বৃত্তাকার অর্থনীতি: টেকসই উন্নয়নের এক নতুন দিগন্ত

· Prothom Alo

বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং ব্যবহারের মাত্রা বৃদ্ধির ফলে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর দিন দিন চাপ বেড়েই চলেছে। একই সঙ্গে বাড়ছে বর্জ্য, দূষণ এবং পরিবেশগত ঝুঁকি। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত অর্থনৈতিক মডেল ছিল—প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ, পণ্য উৎপাদন, ব্যবহার এবং শেষে তা বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া। এই ‘নাও-তৈরি করো-ফেলে দাও’ পদ্ধতি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে ভূমিকা রাখলেও এটি দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য টেকসই নয়। এই বাস্তবতা থেকে বিশ্ব এখন বৃত্তাকার অর্থনীতি বা সার্কুলার ইকোনমি ধারণার দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

বৃত্তাকার অর্থনীতি এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে পণ্য, উপকরণ এবং সম্পদকে যত দীর্ঘ সময় সম্ভব ব্যবহারের মধ্যে টিকিয়ে রাখা হয় এবং বর্জ্য উৎপাদনকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। অর্থাৎ কোনো পণ্য ব্যবহারের পর সেটি সরাসরি ফেলে না দিয়ে পুনর্ব্যবহার, মেরামত ও পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে তার জীবনকাল বৃদ্ধি করা হয়। ফলে একই সম্পদ বারবার ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয় এবং নতুন কাঁচামালের প্রয়োজনীয়তা কমে আসে।

Visit sport-newz.biz for more information.

একটি সাধারণ উদাহরণ হলো প্লাস্টিকের বোতল। প্রচলিত ব্যবস্থায় ব্যবহারের পর এটি বর্জ্যে পরিণত হয়। কিন্তু বৃত্তাকার অর্থনীতিতে সেই বোতল সংগ্রহ করে রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে নতুন পণ্য তৈরি করা হয়। একইভাবে পুরোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, ধাতু, কাগজ, বস্ত্র এবং জৈব বর্জ্যও নতুন নতুন সম্পদে রূপান্তরিত হতে পারে। ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুধু পরিচ্ছন্নতার বিষয় থাকে না; এটি অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত হয়।

যে গাণিতিক সমস্যার সমাধান হলে নড়বড়ে হয়ে যাবে বিশ্বের অর্থনীতি
বৃত্তাকার অর্থনীতি একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে পণ্য, উপকরণ এবং সম্পদকে যত দীর্ঘ সময় সম্ভব ব্যবহারের মধ্যে টিকিয়ে রাখা হয় এবং বর্জ্য উৎপাদনকে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়।

বৃত্তাকার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সুবিধা হলো প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা। পৃথিবীর খনিজ, জ্বালানি ও অন্যান্য কাঁচামাল সীমিত। অথচ ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও শিল্পায়নের কারণে এসব সম্পদের চাহিদা বেড়েই চলেছে। পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে সম্পদের ব্যবহার হ্রাস করা গেলে নতুন সম্পদ আহরণের প্রয়োজনীয়তা কমবে এবং পরিবেশের ওপরও চাপ হ্রাস পাবে।

এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায়ও বৃত্তাকার অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন কাঁচামাল সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উৎপাদনের তুলনায় পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহার করলে সাধারণত কম শক্তি প্রয়োজন হয় এবং কম কার্বন নিঃসরণ ঘটে। ফলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব প্রশমনে সহায়তা করে।

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও বৃত্তাকার অর্থনীতি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। এটি নতুন শিল্প, উদ্যোক্তা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। বর্জ্য সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহার, মেরামত, পুনর্নির্মাণ এবং সম্পদ পুনরুদ্ধারভিত্তিক শিল্পগুলো একটি দেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। অনেক দেশ ইতিমধ্যে বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন করছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বৃত্তাকার অর্থনীতির গুরুত্ব আরও বেশি। আমাদের দেশে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক, খাদ্য, কৃষি ও ইলেকট্রনিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এসব বর্জ্যের একটি বড় অংশ যথাযথভাবে ব্যবস্থাপিত হয় না; ফলে পরিবেশদূষণ, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং সম্পদের অপচয় ঘটে। এসব বর্জ্যকে যদি বৈজ্ঞানিক উপায়ে পুনর্ব্যবহার ও পুনর্চক্রায়নের আওতায় আনা যায়, তাহলে এক দিকে পরিবেশ সুরক্ষিত হবে, অন্যদিকে নতুন অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

প্লাস্টিক রিসাইকেল করে কি কোনো লাভ হচ্ছে
নতুন কাঁচামাল সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং উৎপাদনের তুলনায় পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণ ব্যবহার করলে সাধারণত কম শক্তি প্রয়োজন হয় এবং কম কার্বন নিঃসরণ ঘটে।

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও বৃত্তাকার অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষ করে দায়িত্বশীল ব্যবহার ও উৎপাদন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, টেকসই শিল্পায়ন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সর্বোপরি, বৃত্তাকার অর্থনীতি কেবল একটি পরিবেশগত ধারণা নয়; এটি একটি সমন্বিত উন্নয়ন দর্শন। সীমিত সম্পদের পৃথিবীতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন এবং সমৃদ্ধ পৃথিবী গড়ে তুলতে হলে উৎপাদন ও ব্যবহারের বর্তমান ধারা পরিবর্তন করতে হবে। বর্জ্যকে সমস্যা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। আর সেই পরিবর্তনের অন্যতম কার্যকর পথ হতে পারে বৃত্তাকার অর্থনীতি।

লেখক: বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ রেফারেন্স ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল মেজারমেন্টস (বিআরআইসিএম)বিশ্বব্যাপী প্লাস্টিক দূষণ

Read full story at source