ট্রাম্পের ‘অপ্রত্যাশিত উপহারে’ কাটলো পুতিনের দুশ্চিন্তা

· Prothom Alo

মার্কিন প্রেসিডেন্ট আগমনের ৬ দিন পর, ২০ মে চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে চীনে স্বাগত জানান। চীন ও রাশিয়ার মধ্যে ২০টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চীন যেহেতু তাদের অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৭০ শতাংশ আমদানি করে, সেহেতু ইরান যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পর চীনে রাশিয়ান তেল রপ্তানি বাড়ানো নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।

Visit rouesnews.click for more information.

এই সফর পুতিনকে মার্কিন আধিপত্যের বিরুদ্ধে চীন ও রাশিয়ার যৌথ অংশীদারত্ব এবং চীনের পাশাপাশি রাশিয়াকেও একটি স্থিতিশীল বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ করে দেয়। সি চিন পিং ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুদ্ধের সংযত সমালোচনা করে ‘হামলা বন্ধের’ আহ্বান জানান এবং যুক্তরাষ্ট্রের পুনরায় বিমান হামলাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেন।

সি ও পুতিন একটি বহু মেরুর বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে তাদের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে একটি যৌথ ঘোষণাপত্রেও স্বাক্ষর করেন। ২০০৭ সালে মিউনিখের ভাষণের পর থেকেই পুতিন এ ধারণা প্রচার করে আসছেন। সে ভাষণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এককভাবে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ এনেছিলেন।

এর পর থেকে পুতিনের ইতিহাস জানা। ২০০৮ সালে তিনি জর্জিয়া আক্রমণ করেন। ২০১৪ সালে ইউক্রেনের প্রায় ১৫ শতাংশ দখল করে নেন। ঠিক গত সপ্তাহে তিনি ‘রুশ নাগরিকদের রক্ষা করা’র উদ্দেশ্যে যেকোনো দেশে আগ্রাসন চালানোর অনুমোদনে একটি আইন পাস করেন। বেইজিংয়ে যাওয়ার এক দিন আগে রাশিয়ান পারমাণবিক অস্ত্র সম্পৃক্ত সামরিক মহড়া শুরুর ঘোষণা দিয়েছে বেলারুশ।

ইরান যুদ্ধ: ট্রাম্প যেভাবে পুতিনের সঙ্গেও যুদ্ধে জড়িয়ে গেলেন

রাশিয়ায় অসন্তোষ

অথচ মাত্র কয়েক মাস আগেও পুতিনের পক্ষে ভাগ্য ছিল না। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলায় পুতিন সরকারকে কর বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। বছরের শেষ নাগাদ বাজেটঘাটতি তিন গুণ হয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস ছিল। ভ্যাট বৃদ্ধির ধাক্কা এই প্রথমবার রুশ ব্যবসায়ীরা টের পেতে শুরু করেছিলেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। সরকারি সংস্থা এবং রাষ্ট্রীয় কোম্পানিগুলো ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের উদ্যোগ নেয়। ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ এসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার তেলের ওপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তাব করার পরিকল্পনা করছিল।

যুদ্ধ পরিচালনা এবং অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পুতিনকে বেশ বেগ পোহাতে হচ্ছিল। ক্রেমলিনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে নানা গুজব ও জল্পনা-কল্পনা ছড়িয়ে পড়ছিল। ইন্টারনেট ক্র্যাকডাউনের প্রতিক্রিয়াতে অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সারদের নেতৃত্বে অসন্তোষের একটি গণক্ষোভ দেখা দেয়। অর্থনৈতিক সংকট রাজনৈতিক সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।

তবে ভাগ্য পুতিনের পক্ষে চলে আসে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্প ও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিল এবং রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪৪ ডলার থেকে লাফিয়ে ১০০ ডলারে গিয়ে পৌঁছায়।

ইউক্রেন যুদ্ধের পেছনে রাশিয়ার শত শত কোটি ডলার খরচ হয়েছে, হাজার হাজার লোকের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইরান যুদ্ধের পর তেলের ক্রমবর্ধমান মূল্য পুতিনের জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে।

ইরান যুদ্ধ যেভাবে পুতিনকে সাহায্য করেছিল

দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে সংকটে থাকা ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়ার তেলের প্রতি নতুন করে আগ্রহ দেখাতে শুরু করে। সমুদ্রে ট্যাংকারে আগে থেকে বোঝাইকৃত রাশিয়ান তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে ট্রাম্প পুতিনকে আরও একটি বড় সাফল্য এনে দিয়েছেন। চীন ও ভারত এখন এই তেলের জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এমনকি জাপানও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য রাশিয়ান তেলকে ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলে ঘোষণা করেছে।

ট্রাম্প তেল ছাড়াও পুতিনকে আরও উপহার এনে দিয়েছেন। শুল্ক যুদ্ধ, ভেনিজুয়েলায় মাদুরোর অপসারণ, ইরানের খামেনি হত্যা, গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকি, ন্যাটোর দুর্বলকরণ সামগ্রিকভাবে মার্কিন-ইউরোপীয় আধিপত্যাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকেই দুর্বল করে দিয়েছে। পুতিন দুই দশক যাবৎ এই স্বপ্নই দেখে আসছেন।

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ক্ষয়িষ্ণুতা ও তেলের বিপুল প্রাচুর্য পুতিনকে অর্থনৈতিক সংকট সামলে ইউক্রেনে যুদ্ধের দামামা বাজাতে উৎসাহিত করছে। পুরো দেশ যুদ্ধের ময়দানের জন্য কাজ করবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন পুতিন। তবে যুদ্ধপরিস্থিতি এক অচলাবস্থার রূপ নিয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।

পুতিন এমন কিছু চান, যা তিনি কখনোই পাবেন না

পুতিনের দুর্গকৌশল

রাশিয়ায় আমার ২৫ বছরের সাংবাদিকতার ক্যারিয়ারে আমি কেবল ২০০৮ সালে একবারই রাজনৈতিকভাবে কিছুটা নমনীয় পরিস্থিতি দেখেছি। তখন ইউরোপের নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার নীতিতে ফিরে আসার একটি সম্ভাবনা সাময়িকভাবে দেখা দিয়েছিল। কিন্তু ২০১২ সালের মধ্যেই পুতিন দেশকে আবার স্ব-বিচ্ছিন্নতা এবং সামরিকবাদের দিকে ধাবিত করেন।

জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যমগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, বিরোধী দলগুলোকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং শত শত প্রতিভাবান তরুণকে আটক করা হয়। বিদেশের মাটিতে পুতিন পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যবর্তী বাফার রাষ্ট্রগুলোর একটি বেষ্টনী তৈরির দিকে মনোনিবেশ করেন। ২০২০ সালে ক্রেমলিনের একজন কর্মকর্তা আমার কাছে এটিকে পুতিনের ‘দুর্গ’কৌশল হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

কিন্তু অর্থনীতির ওপর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে এই কৌশল দীর্ঘ মেয়াদে টিকতে পারে না। ইউক্রেন যুদ্ধের চার বছরে রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ ১ হাজার ৬০৩ জন রাজনৈতিক বন্দীকে জেলে পুরেছে। অন্যদিকে যেসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, সেগুলো অভিযোগে সয়লাব হয়ে গেছে। এপ্রিল মাসেই সরকার সম্পৃক্ত এক প্রতিষ্ঠান তাদের জরিপে দেখিয়েছিল, মাত্র ২৯ শতাংশ রাশিয়ান দেশ পরিচালনার জন্য পুতিনকে বিশ্বাস করেন। ক্রেমলিনের প্রতি জনগণের সমর্থনের হার ভেঙে পড়ার উপক্রম।

ভ্লাদিমির পুতিনকে যেভাবে পরাজিত করা সম্ভব

একজন ব্লগার ভিক্টোরিয়া বোনিয়া পুতিনের চারপাশের চাটুকারদের ইঙ্গিত করে এক ভিডিওতে বলেছেন, ‘আপনাকে মিথ্যা বলা হচ্ছে। তারা আপনাকে ভয় পায়।’ মাত্র এক সপ্তাহে ৩ কোটি রুশভাষী মানুষ এটা দেখেছেন।

অন্যদিকে রাশিয়ার সেলিব্রেটি ক্সেনিয়া সোবচাক তাঁর জনপ্রিয় ইউটিউব শোতে ব্লগার ইলিয়া রেমেসলোকে আমন্ত্রণ জানান। রেমেসলো আগে ক্রেমলিনের সমর্থক ছিলেন, কিন্তু পরবর্তী সময়ে পুতিনের বিরোধী হয়ে ওঠেন। শোতে তাঁরা পুতিন–বিষয়ক রেমেসলোর মন্তব্য নিয়ে আলোচনা করেন। রেমেসলো পুতিনকে ‘অবৈধ প্রেসিডেন্ট’ এবং ‘রাশিয়ার সব সমস্যার কারণ’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। এমনকি এই বছরের মধ্যে ‘প্রাসাদ ক্যু’–এর সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করা হয়।

তবে পুতিনের সাবেক বক্তৃতা-লেখক আব্বাস গ্যালিয়মভসহ ক্রেমলিন বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত যে কোনো সমালোচনাই পুতিনের গতি কমাতে পারবে না। তিনি বলেন, ‘পুতিন রাশিয়াকে একটি পুঁজিবাদী অর্থনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার দিকেই টেনে নিয়ে যেতে থাকবেন।’

রাশিয়ানদের অনুভূতি

পুতিনের অদম্য মনোভাব এবং ইরান যুদ্ধ থেকে লাভ হওয়া সত্ত্বেও, রাশিয়ার জনমনে ক্রমশ হতাশা বাড়ছে। সেনাবাহিনী ও অর্থনীতির কথা মাথায় রেখে বেশি করে সন্তান নেওয়ার আহ্বানেও নারীরা সাড়া দেননি। রাশিয়ার জনসংখ্যাগত সংকট রোধে তার কোনো কর্মসূচিই সফল হচ্ছে না। ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে তার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় জন্মের হার আরও ৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।

মস্কোর একটি স্বাধীন জরিপ সংস্থা লেভাদা সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ৬৭ শতাংশ রাশিয়ান শান্তি আলোচনার পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। যুদ্ধের ক্লান্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা এবং অনলাইন ব্যাংকিংয়ে বিঘ্ন ঘটার মতো বিষয়গুলো পরিস্থিতিকে আরও হতাশাজনক করে তুলছে।

আমার ইনস্টাগ্রাম ফিড এখন ক্ষুব্ধ রাশিয়ানদের সেলফি ভিডিওতে সয়লাব। তাঁরা ইন্টারনেট–বিভ্রাট নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন; ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ক্রেমলিনের অনুগত কমিউনিস্ট পার্টির ৮১ বছর বয়সী নেতা গেনাদি জিউগানভও গত ২১ এপ্রিল সংসদের ফ্লোরে দাঁড়িয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে দেশের পুরো অর্থনীতি এখন ‘তলায়’ গিয়ে ঠেকেছে।

এই অর্থনৈতিক উদ্বেগগুলোর কথা বিবেচনা করলে, রাষ্ট্রীয় বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রতিরক্ষায় বরাদ্দ করাটা একধরনের উন্মাদনা বলে মনে হতে পারে। কিন্তু পুতিন মনে করেন, সামরিক ব্যয়ের কারণেই তিনি নিজেকে বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থানরত একজনে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন।

সোভিয়েত আমলের কেজিবির উত্তরসূরি এফএসবি এখন রাশিয়ানদের মনে ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছে। গত এক বছরে ৪৮৬টি রাষ্ট্রদ্রোহ ও গুপ্তচরবৃত্তির মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এক দশক ধরে গানুশকিনা পুতিনের ‘কাউন্সিল ফর সিভিল সোসাইটি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস’-এ দায়িত্ব পালন করছেন। গত ১৬ এপ্রিল গানুশকিনা আয়োজিত এক বার্ষিক সম্মেলনে ১০০ জনের বেশি মানবাধিকারকর্মীকে আমন্ত্রণ জানালে মাত্র ৪৭ জন উপস্থিত হয়েছিলেন। অনেকেই তাঁকে চিরকুট পাঠিয়ে লিখেছিলেন, ‘দুঃখিত, আমি ভয় পাচ্ছি।’

ভিন্নমতাবলম্বীদের শাস্তি হিসেবে জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত করাটা এই মুহূর্তে বড় ভয়। ইউক্রেনের বিরুদ্ধে পুতিনের যুদ্ধ যেমন স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে, তেমনি ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধও স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘তারা একই রকম। তারা দাম্ভিকতায় মোহাচ্ছন্ন এবং নিশ্চিত যে তারা কোনো এক বিশেষ মিশনে আছে। আমার ৮৮ বছরের জীবনে এখনকার চেয়ে বেশি অবাস্তব সময় আমি আর কখনো দেখিনি।’

  • আন্না নেমতসোভা একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, যিনি পূর্ব ইউরোপে কর্মরত আছেন। টাইম থেকে অনূদিত।

Read full story at source