মেসির হাতে ট্রফি দেখার সেই দীর্ঘ অপেক্ষা

· Prothom Alo

সাল ২০১০, তখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ি। খেলাধুলা বলতে ক্রিকেটপাড়ায় মুশফিকসহ চার-পাঁচেক খেলোয়াড়দের নাম মুখস্থ! রেডিও থাকার সুবাদে খেলার বিবরণী শোনার নেশা তখন হালকা হালকা করে নিজের মধ্যে বুঁদ হচ্ছিল।

Visit saltysenoritaaz.org for more information.

ফুটবল বিশ্বকাপের মহড়ায় যখন সবাই দল নিয়ে টানাটানি করত তখন ফুটবলের এত মহাতারকা চিনতাম না। বিশ্বস্ত কয়েকজনের মাধ্যমে জানতে পারলাম আর্জেন্টিনার মেসি নামের একজন খেলোয়াড় আছে, যাঁর খেলার ধরন অনেক পাগলাটে স্বভাবের। পায়ে বল মানে এলাহি কাণ্ড! সেই থেকে মেসি এবং আর্জেন্টিনা নামক দলটার প্রতি ভালো লাগা।

ফেসিনেশনের জায়গা থেকে তখন আর্জেন্টিনা নিয়ে নানা আগ্রহ। কখনো স্টিকারের দোকানে গিয়ে মেসির স্টিকার কেনা, পাশাপাশি গোটা আর্জেন্টিনার দলের সবার ছবি লাগবে এই নেশায় মত্ত হয়ে উঠলাম! যেহেতু সব কটি খেলোয়াড়দের নাম জানা নেই, তাই আমার দরকার এমন স্টিকার, যেখানে সব খেলোয়াড়ের ছবি ও নাম লেখা থাকবে।

বন্ধুদের মধ্যেও তখন রমরমা দলাদলি; কে কোন দলের সাপোর্টার এটা নিয়ে ক্লাসের অবসরে নানা বিতর্ক। কোন দলের সমর্থকগোষ্ঠী ভারী, এটা নিয়েও বেশ আলোচনা। আলোচনার কেন্দ্রে কোন দল কতটা কাপ নিয়েছে, এটাই বড় পার্থক্য হিসেবে বেশির ভাগ সময়ই বড় এক্স–ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করত। ব্রাজিলের পাঁচটা বিশ্বকাপ আছে বিবেচনায় কেন জানি সমর্থক গোষ্ঠীর সংখ্যাটা ভারী। এত এত বড় সমর্থক গোষ্ঠীর ভিড়ে ঠিক প্রথম দিকে শোনা মেসি ও আর্জেন্টিনা অন্য রকম ভালো লাগার জায়গায় চলে আসছিল, তা নিজেই আঁচ করে উঠতে পারিনি। তখন কথা–চালাচালির সময়ে চেষ্টা থাকত মেসি ও আর্জেন্টিনাকে যেন কথাতেই জয়ী করতে হবে এমন ভাবনা।

যেহেতু মাত্র দল চেনা ও সমর্থক হওয়া, সবার নাম জানা নেই; তাই আমার প্রধান লক্ষ্য ছিল সব খেলোয়াড়ের নাম জানা। এ সমস্যার সমাধান খুঁজতে ঘুরেফিরে সেই স্টিকারের দোকানির শরণাপন্ন হয়ে তার মাধ্যমে একটা ফুটবল ক্যালেন্ডার সংগ্রহ করলাম ১০ টাকায়। যার মধ্যে সব খেলোয়াড়ের নামসহ ছবি আছে। এই ক্যালেন্ডার আনন্দ রীতিমতো আমাকে শৈশবের সেরা সুখ দিয়েছিল।

বাড়িতে পড়ার টেবিলঘেঁষা টিনের দেয়ালের লোহায় ক্যালেন্ডারটা ঝুলিয়ে প্রথম দিকে পড়ার সময় ক্যালেন্ডারেই তাকিয়ে থাকতাম বেশি। ক্যালেন্ডারের সুবাদে ধীরে ধীরে মেসির পাশাপাশি কার্লোস তেভেজ, ডি মারিয়া, হিগুয়েইনের নাম জানতে পারি।

যেভাবে যাত্রা শুরু ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপেরছবি: লেখকের সৌজন্যে

এভাবেই দিন গড়াতে বিশ্বকাপ চলে আসে। ছোট থাকায় সেভাবে সব খেলা দেখার সাধ থাকলেও সুযোগ হয়নি। বাড়িতে টেলিভিশন থাকলেও খেলা দেখার মানুষ ছিল কম। সময়েরও একটা ব্যাপার থাকত; তাই সেভাবে সেই বিশ্বকাপে দর্শক হিসেবে সুখকর স্মৃতি নেই বলা যায়।

এরপর দিন যত যাচ্ছিল মেসি ও আর্জেন্টিনাকেন্দ্রিক ভালো লাগা বাড়তে থাকে। এভাবে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ আসার আগেই মোটামুটি সর্বজান্তাদের একজন!
ফুটবল, মেসি ও আর্জেন্টিনা নিয়ে আমার চুলচেরা বিশ্লেষণ ও কথাতে জিততে পারি এই মানসিকতা প্রকটভাবে বাড়তে থাকে। দীর্ঘ ২৮ বছরের খরা কাটিয়ে একজন আর্জেন্টাইন ফ্যান হিসেবে তৃতীয় শিরোপা এবং সমর্থক হিসেবে নিজের দেখা প্রথম ফাইনাল ও সোনালি ট্রফির স্বাদ রীতিমতো অনেকটাই সীমাহীন প্রত্যাশা ছিল।

২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের গোলে হারে পর জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখটা পেয়েছিলাম। রাজ্যের সব খারাপ লাগা নিজের ওপর ভর করে বসে তখন। একদিকে ফাইনালে হেরে যাওয়া, অন্যদিকে প্রতিপক্ষ ব্রাজিলের আনন্দ–উল্লাস রীতিমতো বিষফোড়ার মতো লাগছিল।

এভাবে দিন গড়াচ্ছিল আর মেসি নামক ভিনগ্রহের এই মানুষটার প্রতি মায়াও বাড়ছিল! তাঁর হাতে একটা ট্রফি দেখার ইচ্ছে প্রবলভাবে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। হতাশার সুর আরও ভারী করে তোলে ২০১৫ সালের কোপা আমেরিকায় চিলির বিপক্ষে ম্যাচটি গোলশূন্য (০-০) ড্র হওয়ার পর, টাইব্রেকারে ৪-১ গোলে হেরে আর্জেন্টিনার রানারআপ হওয়া। একইভাবে ২০১৬ সালে কোপায়ও চিলির বিপক্ষে আবারও গোলশূন্য (০-০) ড্রয়ের পর টাইব্রেকারে ৪-২ গোলে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয়।

গোটা দুনিয়ায় ফ্যানবেজ হিসেবে নিজেকে তখন খুবই হতভাগাই মনে হচ্ছিল। এরপর নতুন করে স্বপ্নবুননে ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্বের লড়াই পার করলেও নকআউট পর্বের শুরুতেই বিদায় নেয়। শেষ ষোলোর ম্যাচে তারা ফ্রান্সের কাছে ৪-৩ ব্যবধানে পরাজিত হয়ে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায়। এই সমীকরণগুলো একটা সময় হারতে হারতে রীতিমতো সমর্থক হিসেবে মেনে নেওয়া একটা রীতিতে পরিণত হয়ে ওঠে। তবু মনের ঈষাণকোণে স্বপ্ন সজাগ ছিল শুধু মেসির জন্য। দিন শেষে এই মানুষটা একটা শিরোপার ছোঁয়া যেন পায়।

সবশেষে একজন সমর্থক হিসেবে ২০২১ সালে একটা তৃপ্তির ঢেকুর নিতে পারি, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে কোপা আমেরিকার শিরোপাজয় ও শিরোপাখরা কাটিয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে। এই শিরোপা একজন সমর্থক হিসেবে আমার ১১ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটায়।

পরে আর্জেন্টিনার অনবদ্য জয়রথ ও বিশ্বজয়ের ইতিহাস সবার জানা থাকলেও আমার কাছে একজন সমর্থক হিসেবে প্রথম শিরোপার অপেক্ষার দীর্ঘ ১১ বছরের লম্বা জার্নিটাকে অনবদ্য একটা ইতিহাস মনে হয়। সমর্থনের এখনো অমলিন এই ১১ বছরের স্মৃতি।

সভাপতি, ময়মনসিংহ বন্ধুসভা

Read full story at source