নিউমুরিং টার্মিনাল ইজারায় ডিপি ওয়ার্ল্ড আবার আলোচনায়, এক দিনে দুই চিঠি
· Prothom Alo

চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে একই দিনে একই বিষয়ে দুটি ভিন্ন বার্তার চিঠি গেছে। ওই দুই চিঠিকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল। দুটি চিঠি পাঠিয়েছে নৌ মন্ত্রণালয়।
গত বৃহস্পতিবার সকালে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো এক চিঠিতে দুবাইভিত্তিক বন্দর অপারেটর ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ কিংবা বাতিল করার কথা বলা হয়। আবার একই দিন বিকেলে পাঠানো আরেক চিঠিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আবার আলোচনায় এসেছে বন্দরের এই টার্মিনাল ইজারা ইস্যুটি।
Visit lebandit.lat for more information.
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে স্থগিত হওয়া এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া নতুন সরকারের আমলে আবার সচল হয়। একই বিষয়ে দুই ধরনের নির্দেশনা বন্দরের ভেতরে ও বাইরে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—এনসিটি নিয়ে সরকারের প্রকৃত অবস্থান কী?
একই বিষয়ে দুই চিঠি সম্পর্কে জানতে চাইলে নৌপরিবহন সচিব জাকারিয়া শনিবার সকালে প্রথম আলোকে বলেন, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে দর-কষাকষি অব্যাহত রয়েছে।
প্রথম চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে নৌপরিবহন সচিব বলেন, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ থেকে এ বিষয়ে মতামত পাঠানো হয়। ওই মতামতের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রথম চিঠি দেওয়া হয়েছিল। বন্দর কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে নির্দেশনা চাইলে দ্বিতীয় চিঠিতে দর-কষাকষি অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নতুন করে কোনো পরিবর্তন হয়নি। ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে দর-কষাকষি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার পরদিনই গত শুক্রবার (বন্ধের দিন) দর-কষাকষি কার্যক্রম সম্পন্ন করার জন্য মূল্যায়ন কমিটি গঠনের চিঠি দেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। চিঠিতে সাত সদস্যের মূল্যায়ন কমিটির অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুরোধ জানানো হয়।
বন্দরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল
চট্টগ্রাম বন্দরের চারটি চালু কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে এনসিটিই সবচেয়ে বড়। গত বছর বন্দরে ওঠানো-নামানো মোট কনটেইনারের ৪৪ শতাংশ পরিচালিত হয়েছে এই টার্মিনালের মাধ্যমে।
তবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চলুক বা না চলুক, টার্মিনালটির বর্তমান কার্যক্রমে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। কারণ, ২০২৪ সালের ৭ জুলাই থেকে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড (সিডিডিএল) টার্মিনালটি পরিচালনা করছে এবং ধারাবাহিকভাবে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে নতুন রেকর্ড গড়ছে।
যেমন গত মে মাসে ১ লাখ ২৬ হাজার একক কনটেইনার পরিবহন করে আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে সিডিডিএল। এর আগে একটি দেশীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান টার্মিনালটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিল।
কোথায় শুরু, কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে:
গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) এবং সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) কাঠামোর আওতায় এনসিটি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে দীর্ঘ মেয়াদে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘ হওয়ায় সরকার পরিবর্তনের আগেই তা শেষ করা সম্ভব হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এই উদ্যোগে গতি পায় এবং চূড়ান্ত ধাপ অর্থাৎ দর–কষাকষি পর্যায়ে পৌঁছে। কিন্তু আলোচনা কমিটির সদস্যদের বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি, পাশাপাশি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ঘিরে শ্রমিক অসন্তোষ ও আন্দোলনের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত গত ৯ ফেব্রুয়ারি এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া স্থগিত ঘোষণা করে অন্তর্বর্তী সরকার।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ৮ এপ্রিল বাংলাদেশ-দুবাই যৌথ পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ প্ল্যাটফর্মের চতুর্থ সভায় বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। সেখানে ডিপি ওয়ার্ল্ড শুধু এনসিটি নয়, পাশের চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) যুক্ত করে একটি সমন্বিত টার্মিনাল হিসেবে পরিচালনার প্রস্তাব দেয়।
দুই চিঠির পেছনের গল্প: ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাব নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত জানতে গত ২৯ এপ্রিল পিপিপি কর্তৃপক্ষের কাছে মতামত চায় বন্দর কর্তৃপক্ষ। জবাবে পিপিপি কর্তৃপক্ষ জানায়, বন্দর ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় চাইলে চলমান দর-কষাকষি এগিয়ে নিতে পারে, আবার চাইলে প্রক্রিয়াটি বাতিলও করতে পারে।
এই মতামতের ভিত্তিতেই গত বৃহস্পতিবার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে প্রথম চিঠি জারি করা হয়। কিন্তু একই দিনে দ্বিতীয় চিঠিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, অল্প সময়ের ব্যবধানে অবস্থান পরিবর্তনের কারণ কী?
পিপিপি কর্তৃপক্ষের মতামতের নেপথ্যে কী জানতে চাইলে বাংলাদেশ পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক চৌধুরীর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন না ধরায় তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি।
যদিও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দাবি করে বলছেন, বাস্তবে সরকারের অবস্থানে কোনো পরিবর্তন হয়নি। আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তই বহাল রয়েছে।
এমজিএইচ গ্রুপের প্রস্তাব
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চলমান থাকলেও এরই মধ্যে দেশীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপও এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, ডিপি ওয়ার্ল্ডের তুলনায় প্রতি কনটেইনারে বন্দরের জন্য ৫ ডলার বেশি রাজস্ব দিতে পারবে তারা। তবে এমজিএইচর প্রস্তাব এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিবেচনার পর্যায়ে আসেনি।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বন্দরের দুজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে প্রক্রিয়া এখনো চলমান থাকায় নতুন প্রস্তাবগুলো বিবেচনার সুযোগ নেই। তবে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতা না হলে নতুন করে দরপত্র আহ্বান করা হবে। তখন দেশি-বিদেশি অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবও বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে।
ভবিষ্যৎ কী এনসিটিকে ঘিরে এখন স্পষ্টতই দুটি অবস্থান তৈরি হয়েছে।
দেশীয় বন্দর অপারেটররা মনে করেন, চালু ও লাভজনক টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তাদের মতে, বে টার্মিনালের মতো নতুন প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগ ও পরিচালনার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
অন্যদিকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি অংশ এখনো ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে। তাদের যুক্তি, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও বিনিয়োগ বন্দরের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াবে।
ফলে এখন মূল প্রশ্ন একটাই—রেকর্ড গড়া এনসিটি কি দেশীয় ব্যবস্থাপনাতেই থাকবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি ইজারায় যাবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে? সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে চট্টগ্রাম বন্দরের পরবর্তী পথচলা।