজ। কিন্তু পুরোনো রাগ, ক্ষোভ ও অপমান ভুলে গিয়ে আবার পুরোনো জায়গায় ফিরে আসাটা অনেক বেশি কঠিন।
মমতা বা পাওয়ার কি এখন রাহুল গান্ধীর অধীনে কাজ করতে পারবেন? যদিও নিয়ম অনুযায়ী তাঁদের কাজ করতে হবে দলীয় সভাপতি ও প্রবীণ নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গের অধীনে।
এসব নেতাকে কি নিজেদের রাজ্যে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা দেওয়া হবে? আরও বড় প্রশ্ন হলো, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যেসব কর্মী একে অপরের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ ও কাদা–ছোড়াছুড়ি করেছেন, তাঁরা কি এখন এত সহজে একে অপরকে মেনে নিতে পারবেন?
মমতা ১৯৯৮ সালে এবং শারদ পাওয়ার তার পরের বছর কংগ্রেস ছেড়েছিলেন। তাঁরা ছাড়াও অন্ধ্র প্রদেশে ওয়াই এস জগন মোহন রেড্ডির ‘ওয়াইএসআর কংগ্রেস’ রয়েছে। জগনের বাবা ও অন্ধ্র প্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই এস রাজশেখর রেড্ডির মৃত্যুর পর ২০১০ সালে তাঁরা কংগ্রেস থেকে আলাদা হয়ে যান।
এ ছাড়া জনতা দলের বিভিন্ন অংশের মধ্যেও কংগ্রেসের আদর্শ বা ডিএনএ রয়েছে। তবে শিবসেনা, আম আদমি পার্টি, সমাজবাদী পার্টি বা রাষ্ট্রীয় জনতা দলের (আরজেডি) ক্ষেত্রে বিষয়টি এমন নয়। শেষের দুটি দলের রাজনীতি মূলত পুরোনো দিনের সমাজতন্ত্রীদের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে।
দলগুলো এক হয়ে যাক বা না যাক, সাতারায় শারদ পাওয়ার যে ‘ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক’ গড়ে তোলার কথা বলেছিলেন, সেটা করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে। আসন ধরে ধরে সমঝোতা করলে এমন সম্পর্ক তৈরি করা সম্ভব।
মমতা কংগ্রেসে ফিরে যাবেন কি না, তা সাধারণ মানুষের সহানুভূতির ওপর নির্ভর করবে। সবচেয়ে খারাপ সময়ে তাঁর দলের নেতারাই তাঁর সঙ্গে যে আচরণ করেছেন, তাতে তিনি মানুষের মনে কতটা ও কত দ্রুত সহানুভূতি তৈরি করতে পারেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়। আর এ পরিস্থিতিকে তিনি কীভাবে নিজের পক্ষে কাজে লাগাবেন, তার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করছে।
লেখক পরিচিতি: নীরজা চৌধুরী দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের কন্ট্রিবিউটিং এডিটর।
তিনি ১৬ জুন এই সংবাদমাধ্যমে লেখাটি লিখেছেন।