হাঁটার সময় আমরা কি আসলেই বারবার সামনে পড়ে যাই
· Prothom Alo

পাঠকের লেখা
কখনো কি ভেবে দেখেছেন, আমরা আসলে কীভাবে হাঁটি? শুনতে যতই অদ্ভুত লাগুক না কেন, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে হাঁটা মানে হলো ক্রমাগত সামনের দিকে পড়ে যাওয়া এবং নিজেকে আটকে ফেলা! হ্যাঁ, বিজ্ঞানীদের মতে হাঁটার এই পুরো প্রক্রিয়ার নাম নিয়ন্ত্রিত পতন বা ইংরেজিতে কন্ট্রোলড ফলিং।
কিন্তু কীভাবে ঘটে এই নিয়ন্ত্রিত পতন? আমরা যখন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, তখন আমাদের শরীরের ভরকেন্দ্র থাকে ঠিক আমাদের পেলভিসের কাছাকাছি, দুই পায়ের ঠিক মাঝখানে। এই ভরকেন্দ্রের কারণেই আমরা নিখুঁত ভারসাম্য বজায় রাখতে পারি। কিন্তু যখনই আমরা হাঁটার জন্য পা বাড়াই, ভরকেন্দ্রটি সামান্য সামনের দিকে সরে যায়। এই অবস্থায় পৃথিবীর মহাকর্ষ বল আমাদের সামনের দিকে টেনে নিচে ফেলে দিতে চায়। সহজ কথায়, আপনি তখন আক্ষরিক অর্থেই মাটিতে পড়তে শুরু করেন।
Visit biznow.biz for more information.
আমরা যখন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, তখন আমাদের শরীরের ভরকেন্দ্র থাকে ঠিক আমাদের পেলভিসের কাছাকাছি, দুই পায়ের ঠিক মাঝখানেকিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র ও পেশিগুলোর স্বয়ংক্রিয় যোগাযোগব্যবস্থা এতই দ্রুত যে আমরা সচেতনভাবে কিছু ভাবার আগেই শূন্যে থাকা পা সামনের মাটিতে আছড়ে পড়ে শরীরকে আটকে দেয়। পতন ঠেকিয়ে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে। এরপর ভরকেন্দ্র আবার সামনে এগোয়, আবার আমরা পড়ে যেতে উদ্যত হই এবং অন্য পা এসে আমাদের পতন ঠেকায়। এই পড়ে যাওয়া এবং সামলে নেওয়ার অবিরাম চক্রই হলো হাঁটা।
হাঁটা ভালো, না দৌড়ানো ভালোআমাদের মস্তিষ্ক, স্নায়ুতন্ত্র ও পেশিগুলোর স্বয়ংক্রিয় যোগাযোগব্যবস্থা এতই দ্রুত যে আমরা সচেতনভাবে কিছু ভাবার আগেই শূন্যে থাকা পা সামনের মাটিতে আছড়ে পড়ে শরীরকে আটকে দেয়।
ধরুন, একটি টেবিলের ওপর আপনি একটি কলম খাড়া করে দাঁড় করিয়ে রাখলেন। কলমটি সামান্য কাত হলেই মাধ্যাকর্ষণ তাকে টেনে নিচে ফেলে দেবে। আমাদের শরীরও হাঁটার সময় ঠিক সেভাবেই সামনের দিকে কাত হয়ে যায়। কিন্তু কলম একটি জড়বস্তু, তার নিজেকে সামলানোর কোনো ক্ষমতা নেই। আমাদের সেই ক্ষমতা আছে। তাই মুখ থুবড়ে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তেই আমরা পা বাড়িয়ে নতুন একটি অবলম্বন তৈরি করে ফেলি।
হাঁটা আপাতদৃষ্টিতে পায়ের কাজ মনে হলেও এর পেছনে পুরো শরীরের এক নিখুঁত অর্কেস্ট্রা কাজ করে। আমাদের চোখ চারপাশের পরিবেশ ও রাস্তার গভীরতা মাপে। কানের ভেতরের ভেস্টিবুলার সিস্টেম মাথার অবস্থান ও শরীরের ব্যালান্স সম্পর্কে মস্তিষ্ককে প্রতিনিয়ত সিগন্যাল দেয়।
মস্তিষ্কের পেছনের অংশ সেরিবেলামএর পাশাপাশি আমাদের পেশি ও অস্থিসন্ধিতে থাকা প্রোপায়োসেপ্টর সেন্সরগুলো শরীরের কোন অঙ্গ ঠিক কোথায় আছে, তা মস্তিষ্ককে জানায়।
মস্তিষ্কের পেছনের অংশ, যাকে আমরা সেরিবেলাম বা লঘুমস্তিষ্ক বলি, সে এই বিপুল তথ্য সেকেন্ডের ভগ্নাংশে বিশ্লেষণ করে। কোন পেশি কতটা সংকুচিত হবে, পা ঠিক কোথায় গিয়ে পড়বে; এই সব সিদ্ধান্ত সে এতটাই দ্রুত ও নিখুঁতভাবে নেয় যে আমাদের তা টেরই পেতে হয় না।
বিজ্ঞানের ভাষায় মানুষের এই হাঁটার মেকানিজমকে বলা হয় ইনভার্টেড পেন্ডুলাম। একটি সাধারণ দোলকের ভর থাকে নিচের দিকে ঝুলন্ত অবস্থায়। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে ভরকেন্দ্র থাকে ওপরে আর পা নিচে অক্ষ হিসেবে কাজ করে।
ঘুমের মধ্যে হাঁটা!আমাদের চোখ চারপাশের পরিবেশ ও রাস্তার গভীরতা মাপে। কানের ভেতরের ভেস্টিবুলার সিস্টেম মাথার অবস্থান ও শরীরের ব্যালান্স সম্পর্কে মস্তিষ্ককে প্রতিনিয়ত সিগন্যাল দেয়।
এই মডেলের সবচেয়ে দারুণ দিক হলো এর শক্তির সাশ্রয়। একটি দোলক যেমন গতিশক্তি ও স্থিতিশক্তির ক্রমাগত রূপান্তরের মাধ্যমে দুলতে থাকে, আমাদের শরীরও হাঁটার সময় পেশির শক্তি খুব কম খরচ করে এই দুই শক্তির রূপান্তরের মাধ্যমে সামনে এগোয়।
আপনি যত দ্রুত হাঁটবেন, ভরকেন্দ্র তত দ্রুত সামনে এগোবে এবং পতন ঠেকাতে আপনাকে তত দ্রুত পা ফেলতে হবে। তবে দৌড়ানোর মেকানিজম আবার ভিন্ন। দৌড়ের সময় এমন একটি পর্যায় আসে, যাকে ফ্লাইট ফেজ বলে।
আপনি যত দ্রুত হাঁটবেন, ভরকেন্দ্র তত দ্রুত সামনে এগোবে এবং পতন ঠেকাতে আপনাকে তত দ্রুত পা ফেলতে হবেধরুন, আপনি বেশ দ্রুত হাঁটছেন এবং হঠাৎ ইটের সঙ্গে আপনার পা আটকে গেল। এই অবস্থায় কী হবে? আপনার পা সামনের দিকে এগোতে বাধা পেল ঠিকই, কিন্তু গতির জড়তার কারণে আপনার শরীরের ভরকেন্দ্র ঠিকই সামনের দিকে এগোতে থাকবে। পা যেহেতু পতন ঠেকানোর জন্য আর সামনে যেতে পারছে না, তাই ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যাবে এবং আপনি সত্যিই মাধ্যাকর্ষণের টানে সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়বেন। এ কারণেই হোঁচট খেলে আমরা সব সময় সামনের দিকেই পড়ে যাই।
লেখক: শিক্ষার্থী, এইচএসসি ব্যাচ ২৪, সরকারি কেশব চন্দ্র কলেজ, ঝিনাইদহসূত্র: ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন, ইউএসএ; জার্নাল অব এক্সপেরিমেন্টাল বায়োলজি; কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্টমানুষ এখন ৪০ বছর আগের তুলনায় দ্রুত হাঁটে, কেন জানেন