লিভারপুলে চোখের জলই সালাহর বিদায়ী অর্ঘ্য

· Prothom Alo

‘তবু কেবলই দৃশ্যের জন্ম হয়’—মোহাম্মদ সালাহর বিদায়বেলায় লিভারপুলে তৈরি হয়েছে অসংখ্য দৃশ্য। তাঁকে নিয়ে বানানো তথ্যচিত্র, তাঁর মেয়েদের কথা, শেষ ম্যাচের ‘অ্যাসিস্ট’, দর্শকদের উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানানো, সতীর্থদের বিদায়ী আলিঙ্গন, ভক্তদের সঙ্গে আইকনিক সেলফি এবং সর্বোপরি সালাহর কান্না।

Visit turconews.click for more information.

এখান থেকে যেকোনো একটিকে বাছাই করে সেটাকে নিয়েই লেখা যেতে পারে দীর্ঘ কোনো আবেগময় গদ্য। তবে যত কিছু যতভাবেই লেখা হোক, তাতে লিভারপুলে সালাহর মহাকাব্যিক ক্যারিয়ারের খুব সামান্যই হয়তো ধরা যাবে। আরও অনেক আগেই যে অ্যানফিল্ডের ঘাসে মিশে চিরকালীন হয়ে উঠেছেন সালাহ। লিভারপুল নামের ক্লাব কিংবা অ্যানফিল্ড নামের স্টেডিয়াম যত দিন টিকে থাকবে, তত দিন সালাহর নামটিও সেখানে জ্বলজ্বল করবে।

তবে সালাহকে নিয়ে এই যে আবেগ ও আয়োজন, তার অনেকটুকুই ধরা পড়বে মিসরীয় তারকার একটি কথায়। লিভারপুলের হয়ে শেষ ম্যাচটি খেলার পর বিদায়বেলায় সালাহ বলেছেন, সারা জীবনে যা কেঁদেছেন, তার চেয়ে বেশি কাঁদলেন (গতকাল রাতে)।

সালাহ-গার্দিওলার বিদায়ের রাতে অবনমন বাঁচাল টটেনহাম

আসলে একটি মুহূর্ত যে অনেক সময় গোটা জীবনের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, এ যেন তারই রূপক। লিভারপুল থেকে বিদায়ে সালাহ নিজে যেমন কেঁদেছেন, তেমন কাঁদিয়েছেন লিভারপুল ভক্তদের। ‘অল রেড’দের হারানো গৌরব যাঁর পায়ে নতুন করে ফুল হয়ে ফুটেছে, তাঁর জন্য একটি দিন তো কান্না করাই যায়! দর্শকদের চোখের জলই আসলে সালাহর বিদায়ী অর্ঘ্য।

প্রিমিয়ার লিগ ‘ফ্লপ’ হিসেবে ২০১৬ সালে চেলসি ছেড়ে এএস রোমায় চলে গিয়েছিলেন। এরপর তাঁকে এএস রোমা থেকে লিভারপুলে নিয়ে আসেন ইয়ুর্গেন ক্লপ। পরের গল্পটা শুধুই ইতিহাস। ক্লপের অধীনে সালাহ হয়ে উঠলেন লিভারপুলের ‘নিউক্লিয়াস’।

সমর্থকদের সঙ্গে ছবি তুলছেন সালাহ

বিশেষ করে লিভারপুলের হয়ে দুর্দান্ত খেলা ফিলিপ কুতিনিওর ক্লাব ছাড়ার প্রভাব দলে পড়তেই দেননি সালাহ। আক্রমণভাগে সাদিও মানে ও রবার্তো ফিরমিনোর সঙ্গে গড়ে তোলে অসাধারণ এক ‘ত্রিফলা’। এরপর ধারাবাহিকভাবে লিভারপুলকে সাফল্য এনে দিয়েছেন সালাহ।

প্রথম মৌসুমেই সালাহ করেন রেকর্ড ৪৪ গোল। যদিও তখন অনেকে তাঁকে ‘এক মৌসুমে চমক’ বলেন। কিন্তু সেসব কটাক্ষ ভুলিয়ে দিতে সময় নেননি সালাহ। সালাহ থেকে খুব দ্রুতই হয়ে ওঠেন ভক্তদের ভালোবাসার ‘ইজিপশিয়ান কিং’। যেন রূপকথার কোনো এক গল্পের রাজা!

শুরুতে অবশ্য তাঁকে ‘ইজিপশিয়ান মেসি’ বলেও ডাকতেন অনেকে। তবে ‘মেসি’ নামের ছায়া থেকে বেরিয়ে সালাহ নিজেই হয়ে উঠেছেন স্বতন্ত্র এক ব্যক্তিত্ব। ফলে মেসির নামের সঙ্গে মিলিয়ে সালাহকে আর আলাদা করে চেনাতে হয় না। এরপর সালাহর হাত ধরেই লিভারপুল একে একে জিতেছে চ্যাম্পিয়নস লিগ, প্রিমিয়ার লিগসহ সম্ভাব্য সব ট্রফি।

ভেঙেছেন ছোট–বড় অসংখ্য রেকর্ডও। ইয়ান রাশ ও রজার হান্টের পর সালাহই এখন লিভারপুলের হয়ে তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা (২৫৭)। এমনকি গতকাল প্রিমিয়ার লিগ মৌসুমে শেষ ম্যাচেও গোলে সহায়তা করে লিগে গোল করানোর রেকর্ডে সালাহ (৯৩) টপকে যান লিভারপুল কিংবদন্তি স্টিভেন জেরার্ডকে (৯২)।

পরিবারের সঙ্গে সালাহ

শুধু মাঠেই নয়, মাঠের বাইরেও সালাহর অবদান অসামান্য। ২০১৭–১৮ মৌসুম থেকে ফুটবল রোমান্টিকদের ভাবনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে শুরু করে সালাহ নামের ‘মিথ’। তাঁকে ঘিরে তৈরি হয় ব্যাপক উৎসাহ। সেই উৎসাহ কেমন, একটি তথ্যে বোঝা যেতে পারে।

২০১৯ সালে এক গবেষণায় দেখা গেছে, সালাহর কারণে লিভারপুলে ‘ইসলামোফোবিয়া’ (ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের প্রতি বিদ্বেষ) উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে, যেখানে ‘হেট ক্রাইম’ (ঘৃণাজনিত অপরাধ) ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ কমার কথা বলা হয়। তাঁকে নিয়ে বানানো হয় গানও—যে গান লিভারপুল সমর্থকেরা আজীবন বুকে ধারণ করে রাখবেন।

লিভারপুল সমর্থকদের এমন ভালোবাসার কারণেই গতকাল রাতে সালাহর চোখ বারবার ভিজে উঠেছে। স্কাই স্পোর্টসকে বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, জীবনে যতবার কেঁদেছি, তার চেয়েও বেশি কেঁদেছি এবার। আমি আসলে খুব বেশি আবেগপ্রবণ মানুষ নই। আমরা এখানে আমাদের যৌবন কাটিয়েছি, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছু একসঙ্গে ভাগাভাগি করেছি। আমরা এই ক্লাবকে আবার প্রাপ্য জায়গায় ফিরিয়ে এনেছি।’

Read full story at source