শেষ দিনেও বৃষ্টিতে ভাটা রাজধানীর পশুর হাট
· Prothom Alo

আজ পবিত্র ঈদুল আজহা। ঈদের আগে গতকাল বুধবার ছিল পশুর হাটের শেষ দিন। শেষ বিকেলে বেচাকেনা জমে ওঠার কথা থাকলেও রাজধানীর হাটগুলোতে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। ঢাকার উত্তরা দিয়াবাড়ি, গাবতলী ও উত্তর শাহজাহানপুর পশুর হাট ঘুরে ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলক কম দেখা যায়। বিপরীতে হাটে পর্যাপ্ত গরু দেখা গেছে।
Visit somethingsdifferent.biz for more information.
গতকাল বেলা দুইটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত তিনটি হাট ঘুরে দেখা গেছে, বৃষ্টিতে হাটের ভেতরে বিভিন্ন স্থানে কাদাপানি জমে আছে। কাদাপানির কারণে অনেক ক্রেতা হাটের ভেতরে যাচ্ছিলেন না। ক্রেতার উপস্থিতি কম হওয়ায় খামারি ও পাইকারদের মধ্যে হতাশা ছিল। অনেকে নির্ধারিত প্যান্ডেল ছেড়ে গরু নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণে চলছিল ডাকাডাকি। কেউ বলছিলেন, ‘আর একটা গরু আছে, দেখে যান’; আবার কেউ বলছিলেন, ‘কেনা দামেই ছেড়ে দেব।’
খামারি ও পাইকারেরা জানিয়েছেন, দফায় দফায় বৃষ্টির কারণে আশানুরূপ বেচাকেনা হয়নি। অনেকে দাম না পেয়ে গরু ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন বলেও জানিয়েছেন। অন্যদিকে হাটে আনা বিশালাকার ও বাহারি নামের অনেক গরুই গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্রি হয়নি। এ ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন খামারিরা। ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদাই ছিল বেশি বলেও জানান তাঁরা।
কেনা দামেও ক্রেতা মিলছে না
ফরিদপুরের নগরকান্দা থেকে ১৫০টি গরু নিয়ে উত্তরা দিয়াবাড়ি হাটে আসেন ব্যবসায়ী রবিউল ইসলাম রবি। গতকাল বিকেল চারটার দিকে একটি ছোট আকারের গরু নিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। রবিউল বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে তাঁরা নানা সমস্যায় পড়েছেন। কোথাও কোথাও ত্রিপল ছিঁড়েও গেছে, পানি জমে আছে। এমন পরিস্থিতিতে এখনো তাঁদের আনা ৩০টি গরু অবিক্রীত রয়েছে।
রবিউল ইসলাম বলেন, তাঁদের আনা গরুগুলোর বেশির ভাগের ওজন ছিল ৬ থেকে সাড়ে ৭ মণ। সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় গরু বিক্রি করেছেন। প্রায় ছয় মণ ওজনের গরুটি মণপ্রতি ২৫ হাজার টাকা দরে দেড় লাখে বিক্রি করেছেন। সাড়ে সাত মণ ওজনের গরুটি অবিক্রীত আছে বলেও জানান তিনি। রবিউলের ভাষায়, ‘কোনোটা দুই-এক হাজার লাভে বিক্রি করছি, কোনোটা কেনা দামে। সব মিলাইয়া লসে আছি।’
দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে গাবতলীর হাটে আনা হচ্ছে কোরবানির গরু।সঙ্গে থাকা গরুটি দেখিয়ে রবিউল বলেন, ‘এই গরুটা ৬৫ হাজার টাকায় কেনা। কিন্তু ৫৫ থেকে ৬০ হাজার টাকার বেশি বলতেছে না। রাস্তায় নিয়ে আসছি, যদি কেনা দামে বিক্রি করতে পারি।’ তাঁর মতে, আকাশে মেঘ ও দফায় দফায় ঝড়বৃষ্টির কারণে বাজার পরিস্থিতি খারাপ হয়ে গেছে।
ওই হাটে পাবনার খামারি মোহাম্মদ ইমন ২৫টি গরু নিয়ে এসেছিলেন। তিনি বলেন, বৃষ্টির কারণে বাজার পরিস্থিতি কখনো ভালো ছিল, আবার কখনো একেবারেই মন্দ হয়ে যায়। তাঁর ভাষায়, ‘মঙ্গলবার বিকেল থেকে ভোর চারটা পর্যন্ত বাজার ভালো ছিল। পরে আবার বৃষ্টির কারণে বাজার ডাউন হয়ে যায়।’ এখনো তাঁর চারটি গরু অবিক্রীত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
গতকাল বিকেলে উত্তর শাহজাহানপুর হাটে নির্ধারিত প্যান্ডেল ছেড়ে রাস্তার পাশে চারটি গরু নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন পাইকার মেসবাহ উদ্দিন। তিনি বলেন, যে গরুর দাম গত মঙ্গলবারও ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা বলা হয়েছিল, সেই গরুর জন্য এখন (বুধবার) ক্রেতারা ৭০-৮০ হাজার টাকার বেশি বলছেন না। এমন পরিস্থিতিতে আগে কখনো পড়েননি বলেও জানান তিনি।
খামারি ও পাইকারদের ভাষ্য, এ বছর মানুষ তুলনামূলক কম গরু কিনছেন। যাঁরা কিনছেন, তাঁরা ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর দিকেই ঝুঁকছেন। মানিকগঞ্জ থেকে গাবতলী হাটে ১৬টি গরু আনা খামারি রাশেদ হাসান বলেন, এখন পর্যন্ত ১০টি গরু বিক্রি হলেও ৬টি এখনো অবিক্রীত রয়েছে। এবার লোকসানের আশঙ্কা করছেন তিনি।
‘ঘুরাই নেওন নাগবই’
গরু রাখার নির্ধারিত প্যান্ডেল ছেড়ে রাস্তায় সারি সারি গরু নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন পাইকার ও খামারিরা। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া ক্রেতাদের উদ্দেশে তাঁরা ডাকাডাকি করছিলেন। এ সময় রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দুই পাইকারকে হতাশা নিয়ে নিজেদের মধ্যে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়।
এক পাইকার আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘বাজার এরম খারাপ অইব জানে কেডা। আমার একলার তো না, বেকটিরই খারাপ।’ জবাবে অপর পাশে গরু নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক পাইকার বলেন, ‘গরু যদি ঘুরাই নেন, তাইলে খবর কইয়েন। যদি ঘুরাই নেওন লাগে। ঘুরাই তো নেওন নাগবই।’
পরে কথা হয় প্রথমজন পাইকারের সঙ্গে। তাঁর নাম সাইফুল ব্যাপারী। মানিকগঞ্জ থেকে ছয়টি গরু নিয়ে আসা এই ব্যবসায়ী জানান, চারটি গরু বিক্রি হয়েছে। গরুগুলো ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, ‘মোটামুটি লাভ হইছে। তবে বাজারটা ভালো না।’
দিয়াবাড়ি হাটে কথা হয় উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টরের ক্রেতা নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি প্রায় ৬ মণ ওজনের একটি গরু ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায় কেনেন। দাম নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘গতকাল পর্যন্ত মনে হচ্ছিল বাজেট অনুযায়ী এবার হয়তো পছন্দের গরু কোরবানি দিতে পারব না। কিন্তু আজ (গতকাল) হাটের পরিস্থিতি বদলেছে।’ তিনি যে আকারের গরু কিনেছেন, এমন গরু গত মঙ্গলবার দুই লাখের বেশি চাওয়া হচ্ছিল বলেও জানান তিনি।
ঈদ সামনে রেখে জমে উঠেছে রাজধানীর সবচেয়ে বড় পশুর হাটগুলোর একটি গাবতলী।বাহারি নামের গরুর বাজার মন্দা
রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে এবার বড় আকারের ও বাহারি গরুগুলোর বেশির ভাগই অবিক্রীত রয়েছে। খামারি ও পাইকারেরা বলছেন, ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা থাকলেও বড় গরুর ক্রেতা কম। ফলে কাঙ্ক্ষিত দাম তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে অর্ধেক দামও বলছেন না ক্রেতারা।
টাঙ্গাইলের নাগরপুর থেকে উত্তরা দিয়াবাড়ি হাটে ‘টাঙ্গাইলের মান্না’ নামের একটি বিশাল গরু এনেছেন খামারি কোহিনুর ইসলাম। প্রায় ১ হাজার ১০০ কেজি ওজনের গরুটির দাম চেয়েছেন ১২ লাখ টাকা। তবে ক্রেতারা ৮ থেকে সাড়ে ৮ লাখ টাকার বেশি বলছেন না। কোহিনুর ইসলাম বলেন, ‘আমাদের টার্গেট ১০ লাখ টাকা। কিন্তু আজকে একজন পাঁচ-সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা বলছে। বিক্রি না হলে বাড়িতে নিয়ে যাব।’
একই এলাকার আরেক খামারি আবদুল আওয়ালও প্রায় ২২ মণ ওজনের একটি গরু নিয়ে হাটে এসেছেন। আড়াই বছর ধরে পালন করা গরুটির দাম চেয়েছেন ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু সর্বোচ্চ দাম উঠেছে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। তিনি বলেন, ‘আজকে কেউ ঠিকমতো দামই বলে নাই।’
গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর থেকে ‘বাদশা’ নামের বড় একটি গরু নিয়ে এসেছেন আলী হাসান। গরুটির সঙ্গে ‘মহারাজ’ নামের একটি খাসি ফ্রি দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। প্রায় ১ হাজার ২১৯ কেজি ওজনের গরুটির দাম তিনি চেয়েছিলেন ১২ লাখ টাকা। তবে ক্রেতারা সাড়ে সাত লাখ টাকার বেশি বলছেন না। আলী হাসানের ভাষায়, ‘বৃষ্টির কারণে কাস্টমার কম। এ ছাড়া বাজারে অনেক গরু, কিন্তু ক্রেতা কম।’
প্রায় ৪০ মণ ওজনের ‘সম্রাট বাবু’ নামের গরুটিকে গাবতলী হাটে তুলেছিলেন খামারি হাবিব খান। ওই গরুের জন্য তিনি দাম চেয়েছিলেন ৩২ লাখ টাকা। গতকাল সন্ধ্যায় তিনি প্রথম আলোকে মুঠোফোনে জানান, ১২ লাখ টাকায় গরুটি তিনি বিক্রি করেছেন। গত মঙ্গলবার রাতে গরুটি বিক্রি হয়েছে।