ক্ষুদ্রঋণ খাতের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা: বাজেট পরিপ্রেক্ষিত
· Prothom Alo
ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ) ও প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘ক্ষুদ্রঋণ খাতের চ্যালেঞ্জ ও প্রত্যাশা: বাজেট ২০২৬-২৭ পরিপ্রেক্ষিত’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় ৯ জুন ২০২৬ ঢাকার প্রথম আলো কার্যালয়ে।
অংশগ্রহণকারী:
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান
Visit amunra-opinie.pl for more information.
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা; নির্বাহী চেয়ারম্যান, পিপিআরসি;
ড. মো. আব্দুল করিম
নির্বাহী পরিচালক, ইউসেপ ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পিকেএসএফ;
মুর্শেদ আলম সরকার
চেয়ারম্যান, ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ) ও প্রধান নির্বাহী, পপি;
মো. এনামুল হক
জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা, পল্লী মঙ্গল কর্মসূচি (পিএমকে);
দেওয়ান এ এইচ আলমগীর
উন্নয়ন খাত বিশেষজ্ঞ;
এডভিন বরুণ ব্যানার্জি
নির্বাহী পরিচালক, পিদিম ফাউন্ডেশন;
দৌলত আকতার
সভাপতি, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ);
রাসেল আহম্মেদ লিটন
নির্বাহী প্রধান, এসকেএস ফাউন্ডেশন;
মো. সহিদ উল্লাহ্
প্রধান নির্বাহী, দিশা;
মো. সাজ্জাদ হোসেন
নির্বাহী পরিচালক, ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ);
সঞ্চালক: ফিরোজ চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক, প্রথম আলো।
ড. হোসেন জিল্লুর রহমান
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা; নির্বাহী চেয়ারম্যান, পিপিআরসি
দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক পরিবর্তনের অন্যতম অংশীদার হচ্ছে ক্ষুদ্রঋণ খাত। চার কোটি গ্রাহকের এই খাতে তিন লাখ কোটি টাকা ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ হয়েছে। এটি প্রায় ১৬ থেকে ১৮ বিলিয়ন ডলারের সমান। এই সংখ্যা বিশাল। মূল্য সংযোজন বাদ দিলে আমাদের তৈরি পোশাক খাতের আকার ২০ বিলিয়ন ডলারের কিছুটা বেশি। আর প্রবাসী আয়ের পরিমাণও কাছাকাছি। সে হিসাবে ক্ষুদ্রঋণ খাত তৈরি পোশাক ও প্রবাসী আয়ের প্রায় সমপর্যায়ের একটি খাত। যদিও প্রবৃদ্ধির আলোচনায় প্রথম দুটি খাত যেভাবে গুরুত্ব পায়, ক্ষুদ্রঋণ খাত সেভাবে আলোচনায় আসেনি। অর্থনৈতিক রূপান্তর, কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়নের বিবেচনায় ক্ষুদ্রঋণ খাতকে প্রবৃদ্ধির নতুন চালক হিসেবে নিতে হবে।
ক্ষুদ্রঋণ খাতের প্রচার ও ব্র্যান্ডিংয়ের ঘাটতিতে ভুগছে। ‘এনজিও’ শব্দের পরিবর্তে ‘এমএফআই’ (মাইক্রোফাইন্যান্স ইনস্টিটিউশন) বা ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান শব্দটিকে সামনে আনা এবং খাতটির শক্তি, দুর্বলতা, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করতে একটি হালনাগাদ স্বাধীন মূল্যায়ন জরুরি।
বাংলাদেশ বর্তমানে একধরনের অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণ বা টার্নিং পয়েন্টে রয়েছে। করোনা মহামারি ও ধারাবাহিক বৈশ্বিক সংকটের ধাক্কায় শুধু জাতীয় অর্থনীতিই নয়, ক্ষুদ্রঋণ অর্থনীতিও একটি কঠিন সময় পার করছে। নতুন সরকার লক্ষ কোটি (ট্রিলিয়ন) ডলারের অর্থনীতির কথা বলছে। কিন্তু যারা পরিবর্তন আনতে পারে, মাঠপর্যায়ের সেই প্রকৃত অংশীজনদের আমরা যদি ক্ষমতায়িত না করতে পারি, তাহলে লক্ষ কোটি ডলারের স্বপ্ন কাগজেই থেকে যাবে। নীতিগত সহায়তা, আর্থিক সহযোগিতা ও কৌশলগত স্বীকৃতির মাধ্যমে এই অংশীজনদের সামনে নিয়ে আসতে হবে।
একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতিও বদলে গেছে। আমি একে ‘নিউ রুরাল’ বা ‘নতুন গ্রামীণ অর্থনীতি’ বলি। নতুন গ্রামীণ অর্থনীতির ধারণায় একাধারে গ্রাম, ছোট শহর, উন্নত যোগাযোগ, মূল্য সংযোজন ও বৈশ্বিক বাজার সংযোগ—সব যুক্ত হয়েছে। এই পরিবর্তনগুলোকে গবেষণার মাধ্যমে সামনে আনা প্রয়োজন। জলবায়ু অর্থায়ন, ফসল বিমা, কৃষিতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় ক্ষুদ্রঋণ খাতের আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
সত্তরের দশকে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম মুড়ি বিক্রির মতো ‘টুকটাক অর্থনীতি’র মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু এখন তা বড় ব্যবসা ও গতিশীল কৃষিতে রূপ নিয়েছে। দেশের ৮৫ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতের মানুষের কাছে ব্যাংকের মতো আনুষ্ঠানিক খাত পুরোপুরি পৌঁছাতে পারে না। কিন্তু ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো এই কাজ সহজে করতে পারে। এটি ক্ষুদ্রঋণ খাতের মূল প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি। সরকারের উচিত হবে গ্রামীণ ও প্রান্তিক মানুষের জন্য তাদের বিভিন্ন উদ্যোগে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে জোরালোভাবে সম্পৃক্ত করা।
ড. মো. আব্দুল করিম
নির্বাহী পরিচালক, ইউসেপ; সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পিকেএসএফ
ঋণ একটি দেশের অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা। বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য ক্ষুদ্রঋণ খাতের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। গত কয়েক দশকে ক্ষুদ্র অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাস ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে এ খাতের গ্রাহক ৪ কোটির বেশি, বছরে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ হচ্ছে এবং আদায়ের হার ৯৭-৯৮ শতাংশের বেশি। গ্রাহকদের ৮০-৮৫ শতাংশ নারী হওয়ায় নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও এ খাতের অবদান উল্লেখযোগ্য।
ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু ঋণ বিতরণেই সীমাবদ্ধ নয়। কিশোরী ক্লাব, বাল্যবিবাহ ও যৌতুকবিরোধী কার্যক্রম, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশন ঋণ, গৃহঋণ, জলবায়ু অভিযোজনসহ নানা সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে তারা অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরে ভূমিকা রাখছে।
ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাত বর্তমানে দেশের জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশে অবদান রাখছে। অর্থনৈতিক শুমারি অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১ কোটি ১৭ লাখ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ৯২ শতাংশই কুটির ও মাইক্রো উদ্যোগ। দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৫৬ শতাংশ এ খাত সৃষ্টি করে। কিন্তু তহবিলঘাটতি, নিম্ন প্রযুক্তির ব্যবহার, আন্তর্জাতিক মান সনদের অভাব এবং মূল্য সংযোজনের সীমাবদ্ধতা এ খাতের বিকাশে বড় বাধা হয়ে আছে।
ক্ষুদ্রঋণের সুদহার নিয়ে সমালোচনা থাকলেও এর প্রধান কারণ উচ্চ পরিচালন ব্যয়। তৃণমূল পর্যায়ে সেবা পৌঁছানো, ছোট অঙ্কের ঋণ ব্যবস্থাপনা ও কিস্তি আদায়ের কারণে এই ব্যয় ১০ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত হয়। তবে ডিজিটালাইজেশন ও মোবাইলে আর্থিক সেবার বিস্তারের মাধ্যমে এই ব্যয় কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা কমাতে দ্রুত সমন্বিত সিআইবি ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
আসন্ন বাজেটে ক্ষুদ্র অর্থায়ন খাতের জন্য স্বল্প সুদে তহবিল সরবরাহ বৃদ্ধি, পিকেএসএফের মাধ্যমে অর্থায়ন সম্প্রসারণ, ক্ষুদ্র উদ্যোগের প্রযুক্তি, সার্টিফিকেশন, ব্র্যান্ডিং ও বাজার সংযোগে নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। পাশাপাশি দ্রুত সিআইবি বাস্তবায়ন, ডিজিটালাইজেশনে কর-সুবিধা এবং জলবায়ু–সহনশীল সবুজ উদ্যোগে সহায়তা জরুরি।
কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈষম্য হ্রাস ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ক্ষুদ্র অর্থায়ন ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ খাতের জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা বাজেটে প্রতিফলিত হওয়া উচিত।
মুর্শেদ আলম সরকার
চেয়ারম্যান, ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ) ও প্রধান নির্বাহী, পপি
আমরা দরিদ্র মানুষের খুব কাছে কাজ করি, কিন্তু প্রাক্-বাজেট আলোচনায় এ পর্যন্ত আমাদের অংশগ্রহণের সুযোগ হয়নি। ভবিষ্যতে ক্ষুদ্র অর্থায়ন প্রতিষ্ঠান ও তাদের সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের প্রাক্-বাজেট আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। বাজেটের আকার বেড়েই চলেছে, ক্ষুদ্র অর্থায়ন খাতের মাধ্যমে বছরে তিন লাখ কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ হলেও জাতীয় বাজেট প্রণয়নের সময় এ খাতের মতামত ও অভিজ্ঞতা যথাযথ গুরুত্ব পায় না।
বর্তমান সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলছে। কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ে যারা কাজ করে, তাদের মতামত ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন। বাজেট এমন হওয়া উচিত, যা স্বকর্মসংস্থান ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহায়ক হবে। একই সঙ্গে মানুষ যেন কর দিতে ভয় না পায় এবং করের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো ও সম্পদের সুষম বণ্টনে ক্ষুদ্র অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিস্তৃত নেটওয়ার্ক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। প্রায় চার কোটি গ্রাহকের মাধ্যমে এ খাতের সংযোগ দেশের তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছেছে। একই সঙ্গে এমআরএর ভূমিকা শুধু নিয়ন্ত্রণে নয়, সহায়কও হওয়া উচিত। অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ উদ্ভাবনকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এমএফআইগুলো সরকারের অংশীদার হিসেবে কাজ করতে চায় এবং অপ্রয়োজনীয় কর ও ভ্যাট-সংক্রান্ত হয়রানি থেকে মুক্তি প্রত্যাশা করে।
অনুদান নয়, বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্প সুদে ঋণ চাই, যা যথাসময়ে পরিশোধ করা হবে। এমএফআই খাত তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছ হলেও যথাযথ নীতিগত উৎসাহ প্রয়োজন। কারণ, দুর্যোগে এনজিও ও এমএফআইগুলো দ্রুত মানুষের পাশে দাঁড়ায়। এ ছাড়া এমআরএ বোর্ডে মাঠপর্যায়ের প্র্যাকটিশনারদের অন্তর্ভুক্তি জরুরি—সরকারি ও পিকেএসএফ প্রতিনিধির পাশাপাশি অন্তত দুজন বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সদস্য থাকা উচিত।
দক্ষ জনবলের অভাব এ খাতের বড় চ্যালেঞ্জ। বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রোফাইন্যান্স বিষয়ে স্বতন্ত্র কোর্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি সঞ্চয় সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা শিথিল করে মোট ঋণ স্থিতির ৮০ শতাংশ পর্যন্ত সঞ্চয় গ্রহণের সুযোগ দিলে তহবিলসংকট কমবে। পিকেএসএফের মাধ্যমে আরও অর্থায়ন, ফিনটেকের সম্প্রসারণ, দরিদ্রদের জন্য ক্ষুদ্র বিমা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে এমএফআইগুলোর অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আত্মসমালোচনা ও আত্মানুসন্ধানের মাধ্যমে এগোতে হবে। তথ্যঘাটতির কারণে অনেক সমালোচনা তৈরি হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ সামনে আরও বাড়বে, তাই এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।
মো. এনামুল হক
জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা, পল্লী মঙ্গল কর্মসূচি (পিএমকে)
বাংলাদেশের মাইক্রোফাইন্যান্স খাত অনন্য—এখানে এমআরএ ও পিকেএসএফের মতো পৃথক নিয়ন্ত্রক ও অর্থায়ন কাঠামো রয়েছে; সুদের হারও ভারত, শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারের তুলনায় কম। আমরা বিশ্বের সবচেয়ে কম সার্ভিস চার্জে সেবা দিয়ে থাকি। ‘হাইলি সুপারভাইজড ক্রেডিট’ মডেলে বছরে একবার ঋণ বিতরণ হলেও বাড়ি বাড়ি গিয়ে কিস্তি আদায় করতে হয়, যার উচ্চ ব্যয় সুদের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। প্রায় চার কোটি পরিবার, যার ৯০ শতাংশ নারী, এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ, এক লাখ কোটির বেশি সঞ্চয় ব্যবস্থাপনা এবং বছরে চার–পাঁচ লাখ কোটি টাকার লেনদেনে প্রায় আড়াই লাখ কর্মী যুক্ত।
গ্রামীণ অর্থনীতির প্রায় ৭০ শতাংশে এনজিও ও এমএফআই খাতের অবদান রয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে নারীর ক্ষমতায়ন, সামাজিক উন্নয়ন ও সুশাসনে। কিন্তু বাজেটে এ অবদান যথাযথ স্বীকৃতি পায় না। তাই জাতীয় বাজেটে এ খাতের অবদান আলাদা অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করে সংসদে উপস্থাপনের দাবি জানাই। আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ অর্থায়ন। সদস্যদের সঞ্চয়, পিকেএসএফ ও ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করলেও সঞ্চয় গ্রহণে বিধিনিষেধ রয়েছে, যা বৈষম্যমূলক। তাই সঞ্চয় সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা তুলে দিয়ে এ সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
বিদেশি ঋণদাতাদের অর্থ আনার জটিল অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে ওয়ান-স্টপ প্রুডেনশিয়াল ব্যবস্থা দরকার। পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি ও এসএমই খাতকে শক্তিশালী করতে এনজিও খাতের জন্য ন্যূনতম ৫০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল বরাদ্দ প্রয়োজন।
সিআইবি কাভারেজ এখনো চার কোটি মানুষের মধ্যে নেই—এটি দ্রুত সমাধান জরুরি, প্রয়োজনে বেসরকারি খাতকে যুক্ত করা যেতে পারে। ডিজিটাল লেনদেন ও ক্যাশলেস অর্থনীতির জন্য এনজিওদের লাইসেন্সের আওতায় ডিজিটাল সেবা ব্যবহারের সুযোগ এবং ভবিষ্যতে ডিজিটাল ব্যাংক ও মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংকের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ১ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে; চার কোটি সদস্যভিত্তিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করলে তা আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করা সম্ভব। একই সঙ্গে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ে গ্রাম থেকে টাকা শহরে গেলেও এনজিওরা গ্রামে পুনর্বিনিয়োগ করছে—তাই স্থানীয় পুনর্বিনিয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। এমআরএ-এর উদ্দেশ্য ছিল নিয়ন্ত্রণ ও সহায়তা, কিন্তু কিছু নীতিগত কঠোরতায় খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; তাই লাইসেন্স বাতিল ও বিধিমালা বিষয়ে আরও পর্যালোচনা ও সংলাপ প্রয়োজন।
দেওয়ান এ এইচ আলমগীর
উন্নয়ন খাত বিশেষজ্ঞ
বাজেট প্রসঙ্গে নয়, বরং সামগ্রিকভাবে মাইক্রোফাইন্যান্স খাত নিয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তাব তুলে ধরা জরুরি। প্রায় ৫০ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে দেখি, বাংলাদেশের মাইক্রোফাইন্যান্স এখন অর্থনীতির একটি বড় অংশ হলেও যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি। প্রায় সাড়ে তিন কোটি থেকে চার কোটি মানুষ নিয়মিত এই সেবার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে প্রায় ১৬ থেকে ১৮ বিলিয়ন ডলার ঋণ স্থিতি রয়েছে। এটি দরিদ্র মানুষের জন্য সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অর্থায়নের উৎস, বিশেষ করে কৃষি ও মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ খাতে।
সরকারি ব্যাংকগুলো ঐতিহাসিকভাবে দরিদ্র মানুষের প্রয়োজন মেটাতে পারেনি, আর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো মূলত শহরকেন্দ্রিক। এ অবস্থায় মাইক্রোফাইন্যান্সই গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি এবং ক্ষুদ্র উদ্যোগের মূল চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করছে। খাদ্য ভ্যালু চেইন থেকে শুরু করে ছোট ব্যবসা, টেইলারিং, প্রসেসিং—সব ক্ষেত্রেই এই অর্থায়নের ভূমিকা রয়েছে। তাই আমি মনে করি, এর অবদানকে জাতীয়ভাবে যথাযথভাবে স্বীকৃতি দেওয়া জরুরি।
কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার পাশাপাশি নন-ফার্ম খাতেও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে মাইক্রোফাইন্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। হাই-ভ্যালু অ্যাগ্রিকালচার ও ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশে এটি দ্রুত কর্মসংস্থান তৈরি করছে। তবে শুধু ক্রেডিট নয়, নন-ফাইন্যান্সিয়াল সেবাও জরুরি—যেমন তথ্য, বাজার ও প্রযুক্তি সহায়তা।
জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে এখনো চরম দারিদ্র্য রয়ে গেছে। এসব এলাকায় কেবল ঋণ নয়, সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত বিনিয়োগ প্রয়োজন। মাইক্রোফাইন্যান্স এখানে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
খাতটিতে উদ্ভাবন দরকার, বিশেষ করে তরুণদের জন্য কাস্টমাইজড সেবা ও ফিনটেকের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। যদিও দেশে মোবাইল ও ইন্টারনেট প্রসারিত হয়েছে, তবু এখনো ডিজিটাল লেনদেন সর্বত্র হয়নি। তাই আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ক্যাশলেস ট্রানজেকশন বিস্তৃত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত ট্যাক্স বা চাপ দেওয়া উচিত নয়; বরং বড় আকারের লিকেজ রোধে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে রেগুলেশনের ক্ষেত্রে ফ্যাসিলিটেটর ভূমিকা থাকা উচিত, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ নয়। মাইক্রোফাইন্যান্স খাত নিজস্ব গতিতে গড়ে উঠেছে। এই স্পিরিট রক্ষা করে প্রযুক্তি ও ফিনটেকের মাধ্যমে কস্ট কমিয়ে, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও বিস্তৃত করা দরকার।
এডভিন বরুণ ব্যানার্জি
নির্বাহী পরিচালক, পিদিম ফাউন্ডেশন
বর্তমান সরকারের গভীর আগ্রহ রয়েছে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ কর্মক্ষম মানুষ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে প্রবেশ করে, যাদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানহীন থেকে যায়। এই বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি সরকারসহ জনকল্যাণে নিয়োজিত সব সংস্থার জন্যই একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ।
এমআরএর লাইসেন্সপ্রাপ্ত ৭৫০টি এনজিও তাদের প্রায় ২২ হাজার ৭০০টি শাখার মাধ্যমে সারা দেশে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। তারা প্রায় ৩ কোটি ২৮ লাখ পরিবারকে স্বকর্মসংস্থান ও মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থানের আওতায় এনে দারিদ্র্য হ্রাসে ভূমিকা রাখছে। তবে খরা, বন্যা ও হাওর–কোস্টাল অঞ্চলের মতো দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় আয়মূলক কর্মকাণ্ডের জন্য পুঁজি সরবরাহ করা অত্যন্ত কঠিন। এসব এলাকায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের সম্পদ ও আয়ের উৎস ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ফলে অনেক সময় তাঁরা নিয়মিত ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারেন না। এমন পরিস্থিতিতে এনজিওগুলোকে কিস্তি আদায় স্থগিত রাখতে হয়, এতে তাঁদের মূলধন ক্ষয় হয় এবং কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ব্যাংকঋণ সময়মতো পরিশোধ বাধ্যতামূলক হওয়ায় পরবর্তী ঋণ গ্রহণও কঠিন হয়ে যায়।
জাতীয় বাজেট বিশ্লেষণের মাধ্যমে সরকার দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কী ভূমিকা রাখছে, তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। আমাদের হিসাব অনুযায়ী, জিডিপিতে ক্ষুদ্রঋণ খাতের অবদান ১৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ। পাশাপাশি শ্রমঘন অর্থনীতিতে মজুরিভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ক্ষুদ্রঋণ, উদ্যোগ ঋণ ও কৃষিঋণের সম্মিলিত অবদান ২৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এ ছাড়া গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রতিবছর যে অর্থ বিনিয়োগ হয়, তার প্রায় ৭৩ শতাংশ এনজিওগুলো সরবরাহ করে থাকে।
এ বাস্তবতায় এনজিও পরিচালিত ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমকে আরও কার্যকর ও গতিশীল করতে জাতীয় বাজেটে আলাদা অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এই তহবিল থেকে দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় ‘রিস্ক শেয়ারিং বেসিসে’ স্বল্প সুদে ঋণসহায়তা প্রদান করা যেতে পারে, যা দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের পারিবারিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যক্ষ নজরদারিতে যোগ্য এনজিওগুলোর মাধ্যমে এই স্বল্প সুদের ঋণব্যবস্থা চালু করা গেলে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তা উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে।
দৌলত আকতার
সভাপতি, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)
সরকার সৃজনশীল অর্থনীতি ও নতুন উদ্ভাবন খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে, যার বড় অংশজুড়ে রয়েছেন নারীরা। আগামী বাজেটে এসব খাতে বিশেষ কর–সুবিধাও থাকবে। ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যায়। ক্ষুদ্রঋণ আমাদের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু নীতিনির্ধারণী আলোচনায় তা যথাযথ গুরুত্ব পায় না। এ খাতের সমস্যা ও সম্ভাবনা তুলে ধরতে সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আরও কার্যকর সংলাপ প্রয়োজন।
নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কক্সবাজারের উখিয়ায় গিয়ে আমি নিজে এর বাস্তব প্রভাব দেখেছি। তবে আমরা এখনো গবাদিপশু পালন বা সবজি চাষের মতো প্রচলিত কর্মকাণ্ডের গণ্ডিতে আটকে আছি কি না, তা ভাবার সময় এসেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো করনীতি। বর্তমানে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্রায় একই ধরনের করহার প্রযোজ্য। ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ কর আরোপ করা হলে, তাদের পক্ষে তা পরিশোধ করা সম্ভব হবে না। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা ও বাস্তবতা ভিন্ন। তাদের জন্য আলাদা করনীতি ও আর্থিক নীতির প্রয়োজন রয়েছে। অন্যথা তারা করব্যবস্থায় আগ্রহী হবে না, বরং অনেকে ব্যবসা থেকেই সরে যেতে পারে।
সরকারের সদিচ্ছার বিষয়টিও আমি দেখতে পাই। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী এর নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং এনজিওদের সম্পৃক্ত করার কথা বলেছেন। সরকার একা যে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে না, সেখানে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে।
ইলেকট্রনিক লেনদেন, কর আদায় ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনার বিষয়েও আরও গুরুত্ব দিতে হবে। অতীতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলোর অনেকগুলো প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। তবে কর আদায়ের ক্ষেত্র সম্প্রসারণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কর আদায় ও দুর্নীতির প্রশ্নে আপসের সুযোগ নেই। সরকারের উন্নয়ন ব্যয় নির্বাহের জন্য রাজস্ব প্রয়োজন, আর সেই রাজস্ব আহরণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেই পালন করতে হবে।
এই খাত যত বেশি দৃশ্যমান হবে, ততই নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ আকর্ষণ করবে। ক্ষুদ্রঋণ খাতকে আরও সুসংগঠিত ও কার্যকর করতে হলে গণমাধ্যম, নীতিনির্ধারক এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে। তাহলেই এই খাত তার যথাযথ গুরুত্ব ও স্বীকৃতি পাবে।
রাসেল আহম্মেদ লিটন
নির্বাহী প্রধান, এসকেএস ফাউন্ডেশন
এনজিও খাত মূলত দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি কাজ করে, বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়নে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সবচেয়ে দরিদ্র ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় কাজ করি, মানুষকে সংগঠিত করি, সচেতন করি এবং তাদের জীবিকা উন্নয়নে সহায়তা করি। এই কাজটি দীর্ঘদিন ধরে চললেও এর যথাযথ স্বীকৃতি আমরা অনেক সময় পাই না। ছোট পরিসরের বৈঠক বা আলোচনায় আমাদের কাজের প্রশংসা করা হলেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অনেক সময় আমাদের অবদান যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না।
আমরা মাঠপর্যায়ে সরাসরি মানুষের সঙ্গে কাজ করি—বন্যা, নদীভাঙন, চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় কাজ করতে গিয়ে বহু ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করি। জাতীয় পর্যায়ের অনেক কর্মসূচি বাস্তবায়নে এনজিওদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে, এমনকি সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হয়।
কিছু বিচ্ছিন্ন অনিয়ম বা ব্যক্তিগত ঘটনার ভিত্তিতে পুরো এনজিও খাতকে বিচার করা ঠিক নয়। বাংলাদেশে ৭০০টির বেশি এনজিও কাজ করছে এবং এমআরএর তত্ত্বাবধানে তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই খাতের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি যেন শুধু নিয়ন্ত্রণমূলক না হয়ে সহায়ক ও সহযোগিতামূলক হয়, সেটি অত্যন্ত জরুরি। অতিরিক্ত কঠোরতা বা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলে ভবিষ্যতে এই খাতে নতুন প্রজন্ম আসার আগ্রহ হারাতে পারে, যা দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিকর হবে।
আমরা কর প্রদান করি এবং অনেক ক্ষেত্রে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ করদাতার স্বীকৃতিও পাই। তাই মাঠপর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত করব্যবস্থায় একটি স্বচ্ছ, সহজ ও উৎসাহমূলক নেটওয়ার্ক থাকা প্রয়োজন, যাতে সবাই কর প্রদানে উৎসাহিত হয়।
এনজিও খাত যেহেতু দলীয় রাজনীতির বাইরে থেকে সরাসরি জনগণের সঙ্গে কাজ করে, তাই সরকার চাইলে এই নেটওয়ার্ককে জাতীয় উন্নয়নের অংশ হিসেবে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে।
বর্তমানে এনজিও খাতে অর্থায়নের একটি বড় সংকট রয়েছে। ব্যাংক ও পিকেএসএফ কিছু সহায়তা দিলেও ছোট ও মাঝারি এনজিওগুলো বিশেষভাবে অর্থসংকটে ভুগছে। বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি সহজ, স্বচ্ছ ও সহায়ক অর্থায়নের ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তাহলে এনজিওগুলো দরিদ্র মানুষের জীবনমান উন্নয়নে আরও কার্যকর ও বিস্তৃতভাবে ভূমিকা রাখতে পারবে।
মো. সহিদ উল্লাহ্
প্রধান নির্বাহী, দিশা
আমরা দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে আসছি, যা অনেকটা ‘থ্যাংকলেস জব’-এর মতো। গুরুত্বপূর্ণ কাজ করলেও আমরা অনেক সময় যথাযথ স্বীকৃতি বা ধন্যবাদ পাই না, কারণ নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি সাধারণত ব্যাংকিং খাতেই বেশি। অথচ ব্যাংকিং খাতের এনপিএল এখন বড় সংকট—প্রায় ১৮ লাখ কোটি টাকার ঋণ ও ২২ লাখ কোটি টাকার সঞ্চয়ের বিপরীতে ৫–৬ লাখ কোটি টাকা এনপিএল, যা প্রায় ৩৫ শতাংশ; সরকারি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে তা ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত।
অন্যদিকে এনজিও খাত প্রায় ৫০ বছর ধরে ঝড়–ঘূর্ণিঝড়, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করে দারিদ্র্য বিমোচনে কাজ করে যাচ্ছে। করোনাকাল, বন্যা ও ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আমরা বড় ধাক্কা খেয়েছি, যার প্রভাব বিনিয়োগ ও গ্রামীণ অর্থনীতিতেও পড়েছে। ফলে এনজিও খাতেও এনপিএল বাড়ছে, তবে তা নিয়ে তেমন আলোচনা নেই। অথচ ব্যাংক খাতে রিসিডিউলিংসহ নানা সুবিধা থাকলেও আমাদের ক্ষেত্রে তা নেই। আমরা ব্যাংক, সদস্যদের সঞ্চয় ও পিকেএসএফ—সব উৎস থেকেই নেওয়া অর্থ শতভাগ ফেরত দিতে বাধ্য থাকি।
বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির প্রায় ৭০ শতাংশে এনজিও খাত অর্থ প্রবাহিত করছে। অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, সরকার যখন জনগণের কাছে অর্থ পৌঁছাতে চায়, তখন এনজিও একটি প্রস্তুত ও বিশ্বস্ত মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশে ৫০–৫২ বছর ধরে আমরা সেই দায়িত্বই পালন করে আসছি।
দুঃখজনকভাবে, আমাদের কাজের সাফল্য যতটা আলোচনায় আসে না, ব্যর্থতার একটি ঘটনা ততটাই বড় করে তুলে ধরা হয়। চার কোটি পরিবারের সফলতার চিত্র যথাযথভাবে মিডিয়ায় আসে না। এ কারণে আমাদের খাতটি অনেক সময় ভুলভাবে উপস্থাপিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
এনজিও খাত একটি অস্তিত্বের চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। তাই সরকারের বাজেট ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আমাদের খাতকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আমাদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ হওয়া দরকার—সিডিএফসহ সংশ্লিষ্ট নেতৃত্বকে নিয়ে বাজেটের আগেই আলোচনায় বসা উচিত। এতে করে এনজিও খাতকে আরও কার্যকরভাবে ফ্যাসিলিটেট করা যাবে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিরই উপকার হবে।
মো. সাজ্জাদ হোসেন
নির্বাহী পরিচালক, ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ)
ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ) ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ১৯৯৪ সালে এনজিও ব্যুরোতে নিবন্ধিত হয়ে এবং ১৯৯৭ সালে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জয়েন্ট স্টক কোম্পানির অনুমোদনের মাধ্যমে এটি একটি পূর্ণাঙ্গ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কার্যক্রম বিস্তৃত করে। শুরু থেকেই দেশের শীর্ষ মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠান ও খাতসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন; প্রাক্তন উপদেষ্টা ও মুখ্য সচিবসহ অনেকেই এই প্ল্যাটফর্মে ভূমিকা রেখেছেন, পাশাপাশি বর্তমান ও সাবেক নেতৃত্বও এই খাতের অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করেন।
সিডিএফ শুরু থেকেই মাইক্রোক্রেডিট খাতের উন্নয়ন, সমন্বয় ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। বর্তমানে প্রায় ৬০০টি এমএফআই এর সদস্য। এসব প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা উন্নয়ন, নীতিগত অ্যাডভোকেসি, লবিং এবং টেকসই অর্থায়নের উৎসের সঙ্গে সংযোগ তৈরিতে সিডিএফ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ ও বার্ষিক পরিসংখ্যান প্রকাশের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যভান্ডার গড়ে তুলেছে।
আমাদের মূল বক্তব্য হলো রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতিতে সারপ্লাস জোন থেকে সম্পদ এনে ডেফিসিট জোনে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মাইক্রোক্রেডিট খাত মূলত ডেফিসিট জোনে কাজ করে, যেখানে প্রান্তিক মানুষ ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চলগুলো আর্থিক সেবার বাইরে থেকে যায়। তাই এই খাতে অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করা শুধু প্রয়োজন নয়, বরং কাঠামোগত উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
এই খাতে অতিরিক্ত কর আরোপ যৌক্তিক নয়। কারণ, ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও ক্ষুদ্র আয়ের ওপর ভিত্তি করে যে আয়ের প্রবাহ তৈরি হয়, তার সুবিধাভোগী মূলত গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। সেখানে অতিরিক্ত কর আরোপ তাদের ওপরই পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করে। হাওর, বাঁওড়সহ প্রত্যন্ত ও দুর্গম অঞ্চলে যেখানে ব্যাংকিং সেবার পূর্ণাঙ্গ কাভারেজ নেই, সেখানে ক্ষুদ্রঋণই প্রধান আর্থিক ভরসা হিসেবে কাজ করছে। তাই উন্নয়নকে কেবল শহরকেন্দ্রিক বা পকেটভিত্তিক না করে সমভাবে বিস্তৃত করা জরুরি। অন্যথা বৈষম্য আরও বাড়বে, যা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে। সিডিএফের মাধ্যমে আমরা গবেষণা, নেটওয়ার্কিং এবং নীতিগত সংলাপকে আরও শক্তিশালী করছি। ভবিষ্যতে আমরা আরও স্বতঃপ্রণোদিতভাবে খাতের বাস্তব সংকট ও চাহিদা নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরব।