ট্রাম্প–নেতানিয়াহুর ‘মাস্টারপ্ল্যান’ যেভাবে ধূলিসাৎ হলো

· Prothom Alo

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে চলমান জটিল আলোচনায় প্রতিদিনই নতুন মোড় দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্প যদি তৃতীয়বারের মতো ইরানে হামলার সিদ্ধান্ত নেন, তবু একটি বিষয় নির্মমভাবে স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধ হেরে গেছে—গত ২৫ বছরে এটি তাদের ষষ্ঠ পরাজয়।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

ইরানের হাতে রয়েছে সব তাস—প্রধানত হরমুজ প্রণালি, পাশাপাশি উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের ওপর তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র যে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি করেছে, সেটিও। আরও কিছু তাস এখনো তারা ব্যবহারই করেনি, যেমন লোহিত সাগরের মুখে বাব এল–মানডেব প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া। ট্রাম্পের হাতে তেমন কিছুই নেই।

এ শতাব্দীর প্রথম প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক ব্যর্থতাগুলো—এমন সময়ে যখন তাদের সামরিক শক্তি ছিল প্রশ্নাতীত এবং শক্তি প্রয়োগে তাদের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল যুদ্ধের ইতিহাসে বিশেষভাবে লিপিবদ্ধ হওয়ার মতো ঘটনা। ইরানে হামলা চালিয়ে ট্রাম্প শুধু আফগানিস্তান, ইরাক, ইয়েমেন, লিবিয়া ও সিরিয়ায় তাঁর পূর্বসূরিদের ভুলের পুনরাবৃত্তিই করেননি; বরং নিজের পক্ষ থেকেও নতুন কিছু ভুল যোগ করেছেন।

আরব দেশগুলো নিরাপত্তার নামে যেভাবে প্রতারিত হলো

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ যেমন মিথ্যা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইরাকে আক্রমণ করেছিলেন, দাবি করা হয়েছিল যে সাদ্দাম হোসেনের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে, ট্রাম্পও তেমনি ভুয়া গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ইরানে হামলা চালিয়েছেন। তবে অন্তত বুশের সন্দেহজনক গোয়েন্দা নথি এসেছিল তাঁর নিজের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে। ট্রাম্পের ভুয়া গোয়েন্দা তথ্য তৈরি করেছিল মোসাদ; আর মার্কিন গোয়েন্দা মহলের পরামর্শ উপেক্ষা করে তা পুরোপুরি বিশ্বাস করেছিলেন মার্কিন প্রধান সেনাপতি।

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মোসাদের পরিচালক ডেভিড বার্নেয়া ট্রাম্পকে বোঝান যে জানুয়ারির বিদ্রোহের পর তেহরানের সরকার এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে যে সর্বোচ্চ নেতা হত্যার কয়েক দিনের মধ্যেই সেটি ভেঙে পড়বে। এ যুক্তির সবচেয়ে বড় প্রবক্তা ছিলেন নেতানিয়াহু, যাঁর আজীবনের স্বপ্ন যেন বাস্তবায়নের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল।

তিনি দাবি করছিলেন, আর মাত্র একটি শেষ ধাক্কাই যথেষ্ট। এখন যুদ্ধ শেষ হওয়ার পথে, আর সবচেয়ে বড় পরাজিতও তিনিই; এ কারণেই তিনি মরিয়া হয়ে ট্রাম্পকে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করা থেকে বিরত রাখতে চাইছেন। তবে যুদ্ধ শেষ হলে এই দুই নেতার জন্যই চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশের সময় আসবে।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য হারানোর যুদ্ধ

শক্তির ভারসাম্য

যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি প্রশাসন অর্থাৎ ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদ, জো বাইডেনের প্রশাসন এবং এখন ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের নীতি ছিল সুন্নি আরব দেশগুলোকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে উৎসাহিত করা।

এ নতুন প্রস্তাবিত আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে বিভিন্ন নামে ডাকা হয়েছে: সুন্নি-ইসরায়েল জোট, আরব ন্যাটো কিংবা আব্রাহাম অ্যাকর্ডস। তবে এর রূপ ছিল স্পষ্ট। এটি মোটেও সমান অংশীদারদের জোট হতো না; বরং ইসরায়েলকে নতুন আঞ্চলিক আধিপত্যশীল শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হতো—এমন এক কেন্দ্র, যার মধ্য দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে অস্ত্র, উচ্চপ্রযুক্তি, তথ্য ও বাণিজ্য প্রবাহিত হবে।

এ জোটের প্রকৃত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ অংশীদার ছিলেন মাত্র একজন: সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। তিনিই কেবল দেখেছিলেন, দুই ‘লিটল স্পার্টা’ একত্র হয়ে কীভাবে বিমানঘাঁটি ও বন্দরভিত্তিক পারস্পরিক উপকারী সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পারে, যা কৌশলগতভাবে পারস্য উপসাগর, ওমান উপসাগর ও লোহিত সাগরজুড়ে বিস্তৃত থাকবে।

মার্কিন ঘাঁটির নিরাপত্তাচাদর ফালাফালা, বাদশাহ-আমিরদের কী হবে

ইরানের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ হলে হয়তো শাহের ছেলে রেজা পাহলভির মতো দুর্বল কোনো পুতুল শাসককে ক্ষমতায় বসানো হতো অথবা দেশটি গৃহযুদ্ধ ও ভাঙনের দিকে যেত। ইসরায়েলের তাতে কিছুই আসত-যেত না। ইরাক এবং এখন সিরিয়াকে স্থায়ীভাবে দুর্বল ও বিভক্ত করে রাখা ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠিত নীতি।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান মানচিত্রে কথিত বাইবেলীয় ইসরায়েল রাষ্ট্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি অভিন্ন ধর্মীয় উদ্দেশ্য রয়েছে। তবে তেল আবিবের সমগ্র ইহুদি রাজনৈতিক কাঠামোর বাস্তববাদী অবস্থান হলো, তারা এখন মনে করে যে তারা কেবল এমন প্রতিবেশীদের সঙ্গেই সহাবস্থান করতে পারবে, যাদের হয় তারা দখল করে রাখবে, নয়তো স্থায়ীভাবে দুর্বল করে দেবে।

চূর্ণ-বিচূর্ণ ইরান হলে মধ্যপ্রাচ্যের এ নতুন ব্যবস্থার রাজা হিসেবে ট্রাম্পের অভিষেক ঘটত, আর তাঁর আঞ্চলিক সামন্ত শাসক হিসেবে নেতানিয়াহুরও। তিনিই হতেন সেই ব্যক্তি, যিনি ৪৭ বছর ধরে ওয়াশিংটনের চাপে নতি স্বীকার না করা শক্তিকে অবশেষে ধ্বংস করেছেন। সৌভাগ্যবশত, এটি এখন কেবল ট্রাম্পের মাথার ভেতরকার এক কল্পনা। ইরানের টিকে থাকা অঞ্চলটির শক্তির ভারসাম্য মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে।

প্রান্ত থেকে কেন্দ্রে ও উদীয়মান জোট

আলোচনায় নেতৃত্ব দিচ্ছে কারা, সেটি দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়: পাকিস্তান ও কাতার। ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত শুরুর পর থেকে পাকিস্তান বরাবরই অঞ্চলটির প্রান্তিক অবস্থানে ছিল। ইন্দোনেশিয়া বা মালয়েশিয়ার মতো অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মতো তারাও সহানুভূতি দেখাত, কিন্তু সেখানেই সীমাবদ্ধ ছিল।

পরিবর্তনের মূল মুহূর্তটি আসে ইরান যুদ্ধের তুঙ্গে, যখন প্রধান আরব শক্তিগুলো—সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত বুঝতে পারে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করে গড়ে তোলা মার্কিন সামরিক ছাতাও তাদের রক্ষা করতে পারছে না। ফলে তারা বড় সেনাবাহিনী ও শক্তিশালী বিমানক্ষমতাসম্পন্ন বাইরের শক্তিগুলোর দিকে ঝুঁকে পড়ে: তুরস্ক ও পাকিস্তান।

এখন দুটি স্বতন্ত্র জোট গড়ে উঠেছে। একটি যুদ্ধের উত্তাপে গঠিত হয়েছে, যেখানে রয়েছে সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক, কাতার ও ওমান। ধারণা করা হচ্ছে, কুয়েত ধীরে ধীরে পাকিস্তানের দিকে ঝুঁকছে, আর মিসরের গাজার বিষয়ে ইসরায়েলের পরিকল্পনা নিয়ে ভয়ের কারণও অনেক বেশি। এসব রাষ্ট্রের বেশির ভাগই ট্রাম্পের তথাকথিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর সদস্য; কিন্তু ইরানের বিজয়ের পর সেই পরিচয়ের গুরুত্ব খুব কমে গেছে। তারা সবাই গাজা উপত্যকার অর্ধেক, দক্ষিণ লেবানন এবং পশ্চিম তীরের দুই-তৃতীয়াংশ স্থায়ীভাবে দখল করে রাখার ইসরায়েলি প্রচেষ্টার বিরোধিতা করছে।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে নেতানিয়াহুকে চড়া মূল্য দিতে হবে

এই উদীয়মান জোটের আরেকটি ইঙ্গিত পাওয়া যায় তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক যৌথ বিবৃতিতে, যেখানে ইসরায়েলের বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল সোমালিল্যান্ডে দূতাবাস খোলার নিন্দা জানানো হয়। লক্ষ করার বিষয় হলো, কোন দেশের স্বাক্ষর সেখানে অনুপস্থিত ছিল? সংযুক্ত আরব আমিরাতের। সুন্নি মুসলিম দেশগুলোর একটি শক্তিশালী সামরিক ও কূটনৈতিক জোটের উত্থানই ছিল ঠিক সেই বিষয়, যা ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাত চায়নি। তাদের নিজস্ব জোট এখনো শক্তিশালী এবং ক্রমেই আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠছে। তাদের পেছনে রয়েছে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু এসব দেশ ভৌগোলিকভাবে অনেক দূরে। যদি শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে আবুধাবি নিজেকে রূপক অর্থে অন্তত তার দুই শক্তিশালী প্রতিবেশী ইরান ও সৌদি আরবের বন্দুকের নলের সামনে দেখতে পাবে।

সৌদি আরবকে ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে টেনে আনার আমিরাতের কৌশল ব্যর্থ হয়েছে। রিয়াদ মোটামুটি নিজের অবস্থানেই অটল থেকেছে এবং ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ও ইয়েমেনে হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি অক্ষুণ্ণ রেখেছে; যদিও ক্রমবর্ধমান প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে সৌদি তেলক্ষেত্রের ওপর প্রতিহত করা কিছু ক্ষেপণাস্ত্র উত্তরের ইরাক বা পূর্বের ইরান থেকে নয়, বরং দক্ষিণের ইয়েমেন থেকে এসেছে। একটি বিষয় নিশ্চিত: উদীয়মান সুন্নি জোট নিজেকে প্রকাশ্যে ‘ইসরায়েলবিরোধী’ হিসেবে তুলে না ধরলেও, এর অস্তিত্ব নিঃসন্দেহে ইসরায়েলের স্বার্থের পক্ষে নয়।

ইরান যুদ্ধকে পাকিস্তান যেভাবে পুনরুত্থানের হাতিয়ার বানাল

ট্রাম্প হয়তো যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে রিয়াদকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে সই করতে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করবেন। কিন্তু তিনি যা পাবেন, তা হলো বধির নীরবতা। সর্বশেষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে তিনি আবারও পরাজয়ের মুখ থেকে বিজয় ছিনিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন। ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন: ‘হয়তো এক বা দুই দেশের না করার কারণ থাকতে পারে এবং তা মেনে নেওয়া হবে। কিন্তু অধিকাংশেরই প্রস্তুত, আগ্রহী ও সক্ষম হওয়া উচিত যাতে ইরানের সঙ্গে এ সমঝোতা অন্যথায় যা হতো, তার চেয়ে অনেক বেশি ঐতিহাসিক ঘটনা হয়ে ওঠে’।

পরাজিত ও বিভ্রান্ত এই প্রেসিডেন্ট এমনকি ইরানকেও সদস্য হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন: ‘উপরোক্ত মহান নেতাদের অনেকের সঙ্গে কথা বলেছি। আমাদের দলিলে সই হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁরা ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশ হিসেবে পেলে সম্মানিত বোধ করবেন। ওয়াও, সেটা সত্যিই বিশেষ কিছু হবে!’

প্রতিরোধকে শক্তিশালী করা

বাস্তব পৃথিবীতে ইরান এখন উপসাগরীয় অঞ্চলের আরেকটি প্রধান শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে। তারা আবারও এ অঞ্চলের অন্যান্য তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশের ওপর নিজেদের প্রতিরোধক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করেছে এবং ওমানের সঙ্গে সমন্বয়ে হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের বাস্তব নিয়ন্ত্রণ আর কখনো ছাড়বে না। এটি তাদের কাছে সেই উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের চেয়ে বেশি মূল্যবান, যা তারা উৎপাদন করতে শুরু করেছিল সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে হওয়া পারমাণবিক চুক্তি থেকে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর।

যুদ্ধবিরতির কাঠামোগত চুক্তি যদি ইসরায়েল বা ট্রাম্প নস্যাৎও করে দেন, তবু ইরানের হাতে এখনো অনেক তাস রয়েছে। হ্যাঁ, ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু ইরানের বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীকে ধ্বংস করেছেন, যেমন ইসরায়েল সিরিয়ার ক্ষেত্রেও করেছিল। কিন্তু তারা ইরানের প্রকৃত আকাশ ও সামুদ্রিক শক্তিকে ধ্বংস করতে পারেনি যা ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, ছোট নৌকা ও নৌ-মাইনের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

সাম্প্রতিক দিনগুলোয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে পাকিস্তান ও চীনের উদ্দেশে ট্যাংকার চলাচল করেছে; এটি মোটেও কাকতালীয় নয়। ইরান প্রমাণ করেছে যে তারা চাইলে পানির কলের মতো হরমুজ প্রণালি চালু বা বন্ধ করতে পারে।

ইরানের বিজয় পুরো অঞ্চলের প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোকেও শক্তিশালী করেছে। হিজবুল্লাহকে প্রায় যুদ্ধক্ষমতাহীন বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল, কারণ পেজারে বিস্ফোরণ ও ধারাবাহিক হামলায় তাদের নেতৃত্ব বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। কিন্তু এখন নতুন প্রজন্মের যোদ্ধারা মৌলিক পাল্টা গোয়েন্দা শিক্ষা অর্জন করেছেন; তাঁরা লেবাননকে লেবাননের সরকারের চেয়ে বেশি কার্যকরভাবে রক্ষা করছেন, যদিও সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে।

ইরান বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যও বদলে দিয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সামনে ট্রাম্পকে বিব্রত ও সংকুচিত দেখাটা ছিল কষ্টদায়ক, যখন চীনা নেতা যথেষ্ট আত্মবিশ্বাস নিয়ে ট্রাম্পের সামনেই তাইওয়ানকে স্পর্শ না করার সরাসরি হুমকি দেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে এখন যুক্তরাষ্ট্রকেই একটি ‘বখাটে রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখা হচ্ছে, আর চীন স্থিতিশীলতার কণ্ঠস্বর ও ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর একটি শক্তি হয়ে উঠছে। গত ২৫ বছরে চীনই একমাত্র বড় শক্তি, যারা কোনো যুদ্ধে জড়ায়নি।

বশ্যতা স্বীকার না করার ক্ষেত্রে ইরানের প্রতিরোধ আরব বিশ্বের জন্য শক্তিশালী বার্তা বহন করে। বার্তাটি হলো: যথেষ্ট দৃঢ়তা ও উচ্চমাত্রার সহ্যক্ষমতা থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যম শক্তিগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঔপনিবেশিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে এবং জয়ীও হতে পারে।

ঐতিহাসিক পরাজয়

কাঠামোগত চুক্তি সই হওয়ার পর কী ঘটবে? আমার ধারণা, ইসরায়েল নতুন উদ্যমে লেবানন ও গাজায় আবার বোমাবর্ষণ শুরু করবে। নেতানিয়াহু সম্ভবত লিতানি নদীর দক্ষিণে প্রতিটি বাড়ি, গ্রাম ও শহর ধ্বংস করা অব্যাহত রাখতে চাইবেন, যাতে ইরানে তাঁর ব্যর্থতাকে যত দিন সম্ভব আড়াল করা যায়। এমনকি হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের অজুহাতে পুরো গাজা দখলের কথাও তিনি ভাবতে পারেন। কিন্তু এর মাধ্যমে তিনি নিজের রাজনৈতিক কবরই খুঁড়বেন, কারণ ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধগুলো থেকে তাদের ঘোষিত কোনো লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনাই নেই।

ট্রাম্পও একইভাবে কিউবার বিরুদ্ধে অবরোধ বজায় রাখবেন। শুধু লক্ষ করুন, ইরানের সঙ্গে চুক্তি হয়ে গেলে এই দুই ব্যক্তি কত দ্রুত আলোচনার বিষয় পরিবর্তন করবেন। কারণ, গত তিন মাসের অত্যন্ত অজনপ্রিয় যুদ্ধের জন্য দেশে যাঁরা তাঁদের জবাবদিহির মুখে দাঁড় করাতে চাইবেন, তাঁদের প্রশ্নের উত্তর তাঁরা দিতে পারবেন না।

মার্কিন–ইরান যুদ্ধবিরতিতে পাকিস্তান: এক ঢিলে বহু পাখি শিকার

গাজায় গণহত্যামূলক অভিযানের ফলে ইসরায়েল যেমন এক প্রজন্মের মার্কিন ইহুদিদের সমর্থন হারিয়েছে, তেমনি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধও রিপাবলিকান ঘরানার প্রবীণ ট্রাম্প সমর্থকদের মধ্যে একই ধরনের প্রভাব ফেলেছে। রিপাবলিকান খ্রিষ্টান মহলে এখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই ধারণা যে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে ‘দখল’ করে রেখেছে।

ট্রাম্প বা নেতানিয়াহু কেউই নিজেদের জনগণের চোখে চোখ রেখে বলতে পারবেন না যে ইরানের কাছে তাঁরা পরাজিত হননি।

  • ডেভিভ হার্স্ট মিডলইস্ট আইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক। এর আগে তিনি গার্ডিয়ানের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান লেখক ছিলেন।

মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ

Read full story at source