সংগীতজগতের সফলতার আড়ালে লুকিয়ে ছিল বিশাল প্রতারণা

· Prothom Alo

সংগীতজগতের বিতর্কিত এক নাম—লু পার্লম্যান। নব্বইয়ের দশকে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় কিছু বয় ব্যান্ড গড়ে তোলার পেছনে ছিলেন এই সংগীত উদ্যোক্তা। ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ, এনসিঙ্ক–এর মতো ব্যান্ডের সাফল্যের নেপথ্য কারিগর হিসেবে প্রশংসা কুড়ালেও পরে তাঁর নাম জড়িয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারিতে। তাঁকে নিয়ে নির্মিত হয় তথ্যচিত্র ‘ডার্টি পপ: দ্য বয় ব্যান্ড স্ক্যাম’, যা ২০২৪ সালে মুক্তি পায় নেটফ্লিক্সে। তথ্যচিত্রটিতে পার্লম্যানের উত্থান, প্রতারণা, মামলা ও পতনের গল্প উঠে এসেছে তাঁর সঙ্গে কাজ করা শিল্পীদের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে।

লু পার্লম্যান

লু পার্লম্যান কে
১৯৫৪ সালের ১৯ জুন নিউইয়র্কে জন্মগ্রহণ করেন লু পার্লম্যান। তাঁর বাবা-মা ছিলেন হাই পার্লম্যান ও রিনি পার্লম্যান। সংগীতজগতের প্রতি আগ্রহের পেছনে বড় ভূমিকা ছিল তাঁর আত্মীয় আর্ট গারফাঙ্কেলের।

Visit moryak.biz for more information.

তরুণ বয়সে পার্লম্যান বিমানের প্রতি, বিশেষ করে ব্লিম্পের প্রতি আকৃষ্ট হন। সেই আগ্রহ থেকেই তিনি গড়ে তোলেন ‘এয়ারশিপ ইন্টারন্যাশনাল’ নামের প্রতিষ্ঠান। ১৯৯১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানটি ফ্লোরিডার অরল্যান্ডোতে স্থানান্তর করেন। মেটলাইফ ও সিওয়ার্ল্ডের মতো প্রতিষ্ঠান তাঁর ব্লিম্প সেবার গ্রাহক ছিল।

যদিও পরে এয়ারশিপ ইন্টারন্যাশনাল বন্ধ হয়ে যায়, তবে ফ্লোরিডায় চলে আসাটাই তাঁর জীবনের বড় মোড় হয়ে দাঁড়ায়। এখান থেকেই তিনি সংগীত ব্যবসায় প্রবেশ করেন এবং গড়ে তোলেন ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ।

যেসব শিল্পীর ক্যারিয়ার গড়েছিলেন
আশির দশকের শেষভাগ ও নব্বইয়ের শুরুতে নিউ কিডস অন দ্য ব্লকের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে পার্লম্যান প্রতিষ্ঠা করেন ট্রান্স কন্টিনেন্টাল রেকর্ডস। লক্ষ্য ছিল নতুন বয় ব্যান্ড তৈরি করা। এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম বড় প্রকল্প ছিল ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ। প্রায় ৩০ লাখ ডলারের ট্যালেন্ট সার্চের মাধ্যমে সদস্য বাছাই করা হয়। ব্যান্ডটি দ্রুত বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং পরে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি অ্যালবাম বিক্রি করা বয় ব্যান্ডে পরিণত হয়।

ব্যাকস্ট্রিট বয়েজের সাফল্যের পর পার্লম্যান গড়ে তোলেন এনসিঙ্ক। এরপর তিনি আরও কয়েকটি দল ও শিল্পীর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেন। এর মধ্যে ছিল ও-টাউন, এলএফও, টেক ফাইভ, ন্যাচারাল, মার্শাল ডিলন, ইউএসফাইভ, সলিড হারমনি, ইনোসেন্স, অ্যারন কার্টার, জর্ডান নাইট, স্মাইলজ অ্যান্ড সাউথস্টার এবং সি-নোট।

ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ

যেসব অপরাধে জড়িয়েছিলেন পার্লম্যান
নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকেই পার্লম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠতে শুরু করে। তাঁর শিল্পীরা অভিযোগ করেন, তিনি আয়-ব্যয়ের তথ্য গোপন করতেন এবং প্রতারণা করতেন। ১৯৯৮ সালে প্রথম মামলা করে ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ। তাদের অভিযোগ ছিল, ১৯৯৩ সাল থেকে তারা মাত্র তিন লাখ ডলার পেয়েছে, অথচ পার্লম্যান আয় করেছেন প্রায় এক কোটি ডলার। মামলার পর তিনি ব্যান্ডটির ম্যানেজারের পদ হারান, যদিও সমঝোতার মাধ্যমে তিন কোটি ডলার পান।

পরের বছর একই পথে হাঁটে এনসিঙ্ক। তারাও পার্লম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলার ফলে ব্যান্ডটির সদস্যরা নিজেদের নামের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় এবং পার্লম্যানকে ম্যানেজারের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
শুধু শিল্পীরাই নন, পরে পার্লম্যানের আইনজীবী চেনি ম্যাসনও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেন। অভিযোগ ছিল, পার্লম্যান তাঁর আইনগত সেবার কোটি কোটি ডলারের পারিশ্রমিক দেননি।

সংগীত উৎসবে ট্রুডো–কেটি পেরি, সারা রাত কী করলেন দুজন

পনজি স্কিম কেলেঙ্কারি
২০০৬ সালে পার্লম্যানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ সামনে আসে। তদন্তকারীরা জানতে পারেন, তিনি বহু বছর ধরে একটি বিশাল পনজি স্কিম পরিচালনা করছিলেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অন্তত ৩০ কোটি ডলার আত্মসাৎ করেন। বিভিন্ন ব্যাংকের কাছে তিনি ঋণগ্রস্ত ছিলেন এবং ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ ও এনসিঙ্ক–এর মতো জনপ্রিয় ব্যান্ডের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক ব্যবহার করে মানুষকে এমন সব প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করতেন, যেগুলোর বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই ছিল না।

২০০৭ সালে গ্রেপ্তারের পর ভ্যানিটি ফেয়ার–এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে তরুণ শিল্পীদের সঙ্গে তাঁর অনুপযুক্ত আচরণের অভিযোগও ওঠে। তবে এ বিষয়ে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন হয়নি।

লু পার্লম্যান

যেভাবে গ্রেপ্তার হন
পনজি স্কিমের অংশ হিসেবে পার্লম্যান বিভিন্ন দেশে ঘুরে বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রস্তাব দিতেন। তাঁর সঙ্গে থাকতেন ব্যান্ড ন্যাচারালের সদস্য মাইকেল জনসন। ২০০৭ সালে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে সফরের সময় পার্লম্যান নথি জাল করার বিষয়টি জনসনের কাছে স্বীকার করেন। তখনই জনসনের সন্দেহ হয়। পরে তিনি বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম ব্যবসার কাজে বিশ্ব ভ্রমণ করছি। পরে বুঝলাম, আসলে তিনি এফবিআইয়ের হাত থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন।’

সেই বছরের জুনে বালিতেই গ্রেপ্তার হন পার্লম্যান। তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, অর্থ পাচার এবং দেউলিয়াত্ব–সংক্রান্ত মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়।
শাস্তি

২০০৮ সালের ২১ মে পার্লম্যান অর্থ পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন। আদালত তাঁকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেন। তাঁর মুক্তির সম্ভাব্য তারিখ ছিল ২০২৯ সালের ২৪ মার্চ।
আদালত জানিয়েছিলেন, তিনি যদি আত্মসাৎ করা অর্থের কিছু অংশ উদ্ধার করতে সাহায্য করেন, তাহলে প্রতি ১০ লাখ ডলার ফেরতের বিপরীতে তাঁর সাজা এক মাস করে কমানো হবে। তবে নেটফ্লিক্সের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর পনজি স্কিমের ৪০ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ এখনো উদ্ধার হয়নি।

ইসরায়েলে কনসার্ট বাতিল করল ব্যাকস্ট্রিট বয়েজ

কারাগারে থাকা অবস্থায় দ্য হলিউড রিপোর্টার–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পার্লম্যান নিজেকে পুরোপুরি অপরাধী মনে করেননি। বার্নি ম্যাডফের সঙ্গে তুলনা করা হলে তিনি বলেন, ‘বার্নি সত্যিকারের অপরাধী ছিল। আমি তা নই। আমার তো বয় ব্যান্ড ব্যবসা ছিল। আমি বৈধ ব্যবসায়ী ছিলাম, শুধু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল।’

বিলবোর্ড–এর তথ্য অনুযায়ী, তাঁর ব্যবস্থাপনায় থাকা প্রায় সব সংগীত দলই একসময় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছিল।

কারাগারে মৃত্যু
২০১০ সালে কারাগারে থাকা অবস্থায় পার্লম্যান স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এরপর তাঁর নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। মৃত্যুর কিছুদিন আগে তাঁর হার্টের ভালভ পরিবর্তনের অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল, যার ফলে সংক্রমণ হয়। ২০১৬ সালের ১৯ আগস্ট মায়ামির ফেডারেল কারেকশনাল ইনস্টিটিউশনে কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে মারা যান লু পার্লম্যান।
তাঁর মৃত্যুর পর অনেক শিল্পী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান। জাস্টিন টিম্বারলেক লেখেন, ‘আশা করি তিনি শান্তি পেয়েছেন। ঈশ্বর তাঁর মঙ্গল করুন। শান্তিতে থাকুন, লু পার্লম্যান।’

অন্যদিকে এনসিঙ্ক–এর সদস্য ক্রিস কার্কপ্যাট্রিক ও ল্যান্স ব্যাস জানান, খবরটি তাঁদের মধ্যে ‘মিশ্র অনুভূতি’ তৈরি করেছে। ক্রিস লিখেছিলেন, ‘তিনি হয়তো আদর্শ ব্যবসায়ী ছিলেন না। কিন্তু তাঁর প্রভাব না থাকলে আমি আজ যা ভালোবাসি, তা করতে পারতাম না।’


পিপল

Read full story at source