জেলেনৌকার সদস্য থেকে দক্ষ কারিগর; নিজ চেষ্টায়–প্রচেষ্টায় যেভাবে ভাগ্য বদলালেন ফারুক
· Prothom Alo
মাছ ধরা ট্রলারে ‘মিস্ত্রি’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ। ইঞ্জিন চালু করা থেকে যান্ত্রিক ত্রুটি মেরামত—সব ক্ষেত্রেই তাঁর ভূমিকা অপরিহার্য। আশির দশকে ভোলার লালমোহন উপজেলার ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের এক মাছ ধরা ট্রলারে এমনই এক ঘটনার মধ্য দিয়ে নতুন পরিচয় পান কিশোর মো. ফারুক।
সেদিন ট্রলারের নিয়মিত মিস্ত্রি হঠাৎ ছুটিতে চলে যান। ইঞ্জিন চালু করার মতোও কেউ ছিলেন না। তখন জাপানি ইঞ্জিন নতুন যুক্ত হচ্ছিল ট্রলারে, চীনা ইঞ্জিন তখনো বাজারে আসেনি। অনেক নৌকা তখন দাঁড়ের ওপরই নির্ভরশীল ছিল। এ অবস্থায় ট্রলারের মালিক আবদুল খালেক মাঝি ঘোষণা দেন, ‘যে ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে পারবে, সে পাবে মিস্ত্রির ভাগ।’ সাধারণত নৌকার অন্য সদস্যরা যেখানে মাছের এক ভাগ পেতেন, সেখানে মিস্ত্রি পেতেন সোয়া এক ভাগ।
Visit sweetbonanza.qpon for more information.
ছয়জনের প্রতিযোগিতায় সবার চেয়ে এগিয়ে যান মাত্র ১৫ বছরের ফারুক। তিনিই ইঞ্জিন চালু করতে সক্ষম হন। সেই থেকে শুরু হয় তাঁর মিস্ত্রিজীবনের পথচলা।
বর্তমানে ৫৩ বছর বয়সী ফারুক শুধু ট্রলারের ইঞ্জিন নয়, পাম্প, জেনারেটর ও ট্রাক্টরের ইঞ্জিন মেরামতেও দক্ষ। পরে নিজ চেষ্টায় শিখে ফেলেন ব্যাটারি তৈরি, মাইক-সাউন্ড সিস্টেম, অ্যামপ্লিফায়ার, সোলার প্যানেল, রেডিও ও টেপ রেকর্ডার মেরামতের কাজও।
স্থানীয়দের ভাষায়, তিনি কোনো ওস্তাদ বা প্রশিক্ষকের কাছে প্রশিক্ষণ নেননি। পর্যবেক্ষণ, আগ্রহ ও পরিশ্রম দিয়েই হয়ে ওঠেন দক্ষ কারিগর। স্থানীয়ভাবে মিস্ত্রিদের ‘পিটার’ বলা হয়। সেই থেকেই তাঁর নাম হয়ে যায় ‘ফারুক পিটার’।
ফারুক বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে কোনো ওস্তাদ ছাড়াই নিজের চেষ্টায় সব শিখেছি। ব্যাটারি বানানো, মাইক-সাউন্ড সিস্টেম, অ্যামপ্লিফায়ার, সোলার প্যানেল, রেডিও-রেকর্ড প্লেয়ারের কাজ—সবই এখন করতে পারি।’
ইলেকট্রনিকসের কাজে দক্ষ হওয়ার পর তিনি জেলেনৌকার কাজ ছেড়ে দেন। পরে লালমোহনের মঙ্গল শিকদার বাজারে ফারুক মাইক সার্ভিস নামে ব্যবসা শুরু করেন। এখন তাঁর অনেক শিষ্য ট্রলার ও ট্রাক্টরের ইঞ্জিন মেরামতের কাজ করছেন।
ফারুকের জীবন ছিল সংগ্রামের। পঞ্চম শ্রেণির পর অভাবের কারণে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। ধলীগৌরনগরের কামরহাওলা গ্রামে তাঁদের বড় বাড়ি, জমিজমা ও মাছ ধরার নৌকা ছিল। কিন্তু তিন দফা নদীভাঙনে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে পরিবার। একসময় তাঁর বাবা সেকেন্দার আলী মাঝিকে মাছ ধরার নৌকাটিও বিক্রি করতে হয়।
বাবার মৃত্যুর পর মাত্র ১৫ বছর বয়সে পরের নৌকায় মাছ ধরতে নামেন ফারুক। ট্রলারের ইঞ্জিন চালু করতে করতে ও অন্য মিস্ত্রিদের কাজ দেখে দেখে একসময় নিজেই হয়ে ওঠেন দক্ষ মিস্ত্রি।
১৯৯৭ সালে মেঘনা নদীর তীরে বাত্তিরখাল মাছঘাটে মাইক, ক্যাসেট প্লেয়ার ও ব্যাটারি ভাড়ার ব্যবসা শুরু করেন তিনি। তখন বর্ষায় জেলেরা নদীতে জাল পেতে গান শুনতেন। একটি ব্যাটারি ভাড়া দিয়েই দিনে ৫০ টাকা আয় হতো। পরে বেঙ্গল টাইগার ব্যাটারি হাউস থেকে ব্যাটারি তৈরির কাজ শিখে নিজেই ব্যাটারি বানাতে শুরু করেন। তাঁর তৈরি ব্যাটারির মান এত ভালো ছিল যে প্রতিষ্ঠানের মালিক ফিরোজ পাটওয়ারী তাঁকে বিশেষভাবে সম্মান জানান।
বর্তমানে ফারুক মাইক সার্ভিস থেকে বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিল, সামাজিক অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক আয়োজনে সাউন্ড সিস্টেম ভাড়া দেওয়া হয়। তিনি ও তাঁর ছেলে এমরান হোসেন এখন সাউন্ড সিস্টেমের যন্ত্রাংশ মেরামত ও নতুন অ্যামপ্লিফায়ার তৈরি করেন। ফারুক বলেন, ‘আমার ছেলে এখন আমার থেকেও দক্ষ কারিগর। সুযোগ পেলে ছোট এই ব্যবসা আরও বড় করতে চাই। তারপরও আল্লাহর রহমতে ভালোই আছি।’