পল্লবীতে ধর্ষণের পর শিশুহত্যা মামলায় সাক্ষ্য দিলেন মা–বাবাসহ ১০ জন
· Prothom Alo

রাজধানীর পল্লবীতে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে আট বছরের শিশুকে হত্যার ঘটনায় করা মামলায় আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন শিশুটির মা–বাবাসহ ১০ জন।
Visit tr-sport.bond for more information.
আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে দুপুর নাগাদ ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে এই ১০ জন সাক্ষ্য দেন।
মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না আক্তার। তাঁদের বিরুদ্ধে গতকাল সোমবার অভিযোগ গঠন করেন আদালত। এর মধ্য দিয়ে এই মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। সাক্ষ্য গ্রহণ শুরুর জন্য আদালত আজকের দিন গতকালই ধার্য করেন।
আজ সকাল ৯টার দিকে আসামিদের কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে এনে আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সকাল ১০টা ১২ মিনিটে সোহেলকে, আর সকাল ১০টা ২৪ মিনিটে স্বপ্নাকে আদালতের কাঠগড়ায় তোলা হয়।
কাঠগড়ায় ওঠানোর পর স্বপ্না কাঁদতে শুরু করেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চান সোহেল। তাঁকে থামিয়ে দেয় পুলিশ।
সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে বিচারক আসেন এজলাসে। এরপর শুনানি শুরু করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আজিজুর রহমান। তিনি শুরুতে আসামি সোহেলের গণমাধ্যমে এলোমেলো কথা বলার বিষয় তুলে ধরেন। তিনি আদালতের কাছে আবেদন জানান, আসামিরা যাতে যাতায়াতের সময় গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ না পান।
এরপর সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করেন শিশুটির বাবা। তিনি অসুস্থতার জন্য আদালতের অনুমতি নিয়ে চেয়ারে বসে সাক্ষ্য দেন। বিচারকের বিভিন্ন প্রশ্নের জবার দেন।
শিশুটির বাবা তাঁর সাক্ষ্যে বলেন, ঘটনার দিন সকালে তিনি অফিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হন। আনুমানিক সকাল সাড়ে ৯টা নাগাদ তিনি বের হন। বনানী–কাকলীতে পৌঁছানোমাত্র তাঁকে তাঁর স্ত্রী ফোন দেন। তখন সকাল সোয়া ১০টা বাজে। তিনি বাসায় ফিরে আসেন। এসে দেখেন, বাসার সামনে অনেক লোক জড়ো হয়েছেন। তিনি দৌড়ে তাঁর ফ্ল্যাটের সামনে যান। দেখেন, সেখানে অনেক লোক। তাঁর স্ত্রী বলেন, মেয়ে পাশের ফ্ল্যাটে আটকা পড়ে আছে। আশপাশ থেকে লোকজন জড়ো হন। তাঁরা ডাকাডাকি করে কোনো সাড়া না পেয়ে ফ্ল্যাটের তালা ভাঙার চেষ্টা করেন। অন্যরাও ভাঙার চেষ্টা করেন। পরে তালা ভেঙে দরজা খোলা হয়। ভেতরে ঢুকে কমন রুমের দরজা খুলে দেখেন, শুধু রক্ত আর রক্ত। ভেতরে ঢুকে দেখেন, স্বপ্না দাঁড়িয়ে আছেন রক্তের ওপর। স্বপ্নারা যে রুমে থাকেন, সেই রুমেও গিয়ে দেখেন রক্ত। তাঁদের স্টিলের খাট। সেই খাটের নিচে তাঁর মেয়ের খণ্ডিত লাশ ছিল। মাথা ছিল বিচ্ছিন্ন। এরপর আর কিছু তাঁর মনে নেই। পরে তিনি থানায় গিয়ে মামলা করেন।
পরবর্তী প্রশ্নে এই বাবা বলেন, মেয়ের মাথাটা ছিল বালতির ভেতরে। এ সময় আইনজীবী খণ্ডিত মাথার ছবি দেখালে কাঠগড়ায় বসে কেঁদে ফেলেন বাবা। পরে শিশুটির বাবাকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবী।
বেলা ১১টার দিকে সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করেন শিশুটির মা। সাক্ষ্যে বলেন, তিনি রান্না করছিলেন। রান্না প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে দুই মেয়ে তাদের চাচার বাসায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল। কিছু পরে তিনি রান্নাঘর থেকে শব্দ শুনতে পান। একটু পর এক মেয়ে বাসায় আসে একা। তখন তিনি অন্য মেয়ে কোথায়, তা জানতে চান। এই মেয় বলে, অন্যজন তো তার সঙ্গে যায়নি। তখন তিনি নিচে চলে যান খুঁজতে। লোকজনকে জিজ্ঞাসা করতে থাকেন। লোকজন বলে, তারা দেখেনি। খোঁজাখুঁজির পর না পেয়ে বাসার দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় ফ্ল্যাটের দরজায় ধাক্কা দেন তিনি। তিন তলায় আসামিরা থাকেন। তখন খেয়াল করে নিচের দিকে তাকিয়ে তিনি দেখেন, তাঁর মেয়ের একটা জুতা। তখনো তিনি চিৎকার শুনছিলেন। পাশ থেকে লোকজন আসে। এর মধ্যে তিনি তাঁর স্বামীকে ফোন দিতে থাকেন। অনেক বার দরজা খুলতে বললেও ভেতর থেকে খোলা হয়নি। পরে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখেন রক্ত। তাঁর মেয়ে নেই। মাথা একজায়গায়, দেহ এক জায়গায়।
পরে আসামিপক্ষের আইনজীবী জেরা করেন শিশুটির মাকে।
আজ এই মামলায় আরও সাক্ষ্য দেয় শিশুটির বোন। রুদ্ধদ্বার বিচারকক্ষে (ক্যামেরা ট্রায়াল) এই সাক্ষ্য নেওয়া হয়। এরপর শিশুটির ফুপু, চাচাও সাক্ষ্য দেন। আজ দুপুর ১২টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত এই মামলায় মোট ১০ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এরপর আদালত বিরতিতে যান।
আলোচিত এই মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে মোট ১৮ জনকে।
গত ১৯ মে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পল্লবীর একটি ভবনের তিনতলার ফ্ল্যাট থেকে শিশুটির খণ্ডিত লাশ উদ্ধার করা হয়। ফ্ল্যাটটির বাসিন্দা সোহেল ঘটনার পর বাসার শৌচাগারের গ্রিল ভেঙে পালিয়ে যান। তবে বাসা থেকে তাঁর স্ত্রীকে তখনই আটক করা হয়। আর সেদিন সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে সোহেলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এই ঘটনায় শিশুটির বাবা পল্লবী থানায় মামলা করেন। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন আসামি সোহেল। শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যার কথা তিনি স্বীকার করেন বলে পুলিশ জানায়। নৃশংস এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং দল ও সংগঠন ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছে।