কচু চাষে হারিয়ে হচ্ছে পাহাড়ি বন
· Prothom Alo

খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাঙ্গা বাজার হয়ে পশ্চিমে আট কিলোমিটারের মতো গেলে পূর্ব খেদাছড়ার পিটাছড়া বন। এখানে বন ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ঝিরি, নানা প্রজাতির গাছ, ঝিঁঝি পোকার অনবরত ডাক, গাছে গাছে নানা রকম বন্য প্রাণীর বিচরণের মধ্যে চোখে পড়ে দূরে আরেকটি ধূসর, বিক্ষত পাহাড়। এই পাহাড়ে বনের কোনো চিহ্ন নেই, আছে আগুনের ক্ষত।
শনিবার দুপুরে প্রচণ্ড রোদের মধ্যে আরও দুটি পাহাড় আর একটি ঝিরি অতিক্রম করে সেই পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার পর দেখা গেল ধ্বংসযজ্ঞের সম্পূর্ণ চিত্র। যেদিকে চোখ যায়, শত শত একর পুড়ে যাওয়া বনভূমি। কচুর মুখি চাষের জন্য বনকে পুড়িয়ে দিয়ে কেটে নেওয়া হয়েছে সব গাছ। ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী হিসেবে টিকে আছে পুড়ে যাওয়া গাছের গুঁড়ি। দেখে মনে হবে যেন এখানে গাছের গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে।
Visit extract-html.com for more information.
খোঁজ নিয়ে জানা গেল, শুধু এখানে নয়, পুরো খাগড়াছড়ি জেলার গহিন বন পুড়িয়ে চলছে কচু চাষ। মাটিরাঙ্গা উপজেলার বেলছড়ি ইউনিয়ন, তবলছড়ি ইউনিয়ন, তাইন্দং ইউনিয়ন, গোমতী ইউনিয়নে কচুর মুখি চাষ করতে শত শত একর বনভূমিতে আগুন দেওয়া হয়েছে, তাতে উজাড় হয়েছে গাছপালা।
এ চাষ চলছে পূর্ব খেদাছড়া, চাকমাপাড়া, শষি কার্বারিপাড়া, গঙইরাপাড়া ও পিটাছড়া বনসংলগ্ন পাহাড় ও গোমতী ইউনিয়নের মাকুমতৈছা, খাদাপাড়া, মাইচ্চাকালা টিলা, পানছড়ির চৌমুহনী এলাকায়।
মাটিরাঙ্গা উপজেলার বেলছড়ি ইউনিয়ন, তবলছড়ি ইউনিয়ন, তাইন্দং ইউনিয়ন, গোমতী ইউনিয়নে কচুর মুখি চাষ করতে শত শত একরের বনভূমিতে আগুন দেওয়া হয়েছে, উজাড় করা হয়েছে গাছপালা।
বেলছড়ি ইউনিয়নের পূর্ব খেদাছড়ার পিটাছড়া বনে দীর্ঘদিন ধরে বন ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণে সচেতনতা তৈরির কাজ করে যাচ্ছেন মাহফুজ রাসেল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এ অঞ্চলে প্রাকৃতিক বন নিধনের কাজটি শুরু হয়েছে পামগাছ রোপণের মধ্য দিয়ে। এরপর এল কাসাভা চাষ। কচুর মুখি চাষ ছোট আকারে হতো। কাসাভা আর পাম বন্ধ হওয়ার পর এটি বড় আকারে চাষ হচ্ছে। গত বছর থেকে তা ব্যাপকতা পায়।
প্রকৃতি ও পরিবেশকর্মী রাসেল বলেন, রাতারাতি বনে আগুন দিয়ে, শত শত গাছ কেটে কচু চাষের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। বন্য প্রাণী ও বনের পাখিরা আবাস হারাচ্ছে।
খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার বেলছড়ি ইউনিয়নের পিটাছড়া বনে কচুর মুখি চাষে ন্যাড়া হচ্ছে পাহাড়যেসব বন্য প্রাণীর আবাসস্থল এ বন
পিটাছড়া বনে গত তিন বছরের গবেষণায় মাহফুজ রাসেল ১৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ২৭ প্রজাতির সাপ ও ৯৩ প্রজাতির পাখি নথিভুক্ত করেছেন। স্তন্যপায়ীদের মধ্যে এখানে আছে লজ্জাবতী বানর, খাটাশ (পাম সিভেট), ইন্ডিয়ান লার্জ সিভেট (বাগডাশ), অরেঞ্জ বেলিড হিমালয়ান স্কুইরেল, কাঁকড়াখেকো বেজি, লিওপার্ড ক্যাট (চিতা বিড়াল), ফিশিংক্যাট (মেছো বিড়াল), বনবিড়াল, শজারু, বনরুই, পিগটেল ম্যাকাক, রেসাস ম্যাকাক (বানর), উল্টোলেজি বানর, রামকুত্তা, উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি।
মাহফুজ রাসেল, প্রকৃতি ও পরিবেশকর্মীরাসেল বলেন, রাতারাতি বনে আগুন দিয়ে, শত শত গাছ কেটে কচু চাষের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। বন্য প্রাণী ও বনের পাখিরা আবাস হারাচ্ছে। যারা এ চাষের সঙ্গে যুক্ত, তাদের সচেতন করে তুলতে হবে। না হলে বনের এ সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাবে অচিরেই।এ ছাড়া রয়েছে হলুদ পাহাড়ি কচ্ছপ, শিলা কচ্ছপ, গুইসাপ, তক্ষক। সাপের মধ্যে রাজগোখরা, কালকেউটে, লালডোরা সাপ, সবুজ বোড়া, বার্মিজ পাইথনসহ ২৭ প্রজাতির সাপ ও ১৫০ প্রজাতির পাখি রয়েছে পিটাছড়ার এ বনে।
রাসেল বলছেন, শত শত একর বন পোড়ানোর কারণে এসব পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী ও সাপ লোকালয়ে চলে আসছে, মানুষের হাতে মারা পড়ছে।
কারা চালাচ্ছে এ ধ্বংসযজ্ঞ
খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার মো. হানিফ কচুর মুখি চাষের সঙ্গে যুক্ত ২০১২ সাল থেকে। গত বছর প্রায় ৩ হাজার শতক কচুর মুখি চাষ করেছিলেন পানছড়ি উপজেলায়। এবার তিনি ৬০০ শতক পাহাড়ে এ চাষ করছেন।
হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, এগুলো ইজারা নেওয়া জায়গা। প্রতি ৪০ শতকে ১ থেকে ২ হাজার টাকায় এসব পাহাড় ইজারা নেন। এরপর শ্রমিক ভাড়া করে আগুন দিয়ে বন পুড়িয়ে ভূমি প্রস্তুত করতে হয়। প্রতি ৪০ শতকে (১ কানি) ৪ থেকে ৫ মণ কচুর ছড়া হয়। এগুলো মূলত বিক্রি হয় ঢাকা ও কুমিল্লার পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে।
আশির দশকের শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রামে সমতলের বাঙালিদের পাহাড়ে পুনর্বাসনের সময় ভূমিহীন মানুষদের প্রতি পরিবারকে ৫ একর করে বরাদ্দ দেয় সরকার। বরাদ্দকৃত ভূমির মালিকানার দলিলটি কবুলিয়ত হিসেবে পরিচিত। এই কবুলিয়তে ২১টি শর্ত দেওয়া আছে। এর মধ্যে ১৩ নম্বর শর্তে বলা হয়েছে, ‘বরাদ্দ দেওয়া জমির সমস্ত বা কোনো অংশ বিক্রি, দান বা লাগিয়ত (ইজারা), হস্তান্তর বা বাঁটোয়ারা করা যাবে না। ১১ নম্বর শর্তে বলা হয়েছে, এ জমি বর্গাদার দ্বারা চাষাবাদ করানো যাবে না।’
তিনি জানান, তাঁর সঙ্গে এবার চাষ করছেন আরও ৫০ জন চাষি।
গহিন বন থেকে এসব কচুর ছড়া পরিবহনের কাজের সঙ্গে যুক্ত মাটিরাঙ্গার তাজুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর এলাকায় প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ লোক এভাবে বন পুড়িয়ে চাষ করার সঙ্গে যুক্ত।
এভাবে কচু চাষের জন্য পাহাড়ের পর পাহাড় ন্যাড়া হয়ে যাচ্ছে।
বনভূমি ব্যক্তির হাতে গেল কীভাবে
আশির দশকের শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রামে সমতলের বাঙালিদের পাহাড়ে পুনর্বাসনের সময় ভূমিহীন মানুষদের প্রতি পরিবারকে ৫ একর করে বরাদ্দ দেয় সরকার। বরাদ্দকৃত ভূমির মালিকানার দলিলটি কবুলিয়ত হিসেবে পরিচিত। এই কবুলিয়তে ২১টি শর্ত দেওয়া আছে। এর মধ্যে ১৩ নম্বর শর্তে বলা হয়েছে, ‘বরাদ্দ দেওয়া জমির সমস্ত বা কোনো অংশ বিক্রি, দান বা লাগিয়ত (ইজারা), হস্তান্তর বা বাঁটোয়ারা করা যাবে না। ১১ নম্বর শর্তে বলা হয়েছে, এ জমি বর্গাদার দ্বারা চাষাবাদ করানো যাবে না। অথচ সেটাই এখন হচ্ছে।’
মো. আনোয়ার সাদাত, জেলা প্রশাসক, খাগড়াছড়িআমরা এসব জমি ইজারা দেওয়া ও পুড়িয়ে নানা ফসলের চাষের খবর পেয়েছি। যেহেতু এসব জমিতে গহিন প্রাকৃতিক বন আছে, বন্য প্রাণী আছে; আমাদের এসব বন ও প্রকৃতি রক্ষার বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে হবে।জানতে চাইলে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এসব জমি ইজারা দেওয়া ও পুড়িয়ে নানা ফসলের চাষের খবর পেয়েছি। যেহেতু এসব জমিতে গহিন প্রাকৃতিক বন আছে, বন্য প্রাণী আছে; আমাদের এসব বন ও প্রকৃতি রক্ষার বিষয়ে করণীয় নির্ধারণ করতে হবে।’
রাতারাতি বনে আগুন দিয়ে, শত শত গাছ কেটে কচু চাষের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে পাহাড়। খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার বেলছড়ি ইউনিয়নের পিটাছড়া বনকমছে পার্বত্য অঞ্চলের বনভূমি
বন অধিদপ্তরের করা সম্প্রতি আচ্ছাদন নিয়ে জরিপে দেখা যাচ্ছে, গত এক দশকে বাংলাদেশে বনভূমি কমেছে ১ লাখ হেক্টরের কিছু বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বনভূমি কমেছে পার্বত্য অঞ্চলে। এখানে ৮০ হাজার হেক্টর বনভূমি কমেছে গত এক দশকে।
প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সংগঠন কনজারভেশন ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, পৃথিবীতে ৩৬টি জীববৈচিত্র্যের হটস্পট আছে। এর মধ্যে একটি হলো ইন্দো-বার্মা বায়োডায়ভার্সিটি হটস্পট। পার্বত্য চট্টগ্রাম এটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বন অধিদপ্তরের এক জরিপে দেখা যাচ্ছে, গত এক দশকে বাংলাদেশে বনভূমি কমেছে ১ লাখ হেক্টরের কিছু বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বনভূমি কমেছে পার্বত্য অঞ্চলে। সেখানে ৮০ হাজার হেক্টর বনভূমি কমেছে গত এক দশকে। কাসাভা, কচুর মুখি, পামগাছ, মাল্টা, আম, আনারসসহ নানা ধরনের চাষের কারণে ধীরে ধীরে জীববৈচিত্র্য ও বনভূমি কমে আসছে বলে বন অধিদপ্তরের জরিপে দেখা যায়।
কাসাভা, কচুর মুখি, পামগাছ, মাল্টা, আম, আনারসসহ নানা ধরনের চাষের কারণে ধীরে ধীরে জীববৈচিত্র্য ও বনভূমি কমে আসছে বলে বন অধিদপ্তরের জরিপে দেখা যায়।
জানতে চাইলে বন অধিদপ্তরের খাগড়াছড়ির বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. ফরিদ মিঞা প্রথম আলোকে বলেন, খাগড়াছড়ি একটি জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ এলাকা। এখানে ব্যাপক আকারে যখন এ ধরনের চাষ হয়, তখন বনের বাস্তুতন্ত্র সংকটে পড়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, ‘এগুলো সরকারি বন না হওয়ায় আগুন দিলেও আমরা কিছু করতে পারি না। তবে বন্য প্রাণী রক্ষায় এখানে আমরা কিছু দল গঠন করেছি।’
খাগড়াছড়ি জেলার গহিন বন পুড়িয়ে চলছে কচু চাষ। ছবিটি মাটিরাঙ্গা উপজেলার বেলছড়ি ইউনিয়নের পিটাছড়া বনেরসমাধান কোন পথে
বন কর্মকর্তারা বলছেন, পাহাড় পুড়িয়ে চাষাবাদ করা পার্বত্য অঞ্চলের প্রথাগত জীবনের অংশ। সে জন্য একদিকে জীবন-জীবিকাও রক্ষা করতে হবে, অন্যদিকে প্রকৃতিও রক্ষা করতে হবে। সেটা কীভাবে হতে পারে, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা নিয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা করা যেতে পারে।
মো. ফরিদ মিঞা, বিভাগীয় বন কর্মকর্তাখাগড়াছড়ি একটি জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ এলাকা। এখানে ব্যাপক আকারে যখন এ ধরনের চাষ হয়, তখন বনের বাস্তুতন্ত্র সংকটে পড়ে যায়। এগুলো সরকারি বন না হওয়ায় আগুন দিলেও আমরা কিছু করতে পারি না। তবে বন্য প্রাণী রক্ষায় এখানে আমরা কিছু দল গঠন করেছি।প্রকৃতিকর্মী মাহফুজ রাসেলের মতে, খাগড়াছড়িতে কর্মসংস্থানের খুব বেশি বৈচিত্র্য নেই। ফলে খুব সহজে শ্রমিক ভাড়া করে এসব বন পোড়ানোর কাজ করতে পারে বড় ব্যবসায়ীরা। সরকার উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্পের কাজ বা কুটির শিল্প দাঁড় করালে মানুষের বিকল্প জীবিকার সংস্থান হবে। যারা এ চাষের সঙ্গে যুক্ত, তাদের সচেতন করে তুলতে হবে। তাতে বন ও প্রকৃতি রক্ষা পাবে।
জেলা প্রশাসক আনোয়ার সাদত বলেন, এখানে জেলা পরিষদসহ সরকারি অন্যান্য সংস্থার সমন্বয়ে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে একটা সিদ্ধান্তে আসতে হবে। ডিসি সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ–সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।