‘কাগজে’ আছে, বাস্তবে উধাও ৮১ লাখ টাকার জেট ফুয়েল

· Prothom Alo

  • রেকর্ড জালিয়াতি, কাটাছেঁড়া, ঘষামাজা আর ভুয়া ‘পরিবহন ক্ষতি’ দেখিয়ে তেল চুরি করে বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।

    Visit casino-promo.biz for more information.

  • এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

পদ্মা অয়েল পিএলসির নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল ডিপো থেকে জেট ফুয়েল (জেট এ-১) বোঝাই করে চারটি ট্যাংকলরি ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেয়। গন্তব্য হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপো (কেএডি)।

নিবন্ধন বইয়ে ট্যাংকলরিগুলোর ঢোকার ও বের হওয়ার সময় লেখা আছে। জেট ফুয়েল গ্রহণের নথিতেও রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সই। তবে বাস্তবে লরিগুলো ডিপোতে ঢোকেনি, অর্থাৎ ৭২ হাজার লিটার তেল গায়েব করে দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট অসাধু ব্যক্তিরা।
গত ১১ মার্চ ঘটেছে তেল চুরির এ ঘটনা। পদ্মা অয়েল পিএলসির অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

গত এপ্রিলে করা এ তদন্তে উঠে এসেছে, রেকর্ড জালিয়াতি, কাটাছেঁড়া, ঘষামাজা আর ভুয়া ‘পরিবহন ক্ষতি’ দেখিয়ে এই তেল চুরি করে বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এই তেলের বাজারমূল্য ৮১ লাখ টাকা।

এই ১২৭ ট্যাংকলরির মধ্যে ৬২টির ধারণক্ষমতা ১৮ হাজার লিটার, ৬৫টির ধারণক্ষমতা ৯ হাজার লিটার। ৯ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ট্যাংকলরি প্রতিদিন দুটি করে ট্রিপ দেয়। আর ১৮ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার গাড়িগুলো এক দিন পরপর দুটি ট্রিপ পরিচালনা করে। এ ব্যবস্থায় প্রতিদিন ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন জেট এ-১ পরিবহন করা হয়।

‘নিরাপদ’ ব্যবস্থার মধ্যেই চুরি

পদ্মা অয়েল পিএলসি বলছে, জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। সম্প্রতি তদন্ত প্রতিবেদনটি প্রথম আলোর হাতে এসেছে। এরপর কোম্পানির বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তাঁরা জানান, পদ্মা অয়েলের চট্টগ্রামের প্রধান স্থাপনা থেকে প্রথমে ট্যাংকারে করে জেট এ-১ তেল পাঠানো হয় গোদনাইল ডিপোতে। সেখান থেকে কোম্পানির চুক্তিবদ্ধ ১২৭টি ট্যাংকলরির মাধ্যমে প্রতিদিন সড়কপথে কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে সরবরাহ করা হয় এ জ্বালানি তেল।

এই ১২৭ ট্যাংকলরির মধ্যে ৬২টির ধারণক্ষমতা ১৮ হাজার লিটার, ৬৫টির ধারণক্ষমতা ৯ হাজার লিটার। ৯ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ট্যাংকলরি প্রতিদিন দুটি করে ট্রিপ দেয়। আর ১৮ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার গাড়িগুলো এক দিন পরপর দুটি ট্রিপ পরিচালনা করে। এ ব্যবস্থায় প্রতিদিন ১ হাজার ৭০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন জেট এ-১ পরিবহন করা হয়।

এই পুরো প্রক্রিয়াকে নিরাপদ ধরে নেওয়া হয়। কারণ, এখানে নিবন্ধন বই, সিসিটিভি ফুটেজ, ডিপ (গভীরতা) রেকর্ড, তাপমাত্রা, ঘনত্ব—সবকিছু আলাদাভাবে সংরক্ষিত থাকে। তবে তদন্তে দেখা গেছে, এই ব্যবস্থার মধ্যেই তৈরি হয় ‘চোর চক্র’।

পুরো প্রক্রিয়াটি কয়েক ধাপে সম্পন্ন হয়। গোদনাইল ডিপো থেকে জেট ফুয়েল নিয়ে ট্যাংকলরি কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে পৌঁছায়। এরপর প্রতিটি গাড়ির তথ্য প্রধান ফটকে থাকা নিবন্ধন বইয়ে সংরক্ষণ করা হয়। নির্দিষ্ট কর্মকর্তা গাড়ির প্রতিটি চেম্বারের ডিপ বা গভীরতা মেপে জ্বালানির পরিমাণ নিশ্চিত করেন। এভিয়েশন ফুয়েল স্টক ট্রান্সফার অ্যাডভাইস নোট এবং রিলিজ সার্টিফিকেটে (এএসটিআর) সই করে তেল গ্রহণ দেখানো হয়। সবশেষে জ্বালানি ডিপোর মজুত ট্যাংকে স্থানান্তর করা হয়।

এই পুরো প্রক্রিয়াকে নিরাপদ ধরে নেওয়া হয়। কারণ, এখানে নিবন্ধন বই, সিসিটিভি ফুটেজ, ডিপ (গভীরতা) রেকর্ড, তাপমাত্রা, ঘনত্ব—সবকিছু আলাদাভাবে সংরক্ষিত থাকে। তবে তদন্তে দেখা গেছে, এই ব্যবস্থার মধ্যেই তৈরি হয় ‘চোর চক্র’।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অঙ্গপ্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল। জানতে চাইলে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনার পর পাঁচজনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি এভিয়েশন ডিপোতে কর্মরত আটজনকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনা তদন্তে বিপিসির পক্ষ থেকেও কমিটি করা হচ্ছে। কমিটির প্রতিবেদনের পর জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চার ট্যাংকলরি ‘উধাও’

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১১ মার্চ সকাল ৭টা ৪৫ মিনিট থেকে দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটের মধ্যে চারটি ট্যাংকলরি গোদনাইল ডিপো থেকে জেট এ-১ বোঝাই করে বের হয়। গাড়িগুলো চারটি ভিন্ন কোম্পানির। কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর নিবন্ধন বইয়ে (গেট রেজিস্টার) উল্লেখ করা হয়, ট্যাংকলরিগুলো সন্ধ্যা ৭টা ২৪ মিনিট থেকে ৭টা ২৭ মিনিটের মধ্যে ডিপোতে প্রবেশ করে।

কিন্তু তদন্ত কমিটি সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ভিন্ন তথ্য পায়। ফুটেজে দেখা যায়, ট্যাংকলরির একটিও কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোতে ঢোকেনি। তদন্তকারীরা নিরাপত্তাকর্মীদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, নিরাপত্তারক্ষী মানিক কুমার রায় ও সিকিউরিটি সুপারভাইজার মো. শওকত হোসেন স্বীকার করেছেন, ডিপো ব্যবস্থাপক সাইদুল হকের নির্দেশে গাড়ি না ঢুকলেও নিবন্ধন বইয়ে প্রবেশ দেখানো হয়েছিল।

শুধু তা–ই নয়, জ্বালানি গ্রহণের নথিতেও একই ধরনের জালিয়াতি করা হয়। চুক্তিভিত্তিক জুনিয়র কর্মকর্তা ছমীর উদ্দিন তেলের গভীরতা ও তাপমাত্রা উল্লেখ করে এভিয়েশন ফুয়েল স্টক ট্রান্সফার অ্যাডভাইস নোট এবং রিলিজ সার্টিফিকেটে সই করেন। ডিপোর চেকার আকতার কামাল গাড়ি না ঢুকলেও ডিপ (গভীরতা মাপা) নেওয়ার তথ্য দেন।

বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান এ ঘটনার পর পাঁচজনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি এভিয়েশন ডিপোতে কর্মরত আটজনকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনা তদন্তে বিপিসির পক্ষ থেকেও কমিটি করা হচ্ছে। কমিটির প্রতিবেদনের পর জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কাটাছেঁড়া, ঘষামাজা আর ‘পরিবহন ক্ষতি’

তদন্তে উঠে এসেছে, ট্যাংকলরিগুলো ডিপোতে না ঢোকার পরও কাগজে-কলমে জ্বালানি গ্রহণ দেখিয়ে পরে সেই গরমিল আড়াল করার চেষ্টা করা হয়। এ কাজেই ব্যবহার করা হয় ট্যাংকের মজুত রেকর্ড ও ভুয়া পরিবহন ক্ষতির হিসাব।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, কাগজপত্রে দেখানো হয়েছিল চারটি ট্যাংকলরি থেকে কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর ৭ নম্বর ট্যাংকে জেট এ-১ গ্রহণ করা হয়েছে। রেকর্ড অনুযায়ী, গ্রহণ শেষে ওই ট্যাংকে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ৪ লাখ ৩৭ হাজার ২৭৩ লিটার জেট এ-১ মজুত ছিল।

কিন্তু পরদিন ১২ মার্চের ট্যাংক রিলিজ সার্টিফিকেটে দেখা যায়, একই ট্যাংকে মজুত আছে ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫৪৬ লিটার জেট এ-১, অর্থাৎ দুই হিসাবের মধ্যে পার্থক্য দাঁড়ায় ৭৩ হাজার ৭২৭ লিটার।

তদন্ত কমিটি এরপর ট্যাংক স্টক লেজার রেজিস্টার (টিএসএলআর) পরীক্ষা করে আরও গুরুতর তথ্য পায়। সেখানে দেখা যায়, ১২ মার্চ কোনো ধরনের পরিচালন কার্যক্রম ছাড়াই ৭৩ হাজার ৮৯৫ লিটার তেল পরিবহন ক্ষতি হিসেবে দেখানো হয়েছে।
তদন্ত কমিটি বলেছে, এই গরমিল সামাল দিতে রেকর্ডে কাটাছেঁড়া ও ঘষামাজা করে বিপুল পরিমাণ তেলকে পরিবহন ক্ষতি হিসেবে দেখানো হয়। এর মাধ্যমে ট্যাংক স্টক রেকর্ড থেকে তেল সমন্বয়ের চেষ্টা করা হয়েছিল।

তদন্তে যাঁদের নাম এল

তদন্ত প্রতিবেদনে কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপোর ব্যবস্থাপক মো. সাইদুল হককে পুরো ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী ও নিয়ন্ত্রক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্যাংক স্টক লেজার নিয়মিত হালনাগাদ না হওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি অন্যদের সহযোগিতায় ৭২ হাজার ১৩২ লিটার জেট এ-১ আত্মসাতের অপচেষ্টা করেন। এতে কোম্পানির আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি সুনামও ক্ষুণ্ন হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চুক্তিভিত্তিক জুনিয়র কর্মকর্তা ছমীর উদ্দিন ও চেকার আকতার কামাল জালিয়াতির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। এ ছাড়া সিকিউরিটি সুপারভাইজার শওকত হোসেন ও নিরাপত্তারক্ষী মানিক কুমার রায় ব্যবস্থাপকের নির্দেশ পালন করে অনিয়মে সহায়তা করেছেন।

ঘটনার পর সাইদুল হক, ছমীর উদ্দিন, আকতার কামাল, শওকত হোসেন ও মানিক কুমার রায়কে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সাইদুল হক তেল চুরিতে জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘অন্য কর্মকর্তারা এ কাজ করেছেন। আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে।’

কারা তেল চুরি করেছে—এমন প্রশ্নে সাইদুল হক দাবি করেন, ডিপোর সকালের শিফটে দায়িত্বরত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এ ঘটনা ঘটতে পারে।
তেল চুরির বিষয়ে ছমীর উদ্দিন তদন্ত কমিটিকে বলেছিলেন, চারটি ট্যাংকলরি ডিপোতে আসার পর তিনি তেল গ্রহণ করেছিলেন। গত সোমবার প্রথম আলোর কাছেও একই দাবি করেন তিনি। তবে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ছমীর উদ্দিন ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। একই বিষয়ে জানতে আকতার কামালকে ফোন করলে তিনি রিসিভ করেননি।

পদ্মা অয়েল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তে তেল গায়েব হওয়ার সত্যতা পাওয়া গেছে। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে, যাতে গায়েব হওয়া তেল কোথায় গেছে এবং আর কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা খুঁজে বের করা যায়।

Read full story at source